‘ইউজড কার পার্টস’ বা ব্যবহৃত গাড়ির খুচরা যন্ত্রাংশ ঘোষণার আড়ালে চারটি বিলাসবহুল গাড়ি মাত্র তিন থেকে চারটি বড় অংশে কেটে এসকেডি অবস্থায় আমদানির একটি অভিনব কৌশল উদ্ঘাটন করেছে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর (সিআইআইডি)। শতভাগ কায়িক পরীক্ষা, গাড়ির বিভিন্ন অংশে থাকা নম্বর, লেবেল ও চিহ্ন বিশ্লেষণ এবং বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ), কুয়েটের বিশেষজ্ঞদের কারিগরি সহায়তা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায় চারটি বিলাসবহুল গাড়ির অস্তিত্ব শনাক্ত করা হয়েছে।
গাড়িগুলো হলো— ২০১৭ সালের রেঞ্জ রোভার ভোগ, ২০১০ সালের বিএমডব্লিউ ৬৫০আই, ২০১৬ সালের লেক্সাস এলএক্স৫৭০ এবং একটি টয়োটা ক্রাউন অ্যাথলেট।
কাস্টমস গোয়েন্দার প্রাথমিক হিসাবে, এসব গাড়ির বাংলাদেশে সম্মিলিত সম্ভাব্য বাজারমূল্য প্রায় ৪ কোটি ৫০ লাখ থেকে ৬ কোটি ৭০ লাখ টাকা বা তারও বেশি হতে পারে। অথচ পুরো চালানটি ব্যবহৃত গাড়ির বিভিন্ন খুচরা যন্ত্রাংশ হিসেবে ঘোষণা করে শুল্কায়নযোগ্য মূল্য দেখানো হয়েছে মাত্র প্রায় ৯ লাখ ৯৪ হাজার টাকা।
তবে চারটি গাড়িকে তাদের প্রকৃত প্রকৃতি অনুযায়ী এসকেডি অবস্থায় সম্পূর্ণ মোটরযান হিসেবে শুল্কায়ন করা হলে কত টাকা শুল্ক-কর প্রযোজ্য হতো এবং প্রকৃত রাজস্ব ফাঁকির পরিমাণ কত— তা এখনও চূড়ান্ত হয়নি। কাস্টমস কর্তৃপক্ষ বলছে, যথাযথ শ্রেণিবিন্যাস ও মূল্য নির্ধারণের পরই সম্ভাব্য রাজস্ব ফাঁকির সঠিক অঙ্ক নিরূপণ করা হবে।
গোপন সংবাদের পর থামানো হয় খালাস
কাস্টমস গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, চালানটি মোংলা বন্দরে পৌঁছানোর পর মহাপরিচালকের কাছে গোপন তথ্য আসে যে, ব্যবহৃত গাড়ির যন্ত্রাংশ ঘোষণার আড়ালে পণ্যের প্রকৃত পরিচয় গোপন করা হতে পারে।
এর পরিপ্রেক্ষিতে অতিরিক্ত মহাপরিচালকের সার্বিক তত্ত্বাবধানে এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের নির্দেশনায় কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের খুলনা আঞ্চলিক কার্যালয় এবং মোংলা তদন্ত সার্কেল চালানটির খালাস কার্যক্রম স্থগিত করে।
পরে গত ১৯ জুলাই চালানটির শতভাগ কায়িক পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষার সময় বিআরটিএ ও খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) বিশেষজ্ঞ দলকে যুক্ত করা হয়। পণ্যের বিভিন্ন অংশে লাগানো স্টিকার, খোদাই করা নম্বর, চিহ্ন ও অন্যান্য শনাক্তকারী তথ্য পরীক্ষা করা হয়। পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায় গাড়ির বিভিন্ন খণ্ডের নকশা ও বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করা হয়।
এভাবেই পৃথক যন্ত্রাংশের চালানের মধ্যে চারটি বিলাসবহুল গাড়ির মূল কাঠামো শনাক্ত করা সম্ভব হয় বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
