পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ও সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত ও অনুগত অনেক নেতাই গত দেড় মাসের মধ্যে তাকে ছেড়ে ‘বিদ্রোহী’ শিবিরে কিংবা নতুন কোনও দলে যোগ দিয়েছেন। তবে এই কঠিন পরিস্থিতিতেও কৃষ্ণনগর আসন থেকে পরপর দু’বার তৃণমূলের টিকিটে জেতা দলটির অন্যতম হাই প্রোফাইল ও আলোচিত সংসদ সদস্য (এমপি) মহুয়া মৈত্র স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, যতদিন রাজনীতিতে আছেন, ততদিন তিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে কিছুতেই ছাড়বেন না। তৃণমূল কংগ্রেস বর্তমানে যে সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, সেটির বিভিন্ন দিক নিয়ে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি বাংলার শুভজ্যেতি ঘোষের সঙ্গে এক একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন।
সাক্ষাৎকারের শুরুতে উপস্থাপক জানতে চান, গত মাসখানেকের ভেতর তৃণমূল কংগ্রেসকে প্রায় তিন টুকরো হয়ে যেতে দেখা গেছে। মহুয়া মৈত্র আসলে কোন পক্ষের সঙ্গে আছেন? এর জবাবে কিছুটা সংশোধন এনে মহুয়া মৈত্র বলেন, ‘তৃণমূল কংগ্রেস মূল পার্টি যেটি, সেটি কোনদিন বিভক্ত হয়নি ও হবে না।’ এটি কংগ্রেস বা বিজেপির মতো বংশানুক্রমিক দল নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, তৃণমূল কংগ্রেস পুরোপুরি নেত্রীকেন্দ্রিক ও কর্মীকেন্দ্রিক। এর নেত্রী একজনই, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি নিজে দলটা তৈরি করেছিলেন এবং প্রতীকও নিজের হাতে এঁকেছিলেন। ফলে যতদিন তিনি বেঁচে আছেন ও রাজনীতি করছেন, ততদিন তৃণমূল কংগ্রেস একটাই। তার মতে, তৃণমূলের প্রতীকে জিতে যারা নিজের স্বার্থে মানুষের সঙ্গে চুক্তি ভঙ্গ করে অন্য কিছু করছে, তাকে দল ভাঙ্গা বলা যায় না।
তবে সংসদের ২০ জন এমপি যখন এনডিএকে সাপোর্ট করার কথা বলছেন এবং বিধায়কদের একটি অংশ নিজেদের আসল তৃণমূল দাবি করে আলাদা দল করার কথা বলছেন, তখন একে অনেকে ভেতর থেকে দল ভেঙে চৌচির হওয়া হিসেবে দেখছেন। এর ব্যাখ্যায় মহুয়া মৈত্র বলেন, তিনি এই দুই ঘটনাকে আলাদাভাবে দেখেন। পার্লামেন্টের যে ২০ জন এমপি এখন এনডিএকে সমর্থন করার কথা বলছেন, মানুষ ভোট দেওয়ার সময় কিন্তু তাদের ভোট দেওয়ার পাশাপাশি বিজেপি বা এনডিএকে বর্জন করেছিল। এরা প্রত্যেকেই দলের প্রায় ৭৫ লাখ টাকার তহবিল ব্যবহার করে জিতেছেন।
মহুয়া মৈত্র অভিযোগ করেন, এই এমপিরা এখন এনসিপিআই নামক একটি দলের সঙ্গে একীভূত হওয়ার কথা বলছেন, যার কোনও রাজনৈতিক বা নৈতিক অস্তিত্ব নেই। এটি একটি অনিবন্ধিত দল, যাকে নির্বাচন কমিশন অর্থপাচারে যুক্ত হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এদের ফেসবুক পেজে মাত্র ১ জন ফলোয়িং এবং ৭৫ জন ফলোয়ার্স রয়েছে, যা আসলে একটি রাজনৈতিক ব্যবসা মাত্র। শুভেন্দু অধিকারীর দল ছাড়ার পেছনে রাজনৈতিক ব্যাখ্যা থাকলেও, এদের ক্ষেত্রে কেবল লোভ বা ভয় কাজ করছে। এক মাস আগে যারা সংসদে নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহের বিরুদ্ধে বলেছিলেন, তারা আজ কাজের খাতিরে এনডিএকে সমর্থন করছেন, এটি কোনোভাবেই বিশ্বাসযোগ্য নয়।
অন্যদিকে কলকাতার বিধায়কদের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তাদের নেতা ঋতব্রত বলছেন তারা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে উপদেষ্টা হিসেবে চান, আবার অন্য বিধায়করা তাকে নেত্রী মানছেন। তারা কেউ দল ছাড়ার কথা বলছেন না। মহুয়ার মতে, গত ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকার ফলে নেতাদের চর্বি জমে গেছে, তাদের মধ্যে বিপক্ষ বা বিরোধী রাজনীতি করার দম নেই। তারা কেবল সুবিধাজনক অবস্থান থেকে নামতে চাইছেন না।
