যুক্তরাজ্যের রাজনৈতিক ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ ভূমিধস জয় নিয়ে ক্ষমতায় এলেও দুই বছরের মাথায় পদত্যাগ করলেন প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার। সোমবার সকালে ডাউনিং স্ট্রিটে স্ত্রী ও কর্মীদের পাশে নিয়ে আবেগঘন কণ্ঠে তিনি জানান, ব্রিটেনকে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য তিনি আর সঠিক ব্যক্তি নন। এর মাধ্যমে গত ১০ বছরের মধ্যে ষষ্ঠ ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পদত্যাগ করলেন স্টারমার। ফলে বিগত প্রায় দুই শতাব্দীর মধ্যে দেশটিতে এখন সর্বোচ্চ রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ঘন ঘন সরকার পরিবর্তনের ঘটনা ঘটছে।
তার পূর্বসূরিদের মতোই স্টারমারও ২০০৮ সালের আর্থিক মন্দার পর থেকে স্থবির হয়ে পড়া জীবনযাত্রার মান নিয়ে জনগণের ক্ষোভ প্রশমন করতে ব্যর্থ হয়েছেন। তার ওপর কোভিড মহামারির মতো বৈশ্বিক ধাক্কার কারণে ফুলেফেঁপে ওঠা জাতীয় ঋণ সরকারের ব্যয় করার ক্ষমতাকে অনেকটাই বেঁধে ফেলেছে। পাশাপাশি অবৈধ অভিবাসন মোকাবিলায় ব্যর্থতা দেশে গভীর রাজনৈতিক বিভাজন তৈরি করেছে।
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রীদের উত্থান-পতন নিয়ে ‘দ্য ইম্পসিবল অফিস’ বইয়ের লেখক ও ইতিহাসবিদ অ্যান্থনি সেলডন রয়টার্সকে বলেন, লিজ ট্রাস এবং বরিস জনসনের মতো স্টারমারও একটি স্পষ্ট রূপরেখা তৈরি করে জনগণের মধ্যে আস্থা ও বিশ্বাস জোগাতে ব্যর্থ হয়েছেন। ফলে ব্রিটেন এখন এক গভীর গর্তে পতিত হয়েছে। স্টারমারের সম্ভাব্য উত্তরসূরির দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অ্যান্ডি বার্নহামও যদি ব্যর্থ হন, তবে ব্রিটেনের ভবিষ্যৎ অন্ধকার।
একসময়ের স্থিতিশীলতার স্তম্ভ এখন ভঙ্গুর
মার্গারেট থ্যাচার এবং টনি ব্লেয়ারের মতো নেতাদের দেশ ব্রিটেন একসময় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার স্তম্ভ হিসেবে পরিচিত ছিল, যারা সম্মিলিতভাবে ২১ বছর ক্ষমতায় থেকে আধুনিক ব্রিটেনকে নতুন রূপ দিয়েছিলেন। কিন্তু বৈশ্বিক আর্থিক সংকট ব্রিটেনকে মারাত্মকভাবে আঘাত করে, কারণ দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মূলত বিশাল আর্থিক খাতের ওপর নির্ভরশীল ছিল। পরবর্তী সময়ে সরকারি খাতের ব্যয়সংকোচন নীতি দেশকে ভবিষ্যতের সংকটের মুখোমুখি হওয়ার জন্য দুর্বল করে ফেলে।
২০০১ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত টনি ব্লেয়ারই ছিলেন শেষ প্রধানমন্ত্রী, যিনি কোনও দলের সমর্থন ছাড়া একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে পুরো মেয়াদ পার করেছিলেন। একসময় ব্রিটেন যেখানে ইতালির ঘন ঘন সরকার পরিবর্তন নিয়ে উপহাস করত, আজ তারা ইতালির জর্জিয়া মেলোনির দিকে ঈর্ষার চোখে তাকাচ্ছে, যিনি প্রায় চার বছর ক্ষমতায় থেকে ইতালীয় প্রজাতন্ত্রের ইতিহাসে দীর্ঘতম মেয়াদে সরকারপ্রধান হতে চলেছেন।
ইনস্টিটিউট অব গভর্নমেন্ট (ইফজি) থিংক ট্যাঙ্কের সিনিয়র ফেলো ও সাবেক অর্থ মন্ত্রণালয় কর্মকর্তা জিল রাটার বলেন, মানুষ দেখছে তাদের নিজেদের জীবন বা তাদের সন্তানদের জীবনযাত্রার কোনও উন্নতি হচ্ছে না। এবং এরপর থেকে আসা প্রতিটি সরকারই তা পরিবর্তনে ব্যর্থ বলে মনে হয়েছে।
২০১৬ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পক্ষেবা ব্রেক্সিট ভোট দিয়ে ব্রিটেন তার দীর্ঘমেয়াদি পররাষ্ট্রনীতি ভেঙে ফেলে, যা স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতা আন্দোলনকে পুনরায় চাঙ্গা করে তোলে। পরবর্তীতে কোভিড-১৯ মহামারি এবং ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণাঙ্গ আগ্রাসনের আর্থিক প্রতিক্রিয়ায় ব্রিটেনের জাতীয় ঋণ জিডিপির প্রায় ১০০ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছে যায়।
সবকিছু কেন অচল?
সাবেক সরকারি উপদেষ্টা স্যাম ফ্রিডম্যান তার সাম্প্রতিক বই ‘ফেইলড স্টেট: হোয়াই নাথিং ওয়ার্কস অ্যান্ড হাউ উই ফিক্স ইট’-এ যুক্তি দিয়েছেন, ব্রিটেন অতিরিক্ত কেন্দ্রীয়করণ এবং এর মূল রাষ্ট্রীয় দফতরগুলো সংকট মোকাবিলা করার জন্য আকারে খুবই ছোট।
তাছাড়া, ইফজি-এর জিল রাটার এবং ১৯৮৩ সাল থেকে পার্লামেন্টে থাকা ব্রিটেনের অন্যতম দীর্ঘমেয়াদি আইনপ্রণেতা রজার গেল মনে করেন, ব্রিটিশ রাজনীতির সংস্কৃতি আরও খারাপ হয়েছে। চব্বিশ ঘণ্টার টেলিভিশন চ্যানেল এবং সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে রাজনীতিবিদরা দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হচ্ছেন। কনজারভেটিভ আইনপ্রণেতা গেল রয়টার্সকে বলেন, প্রচুর আইন তৈরি হচ্ছে, যার বেশিরভাগই খারাপ এবং বাজেভাবে খসড়া করা। আমাদের আরও পরিপক্ক সরকারের প্রয়োজন।
গ্রেটার ম্যানচেস্টারের সাবেক মেয়র অ্যান্ডি বার্নহাম আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে দায়িত্ব নিতে পারেন। ক্ষমতা গ্রহণের পর তাকে দ্রুত একটি মন্ত্রিসভা গঠন এবং দেশের জন্য স্পষ্ট রূপরেখা তৈরি করতে হবে। ২০২৪ সালের নির্বাচনে স্টারমারের কাছে হেরে যাওয়া কনজারভেটিভ প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনাক ‘সান্ডে টাইমস’-এ লিখেছেন, বার্নহামের একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা প্রয়োজন, তা না হলে, তিনিও আরেকজন প্রধানমন্ত্রী হবেন যিনি রাতে জেগে ভাববেন; কেন কোনও কিছুই কাজ করছে না।
সূত্র: রয়টার্স

কেমন ছিলেন স্টারমার, বার্নহামের পথ কি সহজ?
অবশেষে পদত্যাগের ঘোষণা দিলেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী






