মা ও তিন মেয়েকে হত্যায় অভিযুক্তকে যেভাবে আটকালেন এক নারী

লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি
২৭ জুন ২০২৬, ১০:২৭ আপডেট : ২৭ জুন ২০২৬, ১০:২৭

লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে মা ও তিন মেয়েকে হত্যার ঘটনায় অভিযুক্ত অন্তর মজুমদার (৩০) একসময় ভুক্তভোগীদের প্রতিবেশী ছিলেন। তবে বাড়িওয়ালা তাকে বাসা থেকে বের করে দিয়েছিলেন। এক বছর পর আবার ওই বাসায় আসেন অভিযুক্ত যুবক। ঘটনার পর দেখে সন্দেহ হওয়ায় গেট আটকে তাকে অবরুদ্ধ করেন এক নারী। পরে স্থানীয়দের পিটুনিতে গুরুতর আহত হন অন্তর এবং হাসপাতালে নেওয়ার পর মারা যান।

বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) সকাল সাড়ে ৮টার দিকে ওই বাসায় ঢুকে ভ্রাম্যমাণ ফল ব্যবসায়ী অন্তর মজুমদার দা দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করেন শাহিনুর বেগম ও তার তিন মেয়েকে। লক্ষ্মীপুরের রায়পুর পৌরসভার ধানহাটা-গোডাউন রোড এলাকার ভাড়া বাসায় এ ঘটনা ঘটে।

এ ঘটনায় নিহতরা হলেন- মা শাহিনুর বেগম, তার বড় মেয়ে ঢাকার আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ থেকে গত বছর এইচএসসি পাস করা সায়মা আক্তার (২০), মেজো মেয়ে রায়পুর সরকারি মার্চেন্টস একাডেমি থেকে এসএসসি পরীক্ষা দেওয়া নাফিসা আক্তার ইকরা (১৬) ও ছোট মেয়ে একই প্রতিষ্ঠানের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী সিফা আক্তার (৯)। তাদের সবাইকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়।

জানা গেছে, ওই যুবকের নাম অন্তর মজুমদার। বয়স আনুমানিক ৩০। তিনি নোয়াখালী জেলার সুবর্ণচর এলাকার কার্তিক মজুমদারের ছেলে। রায়পুর শহরের ভ্রাম্যমাণ ফল বিক্রেতা ছিলেন।

ভুক্তভোগীদের পরিবার সূত্রে জানা গেছে, শাহিনুর বেগমের বাড়ি কুমিল্লা জেলায়। তারা বেশ কয়েক বছর ধরে রায়পুরের ওই বাসায় ভাড়া আছেন। তার বড় মেয়ে সায়মা আক্তার আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেছেন। মেজো মেয়ে নাফিজা আক্তার ইকরা রায়পুর সরকারি মার্চেন্টস একাডেমি থেকে এসএসসির ফলপ্রত্যাশী ছিল। একই প্রতিষ্ঠানের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী ছিল ছোট মেয়ে শিফা আক্তার। আর একমাত্র ছেলে জুনায়েদ ইসলাম রায়পুর সরকারি কলেজে দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়ার পাশাপাশি একটি দোকানে কাজ করছেন।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শাহিনুরের স্বামী কামাল হোসেন ২০১৯ সালে উপজেলার মোল্লারহাট এলাকায় রাস্তায় পড়ে থাকা তারে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যান। তিনি গ্রামে ঘুরে ঘুরে হাঁড়ি-পাতিল বিক্রি করতেন। স্বামীর মৃত্যুর পর থেকে তিন মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে ভাড়া বাসায় থাকতেন শাহিনুর। অভিযুক্ত ওই যুবক নোয়াখালীর বাসিন্দা হলেও রায়পুরে ভ্যানে করে ফল বিক্রি করতেন। এক বছর আগে শাহিনুরের ওই ভবনের একটি কক্ষে ভাড়া থাকতেন। সেখান থেকে তাদের মধ্যে পরিচয় হয়। তবে কেন হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন, তা এখনও নিশ্চিতভাবে জানাতে পারেনি পুলিশ। 

