প্রতি উপজেলায় প্রবীণদের জন্যে যত্নকেন্দ্র চাই 

একজন মায়ের একাকী মৃত্যুর খবরে আমাদের সমাজ কষ্ট পেয়েছে, রাগান্বিত হয়েছে, প্রায় সব খবরের কাগজ এই খবর ছেপেছে, সামাজিক মাধ্যমে এই মায়ের সন্তানদের ছবি প্রকাশ করে ধিক্কার দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কাল আমরা এই ঘটনা ভুলে যাবো। তবে আমাদের সমাজ একদিনের জন্যে হলেও আবেগ-তাড়িত হয়েছে, তা দেখে মনে হয়েছে, যেমন করেই হোক, সমাজ এখনও বেঁচে আছে।

এই ঘটনা ভুলে যাবার সঙ্গে সঙ্গেই এমন সমাজ পরিস্থিতি কেন তৈরি হলো, আমাদের প্রবীণ বাবা-মায়েরা কেমন আছেন, কী করছেন– এই প্রশ্নগুলোও আমাদের মন থেকে মুছে যাবে।

যেই মা একাকী মৃত্যুবরণ করলেন, তিনি কি শুধুই একজন? আমাদের সমাজে আর কোনও মা-বাবা কি একাকী মৃত্যুর জন্যে অপেক্ষা করছেন না? আমরা সবাই জানি যে, এমন লাখ লাখ প্রবীণ ব্যক্তি আছেন, যাদের দিকে কেউ তাকাচ্ছে না, যাদেরকে নিয়ে কেউ ভাবছে না। আমাদের রাষ্ট্রের হয়তো সক্ষমতা কম, কিন্তু প্রস্তুতি নিলে অনেক কিছুই করা সম্ভব।

একসময় আমাদের সবচেয়ে বড় ভাবনা ছিল শিশু ও মাতৃ মৃত্যুহার, অপুষ্টি, সংক্রামক রোগ এবং গড় আয়ু কম হওয়া। আমরা সেই পরিস্থিতি থেকে অনেক দূর এগিয়েছি। বাংলাদেশের মানুষ এখন বেশি বছর বাঁচছে। চিকিৎসা ব্যবস্থা যতটুকুই থাকুক, কিছু না কিছু কাজে আসছে। কিন্তু আমাদের আয়ু বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আরেকটি বাস্তবতা আমাদের সামনে এসেছে, তা হচ্ছে প্রবীণ মানুষদের সংখ্যা।

২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী, বাংলাদেশে ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা ইতোমধ্যে প্রায় ১ কোটি ৫৩ লাখ। অর্থাৎ দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৯ শতাংশের বেশি মানুষ প্রবীণ। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার পূর্বাভাস বলছে, ২০৫০ সালের মধ্যে এই সংখ্যা ৩ কোটিরও বেশি হবে। তখন দেশের প্রতি পাঁচজন মানুষের একজন হবেন প্রবীণ। কয়েক বছর আগে ডেইলি স্টারে এক প্রতিবেদনে দেখেছিলাম— ২০২৯ সাল থেকে বাংলাদেশ একটি বয়স্কদের দেশ হতে শুরু করবে এবং ২০৪৩ সালে গিয়ে এর পূর্ণতা পাবে। তার অর্থ হচ্ছে, তখন ৬৫ এবং তার বেশি বয়সী মানুষ সংখ্যাগরিষ্ঠ হবেন।

এমন যদি হয়, তাহলে বাংলাদেশের সামাজিক ইতিহাসের একটি বড় পরিবর্তন হবে। এই মানুষেরা বসবাস করবেন কোথায়? অর্থনীতিতে এদের অবদান কী হবে?