১৪ আইটেমে ১৬৪ প্যাকেজ, ঘোষণা ছিল ‘খুচরা যন্ত্রাংশ’
কাস্টমস নথি অনুযায়ী, চালানটির বিল অব এন্ট্রি নম্বর সি-৬৯০৪, তারিখ ২০ এপ্রিল ২০২৬। ম্যানিফেস্ট নম্বর ২০২৬/২৫৬। সংশ্লিষ্ট একটি ফাইলে ৬৯০৬ নম্বর উল্লেখ থাকলেও মূল কাস্টমস নথিতে বিল অব এন্ট্রি নম্বর সি-৬৯০৪ পাওয়া গেছে।
চালানটির আমদানিকারক ক্রাউন অটো মোবাইল সার্ভিসেস, গেন্ডারিয়া, ঢাকার একটি প্রতিষ্ঠান। এর সিএন্ডএফ এজেন্ট খুলনার সোনাডাঙ্গার এস টি ইন্টারন্যাশনাল।
জাপানের আশিকাগা শহরের মাহি কার পোর্ট চালানটির রপ্তানিকারক। পণ্যবাহী জাহাজের নাম এমভি এমসিসি টোকিও। চালানটি সিএফআর ভিত্তিতে আমদানি করা হয়।
ইনভয়েস নম্বর CAS21MAHI26, তারিখ ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬। চালানটির জন্য ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে ঋণপত্র খোলা হয়েছিল।
মোট ১৪ ধরনের পণ্য হিসেবে চালানটিতে ১৬৪টি প্যাকেজ আনা হয়। ঘোষণায় পণ্যগুলোর মোট ওজন দেখানো হয়েছে প্রায় ১০ হাজার ২২০ কেজি।
ঘোষণাপত্রে ব্যবহৃত গাড়ির দরজা, ২০০০ সিসির পেট্রোল ইঞ্জিন ও গিয়ার, সাসপেনশন, শক অ্যাবজরবার, নোজ কাট, হেডলাইট, টেইললাইট, ফেন্ডার, কেবিন, স্টিয়ারিং হুইল, বাম্পার, এয়ার ক্লিনার বক্স, রাবার চ্যানেল, ডিফারেনশিয়াল ও অ্যাক্সেলসহ বিভিন্ন ব্যবহৃত যন্ত্রাংশের কথা উল্লেখ করা হয়।
কিন্তু কায়িক পরীক্ষায় দেখা যায়, ঘোষিত বিচ্ছিন্ন যন্ত্রাংশের অনেকগুলোই আসলে গাড়ির বড় কাঠামোগত অংশের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ সংযুক্ত অবস্থায় রয়েছে।
‘পার্টস’ হিসেবে ঘোষণা, বাস্তবে গাড়ির মূল কাঠামো
কাস্টমস গোয়েন্দার অনুসন্ধানে দেখা যায়, চালানে পাওয়া বেশ কয়েকটি অংশকে সাধারণ খুচরা যন্ত্রাংশ হিসেবে বিবেচনা করা কঠিন। বিভিন্ন বড় অংশের সঙ্গে ওয়্যারিং হারনেস, সেন্সর এবং গাড়ির অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ সংযুক্ত ছিল।
পরীক্ষায় পাওয়া যায়— সামনের অংশ বা ফ্রন্ট কাট; সম্পূর্ণ পেছনের অংশ বা রিয়ার/টেইল কাট; সামনের ও পেছনের বডি কাট; ছাদের অংশসহ রুফ কাট প্যানেল অ্যাসেম্বলি।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, একটি গাড়িকে সাধারণ খুচরা যন্ত্রাংশ হিসেবে আমদানি করতে হলে সেটির যন্ত্রাংশগুলোকে প্রকৃত অর্থেই পৃথক ও বিচ্ছিন্ন অবস্থায় থাকতে হয়। কিন্তু এই চালানে গাড়িগুলোকে মাত্র কয়েকটি বড় খণ্ডে কেটে পাঠানো হয়েছে বলে পরীক্ষায় প্রাথমিকভাবে প্রতীয়মান হয়েছে।
অর্থাৎ ইঞ্জিন, বডি, সামনের ও পেছনের কাঠামো এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অংশ এমনভাবে আনা হয়েছে, যা পুনরায় সংযোজনের মাধ্যমে গাড়ির মূল কাঠামো পুনর্গঠনের সুযোগ তৈরি করতে পারে।
এখানেই প্রশ্ন উঠেছে— পণ্যগুলোকে পৃথক খুচরা যন্ত্রাংশ হিসেবে গণ্য করা হবে, নাকি খণ্ডিত অবস্থায় থাকা একটি সম্পূর্ণ মোটরযানের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
