‘পূজার ছুটিতে সৈকতে ভিড়, ফাঁকা রিসোর্ট’ আগুনের ঘটনায় কতটা প্রভাব পড়েছে কক্সবাজারের পর্যটনে?

কক্সবাজার প্রতিনিধি
২০ অক্টোবর ২০২৬, ১০:০৫ আপডেট : ২০ অক্টোবর ২০২৬, ১০:০৫

দুর্গাপূজার ছুটিতে কক্সবাজারের সমুদ্রসৈকতে পর্যটকদের ভিড় বাড়ছে। শহরের হোটেল-গেস্টহাউসেও বাড়ছে অতিথির চাপ। তবে চিত্রটি ভিন্ন মেরিন ড্রাইভের সৈকতঘেঁষা রিসোর্ট ও কটেজগুলোতে। উখিয়ার পাটুয়ারটেকের টুপটুপ রিসোর্টে আগুনে ১০ পর্যটকের মৃত্যুর পর এসব স্থাপনায় রাত কাটানোর বিষয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন অনেক পর্যটক। কেউ আগাম বুকিং বাতিল করছেন, কেউ আবার মেরিন ড্রাইভের বদলে শহরের হোটেলে উঠছেন।

পর্যটন ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, একটি রিসোর্টের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে আশপাশের অনেক প্রতিষ্ঠানে। ছুটির মৌসুমে পর্যটকের ব্যাপক সমাগমের প্রত্যাশা থাকলেও মেরিন ড্রাইভের ৮০টির বেশি রিসোর্ট ও কটেজের প্রায় ৮০ শতাংশ কক্ষ খালি পড়ে থাকার কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট মালিকদের সংগঠনের এক নেতা। এতে পর্যটকের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের পাশাপাশি ব্যবসায়িক ক্ষতির আশঙ্কাও বাড়ছে।

গত ১৭ অক্টোবর সকালে পাটুয়ারটেকের টুপটুপ রিসোর্টে আগুন লাগে। পরে সেখান থেকে ১০ জনের মরদেহ উদ্ধার করেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। এ ঘটনায় অবহেলাজনিত মৃত্যুর অভিযোগে উখিয়া থানার উপপরিদর্শক আশীষ সূত্রধর ২৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। তাদের মধ্যে চারজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে, বাকি ১৯ জন অজ্ঞাতনামা। মামলার চার নম্বর আসামি জাহিদ হোসেনকে গ্রেফতারের পর আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাত দিনের রিমান্ড চেয়েছে পুলিশ।

বুকিং বাতিল, খালি কক্ষ

মেরিন ড্রাইভের ইনানী সৈকতসংলগ্ন সালমান রিসোর্টের চিত্র পর্যটকদের অনাগ্রহের বিষয়টি সামনে এনেছে। নয়টি কক্ষের এই রিসোর্টে শনিবার সকালেও সাতটি কক্ষে অতিথি ছিলেন। কিন্তু পরদিন থেকে সেখানে আর কোনও অতিথি ছিলেন না। রিসোর্টের এক কর্মীর দাবি, অগ্নিকাণ্ডের পর পর্যটকেরা সেখানে থাকতে নিরাপদ বোধ করছেন না। ২১ অক্টোবর পর্যন্ত আগাম বুকিং দেওয়া কয়েকটি কক্ষও বাতিল করা হয়েছে।

পাশের পালকি রিসোর্ট, বিচ ভিউ ও ফাইন ডাইনেও অতিথির সংখ্যা কমেছে। এসব প্রতিষ্ঠানে একসঙ্গে ৬০ জনের থাকার ব্যবস্থা থাকলেও সোমবার ছিলেন মাত্র সাতজন।

মেরিন ড্রাইভ এলাকায় বাঁশ ও কাঠ দিয়ে তৈরি পরিবেশবান্ধব ইকো রিসোর্ট ও কটেজের সংখ্যা অর্ধশতাধিক। এসব স্থাপনায় আগুনের ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। তবে সব রিসোর্টের পরিস্থিতি এক নয়। প্যাঁচারদ্বীপের মারমেইড বিচ রিসোর্টের ব্যবস্থাপক রিসাদ জানিয়েছেন, তাদের প্রতিষ্ঠানে অগ্নিকাণ্ডের প্রভাব তেমন পড়েনি। ৩৩টি কটেজে সেখানে ৯০ জনের থাকার ব্যবস্থা রয়েছে।

