হোটেল কক্ষে তরুণ-তরুণীকে হত্যা: সিনেমাকেও হার মানানো ঘটনা

বাংলা ট্রিবিউন ডেস্ক
০৭ মে ২০২৬, ১৬:০৬আপডেট : ০৭ মে ২০২৬, ১৭:৫৪

রাজশাহীর বোয়ালিয়া এলাকার সেই ভোরটা শুরু হয়েছিল একেবারে ভিন্নরকম ধারণা দিয়ে। হোটেল নাইস ইন্টারন্যাশনালের ৩০৩ নম্বর কক্ষ—ভেতর থেকে বন্ধ দরজা, সিলিং ফ্যানে ঝুলন্ত এক তরুণ আর বিছানায় নিথর পড়ে থাকা এক তরুণী।

ময়নাতদন্তে একটিকে আত্মহত্যা, আরেকটিকে ধর্ষণের পর হত্যার ইঙ্গিত মিললেও তদন্তের শুরুতে পুরো ঘটনাই “আত্মহত্যা” হিসেবে চূড়ান্ত প্রতিবেদনের দিকে এগোয়।

কিন্তু যে দৃশ্য একবারে শেষ বলে মনে হয়েছিল, সেটাই ধীরে ধীরে পরিণত হয় এক ভয়াবহ অপরাধের দরজায়—যেখানে আত্মহত্যার সাজানো নাটকের আড়ালে লুকিয়ে ছিল পরিকল্পিত সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও হত্যা।

চলতি বছরের জানুয়ারিতে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) থেকে প্রকাশিত ‘পরিচয়হীন অজ্ঞাতনামা মৃতদেহ এবং ক্লুলেস মার্ডার মামলার তদন্ত’ শিরোনামে প্রকাশিত বইয়ে এ ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে।

এতে বলা হয়েছে, ২০১৬ সালের ২২ এপ্রিল ভোরে হোটেল নাইস ইন্টারন্যাশনালের চতুর্থ তলার ৩০৩ নম্বর কক্ষ থেকে উদ্ধার হয় দুই তরুণ-তরুণীর ঝুলন্ত ও নিথর দেহ। নিহতরা হলেন পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী সুমাইয়া নাসরীন (২১) এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মিজানুর রহমান (২৩)।

শুরুতে ঘটনাটিকে আত্মহত্যা হিসেবে ধরে নেয় পুলিশ। পরে মেয়ের বাবা মো. আ. করিম অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা ও ধর্ষণের অভিযোগে মামলা করেন। কিন্তু প্রায় ১০ মাস তদন্ত শেষে থানা পুলিশ চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয় “তথ্যগত ভুল” উল্লেখ করে, যেখানে মূলত ঘটনাটিকে আত্মহত্যার দিকেই ইঙ্গিত করা হয়।

কিন্তু সেই রিপোর্টে সন্তুষ্ট হয়নি রাষ্ট্রপক্ষ। বিজ্ঞ পিপির আপত্তির পর আদালত স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে তদন্তভার দেয় পিবিআই রাজশাহীকে। এখান থেকেই শুরু হয় আসল রহস্য উন্মোচন।

ছায়াতদন্তে ক্রাইমসিন বিশ্লেষণ করে পিবিআই যে অস্বাভাবিক বিষয়গুলো খুঁজে পায়, তা পুরো ঘটনাকে উল্টে দেয়—কক্ষে পাওয়া যায় ৬ ধরনের সিগারেট ফিল্টার, অথচ ভিকটিমরা ধূমপায়ী ছিলেন না। ঝুলন্ত অবস্থায় থাকা মিজানুর রহমানের দুই হাত বাঁধা ছিল। সুমাইয়ার মাথার বালিশে রক্তমাখা হাতের ছাপ পাওয়া যায়, অথচ নিহত কারও হাত রক্তাক্ত ছিল না। ভিকটিমের জিন্স অস্বাভাবিকভাবে ওঠানো অবস্থায় ছিল। আর মিজানের হাতে থাকা মোবাইল ফোন দিয়ে আত্মহত্যামূলক পোস্ট দেওয়ার বাস্তব সম্ভাবনাও ছিল না।

এই “অসম্ভবের সমষ্টি” থেকেই তদন্ত মোড় নেয় নতুন দিকে।

পিবিআই কললিস্ট বিশ্লেষণ, প্রযুক্তিগত তথ্য এবং স্থানীয় সাক্ষীদের মাধ্যমে একজন সন্দেহভাজনকে শনাক্ত করে। পরে তাকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসে ভয়াবহ সত্য। ওই ব্যক্তি ঘটনার দায় স্বীকার এবং আরও কয়েকজনের নাম প্রকাশ করে।

পরে তিন জন আসামি আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। তাদের বক্তব্যে উঠে আসে একটি পরিকল্পিত প্রতিশোধের গল্প—ত্রিভুজ প্রেমকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ক্ষোভ, প্রতিশোধ এবং পরিকল্পিত হত্যার নীলনকশা।