বিশেষজ্ঞদের পরীক্ষা ও বিভিন্ন শনাক্তকারী তথ্য বিশ্লেষণ করে চারটি গাড়ির পরিচয় পাওয়া গেছে।
রেঞ্জ রোভার ভোগ
একটি গাড়ির পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে ২০১৭ সালের রেঞ্জ রোভার ভোগ হিসেবে। গাড়িটির উৎপত্তি যুক্তরাজ্য। শনাক্তকরণ নম্বর SALGA2EE9HA365609।
বাংলাদেশের বাজারে গাড়িটির সম্ভাব্য মূল্য প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ থেকে ১ কোটি ৮৫ লাখ টাকা হতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
বিএমডব্লিউ ৬৫০আই
আরেকটি গাড়ি শনাক্ত হয়েছে ২০১০ সালের বিএমডব্লিউ ৬৫০আই হিসেবে। জার্মানিতে উৎপাদিত গাড়িটির শনাক্তকরণ নম্বর WBALZ320X0C578880।
বাংলাদেশে এ ধরনের গাড়ির সম্ভাব্য বাজারমূল্য প্রায় ৬০ লাখ থেকে ৯০ লাখ টাকা হতে পারে।
লেক্সাস এলএক্স৫৭০
চালান থেকে শনাক্ত হওয়া সবচেয়ে মূল্যবান গাড়িগুলোর একটি ২০১৬ সালের লেক্সাস এলএক্স৫৭০। জাপানে তৈরি গাড়িটির চেসিস নম্বর URJ201-4204300।
বছর, অবস্থা ও অন্যান্য বৈশিষ্ট্যভেদে বাংলাদেশের বাজারে এ ধরনের গাড়ির মূল্য ২ কোটি থেকে সাড়ে ৩ কোটি টাকা বা তারও বেশি হতে পারে।
টয়োটা ক্রাউন অ্যাথলেট
চতুর্থ গাড়িটি টয়োটা ক্রাউন অ্যাথলেট জিআরএস২০৪ মডেলের বলে শনাক্ত হয়েছে। তবে এর পূর্ণাঙ্গ চেসিস বা ভিআইএন নম্বর উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
প্রাথমিক বাজারমূল্য ধরা হয়েছে প্রায় ৩০ লাখ থেকে ৪৫ লাখ টাকা।
সব মিলিয়ে চারটি গাড়ির সম্ভাব্য বাজারমূল্য প্রায় ৪ কোটি ৫০ লাখ থেকে ৬ কোটি ৭০ লাখ টাকা বা তারও বেশি হতে পারে।
৯ লাখ ৯৪ হাজার টাকার শুল্কায়নযোগ্য মূল্য
চারটি বিলাসবহুল গাড়ির অংশ শনাক্ত হলেও কাস্টমস নথিতে পুরো চালানটিকে ১৪ ধরনের ব্যবহৃত গাড়ির যন্ত্রাংশ হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
ঘোষণায় চালানটির মোট ইনভয়েস মূল্য দেখানো হয়েছে মাত্র ৭ হাজার ৯৩৫ মার্কিন ডলার।
প্রতি ডলারের বিনিময় হার ১২২ টাকা ৭৪ পয়সা এবং অন্যান্য ব্যয় যুক্ত করে চালানটির শুল্কায়নযোগ্য মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ৯ লাখ ৯৩ হাজার ৫৪৭ টাকা।
এই মূল্যের বিপরীতে ঘোষণায় মোট শুল্ক-কর দেখানো হয়েছে ৬ লাখ ৭ হাজার ৩৯৬ টাকা ৬৬ পয়সা। অন্যান্য প্রযোজ্য ফি যোগ করে মোট পরিশোধযোগ্য অর্থ দেখানো হয়েছে ৬ লাখ ১০ হাজার ৩০ টাকা ২ পয়সা।
অর্থাৎ যে চালানে চারটি বিলাসবহুল গাড়ির অস্তিত্ব পাওয়া গেছে বলে কাস্টমস গোয়েন্দার অনুসন্ধানে প্রতীয়মান হয়েছে, সেটিকে সাধারণ ব্যবহৃত গাড়ির যন্ত্রাংশ হিসেবে ঘোষণা করে তুলনামূলক কম মূল্যে শুল্কায়নের চেষ্টা করা হয়েছিল বলে প্রাথমিক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
মূল প্রশ্ন— যন্ত্রাংশ, নাকি এসকেডি গাড়ি?
