রাজধানীতে বাস-সিএনজির সংখ্যা অর্ধেক হয়ে গেলো কেন

ইমরান আলী 
২৭ জুলাই ২০২৬, ১৯:১০ আপডেট : ২৭ জুলাই ২০২৬, ১৯:১০

রাজধানী ঢাকা জুড়ে তীব্র গ্যাস সংকটের সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে নগরীর গণপরিবহন ব্যবস্থায়। সিএনজি পাম্পগুলোতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার পর পর্যাপ্ত চাপ (প্রেশার) না থাকায় রাস্তায় হু-হু করে কমে গেছে গ্যাসে চালিত বাস, সিএনজি অটোরিকশা এবং রাইড শেয়ারিং (উবার-পাঠাও) অ্যাপভিত্তিক প্রাইভেট কারের সংখ্যা। চরম যানবাহন সংকটে পড়ে প্রতিদিনের গন্তব্যে পৌঁছাতে সীমাহীন ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন সাধারণ নগরবাসী। এই সুযোগে অটোরিকশা ও উবারে ভাড়া বেড়েছে কয়েক গুণ। বিকল্প হিসেবে যাত্রীরা মেট্রোরেলমুখী হওয়ায় সেখানেও উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা যাচ্ছে। 

সোমবার (২৭ জুলাই) রাজধানীর রামপুরা, বাড্ডা, বিমানবন্দর সড়ক, বনশ্রী ও মিরপুরসহ প্রধান প্রধান সড়ক ঘুরে গণপরিবহনের এই সংকটের সার্বিক চিত্র চোখে পড়েছে। 

সব রুটে বাস অর্ধেক, ডেমরা-বাড্ডা-মিরপুরে হাহাকার 

সোমবার সকাল সাড়ে ১০টায় রাজধানীর রামপুরা সেতু সংলগ্ন বনশ্রী-ডেমরা সড়কে গিয়ে দেখা যায় গন্তব্যমুখী মানুষের দীর্ঘ সারি। এই রুটে চলাচলকারী অছিম, আলিফ, স্বাধীন ও আসমানী পরিবহনের কর্মচারীরা জানান, ডিজেলচালিত বাসগুলো নিয়মিত চললেও গ্যাসে চালিত বাসগুলো পাম্পে দীর্ঘ অপেক্ষার কারণে সময়মতো ট্রিপে আসতে পারছে না। সারারাত জেগে পাম্পে বসে থেকে সকালে মাত্র একটি ট্রিপ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে।

অছিম পরিবহনের লাইন চেকার আব্বাস উদ্দিন জানান, তাদের রুটে থাকা ৫০টিরও বেশি বাসের প্রায় অর্ধেকই চলে গ্যাসে। পাম্পে প্রেশার না থাকায় বাসের বড় একটি অংশ অলস বসে থাকছে। 

আলিফ পরিবহনের লাইন চেকার মো. সেলিম ও ভিক্টর পরিবহনের হেলপার আবদুল্লাহ জানান, ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে গ্যাস নেওয়া চালক-হেলপারদের জন্য চরম বিরক্তির ও কষ্টের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সারারাত না ঘুমিয়ে সকালে একটি ট্রিপ দেওয়ার পর ডেমরা বা উত্তরার দিকে দ্বিতীয়বার গ্যাস নেওয়ার জায়গা বা সময় থাকছে না।

একই অবস্থা দেখা গেছে গুলশান-মিরপুর, গাবতলী, সায়েদাবাদ, শাহবাগ ও বিমানবন্দর রুটেও। বাসের সংখ্যা অর্ধেকের নিচে নেমে আসায় সচল বাসগুলোতে উঠতে চরম হুড়োহুড়ি ও ঠেলাঠেলির শিকার হতে হচ্ছে যাত্রীদের। 

