মেয়ে সন্তান হলে কি সত্যিই বাবার আয়ু বাড়ে?

বাংলা ট্রিবিউন ডেস্ক  
১২ অক্টোবর ২০২৬, ১৬:৩৬ আপডেট : ১২ অক্টোবর ২০২৬, ১৬:৩৬

সন্তান জন্মের পর বদলে যায় একজন মানুষের জীবন। দায়িত্ব বাড়ে, বদলে যায় দৈনন্দিন অভ্যাস, ভবিষ্যৎ নিয়ে তৈরি হয় নতুন পরিকল্পনা। সন্তানের জন্য দীর্ঘদিন সুস্থভাবে বেঁচে থাকার তাগিদও অনেকের মধ্যে কাজ করে। কিন্তু সন্তান ছেলে না মেয়ে—তার ওপরও কি বাবার আয়ু নির্ভর করে? বিশেষ করে, কন্যাসন্তান হলে বাবার আয়ু বাড়ে—এমন ধারণার কি কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি আছে?

প্রশ্নটির উত্তর খুঁজতে গিয়ে গবেষণায় পাওয়া গেছে চমকপ্রদ কিছু তথ্য। কোথাও কন্যাসন্তানের সঙ্গে বাবার দীর্ঘায়ুর ইতিবাচক সম্পর্ক দেখা গেছে, আবার কোথাও সন্তানের লিঙ্গের সঙ্গে বাবার মৃত্যুঝুঁকির উল্লেখযোগ্য সম্পর্কই পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ, বিষয়টি যতটা সরল মনে হয়, বিজ্ঞান ততটা সরল উত্তর দিচ্ছে না।

এক গবেষণায় আয়ু বেড়েছিল ৭৪ সপ্তাহ

২০০৬ সালে আমেরিকান জার্নাল অব হিউম্যান বায়োলজি সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণায় পোল্যান্ডের গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মানুষের সন্তানসংখ্যা ও আয়ুর সম্পর্ক বিশ্লেষণ করেন গবেষকেরা। গবেষণাটির শিরোনাম ছিল ‘Daughters increase longevity of fathers, but daughters and sons equally reduce longevity of mothers’।

গবেষণায় দেখা যায়, একজন বাবার যত বেশি কন্যাসন্তান ছিল, তার আয়ুও গড়ে তত বেশি হওয়ার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, প্রতিটি কন্যাসন্তান জন্মের সঙ্গে বাবার আয়ু গড়ে ৭৪ সপ্তাহ বেশি হওয়ার সম্পর্ক ছিল। অন্যদিকে, ছেলেসন্তানের সংখ্যার সঙ্গে বাবার আয়ুর উল্লেখযোগ্য সম্পর্ক পাওয়া যায়নি।

তবে এই ফলাফলকে এমনভাবে ব্যাখ্যা করার সুযোগ নেই যে একটি মেয়ে জন্মালেই বাবার আয়ু নিশ্চিতভাবে ৭৪ সপ্তাহ বেড়ে যাবে। এটি একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর ওপর পরিচালিত পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণার ফল। এখানে যে সম্পর্ক দেখা গেছে, সেটিই যে সরাসরি আয়ু বৃদ্ধির কারণ, তা প্রমাণিত হয়নি।

গবেষণাটিতে মায়ের আয়ুর সঙ্গে সন্তানের সংখ্যার সম্পর্কও পরীক্ষা করা হয়েছিল। সেখানে ছেলে ও মেয়ে—উভয় ধরনের সন্তানের সংখ্যার সঙ্গে মায়ের তুলনামূলক কম আয়ুর সম্পর্ক পাওয়া যায়। তবে এই ফলও সব জনগোষ্ঠী বা সব সময়ের মানুষের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, এমন সিদ্ধান্ত টানা যায় না।

অন্য গবেষণায় কী পাওয়া গেছে?

একটি গবেষণার ফল দিয়ে বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। একই প্রশ্ন নিয়ে অন্য জনগোষ্ঠীর ওপর করা গবেষণায় কী পাওয়া গেছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

২০১৭ সালে সায়েন্টিফিক রিপোর্টস সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণায় নরওয়ের বিপুলসংখ্যক মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। এতে ৬ লাখ ৬১ হাজারের বেশি মা এবং ৬ লাখ ৯১ হাজারের বেশি বাবার তথ্য অন্তর্ভুক্ত ছিল। গবেষকেরা সন্তানের লিঙ্গের সঙ্গে বাবা-মায়ের সামগ্রিক ও হৃদ্‌রোগজনিত মৃত্যুঝুঁকির সম্পর্ক পরীক্ষা করেন।

