বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রকৃত সংখ্যা কত? কেউ জানে? যারা এই ব্যক্তিদের নিয়ে কাজ করেন, তারাও জানেন না, সরকারের দফতরগুলোও জানে না। এই প্রশ্নের উত্তর আজও নিশ্চিতভাবে কেউ দিতে পারেন না। একই দেশের সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন জরিপে প্রতিবন্ধী মানুষের সংখ্যা এতটাই ভিন্ন যে কোন সংখ্যাটাকে ধরে এই মানুষদের উন্নয়নে কাজ করা হবে, তা নিয়েই বিভ্রান্তি তৈরি হয়ে আছে। কোথাও বলা হচ্ছে— মোট জনসংখ্যার ১.৪৩ শতাংশ, কোথাও ২.৮০ শতাংশ, কোথাও আবার ৬.৯৪ বা ৭.১৪ শতাংশ। এমনকি একটা গবেষণায় দেখা যাচ্ছে এই হার ১.৪ শতাংশ থেকে ৩১.৯ শতাংশ পর্যন্ত ভ্যারি করেছে। এমনই যদি দশা হয়, তাহলে এই মানুষদের জন্যে নীতিনির্ধারণ, বাজেট, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান এবং মানবাধিকার নিশ্চিত করার চেষ্টা আমরা কেমন করে করবো?
যে কেউ-ই বোঝে যে, দেশ ও সমাজের উন্নয়ন পরিকল্পনার জন্যে সঠিক তথ্যের প্রয়োজন হয়। আমরা যদি না জানি— কতজন মানুষের বিশেষ সহায়তা প্রয়োজন, তারা কোথায় কোথায় বসবাস করেন, কী ধরনের প্রতিবন্ধিতার সঙ্গে জীবনযাপন করেন এবং তাদের প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো কী কী, তাহলে এই মানুষদের জন্যে কার্যকর পরিকল্পনা করা তো অসম্ভব। আমাদের হাতে যেই সংখ্যাগুলো আছে, সেগুলোর দিকে তাকালে, সবই অনুমান মনে হয়। অনুমান দিয়ে হয়তো কিছু নীতি তৈরি বা পরিকল্পনা করা যায়, কিন্তু বাস্তবে এদের জীবনে কোনও পরিবর্তন আনা যায় না।
প্রতিবন্ধত্ব নিয়ে কাজ করতে গেলে আমাদের প্রথমেই যা বোঝা দরকার তা হচ্ছে— এটা নিছক একটা ডাক্তারি বিদ্যা নয়। আমাদের চেয়ে পরিণত দেশগুলো প্রতিবন্ধিতাকে মানুষের শারীরিক বা মানসিক সীমাবদ্ধতার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয় সমাজের প্রতিবন্ধকতাগুলোকে। একজন ক্রাচ বা হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী মানুষ তখনই সবচেয়ে বেশি প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়েন, যখন আমাদের তৈরি ভবনগুলোতে এবং রাস্তায় তাঁর জন্যে চলাফেরার উপায় থাকে না। একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষ পিছিয়েই থাকবেন যদি আমরা তাঁকে ব্রেইল বা অডিও আকারে তথ্য দিতে না পারি। এমন উদাহরণ অনেক দেওয়া যায়।
এই জন্যেই জাতিসংঘের Convention on the Rights of Persons with Disabilities (CRPD)-তে সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে প্রতিবন্ধিতা-সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করার কথা বলা হয়েছে। শুধু তথ্য সংগ্রহ করলেই হবে না, সেই তথ্যকে শ্রেণিবিন্যাস করতে হবে, সংরক্ষণ করতে হবে এবং নীতিনির্ধারণে ব্যবহার করতে হবে।
কিন্তু এসব আমরা পরোয়া করি না। বাংলাদেশে প্রতিবন্ধিতা নিয়ে এখনও সঠিক ও গ্রহণযোগ্য তথ্য আমাদের কাছে নেই। ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী, দেশে প্রতিবন্ধী মানুষের হার ১.৪৩ শতাংশ। আবার ২০২১ সালের National Survey on Persons with Disabilities-এ Washington Group পদ্ধতি ব্যবহার করে এই হার পাওয়া গেছে ৭.১৪ শতাংশ। একই জরিপে অন্য পদ্ধতিতে আবার এই হার দাঁড়িয়েছে ২.৮০ শতাংশ। ২০১৬ সালের Household Income and Expenditure Survey বলছে ৬.৯৪ শতাংশ।
কী বুঝলেন? আমি বুঝলাম যে আমাদের অবস্থা খুবই এলোমেলো। এই মানুষদের নিয়ে সততার সাথে কাজ করার বিষয়টা আমরা আমলে আনছি না। একই দেশে যদি চার রকমের চিত্র পাওয়া যায়, তাহলে ধরেই নিতে হবে যে, বিষয়টা নিয়ে আমরা মশকরা করছি।
আমাদের তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি এক রকম নয়। একেক সংস্থা একেকভাবে কাজ করে পরিসংখ্যান প্রকাশ করছে, কিন্তু কারও সাথে কারও যোগাযোগ নেই। আবার একেকটা জরিপে এক এক ধরনের প্রশ্ন করা হয়। কোথাও মানুষের শারীরিক সীমাবদ্ধতার ওপর জোর দেওয়া হয়, কোথাও আবার দৈনন্দিন কাজ করার সক্ষমতা বিবেচনা করা হয়। ফলে একই মানুষ একটা জরিপে প্রতিবন্ধীব্যক্তি হিসেবে গণ্য হলেও অন্য জরিপে বাদ পড়ে যান। আমাদের নিজেদের হীনম্মন্যতা এবং সমাজের পচা সংস্কারগুলোও এর জন্যে দায়ী।
আমাদের দেশে এখনও অনেক পরিবার প্রতিবন্ধিতাকে লুকিয়ে রাখতে চায়। সামাজিক লজ্জা ও বৈষম্যের ভয়েই আমরা এমনটা করি। এসব উদ্বেগের কারণে আমরা অনেকেই নিজেদের বা পরিবারের সদস্যের প্রতিবন্ধিতার কথা জরিপকারীদের জানাই না। ফলে আসল সংখ্যা আড়ালেই থেকে যায়।
তথ্য সংগ্রহকারী কারা? তারা কী প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সাথে ঠিকমতো কমিউনিকেট করতে পারে? ধরুন, একজন শ্রবণপ্রতিবন্ধী ব্যক্তি সাংকেতিক ভাষায় কথা বলেন, কিন্তু আমাদের জরিপকারী তা জানেন না। তাহলে আমরা কেমন তথ্য পাবো? একজন বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী মানুষের সাথে কমিউনিকেট করার জন্যেও বিশেষ দক্ষতার প্রয়োজন। এসব বিষয়গুলো তো অপরিহার্য। এসব উপেক্ষা করে আমরা তথ্য জোগাড় করতে যাই কেন?