রায়পুর ও রামগঞ্জ সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আব্দুর রাশেদ বলেন, ‘বাড়ির মালিক ও প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অন্তর মজুমদার স্ত্রীকে নিয়ে প্রায় দেড় বছর ওই বাসায় ভাড়াটিয়া ছিলেন। প্রায় এক বছর আগে তিনি বাসা ছেড়ে চলে যান। পূর্বপরিচয়ের সূত্রে তিনি সকালে সেখানে যান বলে ধারণা করা হচ্ছে। রাণী নামের এক প্রতিবেশী তাকে বাসায় দেখে কারণ জানতে চাইলে অন্তর বলেন, তিনি পানির পাইপ ঠিক করতে এসেছেন। সন্দেহ হওয়ায় রাণী কলাপসিবল গেট আটকে স্থানীয়দের খবর দেন। তার এই পদক্ষেপ না থাকলে ঘটনাটি হয়তো আরও পরে উদ্‌ঘাটিত হতো।’

তিনি আরও বলেন, ‘তদন্ত চলছে। প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, অন্তরের চরিত্র ভালো ছিল না। তিনি শাহিনুর বেগমকে বিরক্ত করতেন। এ কারণে বাড়িওয়ালা তাকে বাসা থেকে বের করে দেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে প্রতিশোধ নিতে তিনি এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে থাকতে পারেন।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই ভবনের দুজন ভাড়াটিয়া নারী বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন, প্রায় এক বছর আগে স্কুলশিক্ষক আমির হোসেনের ভবনের পাঁচতলায় ভাড়া থাকতেন অন্তর মজুমদার। পাশাপাশি ভ্যানে করে ফল বিক্রি করতেন। নিচতলায় তিন মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে ভাড়া থাকতেন শাহিনুর বেগম। সেই সূত্রে শাহিনুর বেগমের সঙ্গে পরিচয় হয়। এরপর মাঝে মধ্যে উত্ত্যক্ত করতেন। আজেবাজে কথা বলতেন। অন্তরের স্বভাব ভালো ছিল না। নেশা করতেন। কয়েক মাস আগে শাহিনুরকে আজেবাজে কথা বললে তা নিয়ে দুজনের বাগবিতণ্ডা হয়। তখন শাহিনুরের সঙ্গে খারাপ আচরণ করেন অন্তর। আশপাশের লোকজনও তখন জড়ো হন। একপর্যায়ে বাড়ির মালিক আমির হোসেনকে জানালে অন্তরকে বাসা ছেড়ে দেওয়ার কথা বলা হয়। চাপাচাপিতে বাধ্য হয়ে পরে বাসা ছেড়ে চলে যান অন্তর। কিন্তু চলে গেলেও ভেতরে ভেতরে যে ক্ষোভ জমিয়ে রেখেছেন তা কারও জানা ছিল না। ওই ঘটনায় প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে এ ঘটনা ঘটিয়েছেন।

আরেক প্রতিবেশী জানিয়েছেন, সকাল ৯টার দিকে শাহিনুরের বাসায় আসেন অন্তর। তখন তাদের মধ্যে ঝগড়া হয়। একপর্যায়ে শাহিনুর ও তাদের মেয়েদের কুপিয়ে জখম করেন। এ সময় শাহিনুর চিৎকার দিলে অন্তর পালানোর চেষ্টা করে। তখন স্থানীয়রা তাকে আটক করে গণপিটুনি দেয়। পরে তার মৃত্যু হয়। ঘটনার পর উত্তেজিত জনতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে ইটপাটকেলের আঘাতে পুলিশের ছয় সদস্য আহত হয়েছেন।

