চার মাস না পেরোতেই হোঁচট খেলো করোনাভাইরাস প্রতিরোধী টিকাদান কর্মসূচি। ভারতের সেরাম ইন্সটিটিউটের সঙ্গে তিন কোটি ডোজের চুক্তি হলেও এসেছে এক কোটি দুই লাখ ডোজ। হাতে আছে আর চার লাখ সাত হাজার ৮৭০ ডোজ। এই মুহূর্তে দরকার আরও প্রায় ১৫ লাখ ডোজ। স্বাস্থ্য অধিদফতরও একাধিকবার জানিয়েছে, টিকা নিয়ে সংকট না কাটলে প্রথম ডোজ নেওয়া সবাইকে দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া যাবে না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অন্য অনেক দেশ একাধিক প্রতিষ্ঠানের ভ্যাকসিন ব্যবহার করছে। সেখানে আমাদের কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করে থাকাটা ঠিক হয়নি।
অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা পেতে সরকার যুক্তরাষ্ট্র-কানাডাকে অনুরোধ করেছে। তবে অনুরোধে এখনও সাড়া মেলেনি।
গত ১৬ মে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মুখপাত্র অধ্যাপক ডা. নাজমুল ইসলাম বুলেটিনে জানান, যা টিকা আছে তাতে আর এক সপ্তাহ দ্বিতীয় ডোজ চালানো যাবে।
৭ ফেব্রুয়ারি জাতীয়ভাবে করোনা ভাইরাস প্রতিরোধী টিকাদান কর্মসূচি শুরু হবার পর থেকে গতকাল (২২ মে) পর্যন্ত টিকা দেওয়া হয়েছে ৯৭ লাখ ৯২ হাজার ১৩০ ডোজ। সবকটাই ছিল অক্সফোর্ডের অ্যাস্ট্রাজেনেকার উদ্ভাবিত ও ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটের তৈরি কোভিশিল্ড ভ্যাকসিন।
স্বাস্থ্য অধিদফতর জানায়, এখন পর্যন্ত ভ্যাকসিনের প্রথম ডোজ নিয়েছেন ৫৮ লাখ ১৯ হাজার ৯১২ জন। দ্বিতীয় ডোজ নিয়েছেন ৩৯ লাখ ৭২ হাজার ২১৮ জন। দুই ডোজ মিলিয়ে ৯৭ লাখ ৯২ হাজার ১৩০ ডোজ দেওয়া হয়েছে। শনিবার দ্বিতীয় ডোজ নিয়েছেন ৪১ হাজার ৪৬৭ জন।
এর মধ্যে স্বাস্থ্য অধিদফতর জানালো, প্রথম ডোজ নেওয়া ১৪ লাখ ৩৯ হাজার ৮২৪ জনের দ্বিতীয় ডোজ নেওয়া নিয়েই দেখা দিয়েছে সংকট।
প্রথম ডোজ নেওয়া সবাইকে অক্সফোর্ড অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকারই দ্বিতীয় ডোজ দিতে হবে বলেও জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদফতর। কেননা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এখনও দুই কোম্পানির দুই টিকার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত দেয়নি।
ধৈর্যশীল হওয়ার অনুরোধ
এদিকে, টিকা সংকট দেখা দেওয়ায় ২৬ এপ্রিল থেকে প্রথম ডোজ দেওয়া বন্ধ ঘোষণা করে স্বাস্থ্য অধিদফতর। ২ মে’র পর থেকে বন্ধ করে দেওয়া হয় টিকার জন্য নিবন্ধনও। দ্বিতীয় ডোজ দিতে গিয়ে সেটা না পাওয়াতে বেশকিছু টিকাদান কেন্দ্রে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে মানুষ।