অবশ্য আমরা এও বুঝি যে আমাদের সরকারি সংস্থার হাতে জাতীয় পর্যায়ে বড় কোনও জরিপ পরিচালনা করার মতো অর্থ নেই। তাই অনেক সময় প্রতিবন্ধিতা নিয়ে বিস্তারিত বুঝলেও কর্মকর্তারা বাস্তবায়ন করেন না। সঠিক তথ্য সংগ্রহ করতে পারলেও তার বিশ্লেষণ ও প্রকাশ ঠিকমতো করেন না। এটা একরকম দেখেও না দেখার ভান করা। কেউ কেউ হয়তো মনে করেন, সংখ্যা একটু উনিশ-বিশ হলে কী এমন আসে যায়? আসলে অনেক কিছু আসে যায়।
ধরুন, সরকার যদি মনে করে— দেশে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সংখ্যা মাত্র ১.৫ শতাংশ, তাহলে বাজেট, পুনর্বাসন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিও সেই হিসাব করেই পরিকল্পনা করা হবে। কিন্তু আসলে সংখ্যা যদি ৭ শতাংশ হয়, তাহলে? একেই বলে দেখেও না দেখার ভান করা। এ আমরা বুঝি। এবার আসুন, আমরা প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়া-আসা নিয়ে কিছু কল্পনা করি।
আমরা যদি এই মানুষদের প্রকৃত সংখ্যা জেনেই যাই, তাহলে দেশের কতগুলো শিক্ষালয়কে এমন মানুষদের জন্যে প্রবেশগম্য করতে হবে, কতজন শিক্ষককে অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার প্রশিক্ষণ দিতে হবে?
আমাদের সেই মুরোদ আছে, দম আছে? আসলে – ‘নেই’ কর্মক্ষেত্রের কী অবস্থা তাহলে দেখা যাক। ২০২১ সালের জাতীয় জরিপ অনুযায়ী প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মধ্যে মাত্র ২৭.২১ শতাংশ কাজ করছেন। এর মধ্যে নারীদের অংশ মাত্র ৭.৩০ শতাংশ। এখন কী করবো? কার কী উন্নয়ন করবো?
আমাদের তৈরি পোশাক শিল্প দেশের সবচেয়ে বড় চাকরিদাতাদের একটা। এই খাতে অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মপরিবেশ আনতে হলে, আগে জানতে হবে কতজন প্রতিবন্ধী চাকরিপ্রার্থী আছেন, তাদের দক্ষতা কী, তারা কোথায় বাস করেন এবং কী ধরনের সাহায্য প্রয়োজন। এই তথ্য আছে? তথ্য ছাড়া অন্তর্ভুক্ত করবেন কেমন করে?
এই মানুষদের জন্যে করার মতো কিছু করতে হলে, প্রতিবন্ধিতা-সংক্রান্ত একটা সমন্বিত জাতীয় তথ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। সব সরকারি জরিপে আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি ব্যবহার করতে হবে, প্রশ্নমালা একীভূত করতে হবে এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সংগঠনগুলোকেও তথ্য সংগ্রহের প্রক্রিয়ায় যুক্ত করতে হবে। একইসঙ্গে তথ্য সংগ্রহকারীদের প্রশিক্ষণ এবং নিয়মিত তথ্য হালনাগাদের ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে।
মনে রাখতে হবে যে, আমরা শুধু একটা সংখ্যা বের করতে চাইছি না। আমাদের লক্ষ্য সেই সংখ্যার পেছনের মানুষগুলোর জীবনকে ও জীবিকাকে সবার সামনে দৃশ্যমান করা। দেশের প্রতিবন্ধী মানুষের প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণ শুধু একটা পরিসংখ্যানগত অনুশীলন নয়। এটা ন্যায়বিচারের প্রশ্ন।
[বি. দ্র. এই লেখার সংখ্যাগুলো আমি পেয়েছি অ্যাডভোকেট রেজাউল করিম সিদ্দিকীর গবেষণা “Data Matters: Numbers and Evidence are key to Disability Inclusive Society” থেকে।]
ইকরাম কবীর: কথাসাহিত্যিক