সিএনজির আয়ের দ্বিগুণ গ্যারেজ জমা, বাধ্য হয়ে বাড়তি ভাড়া

গ্যাস সংকটে সবচেয়ে বড় ধকল গেছে গ্যাসে চালিত সিএনজি অটোরিকশার ওপর। পাম্পে ৫ ঘণ্টা দাঁড়িয়ে মাত্র ১০০ থেকে ১৫০ টাকার গ্যাস পাওয়ায় একটু চালানোর পরেই অটোরিকশার ইন্ডিকেটরে লাল বাতি জ্বলে উঠছে। অথচ সারাদিন গাড়ি চলুক বা না চলুক, চালকদের পকেট থেকে দৈনিক ১২০০ টাকার মতো মালিকের জমা ঠিকই গুণতে হচ্ছে।

অটোরিকশা চালক কাওছার আহমেদ ও রহিম বলেন, ৫ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে ১০০ টাকার গ্যাস পাওয়া যায়, যা দিয়ে সামান্য দূর গেলেই আবার শেষ। গাড়ি না চললে মহাজনের জমা দেবো কীভাবে আর পরিবারকে বা খাওয়াবো কীভাবে? 

এদিকে রাজধানীতে নিবন্ধিত ১০-১২ হাজার অটোরিকশার অর্ধেকেরও বেশি এখন সিএনজি সংকটে বন্ধ রয়েছে। যা দু-একটি চলছে, চালকরা গ্যাসের অজুহাতে দ্বিগুণ ভাড়া দাবি করছেন। বনশ্রী থেকে গুলশান-১ এর নিয়মিত ভাড়া যেখানে ২০০ টাকা ছিল, সেখানে এখন ৩০০ টাকার নিচে কেউ যেতে চাচ্ছে না। একইভাবে বনশ্রী থেকে বিমানবন্দরের ভাড়া সাড়ে ৩০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪৫০০ থেকে ৫০০ টাকা দাবি করা হচ্ছে। 

চুক্তিভিত্তিক উবার-পাঠাও চালকদের মাথায় হাত 

ভাড়ায় ও চুক্তিভিত্তিক গাড়ি নিয়ে রাইড শেয়ারিং প্ল্যাটফর্মে গাড়ি চালানো চালকরা পড়েছেন চরম আর্থিক বিপাকে। উবার ও পাঠাওয়ের নিবন্ধিত গাড়িগুলোর সিংহভাগই গ্যাসনির্ভর। তেলে চালিয়ে উবার রাইড দিলে লোকসান নিশ্চিত জেনে তারা বাধ্য হয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পাম্পের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকছেন। 

মেরুল বাড্ডার জামান ফিলিং স্টেশনে অপেক্ষারত উবার চালক সুমন মিয়া বলেন, “মালিককে প্রতি মাসে চুক্তি অনুযায়ী ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা দিতে হয়। এর জন্য মাসে অন্তত ৫০ হাজার টাকার ওপর ট্রিপ মারতে হয়। তেলে গাড়ি চালালে নিজের পকেট থেকে টাকা দিতে হবে। ৪-৫ ঘণ্টা দাঁড়িয়ে মাত্র ২০০-২৫০ টাকার গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে, যা দিয়ে অল্প কয়েকটি ট্রিপের পর আবার পাম্পে ছুটতে হয়।” 

মেট্রোরেলে যাত্রীর উপচে পড়া ভিড় 

সড়কে বাস, অটোরিকশা ও অ্যাপভিত্তিক গাড়ির চরম সংকট থাকায় যেসব যাত্রী আগে সিএনজি বা উবারে যাতায়াত করতেন, তারা বাধ্য হয়ে এখন মেট্রোরেলমুখী হচ্ছেন। এতে করে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় মেট্রোরেল স্টেশনগুলো এবং ট্রেনের ভেতরে উপচে পড়া ভিড় তৈরি হচ্ছে।