ফলাফলে দেখা যায়, সন্তান ছেলে না মেয়ে—তার সঙ্গে বাবার সামগ্রিক মৃত্যুঝুঁকি কিংবা হৃদ্‌রোগজনিত মৃত্যুঝুঁকির উল্লেখযোগ্য সম্পর্ক পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ, পোল্যান্ডের গবেষণায় কন্যাসন্তানের সঙ্গে বাবার দীর্ঘায়ুর যে সম্পর্ক দেখা গিয়েছিল, নরওয়ের এই বৃহৎ গবেষণা তা সমর্থন করেনি।

চীন ও তাইওয়ানের প্রবীণদের তথ্য নিয়ে ২০১২ সালে প্রকাশিত আরেকটি গবেষণাতেও সন্তান ছেলে না মেয়ে, সেই অনুপাতের ভিত্তিতে বাবা-মায়ের মৃত্যুঝুঁকি কমে যাওয়ার ধারাবাহিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি। যদিও গবেষণাটিতে কিছু নির্দিষ্ট বিশ্লেষণে কন্যাসন্তানের সম্ভাব্য সুবিধার ইঙ্গিত ছিল, সামগ্রিক ফলাফলকে নিশ্চিত প্রমাণ বলা যায় না।

এসব গবেষণার ফলাফল পাশাপাশি রাখলে বোঝা যায়, কন্যাসন্তান বাবার আয়ু বাড়ায়—এমন সর্বজনীন বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো প্রমাণ এখনো নেই।

তাহলে মেয়ের সঙ্গে বাবার সম্পর্ক কি স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলতে পারে?

এখানে আলোচনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে। সন্তান ছেলে না মেয়ে, সেটি সরাসরি আয়ু বাড়ায় কি না—তার পাশাপাশি সন্তানদের সঙ্গে বাবা-মায়ের সম্পর্ক, মানসিক সমর্থন এবং পারিবারিক যোগাযোগের মতো বিষয়ও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

বার্ধক্যে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ, আবেগগত সমর্থন এবং প্রয়োজনের সময় সহযোগিতা পাওয়া মানুষের জীবনযাপনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সন্তানদের সঙ্গে সুসম্পর্ক একজন মানুষের একাকিত্ব কমাতে, মানসিকভাবে ভালো থাকতে এবং প্রয়োজনের সময় সহায়তা পেতে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এসব সুবিধা শুধু কন্যাসন্তানের কাছ থেকেই আসে, এমন নয়।

চীনের প্রবীণদের নিয়ে ২০১৬ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা যায়, ছেলেসন্তানের তুলনায় কন্যাসন্তানের কাছ থেকে পাওয়া আবেগগত যত্নের সঙ্গে প্রবীণদের জ্ঞানীয় সক্ষমতা বজায় থাকা এবং মৃত্যুঝুঁকি কম থাকার সম্পর্ক রয়েছে। তবে এটি চীনের নির্দিষ্ট সামাজিক ও পারিবারিক প্রেক্ষাপটের গবেষণা। এর ফল সরাসরি বাংলাদেশের পরিবারগুলোর ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা যাবে না।

এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—কোনও সম্পর্কের সঙ্গে স্বাস্থ্যগত সুবিধা দেখা গেলেই সেই সম্পর্কই সুবিধাটির একমাত্র কারণ, এমনটা ধরে নেওয়া যায় না। পারিবারিক আয়, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ, বসবাসের পরিবেশ, সন্তানদের সঙ্গে যোগাযোগের ধরন এবং সামাজিক রীতিনীতিও মানুষের বার্ধক্য ও স্বাস্থ্যে ভূমিকা রাখতে পারে।

দীর্ঘায়ুর পেছনে আসল বিষয়গুলো কী?

একজন মানুষের কত দিন বেঁচে থাকার সম্ভাবনা রয়েছে, তা বহু বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। জিনগত বৈশিষ্ট্য, বয়স, ধূমপানের অভ্যাস, শারীরিক সক্রিয়তা, খাদ্যাভ্যাস, রক্তচাপ, ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন রোগের নিয়ন্ত্রণ এবং স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সুযোগ—সবই গুরুত্বপূর্ণ।

পরিবারের সঙ্গে সুসম্পর্ক ও সামাজিক সমর্থনও সুস্থ থাকার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু কন্যাসন্তান জন্মের কারণে বাবার শরীরে এমন কোনো নির্দিষ্ট জৈবিক পরিবর্তন ঘটে, যা নিশ্চিতভাবে তার আয়ু বাড়িয়ে দেয়—বর্তমান গবেষণা থেকে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।

তাই কোনও বাবা কন্যাসন্তানের জন্মের পর নিজের জীবনযাপনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনলে, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করালে কিংবা পরিবারের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুললে তার স্বাস্থ্যের উপকার হতে পারে। তবে এসব সম্ভাব্য সুবিধাকে কেবল সন্তানের লিঙ্গের ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করা ঠিক হবে না।

তাহলে কথাটির সত্যতা কতটুকু?

