বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারের মান নিয়ে প্রশ্ন তুললো হিউম্যান রাইটস ওয়াচ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক 
২৯ জুলাই ২০২৬, ১২:০৮ আপডেট : ২৯ জুলাই ২০২৬, ১২:১৯

বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (আইসিটি) মামলা পরিচালনার ধরন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। সংস্থাটি বলেছে, তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ার বিভিন্ন ঘাটতি ন্যায়বিচার ও আইনের শাসনকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

বুধবার (২৯ জুলাই) লন্ডন থেকে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে এইচআরডব্লিউ বলেছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলে সংঘটিত গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য দায়ীদের অবশ্যই জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। তবে তাদের দাবি, অনেক বিচার আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী ন্যায্য বিচারের শর্ত পূরণ করছে না।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া বিভাগের উপপরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলি বলেন, বাংলাদেশের ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার জরুরি সংস্কার প্রয়োজন। নতুন সরকারের উচিত দুর্বল তদন্ত ও ভিত্তিহীন অভিযোগের মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার সুযোগ না রাখা।

ট্রাইব্যুনালে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে হওয়া আন্দোলনে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানের ঘটনাগুলোর বিচার চলছে। ওই দমন-পীড়নে ৮০০ জনের বেশি নিহত এবং হাজারো মানুষ আহত হন। পাশাপাশি আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সংঘটিত কথিত বিচারবহির্ভূত হত্যা ও গুমের ঘটনাও ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন রয়েছে।

এইচআরডব্লিউ জানায়, ট্রাইব্যুনালের এক ডজনের বেশি মামলা পর্যবেক্ষণ করে তারা বিচারপ্রক্রিয়ায় গুরুতর উদ্বেগের বিষয় পেয়েছে। তাদের দাবি, পর্যাপ্ত সুরক্ষা ছাড়াই আসামিদের আটক ও অভিযুক্ত করা হয়েছে এবং কয়েকটি মামলায় অভিন্ন ভাষার সাক্ষ্য ব্যবহার করা হয়েছে, যা সাক্ষ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

সংস্থাটি জানায়, গত ২৭ জুলাই প্রসিকিউশন মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার অভিযোগে ৪১ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছে। অভিযুক্তদের মধ্যে রাজনীতিক, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য এবং দুই সাংবাদিক রয়েছেন।

এইচআরডব্লিউর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ট্রাইব্যুনাল ছয়টি মামলার বিচার শেষ করেছে। এতে মানবতাবিরোধী অপরাধে ৬২ জন দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। তাদের মধ্যে শেখ হাসিনাসহ ৪২ জনের বিচার হয়েছে অনুপস্থিতিতে এবং ১৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

সংস্থাটি স্মরণ করিয়ে দেয়, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকালীন অপরাধের বিচার করতে ২০১০ সালে প্রতিষ্ঠিত এই ট্রাইব্যুনাল অতীতেও রাজনৈতিক পক্ষপাত ও যথাযথ বিচারপ্রক্রিয়ার ঘাটতির অভিযোগে আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে পড়েছিল।

বিবৃতিতে বলা হয়, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ট্রাইব্যুনাল আইন সংশোধন করে কিছু অপরাধ আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা হলেও বিদ্যমান আইনি কাঠামো এখনও আন্তর্জাতিক ন্যায্য বিচার মানদণ্ড পূরণ করতে পারেনি।

এইচআরডব্লিউর দাবি, স্পষ্ট প্রমাণের মানদণ্ড পূরণ না করেও প্রসিকিউশন গ্রেফতার চাইতে পারে, লিখিত কারণ ছাড়াই আটক ব্যক্তিদের মাসের পর মাস হেফাজতে রাখা যায় এবং বিচার শুরুর আগেই অন্য আদালতে আপিলের সুযোগ নেই।

এছাড়া আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য অল্প সময় দেওয়া, পর্যাপ্ত সুরক্ষা ছাড়া অনুপস্থিতিতে বিচার অব্যাহত রাখা এবং জেরা চলাকালে আসামিপক্ষের আইনজীবীদের ওপর বিধিনিষেধেরও সমালোচনা করেছে সংস্থাটি।

বিবৃতিতে ২০১৩ সালের মে মাসে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের সমাবেশ নিয়ে সংবাদ প্রকাশের ঘটনায় গত ১৪ মে সাংবাদিক মোজাম্মেল বাবু ও ফারজানা রূপার গ্রেফতারের বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়। এইচআরডব্লিউর দাবি, তাদের আইনজীবীরা অভিযোগ করেছেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন এবং আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সনদের বিধান অনুযায়ী গ্রেফতারের লিখিত কারণ প্রসিকিউশন দেয়নি।

এছাড়া ২৭ জুলাই দাখিল করা অভিযোগপত্রে দুই সাংবাদিকের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়েও প্রশ্ন তুলেছে সংস্থাটি। তাদের মতে, আন্তর্জাতিক আইনে গণহত্যার অভিযোগ প্রমাণের জন্য কোনও জাতীয়, জাতিগত, বর্ণগত বা ধর্মীয় গোষ্ঠীকে সম্পূর্ণ বা আংশিক ধ্বংস করার উদ্দেশ্যের প্রমাণ থাকতে হয়।

চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগের ২২ নেতা-কর্মীকে জড়িয়ে করা একটি মামলারও উল্লেখ করেছে এইচআরডব্লিউ। সংস্থাটির দাবি, কয়েকটি সাক্ষ্যবিবরণীতে রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলার পরিকল্পনা, অর্থায়ন ও নির্দেশনার অভিযোগে অভিন্ন ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে, যা প্রমাণের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে।

একই সঙ্গে ট্রাইব্যুনালের এক প্রসিকিউটর ১ কোটি টাকার বিনিময়ে এক আসামিকে জামিনের প্রস্তাব দিয়েছিলেন এমন অভিযোগও উল্লেখ করেছে সংস্থাটি। অডিও রেকর্ড প্রকাশের পর ওই প্রসিকিউটর পদত্যাগ করলেও প্রধান প্রসিকিউটরের দফতর এখনও তদন্ত শেষ করেনি। এদিকে, মামলার বিচার আগামী ৬ আগস্ট শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।

গুরুতর অপরাধের বিচার যেন আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসারে ন্যায্য, নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সম্পন্ন হয়, তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ।

সূত্র: হিউম্যান রাইটস ওয়াচ

/এএস/ 
সম্পর্কিত
মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরপরই ইরানে তীব্র হামলার হুঁশিয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির কাতারি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলো ইরান
দিনের গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক খবর
সর্বশেষ খবর
আইইডিসিআর পরিচালকের ওপর হামলা: প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারীর উদ্বেগ
আইইডিসিআর পরিচালকের ওপর হামলা: প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারীর উদ্বেগ
বিদেশ সফরে দেশ নির্বাচনে কী প্রাধান্য দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী 
বিদেশ সফরে দেশ নির্বাচনে কী প্রাধান্য দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী 
মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরপরই ইরানে তীব্র হামলার হুঁশিয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের
মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরপরই ইরানে তীব্র হামলার হুঁশিয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা ও স্ত্রীর ব্যাংক হিসাব তলব
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা ও স্ত্রীর ব্যাংক হিসাব তলব
সর্বাধিক পঠিত
নভেম্বর থেকে কর্মী যাবে মালয়েশিয়ায়, খরচ জানালেন প্রতিমন্ত্রী
নভেম্বর থেকে কর্মী যাবে মালয়েশিয়ায়, খরচ জানালেন প্রতিমন্ত্রী
কে হচ্ছেন ইসরায়েলের নতুন প্রধানমন্ত্রী
কে হচ্ছেন ইসরায়েলের নতুন প্রধানমন্ত্রী
ইউরোপের ট্রেনের সঙ্গে বন্দে ভারতের তুলনা করে যা জানালেন পোল্যান্ডের পর্যটক
ইউরোপের ট্রেনের সঙ্গে বন্দে ভারতের তুলনা করে যা জানালেন পোল্যান্ডের পর্যটক
এখন কী করবেন নেতানিয়াহু
এখন কী করবেন নেতানিয়াহু
ইসরায়েলের নির্বাচন: কোন দল কত আসন পেলো
ইসরায়েলের নির্বাচন: কোন দল কত আসন পেলো