মিরপুর-১১ এর বাসিন্দা ইউসুফ আহমেদ ও ১০ এর বাসিন্দা উজ্জ্বল জানান, মতিঝিল বা অন্যান্য গন্তব্যে যাওয়ার জন্য আগে তারা অ্যাপে ১০ মিনিটে গাড়ি পেতেন বা অটোরিকশা নিতেন। কিন্তু এখন আধা ঘণ্টা অপেক্ষার পরও উবার মেলে না এবং সিএনজি চালকরা অযৌক্তিক ভাড়া চায়। এ কারণে ভোগান্তি এড়াতে বাধ্য হয়ে তারা এখন মেট্রোরেল ব্যবহার করছেন। 

সুনির্দিষ্ট নির্দেশনার দাবি নগরবাসীর

নগরবাসীরা বলছেন, সিএনজি পাম্পগুলোতে সংকট স্থায়ী রূপ নেওয়ায় গোটা রাজধানীর সার্বিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। গ্যাস সরবরাহ কখন স্বাভাবিক হবে— সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনও তথ্য বা দিকনির্দেশনা না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করছেন সাধারণ মানুষ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনাসহ পাম্পগুলোতে স্বাভাবিক প্রেশার ফিরিয়ে আনতে দ্রুত ও সমন্বিত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য সরকারের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছেন তারা। 

/এসটি/ 
সম্পর্কিত
সামিটের এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ: বিদ্যুৎ উৎপাদন কতটা কমলো?
২০৩১ সালের মধ্যে ১৫০ কূপ খনন ও ওয়ার্কওভারের পরিকল্পনা
নির্ধারিত দামে মিলছে না এলপিজি: বাজারে গেলে সিলিন্ডারপ্রতি দিতে হয় ৫০০ টাকা বেশি
সর্বশেষ খবর
মানি চেঞ্জারদের জন্য সুখবর দিলো বাংলাদেশ ব্যাংক
মানি চেঞ্জারদের জন্য সুখবর দিলো বাংলাদেশ ব্যাংক
মালিকদের ওপর বাড়তি মজুরি চাপিয়ে দিলে ব্যবসা টিকবে না: নুরুল হক
মালিকদের ওপর বাড়তি মজুরি চাপিয়ে দিলে ব্যবসা টিকবে না: নুরুল হক
নারীর বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর, ছেলেকে পুলিশের হাতে তুলে দিলেন বিএনপি নেতা বাবা
নারীর বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর, ছেলেকে পুলিশের হাতে তুলে দিলেন বিএনপি নেতা বাবা
রিপাবলিকানদের হারে ৬ হাজার কোটি ডলারের বেশি হারালেন মাস্ক
রিপাবলিকানদের হারে ৬ হাজার কোটি ডলারের বেশি হারালেন মাস্ক
সর্বাধিক পঠিত
নতুন দায়িত্বে ইশরাক হোসেন
নতুন দায়িত্বে ইশরাক হোসেন
আগস্টের পর একের পর এক পদোন্নতি, এবার ডিআইজি হলেন আশরাফ আলী
আগস্টের পর একের পর এক পদোন্নতি, এবার ডিআইজি হলেন আশরাফ আলী
ধানক্ষেতে দুজনকে আপত্তিকর অবস্থায় দেখে ফেলায় সেখানেই স্বামী-স্ত্রীকে হত্যা
ধানক্ষেতে দুজনকে আপত্তিকর অবস্থায় দেখে ফেলায় সেখানেই স্বামী-স্ত্রীকে হত্যা
‘আমেরিকানরা বিরক্ত হলে ইসরায়েলে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী হবো’: ট্রাম্প
‘আমেরিকানরা বিরক্ত হলে ইসরায়েলে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী হবো’: ট্রাম্প
৭ নভেম্বর ঘিরে সরকারের ব্যাপক কর্মসূচি, থাকছে সাধারণ ছুটি
৭ নভেম্বর ঘিরে সরকারের ব্যাপক কর্মসূচি, থাকছে সাধারণ ছুটি