এ ঘটনায় কাস্টমস গোয়েন্দার সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—চারটি গাড়িকে খণ্ডিত অবস্থায় আনা হলেও সেগুলো কি শুল্কায়নের ক্ষেত্রে পৃথক ব্যবহৃত যন্ত্রাংশ হিসেবে গণ্য হবে, নাকি সম্পূর্ণ গাড়ির বৈশিষ্ট্য বহনকারী এসকেডি মোটরযান হিসেবে বিবেচিত হবে?
আন্তর্জাতিক পণ্য শ্রেণিবিন্যাসের সাধারণ ব্যাখ্যা বিধির ২(ক) অনুযায়ী, কোনো অসম্পূর্ণ, অসমাপ্ত বা খণ্ডিত পণ্যের মধ্যে যদি সম্পূর্ণ পণ্যের মৌলিক বা অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান থাকে, তাহলে নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে সেটিকে সম্পূর্ণ পণ্য হিসেবে শ্রেণিবিন্যাসের সুযোগ থাকে।
কাস্টমস গোয়েন্দার প্রাথমিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চালানটিতে পাওয়া বড় বড় কাঠামোগত অংশের প্রকৃতি, বিন্যাস এবং সংযুক্ত গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ বিবেচনায় চারটি সম্পূর্ণ মোটরযানের অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান বলে প্রতীয়মান হয়েছে।
সেই কারণে পণ্যগুলোকে পৃথক ‘ইউজড কার পার্টস’ হিসেবে না দেখে এসকেডি অবস্থায় আমদানি করা মোটরযান হিসেবে শুল্কায়নের প্রশ্ন উঠেছে।
রাজস্ব ফাঁকির অঙ্ক এখনো চূড়ান্ত নয়
তবে এ ঘটনায় সম্ভাব্য রাজস্ব ফাঁকির পরিমাণ নিয়ে এখনই কোনো নির্দিষ্ট অঙ্ক বলছে না কাস্টমস গোয়েন্দা।
বর্তমানে আমদানিকারকের ঘোষণায় পুরো চালানের শুল্ক-কর ধরা হয়েছে প্রায় ৬ লাখ ৭ হাজার টাকা। কিন্তু চারটি গাড়িকে এসকেডি মোটরযান হিসেবে শ্রেণিবিন্যাস করা হলে প্রতিটি গাড়ির পৃথক মূল্য নির্ধারণ করতে হবে।
এ ক্ষেত্রে গাড়ির ইঞ্জিন ক্ষমতা, উৎপাদন সাল, বয়স, অবচয়, প্রযোজ্য ন্যূনতম বা নির্ধারিত মূল্য এবং শুল্কহার বিবেচনায় নিতে হবে। এরপর কাস্টমস ডিউটি, রেগুলেটরি ডিউটি, সম্পূরক শুল্ক, মূল্য সংযোজন কর, অগ্রিম কর ও অগ্রিম আয়করসহ প্রযোজ্য সব কর নির্ধারণ করা হবে।
এই পুরো প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পরই প্রকৃত রাজস্ব ফাঁকির সম্ভাব্য পরিমাণ নির্ধারণ করা সম্ভব হবে।
তবে কাস্টমস গোয়েন্দার অনুসন্ধানে ইতোমধ্যে যে বিষয়টি সামনে এসেছে, তা হলো— বহু কোটি টাকা সম্ভাব্য বাজারমূল্যের চারটি বিলাসবহুল গাড়ির মূল কাঠামো ও অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য বহনকারী অংশকে ব্যবহৃত গাড়ির খুচরা যন্ত্রাংশ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল।
আইন ও নীতিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগ
প্রাথমিক অনুসন্ধানে আমদানি নীতি আদেশ, ২০২১–২৪, আমদানি ও রফতানি নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৫০ এবং কাস্টমস আইন, ২০২৩-এর প্রযোজ্য বিধান লঙ্ঘনের বিষয় পরিলক্ষিত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ৯ এপ্রিল ১৯৯৭ সালের একটি প্রাসঙ্গিক নির্দেশনার শর্ত ভঙ্গের বিষয়ও কাস্টমস গোয়েন্দার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