তদন্তে জানা যায়, ওই তরুণীর প্রাক্তন প্রেমিক ও তার সহযোগীরা পরিকল্পিতভাবে হোটেল কক্ষের জানালা দিয়ে প্রবেশ করে। এরপর মিজানকে শারীরিকভাবে আঘাত করে হত্যা করা হয়। পরে সুমাইয়াকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের পর বালিশচাপা দিয়ে হত্যা করে তারা।

এরপর ঘটনাকে আত্মহত্যা হিসেবে সাজাতে মিজানের মরদেহ সুমাইয়ার ওড়না দিয়ে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। এমনকি মিজানের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে আত্মহত্যার পোস্টও করা হয়, যাতে ঘটনাটিকে আত্মহত্যা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যায়।

তদন্তে আরও উঠে আসে, আসামিরা হোটেলের পেছনের মার্কেটের ছাদ ও জানালা ব্যবহার করে রুমে প্রবেশ ও প্রস্থান করে, এবং হোটেল বয়ের সহযোগিতার বিষয়ও সামনে আসে।

সব প্রমাণ, স্বীকারোক্তি ও ফরেনসিক বিশ্লেষণের ভিত্তিতে পিবিআই মোট ৬ জন আসামির বিরুদ্ধে ২০১৯ সালের ৪ এপ্রিল অভিযোগপত্র দাখিল করে। ঘটনাটি তদন্ত করেন পিবিআই রাজশাহী জেলার এসআই (নিরস্ত্র) মহিদুল ইসলাম।

এ ঘটনা সম্পর্কে পিবিআই’র ‘ক্লুলেস মার্ডার মামলার তদন্ত’ বইয়ে বলা হয়েছে,  থানা পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে যেসব জায়গা উপেক্ষিত ছিল; সেগুলো হলো—বন্ধ দরজাকে “আত্মহত্যার প্রমাণ” হিসেবে ধরে নেওয়া, জানালা দিয়ে প্রবেশের সম্ভাবনা না দেখা, হাত বাঁধা অবস্থার ব্যাখ্যা না খোঁজা এবং রক্তমাখা হাতের ছাপকে গুরুত্ব না দেওয়া—সেগুলোই শেষ পর্যন্ত পুরো মামলার মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

পিবিআইয়ের ভাষায়, এই মামলা আবার প্রমাণ করেছে—ক্রাইমসিনকে উপেক্ষা করলে সত্য চাপা পড়ে যায়, আর সঠিকভাবে বিশ্লেষণ করলে “আত্মহত্যা” মনে হওয়া ঘটনার আড়ালে থাকা পরিকল্পিত হত্যার পর্দা উন্মোচন করা যায়।

/এম/এমওএফ/ 
সম্পর্কিত
ইতালিতে হত্যাকাণ্ডের শিকার পরিবারটিকে পাঠানো উড়োচিঠিতে কী আছে
রোমে ৩ বাংলাদেশিকে হত্যা, যাকে খুঁজছে ইতালি পুলিশ
মা ও তিন মেয়েকে হত্যায় অভিযুক্তকে যেভাবে আটকালেন এক নারী
সর্বশেষ খবর
নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও চার্জিং অবকাঠামোর ঘাটতিতে পিছিয়ে ইভির প্রসার
নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও চার্জিং অবকাঠামোর ঘাটতিতে পিছিয়ে ইভির প্রসার
‘বীমা খাতে আস্থা ফেরাতে ডিজিটাল রূপান্তর ও সুশাসনের বিকল্প নেই’
‘বীমা খাতে আস্থা ফেরাতে ডিজিটাল রূপান্তর ও সুশাসনের বিকল্প নেই’
রেস্তোরাঁয় রেখে যাওয়া শিশুটি পাকিস্তানি, কী ঘটেছিল জানালেন বাবা-মা
রেস্তোরাঁয় রেখে যাওয়া শিশুটি পাকিস্তানি, কী ঘটেছিল জানালেন বাবা-মা
বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিরা মেট্রোরেলে কী সুবিধা পেতে যাচ্ছেন
বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিরা মেট্রোরেলে কী সুবিধা পেতে যাচ্ছেন
সর্বাধিক পঠিত
‘ব্যবস্থা না নিলে এমপি পদ থেকে পদত্যাগ করবো’
‘ব্যবস্থা না নিলে এমপি পদ থেকে পদত্যাগ করবো’
ভিটামিন এ প্লাস ক্যাম্পেইন: কারা খাবে না ক্যাপসুল, কারা খেতে পারবে?
ভিটামিন এ প্লাস ক্যাম্পেইন: কারা খাবে না ক্যাপসুল, কারা খেতে পারবে?
আগুনে পুড়ে ছাই সাবেক উপদেষ্টার চেম্বার, প্রাণ হারালেন দুই কর্মচারী
আগুনে পুড়ে ছাই সাবেক উপদেষ্টার চেম্বার, প্রাণ হারালেন দুই কর্মচারী
ইজারা দেওয়া হবে রেলওয়ে পশ্চিমাঞ্চলের ১১ ট্রেন
ইজারা দেওয়া হবে রেলওয়ে পশ্চিমাঞ্চলের ১১ ট্রেন
তীব্র গরমেও কেন এসি ব্যবহার করতে পারছে না ইউরোপ
তীব্র গরমেও কেন এসি ব্যবহার করতে পারছে না ইউরোপ