‘মেয়ে সন্তান হলে বাবার আয়ু বাড়ে’—কথাটির পেছনে অন্তত একটি প্রকাশিত গবেষণার ইতিবাচক ফল রয়েছে। কিন্তু অন্য গবেষণায় একই ফল পাওয়া যায়নি। ফলে এটিকে প্রতিষ্ঠিত বৈজ্ঞানিক সত্য হিসেবে প্রচার করা যাবে না।

বরং গবেষণাগুলো যে বিষয়টি মনে করিয়ে দেয়, তা হলো—দীর্ঘায়ু কোনও একক ঘটনা বা সম্পর্কের ফল নয়। সুস্থ জীবনযাপন, নিয়মিত চিকিৎসা, সামাজিক সমর্থন এবং পারিবারিক সম্পর্ক—সবকিছুরই গুরুত্ব রয়েছে।

কন্যাসন্তান বাবার জীবনে আনন্দ, ভালোবাসা ও নতুন দায়িত্বের অর্থ যোগ করতে পারে। কিন্তু তার জন্মের কারণে বাবার আয়ু নির্দিষ্টসংখ্যক সপ্তাহ বা বছর বাড়বে, এমন নিশ্চয়তা বিজ্ঞান দেয় না।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি শুধু মেয়ের বাবা হওয়ার কারণে কত দিন বেশি বাঁচা যাবে, তা নয়; বরং পরিবারে ভালোবাসা, যত্ন ও পারস্পরিক সমর্থনের সম্পর্ক কীভাবে গড়ে তোলা যায়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ জীবনের নিশ্চয়তা না থাকলেও, সম্পর্কের যত্ন জীবনের মান উন্নত করতে পারে।

/এম/
সম্পর্কিত
ফেসবুকে যা দেখেন, মানুষের জীবন কি সত্যিই তেমন?
টিকটক-রিলস দেখা কমিয়ে সিনেমা দেখবেন যে কারণে
তেল-গ্যাসের বাড়তি দামে মাথা গরম? এর পেছনে আছে মনের খেলাও
সর্বশেষ খবর
জাহাঙ্গীরনগরের সেই শিক্ষার্থী কুমিল্লায় উদ্ধার, বললেন ‘বারবার নামাজ পড়ায় ফিরতে পেরেছি’
জাহাঙ্গীরনগরের সেই শিক্ষার্থী কুমিল্লায় উদ্ধার, বললেন ‘বারবার নামাজ পড়ায় ফিরতে পেরেছি’
বেক্সিমকোর দুই খেলাপি প্রতিষ্ঠানকে বিশেষ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন
বেক্সিমকোর দুই খেলাপি প্রতিষ্ঠানকে বিশেষ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন
বাংলাদেশের সুনীল ইকোনমি খাতে নতুন শিল্পের সম্ভাবনা নিয়ে আইইউবিতে সেমিনার
বাংলাদেশের সুনীল ইকোনমি খাতে নতুন শিল্পের সম্ভাবনা নিয়ে আইইউবিতে সেমিনার
রজনীকান্তের হাতে মার খাবেন না মিঠুন, ‘জেলার ২’ ছবির জন্য দিয়েছিলেন বিশেষ শর্ত
রজনীকান্তের হাতে মার খাবেন না মিঠুন, ‘জেলার ২’ ছবির জন্য দিয়েছিলেন বিশেষ শর্ত
সর্বাধিক পঠিত
জয়ের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য, উঠে এলো আ.লীগ সরকারের সিদ্ধান্তের দুই অভিনেতার নাম
জয়ের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য, উঠে এলো আ.লীগ সরকারের সিদ্ধান্তের দুই অভিনেতার নাম
লাখ টাকায় আইফোন কিনে বাড়িতে নেওয়ার পরই গেলো পুলিশ
লাখ টাকায় আইফোন কিনে বাড়িতে নেওয়ার পরই গেলো পুলিশ
ইলিশ শিকার করায় ১০ জেলে আটক, ৪০ কেজি মাছ মাদ্রাসায় বিতরণ
ইলিশ শিকার করায় ১০ জেলে আটক, ৪০ কেজি মাছ মাদ্রাসায় বিতরণ
রাশেদ খাঁনের দুঃখ প্রকাশ 
রাশেদ খাঁনের দুঃখ প্রকাশ 
পাগলা মসজিদের দানবাক্সে বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ-রুপা ও বৈদেশিক মুদ্রা
পাগলা মসজিদের দানবাক্সে বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ-রুপা ও বৈদেশিক মুদ্রা