এসব বিবেচনায় চালানটিকে এসকেডি মোটরযান হিসেবে শুল্কায়নের বিষয়ে মতামত দিয়ে কাস্টম হাউস, মোংলায় প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞ দলের প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে পণ্যের প্রকৃত শ্রেণিবিন্যাস, মূল্য নির্ধারণ, শুল্কায়ন এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
কেন ঘটনাটি গুরুত্বপূর্ণ
বাংলাদেশে গাড়ি আমদানিতে ইঞ্জিন ক্ষমতা, উৎপাদন সাল, গাড়ির ধরন এবং আমদানির অনুমোদনসংক্রান্ত নানা শর্ত প্রযোজ্য। অন্যদিকে ব্যবহৃত গাড়ির খুচরা যন্ত্রাংশ আমদানির ক্ষেত্রে পণ্যের ধরন ও শুল্কায়নের কাঠামো আলাদা।
এই সুযোগের অপব্যবহার করে যদি একটি সম্পূর্ণ গাড়িকে কেবল কয়েকটি বড় অংশে কেটে ‘পার্টস’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়, তাহলে তা আমদানি নিয়ন্ত্রণ, পণ্যের প্রকৃত শ্রেণিবিন্যাস এবং শুল্কায়নব্যবস্থার ক্ষেত্রে বড় ধরনের প্রশ্ন তৈরি করে।
এই চালানে কেবল বিচ্ছিন্ন ইঞ্জিন, দরজা, হেডলাইট বা বাম্পারের মতো সাধারণ যন্ত্রাংশ পাওয়া যায়নি। বরং এমন বড় বড় কাঠামোগত অংশ পাওয়া গেছে, যেগুলোর সঙ্গে গাড়ির গুরুত্বপূর্ণ বৈদ্যুতিক ও যান্ত্রিক উপাদানও সংযুক্ত ছিল।
ফলে কাস্টমস গোয়েন্দার অনুসন্ধানটি ব্যবহৃত যন্ত্রাংশের নামে সম্পূর্ণ গাড়ি বা গাড়ির অপরিহার্য কাঠামো আমদানির সম্ভাব্য নতুন কৌশলের দিকেও ইঙ্গিত করছে।
তদন্তের পর কী হবে
এখন বিশেষজ্ঞ দলের পূর্ণাঙ্গ মতামত, পণ্যের চূড়ান্ত শ্রেণিবিন্যাস এবং কাস্টম হাউসের শুল্কায়ন প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করবে পরবর্তী ব্যবস্থা।
যদি কাস্টমস কর্তৃপক্ষ পণ্যগুলোকে খণ্ডিত অবস্থায় আমদানিকৃত সম্পূর্ণ মোটরযান হিসেবে শ্রেণিবিন্যাস করে, তাহলে নতুন করে মূল্য নির্ধারণ এবং প্রযোজ্য শুল্ক-কর হিসাব করা হবে। একই সঙ্গে মিথ্যা ঘোষণা, পণ্যের প্রকৃত পরিচয় গোপন এবং প্রযোজ্য আমদানি নিয়ন্ত্রণ আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে আইনগত ব্যবস্থাও নেওয়া হতে পারে।
কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের কর্মকর্তারা বলছেন, ব্যবহৃত যন্ত্রাংশের আড়ালে এসকেডি বা সিকেডি অবস্থায় মোটরযান আমদানির মাধ্যমে শুল্ক ও আমদানি নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এড়িয়ে যাওয়ার যেকোনো অপচেষ্টা ঠেকাতে গোয়েন্দা নজরদারি আরও জোরদার করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে মোংলা বন্দরের এই ঘটনা শুধু একটি সন্দেহজনক আমদানি চালান আটকের ঘটনা নয়; বরং ব্যবহৃত গাড়ির যন্ত্রাংশের ঘোষণার আড়ালে কয়েকটি বড় খণ্ডে বিভক্ত করে বিলাসবহুল গাড়ি আমদানির সম্ভাব্য একটি নতুন কৌশল সামনে এনেছে। এখন চূড়ান্ত শুল্কায়ন ও আইনগত প্রক্রিয়াই নির্ধারণ করবে—এই চালানের আড়ালে কত টাকার রাজস্ব ফাঁকির চেষ্টা হয়েছিল এবং এর সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বিশ্ব ছুটছে তুলাহীন পোশাকের দিকে, বাংলাদেশ এখনও ৭২ শতাংশের ফাঁদে