এদিকে, নিহত মা ও তার তিন মেয়েকে কুমিল্লার হোমনা উপজেলার পারিবারিক কবরস্থানে পাশাপাশি দাফন করা হয়েছে। শুক্রবার (২৬ জুন) রাত ১০টার দিকে জানাজা শেষে হোমনা পৌরসভার অন্তর্গত নটিয়া এলাকার স্থানীয় কবরস্থানে তাদের দাফন সম্পন্ন হয়। দাফনের আগে নিহতদের লাশ গ্রামে পৌঁছালে সৃষ্টি হয় শোকাবহ পরিবেশ। স্বজনদের আহাজারি আর কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে চারপাশ। শুধু পরিবারের সদস্যরাই নয়, আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকেও শত শত মানুষ শেষবারের মতো তাদের দেখতে ভিড় করেন।

/এফআর/
সম্পর্কিত
মাদকসহ যুবদল নেতাকে ধরে পুলিশে দিলো এলাকাবাসী
অনুষ্ঠানের প্রথম পর্ব শেষেই টাউনহলের তত্ত্বাবধায়ককে স্ত্রীর সামনে হত্যা
গ্রেফতার ছাত্রদলের ৩ নেতার ওপর আদালতে জুতা নিক্ষেপ
সর্বশেষ খবর
সেতু ভব‌নে কক‌টেল বি‌স্ফোরণ
সেতু ভব‌নে কক‌টেল বি‌স্ফোরণ
মূল্যস্ফীতির চাপে কেনাকাটায় কাটছাঁট, চাপে খুচরা ব্যবসা
মূল্যস্ফীতির চাপে কেনাকাটায় কাটছাঁট, চাপে খুচরা ব্যবসা
শ্রমিক আন্দোলনের ঘটনায় পুলিশের ১২ মামলায় গ্রেফতার ৭০, তৌফিকের মৃত্যুতে হয়নি মামলা
শ্রমিক আন্দোলনের ঘটনায় পুলিশের ১২ মামলায় গ্রেফতার ৭০, তৌফিকের মৃত্যুতে হয়নি মামলা
সৌদি আরবে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৭ বাংলাদেশি সম্পর্কে যা জানা গেলো
সৌদি আরবে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৭ বাংলাদেশি সম্পর্কে যা জানা গেলো
সর্বাধিক পঠিত
তারেক রহমানের জায়গায় শেখ হাসিনার নাম, স্বয়ংক্রিয় অনুবাদের ভুলে অস্বস্তিতে জাপানি মন্ত্রী 
তারেক রহমানের জায়গায় শেখ হাসিনার নাম, স্বয়ংক্রিয় অনুবাদের ভুলে অস্বস্তিতে জাপানি মন্ত্রী 
লাঠি খেলে ঐতিহ্যবাহী লাঠিখেলা উদ্বোধন করলেন সংস্কৃতিমন্ত্রী
লাঠি খেলে ঐতিহ্যবাহী লাঠিখেলা উদ্বোধন করলেন সংস্কৃতিমন্ত্রী
চট্টগ্রাম, সিলেট, নোয়াখালী ফিরিয়ে নেওয়ার সময় এসেছে: বিজেপি এমপি নিশিকান্ত
চট্টগ্রাম, সিলেট, নোয়াখালী ফিরিয়ে নেওয়ার সময় এসেছে: বিজেপি এমপি নিশিকান্ত
আ.লীগের মিছিল থেকে পুলিশের ওপর হামলা, ওসিসহ ৬ সদস্য আহত
আ.লীগের মিছিল থেকে পুলিশের ওপর হামলা, ওসিসহ ৬ সদস্য আহত
সুন্দরবনের জলদস্যু জোনাব বাহিনীর প্রধানকে যেভাবে গ্রেফতার করলো এসআরবি
সুন্দরবনের জলদস্যু জোনাব বাহিনীর প্রধানকে যেভাবে গ্রেফতার করলো এসআরবি