কক্সবাজার মেরিন ড্রাইভ হোটেল-রিসোর্ট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুকিম খানের ভাষ্য, অগ্নিকাণ্ডের পর মেরিন ড্রাইভের রিসোর্টগুলোতে পর্যটকের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। বিপরীতে শহরের হোটেল ও গেস্টহাউসে অতিথির চাপ বেড়েছে। সোমবার শহরের হোটেল-গেস্টহাউসগুলোতে ৯০ হাজারের বেশি পর্যটক অবস্থান করছিলেন বলে জানান তিনি।

সৈকতে ভিড়, থাকার জায়গা বাছাইয়ে সতর্কতা

পর্যটকেরা কক্সবাজারে আসা বন্ধ করেননি; বরং থাকার জায়গা নির্বাচনে সতর্ক হচ্ছেন এমন চিত্রও দেখা যাচ্ছে। সোমবার দুপুরে লাবণী পয়েন্টে পর্যটকদের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। কেউ সাগরে গোসল করছেন, কেউ বালুচরে বসে সময় কাটাচ্ছেন। সুগন্ধা ও কলাতলী সৈকতেও ছিল উল্লেখযোগ্য সমাগম।

ঢাকার কমলাপুরের ব্যবসায়ী মাহবুবুল হক জানান, ইনানী সৈকতের একটি রিসোর্টে থাকার পরিকল্পনা করেছিলেন তিনি। কিন্তু আগুনে ১০ পর্যটকের মৃত্যুর খবর জানার পর সেখানে রাত কাটানোর বিষয়ে তার উদ্বেগ তৈরি হয়। মেরিন ড্রাইভের অনেক রিসোর্ট বাঁশ ও কাঠ দিয়ে তৈরি হওয়ায় তিনি বিকল্প হিসেবে শহরের হোটেল বেছে নেন।

এই অভিজ্ঞতা পর্যটন ব্যবসার জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে: সৈকতে পর্যটকের উপস্থিতি থাকলেও আবাসন প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা নিয়ে সংশয় তৈরি হলে তার প্রভাব কতটা বিস্তৃত হতে পারে?

ছুটিতে বড় ব্যবসার আশা, কিন্তু আস্থাই বড় চ্যালেঞ্জ

দুর্গাপূজা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছুটি মিলিয়ে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত টানা ১০ দিনের অবকাশ চলছে। পর্যটন ব্যবসায়ীরা আশা করছেন, এ সময়ে কক্সবাজারে অন্তত ১০ লাখ পর্যটকের সমাগম হবে। পর্যটনসংশ্লিষ্ট খাতে তাদের প্রত্যাশিত ব্যবসার পরিমাণ ৯০০ থেকে ১ হাজার কোটি টাকা।

কক্সবাজার হোটেল-গেস্টহাউস মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম সিকদার জানান, তারকা মানের ২০টির বেশি হোটেলের প্রায় ৯৫ শতাংশ কক্ষ আগাম বুকিং হয়েছে। মাঝারি মানের হোটেল, গেস্টহাউস ও কটেজের ক্ষেত্রেও বুকিংয়ের হার প্রায় ৮০ শতাংশ। শহরে পাঁচ শতাধিক হোটেল, রিসোর্ট ও গেস্টহাউস মিলিয়ে একসঙ্গে ১ লাখ ৬৮ হাজার মানুষের রাতযাপনের ব্যবস্থা রয়েছে।

আগামী ২১ অক্টোবর বিজয়া দশমী উপলক্ষে সৈকতের লাবণী পয়েন্টে প্রতিমা বিসর্জন উৎসব হওয়ার কথা। আয়োজকদের প্রত্যাশা, এ আয়োজন দেখতে আড়াই থেকে তিন লাখ মানুষের সমাগম হতে পারে। উৎসবকে ঘিরে পর্যটকের সংখ্যা বাড়ার সম্ভাবনা থাকলেও মেরিন ড্রাইভের রিসোর্টগুলোতে সেই বাড়তি চাহিদা কতটা প্রতিফলিত হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।

কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আবদুল শুক্কুর বলেন, ১০ দিনের ছুটিতে ১০ লাখ পর্যটক এলে হোটেল, রেস্তোরাঁসহ পর্যটনসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন খাতে ৯০০ থেকে ১ হাজার কোটি টাকার ব্যবসা হতে পারে।

জেলা প্রশাসক আ. মান্নান জানিয়েছেন, ছুটিতে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। পর্যটকদের হয়রানি বন্ধ ও সেবা নিশ্চিত করতে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের নেতৃত্বে একাধিক ভ্রাম্যমাণ আদালত কাজ করছেন। পুলিশ সুপার সাজেদুর রহমানও পর্যটকদের নিরাপত্তায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রস্তুতির কথা জানিয়েছেন।

তবে পর্যটন ব্যবসায়ীদের সামনে এখন শুধু ছুটির মৌসুমের ব্যবসা ধরে রাখার প্রশ্ন নয়, রিসোর্টে রাতযাপন নিয়ে পর্যটকদের আস্থাও ফিরিয়ে আনার চ্যালেঞ্জ রয়েছে। অগ্নিকাণ্ডের পর সংশ্লিষ্ট রিসোর্টগুলোর অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা কীভাবে যাচাই করা হচ্ছে, ঝুঁকি কমাতে কী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে এবং পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কী পরিবর্তন আসছে এসব প্রশ্নের উত্তরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

/আরএইচ/
সম্পর্কিত
মণ্ডপে মণ্ডপে বিসর্জনের সুর, রঙিন মুখে দেবী বিদায়ের প্রস্তুতি
রাজধানীতে ছুটির হাওয়া, সড়কে নেই চিরচেনা ব্যস্ততা
১২৬ বছরের ইতিহাস, ২৫ লাখ টাকার ৫২০ কেজির প্রতিমা, যেভাবে হয় বিসর্জন
সর্বশেষ খবর
সৌদিতে মৃত্যুদণ্ড: বাবা-মা বললেন ‘সুইটি জীবিত নাকি মৃত এখনও জানি না’
সৌদিতে মৃত্যুদণ্ড: বাবা-মা বললেন ‘সুইটি জীবিত নাকি মৃত এখনও জানি না’
মণ্ডপে মণ্ডপে  বিসর্জনের সুর, রঙিন মুখে দেবী বিদায়ের প্রস্তুতি
মণ্ডপে মণ্ডপে বিসর্জনের সুর, রঙিন মুখে দেবী বিদায়ের প্রস্তুতি
দুর্ঘটনায় ১৪ জন নিহত: বাসটি চালাচ্ছিলেন সুপারভাইজার, গতি ছিল বেপরোয়া
দুর্ঘটনায় ১৪ জন নিহত: বাসটি চালাচ্ছিলেন সুপারভাইজার, গতি ছিল বেপরোয়া
‘আমরা একদিন ভারতকে হারাবো’
‘আমরা একদিন ভারতকে হারাবো’
সর্বাধিক পঠিত
ইশরাকের পদত্যাগের পরই ‘ক্ষমতা’ নিয়ে স্ত্রীর বার্তা
ইশরাকের পদত্যাগের পরই ‘ক্ষমতা’ নিয়ে স্ত্রীর বার্তা
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর প্রসঙ্গে যা বললেন জামায়াত আমির
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর প্রসঙ্গে যা বললেন জামায়াত আমির
ওআইসির কাশ্মীর প্রস্তাবের নিন্দা ভারতের
ওআইসির কাশ্মীর প্রস্তাবের নিন্দা ভারতের
বাবার চোখ এড়াতে ঢোলা জামা, আড়ালে চলতো শিশুর ওপর নির্যাতন
বাবার চোখ এড়াতে ঢোলা জামা, আড়ালে চলতো শিশুর ওপর নির্যাতন
পদত্যাগ করানো সরকারের প্যারাসিটামল থেরাপি: হাসনাত
পদত্যাগ করানো সরকারের প্যারাসিটামল থেরাপি: হাসনাত