রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ বা মেয়াদ শেষ করার পর তিনি আইনের ঊর্ধ্বে থাকেন কিনা— এমন প্রশ্নে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে সংবিধান বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বাংলাদেশের সংবিধানে রাষ্ট্রপতির জন্য যে দায়মুক্তির বিধান রয়েছে, তা মূলত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনকালীন সময়ের জন্য প্রযোজ্য। পদত্যাগ বা মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার পর সেই সাংবিধানিক সুরক্ষা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বহাল থাকে না।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৫১ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতির দায়মুক্তির বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে। এ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি তার সাংবিধানিক ক্ষমতা ও দায়িত্ব পালনের জন্য কোনও আদালতের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য নন। একইসঙ্গে রাষ্ট্রপতির কার্যকাল চলাকালে তার বিরুদ্ধে কোনও ফৌজদারি মামলা শুরু বা পরিচালনা করা যায় না এবং তাকে গ্রেফতার বা কারাগারে পাঠানোও যায় না।
তবে এসব সুরক্ষা মূলত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনের সময়কাল পর্যন্ত সীমাবদ্ধ। রাষ্ট্রপতির পদ থেকে অব্যাহতি বা পদত্যাগের পর তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি বা দেওয়ানি কার্যক্রম গ্রহণের ক্ষেত্রে সংবিধানের ৫১ অনুচ্ছেদের সেই অস্থায়ী দায়মুক্তি আর প্রযোজ্য থাকে না। মূলত রাষ্ট্রপতি হিসেবে সাংবিধানিক ক্ষমতা প্রয়োগের মাধ্যমে গৃহীত সরকারি সিদ্ধান্ত বা কর্মকাণ্ডের বিচারযোগ্যতা একটি পৃথক সাংবিধানিক প্রশ্ন; যা প্রতিটি ঘটনার প্রকৃতি ও আদালতের ব্যাখ্যার ওপর নির্ভর করবে।
আপাতদৃষ্টিতে এ বিষয়ে বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টে এখন পর্যন্ত কোনও সাবেক রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ-পরবর্তী ফৌজদারি বিচার নিয়ে প্রত্যক্ষ ও নির্ধারক নজির প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এহসান কবির বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক দায়মুক্তির ভিত্তি ঐতিহাসিকভাবে ব্রিটিশ সাংবিধানিক মতবাদ ‘দ্য কিং ক্যান ডু নো রঙ’। এই নীতির মূল তাৎপর্য ছিল রাজাকে ব্যক্তিগতভাবে আইনের ঊর্ধ্বে রাখা নয়; বরং রাষ্ট্রক্ষমতার ধারাবাহিকতা ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা। কারণ, ঐতিহ্যগতভাবে রাজার সব কার্যক্রম মন্ত্রীদের পরামর্শে সম্পাদিত হতো এবং সেই কার্যক্রমের রাজনৈতিক ও আইনগত দায়ভার বহন করতেন মন্ত্রীরাই।
তিনি আরও বলেন, আধুনিক গণতান্ত্রিক সংবিধানে ওই নীতি রূপান্তরিত হয়ে রাষ্ট্রপ্রধানের জন্য একটি কার্যকরী ও সাময়িক দায়মুক্তিতে পরিণত হয়েছে, যাতে তিনি দায়িত্ব পালনকালে মামলা বা বিচারিক প্রক্রিয়ার চাপে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনে ব্যাহত না হন। বাংলাদেশ সংবিধানের ৫১ অনুচ্ছেদও সেই দর্শনের প্রতিফলন। তবে এই দায়মুক্তি রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত বা আজীবন বিশেষাধিকার নয়; এটি কেবল তার সাংবিধানিক পদের সঙ্গে সম্পৃক্ত একটি সুরক্ষা। তাই পদত্যাগ বা মেয়াদ শেষ হওয়ার পর সংবিধান আর কোনও বিশেষ দায়মুক্তি দেয় না। ফলে সাবেক রাষ্ট্রপতি নীতিগতভাবে আইনের শাসনের অধীন অন্য সব নাগরিকের মতোই আইনগত জবাবদিহির আওতায় আসতে পারেন। তবে রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে গৃহীত সাংবিধানিক কার্যক্রমের দায় ও তার বিচারযোগ্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট আইন, সাংবিধানিক কাঠামো এবং বিচারিক ব্যাখ্যা অবশ্যই বিবেচ্য হবে।
উল্লেখ্য, অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে শুক্রবার (২৪ জুলাই) দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। তিনি জাতীয় সংসদের স্পিকারের কাছে পদত্যাগ জমা দেন। ওইদিন বিকাল ৪টার দিকে রাষ্ট্রপতির সামরিক সচিব মেজর জেনারেল এ এস এম বাহাউদ্দিন রাষ্ট্রপতির সই করা পদত্যাগপত্রটি জাতীয় সংসদে স্পিকারের দফতরে পৌঁছে দেন।

কীভাবে হবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ







