চব্বিশের জুলাই আন্দোলনে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার কার্যক্রম চলছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে। ইতোমধ্যে ছয়টি মামলার রায় হয়েছে। তবে রায়ের অপেক্ষায় থাকা মামলার পাশাপাশি এখনও বিচারাধীন এবং তদন্তাধীন রয়েছে ৬৫টি মামলা। ফলে মামলার বড় একটি অংশের বিচারিক পথ এখনও বাকি। এ অবস্থায় দ্রুত বিচার শেষ করার চাপ যেমন বাড়ছে, তেমনি সামনে এসেছে আরও বড় প্রশ্ন—বিপুলসংখ্যক মামলা কীভাবে দ্রুত নিষ্পত্তির দিকে নেওয়া হবে?
ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ট্রাইব্যুনালের মোট মামলা সংখ্যা ৭১টি। এর মধ্যে ছয়টি মামলার রায় হয়েছে, একটি মামলা রায়ের অপেক্ষায়, ২৩টি মামলা বিচারাধীন এবং ৪১টি মামলা এখনও তদন্তাধীন রয়েছে। অর্থাৎ, ছয়টি মামলার বিচার শেষ হলেও মোট মামলার প্রায় ৯০ শতাংশের বিচার এখনও সম্পন্ন হয়নি। রায়ের অপেক্ষায় থাকা একটি মামলা বাদ দিলে ৬৪টি মামলার মধ্যে ২৩টি বিচারিক পর্যায়ে এবং ৪১টি তদন্তের পর্যায়ে রয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দুপুর সাড়ে ৩টার দিকে যাত্রাবাড়ী থানার সামনে হানিফ ফ্লাইওভারের নিচে গুলিতে মারা যান শিক্ষার্থী মিরাজ হোসেন। মিরাজের বাবা মো. আব্দুর রব দাবি করেন, ‘আমার ছেলে মিরাজ অন্যদের মতোই দেশকে ভালোবেসে আন্দোলনে যায়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দুপুর সাড়ে ৩টার দিকে যাত্রাবাড়ী থানার সামনে হানিফ ফ্লাইওভারের নিচে গুলিতে মারা যায়। তাকে হাসপাতাল নিয়েও বাঁচানো যায়নি। আমার ছেলেকে নির্মমভাবে গুলি করা হয়েছিল। আমি আমার সন্তান হত্যার বিচার চাই। দ্রুত বিচার চাই এবং দোষীদের ফাঁসি দেখতে চাই।’
মিরাজের বাবার মতো এমন শত শত বিচারপ্রার্থী তাদের স্বজন হারানোর ঘটনায় বা নিজের আহতের ঘটনায় দ্রুত বিচার প্রত্যাশা করে আছেন।
মামলার চাপ কমাতে একীভূত হচ্ছে ‘অপরাধ’
প্রসিকিউশনের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত প্রসিকিউশন মোট ৫৯০টি অভিযোগ গ্রহণ করেছে। যাচাই-বাছাইয়ের পর সেগুলোর মধ্য থেকে ১০৯টি তদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে। তদন্ত শেষ হওয়া মামলাগুলোর বিচার চলছে এবং আরও কয়েকটি মামলা শিগগিরই বিচারের জন্য আসবে।
এ বিষয়ে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘একাধিক অভিযোগে একেক আসামির নাম বারবার এসেছে। আবার কিছু ক্ষেত্রে একই অপরাধের ঘটনায় ভিন্ন ভিন্ন আসামিদের অভিযুক্ত করা হয়েছে। তাই আমরা বিচার দ্রুত করার লক্ষ্যে অপরাধকে একীভূত করে দ্রুত বিচার শেষ করতে চাইছি।’
ছয় মামলায় ৬১ জনের সাজা
এরই মধ্যে ছয়টি মামলার বিচার শেষ হয়েছে। দুই ট্রাইব্যুনালের রায়ে মোট ৬১ জন আসামিকে মৃত্যুদণ্ডসহ বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ডাদেশ দেওয়া হয়েছে।
ট্রাইব্যুনাল-১-এর তিন মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও সাবেক পুলিশপ্রধান চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুনসহ ১৫ জন দণ্ডিত হয়েছেন। অন্যদিকে ট্রাইব্যুনাল-২-এর তিন মামলায় ৪৬ জন বিভিন্ন মেয়াদে সাজা পেয়েছেন। দুই ট্রাইব্যুনাল মিলিয়ে দণ্ডিত ৬১ জনের মধ্যে ৪১ জনই এখনও পলাতক। আর এই পলাতক আসামিদের বড় অংশ সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্য। দণ্ডিত ৬১ জনের মধ্যে ৩৪ জনই পুলিশের কর্মকর্তা ও সদস্য বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য।
চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের প্রাপ্ত অভিযোগগুলোর মধ্যে থেকে শহীদ ও পঙ্গুত্ববরণকারীদের ঘটনার তদন্ত দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। আগামী এক বছরের মধ্যে জুলাই-সংশ্লিষ্ট মানবতাবিরোধী অপরাধের সব মামলার তদন্ত শেষ করে অভিযুক্তদের বিচারের মুখোমুখি করার লক্ষ্য রয়েছে। তদন্ত কর্মকর্তারা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ, সাক্ষ্য গ্রহণ ও প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে কাজ করছেন।’
পরবর্তী এক মাসের মধ্যে আরও তিন থেকে চারটি মামলার রায় পাওয়ার প্রত্যাশাও ব্যক্ত করেন চিফ প্রসিকিউটর।