কোভিড-১৯ বিষয়ক জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটি বলেছে, যেসব দেশে ভ্যাকসিন তৈরিতে সেই দেশের সরকারের সম্পৃক্ততা আছে তাদের সঙ্গেই যোগাযোগ করা প্রয়োজন। তবে সরকার এ বিষয়ে আন্তরিক ও সক্রিয়ভাবে প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে ও বিকল্প অনুসন্ধান করছে জানিয়ে কমিটি সুপারিশ করেছে- প্রথম ডোজের ৮ থেকে ১২ সপ্তাহের মধ্যেও দ্বিতীয় ডোজ নেওয়া যায়। কোনও কোনও দেশ ১৬ সপ্তাহ পরেও দ্বিতীয় ডোজের টিকা দিচ্ছে।
এ নিয়ে সকলকে ধৈর্যশীল হওয়ার জন্য অনুরোধ করে কমিটির বৈঠকে স্বাস্থ্য বিভাগকে টিকার পরিস্থিতি ও সরকারের বিকল্প পরিকল্পনা জনগণকে জানানোর পরামর্শ দেওয়া হয়।
টিকার মজুত সম্পর্কে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদফতরের ভ্যাকসিন ডেপ্লয়মেন্ট কমিটির সদস্য সচিব ডা. শামসুল হক বলেন, ‘কোনও কেন্দ্রে টিকা শেষ হয়ে গেছে। কোথাও চার-পাঁচদিন, আর কোথাও সাত-আট দিন দেওয়া যাবে। তবে কোথাও শেষ হয়ে গেলে সেখানে পাঠানোর মতো টিকা আমাদের হাতে নেই।’
জনস্বাস্থ্যবিদ অধ্যাপক ডা. লিয়াকত আলী বলেন, ‘সরকার চেষ্টা করছে। এক সোর্সের ওপর নির্ভর না করে বিভিন্ন উৎসের সঙ্গে যোগাযোগ করার দরকার ছিল প্রথম থেকেই। আমরা এমনটা বার বার বলেছিলাম।’
এখন ভ্যাকসিন মিক্স করা যায় কিনা সে বিষয়ে চিন্তা ভাবনা চলছে জানিয়ে তিনি বলেন, যতক্ষণ না বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অনুমোদন না দেবে ততোক্ষণ বাংলাদেশের বিশেষজ্ঞ কমিটিও এ নিয়ে কিছু বলবে না।
‘যদিও বৈজ্ঞানিকভাবে এটা সম্ভব হবে বলেই মনে হচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও অনুমোদন দেবে বলেই আমি মনে করছি।’ বলেন ডা. লিয়াকত।
তিনি আরও বলেন, ‘আমেরিকা যে টিকা মজুত করে দরিদ্র দেশগুলোতে দিতে চেয়েছে সেটা তারা এফডিএ (আমেরিকার ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন)-এর অনুমোদন না দেওয়া পর্যন্ত দিতে পারবে না। জুন নাগাদ এফডিএ সেই অনুমোদন দিতে পারে।’
‘একজন ল্যাবরেটরি পারসন হিসেবে আমি কখনই সিঙ্গেল সোর্সের ওপর নির্ভর করি না’, এমনটা জানালেন কোভিড-১৯ বিষয়ক জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির সদস্য অধ্যাপক ডা. ইকবাল আর্সলান।
বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘যেকোনও কিছুর সরবরাহে একক উৎসের ওপর নির্ভর করাটা বোকামি। বিশেষ করে মেডিক্যাল সাপ্লাই চেইন সবসময় একাধিক উৎস নির্ভর হতে হয়।’
জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটি শুরু থেকেই একাধিক উৎসের সঙ্গে পরামর্শ করার সুপারিশ করেছিল জানিয়ে অধ্যাপক আর্সলান বলেন, ‘এতো সুন্দরভাবে টিকাদান কর্মসূচি শুরু হলো। এখন হোঁচট খেতে হলো। মানুষের মনে শঙ্কা। টিকাদান কর্মসূচিও গতি হারালো।’