এই ভাঙনের পেছনে নেত্রীর কোনও দায় আছে কি না, জানতে চাইলে মহুয়া মৈত্র বলেন, “দায় আছে, আমি কোনোদিন বলবো না দায় নেই। মমতাদি একজন ইমোশনাল এবং গণভিত্তিসম্পন্ন নেতা। গত ১৫ বছরে যারা পার্টিতে যোগ দিয়েছে তারা ক্ষমতার রাজনীতি দেখে এসেছে। তারা দলের ‘আসল রক্ত’ নয়, ক্ষমতার লোভে এসেছে। যারা দলকে সামনে রেখে নিজের আখের গুছিয়েছে, তাদের একটু নিয়ন্ত্রণে আগে থেকেই রাখা উচিত ছিল।” এ ছাড়া নির্বাচনে প্রায় ৩০ লাখ বৈধ ভোটারকে বাদ দেওয়া হয়েছে এবং অসম নির্বাচনি ময়দানের কারণে একে প্রকৃত মানুষের রায় বলা যায় না বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
বিদ্রোহীদের অভিযোগ, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঔদ্ধত্য এবং আইপ্যাক-এর মতো সংস্থার মাধ্যমে করপোরেট কায়দায় দল চালানোই এর আসল কারণ। এই অভিযোগকে ‘ভণ্ডামি’ আখ্যা দিয়ে মহুয়া মৈত্র বলেন, এরা প্রত্যেকে দেড় মাস আগেই তৃণমূলের প্রতীকে এবং অভিষেকের নেতৃত্বেই নির্বাচনে জিতেছে। তখন কেন তারা এই কালচারের বিরোধিতা করেনি? আসলে টিকিট বা পরিবারের জন্য পদ পাওয়ার সময় অভিষেককে দরকার হয়, আর আজ তিনি অভিশাপ হয়ে গেলেন! দলে আলোচনার জায়গা আছে, পছন্দ না হলে তারা অন্য দলে গিয়ে দাঁড়াতে পারতেন। পাপি হালদার বা ইউসুফ পাঠানদের মতো যারা তৃণমূলের টিকিটে জিতেছেন, তারা কেন গেলেন তার ব্যাখ্যা তাদেরই দিতে হবে।
তবে এই ২০ জনের মধ্যে সায়নী ঘোষের চলে যাওয়াটা তাকে ভীষণ হতাশ করেছে জানিয়ে মহুয়া মৈত্র বলেন, সায়নী ঘোষের যাওয়াটা আমার কাছে একটি ‘শক’ ছিল। দল তাকে খুব কম সময়ে যুব সভাপতির পদ থেকে শুরু করে যাদবপুরের মতো গুরুত্বপূর্ণ আসন এবং হেলিকপ্টারে করে পুরো বাংলায় প্রচারের সুযোগ দিয়েছে। দল যাকে এত কম সময়ে এত কিছু দিলো, তার এভাবে চলে যাওয়া তিনি ভাবতেও পারেননি।
নিজের ব্যক্তিগত অবস্থানের বিষয়ে মহুয়া মৈত্র দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, আমি এদের বিদ্রোহী নয়, গাদ্দার বলব। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিজের মায়ের মতো উল্লেখ করে তিনি বলেন, কোনও সমস্যা থাকলে তিনি নেত্রীকেই বলবেন। তিনি দলে আছেন এবং আজীবন থাকবেন। আবেগ না থাকলে রাজনীতি করার মানে হয় না, তাহলে তিনি জেপি মরগানে করপোরেট চাকরিই করতেন।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কি আবার কংগ্রেসে যোগ দিতে পারেন, এমন প্রশ্নের জবাবে মহুয়া মৈত্র বলেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজের শক্তিতে একা সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে তিনবার মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন, যা ভারতের ইতিহাসে বিরল। তিনি কংগ্রেসে গিয়ে পার্টি একীভূত করবেন বলে মনে হয় না। তবে ২০২৯-এ বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য তৃণমূল এবং কংগ্রেসের জোট হবেই, এর কোনও বিকল্প নেই। গণতন্ত্র রক্ষার স্বার্থে বিরোধীদের একত্রিত হতেই হবে।
পরিশেষে তিনি বলেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাকে যে রাজনৈতিক পরিচয় দিয়েছেন সেজন্য তিনি চিরকৃতজ্ঞ এবং তিনি নেত্রীর সঙ্গেই থাকবেন।

ভারতে তাজিয়া মিছিলে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে নিহত ৩
চিকিৎসায় যুগান্তকারী আবিষ্কার হচ্ছে, কিন্তু রোগীদের কাছে পৌঁছাচ্ছে না কেন
ভেনেজুয়েলায় ভূমিকম্পে ধসে পড়া ভবনে তল্লাশি, নিখোঁজ হাজারো মানুষ
পাখির সঙ্গে ইসরায়েলি প্রেসিডেন্টকে বহনকারী হেলিকপ্টারের ধাক্কা, জরুরি অবতরণ