আমরা এখনও মনে করি যে, পরিবারই প্রবীণদের যত্ন নেবে। এখনও ধরে বসে আছি যে, ছেলে-মেয়েরা বাবা-মায়ের পাশে থাকবে। নাতি-নাতনিদের সঙ্গে প্রবীণেরা সময় কাটাবেন, এক ছাদের নিচে কয়েক প্রজন্মের বসবাস হবে। এই কল্পনা সুন্দর, কিন্তু এখন আর বাস্তব নয়।

এখন আমাদের পরিবার কাঠামো বদলে গেছে। যৌথ পরিবার ভেঙে একক পরিবার হয়েছে। গ্রামের মানুষ শহরে চলে আসছে। মানুষ বিদেশে যাচ্ছে। মেয়েরা কর্মজীবনে যুক্ত হয়েছে। চাকরির প্রয়োজন মানুষকে এক জেলা থেকে আরেক জেলায়, এক দেশ থেকে আরেক দেশে যাচ্ছে। আগে যেখানে একই বাড়িতে তিন ভাইয়ের পরিবার থাকতো, এখন তারা তিন শহরে, তিন দেশে থাকে। আগে যেখানে বৃদ্ধ বাবা-মা ছেলেমেয়েদের সঙ্গে থাকতেন, এখন বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তারা একা থাকেন। আমরা তবে কেন মানতে চাইছি না যে, পারিবারিক পরিস্থিতি আগের মতো নেই এবং সেকারণেই প্রবীণদের প্রায় সবাই-ই একা জীবন যাপন করছেন। বিশ্বের অনেক দেশেই আমরা একই ঘটনা ঘটতে দেখেছি।

এই পরিবর্তনকে আমরা ভালো-খারাপ অনেক কিছুই বলতে পারি, কিন্তু এই সত্যকে অস্বীকার করতে পারবো না। আমি মনে করি, বাংলাদেশে আগামী ত্রিশ বছরে আমাদের সবচেয়ে বড় সামাজিক চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হবে প্রবীণদের একাকীত্ব এবং তাদেরকে দেখাশোনা করা।

প্রবীণদের নিয়ে আলোচনা করলেই আমরা শুধু খরচের কথা বলি। বয়স্ক ভাতা, পেনশন, চিকিৎসা ব্যয়—  এসব নিয়ে তুমুল আলোচনা হয়। কিন্তু একাকীত্বের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়ই না। মানুষ শুধু খাবার খেয়ে বাঁচে না। আমরা সঙ্গ চাই; কথা বলার মানুষ চাই; অসুস্থ হলে পাশে কাউকে চাই। কেউ যেন দেখা করে বা ফোন করে জানতে চেয়ে বলে— ‘আপনি কেমন আছেন?’ এই আকাঙ্ক্ষাও আমাদের মানসিক চাহিদা।

অনেক দেশেই এখন একাকীত্বকে জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ একাকীত্ব শুধু মানসিক সমস্যাই তৈরি করে না, এটি শারীরিক অসুস্থতার ঝুঁকিও বাড়িয়ে দেয়। আমরাই শুধু এটি বুঝি না।

আমাদের এখানে এই সংকট এখনও এত গুরুতর বলে আমরা মনে করি না, তবে সংকেতগুলো স্পষ্ট বোঝা যায়। আমাদের শহরগুলোতে অসংখ্য প্রবীণ মানুষ একা বসবাস করছেন। অনেকের সন্তান বিদেশে। অনেকের সন্তান দেশের অন্য শহরে। অনেকের পরিবার আছে, কিন্তু পরিবারের সদস্যদের সময় নেই। অনেকে শারীরিকভাবে দুর্বল, হাঁটতে পারেন না, ডিমেনশিয়া বা আলঝেইমারে ভুগছেন। কেউ পিছলে পড়ে গেলে তাকে হাসপাতালে নেওয়ার মানুষ নেই, কেউ অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়ে থাকলে খবর নেয়ারও মানুষ নেই।

এই মানুষেরা যাবেন কোথায়? কার কাছে যাবেন?

বাংলাদেশে এখনও প্রবীণ নিবাসকে এখনও নেতিবাচক দৃষ্টিতে বিচার করা হচ্ছে। ‘বৃদ্ধাশ্রম’ শব্দটি শুনলেই আমাদের মনে হয়— সন্তানেরা বাবা-মাকে পরিত্যাগ করেছে। কিন্তু আসলে তা নয়। তা কেন হবে? প্রবীণ নিবাস মানেই পরিত্যাগ নয়। প্রবীণ নিবাস মানে হতে পারে নিরাপত্তা, হতে পারে ভালো এবং সময়মতো চিকিৎসা, হতে পারে সঙ্গ, হতে পারে মর্যাদাপূর্ণ এবং আনন্দঘন।

আমরা জানি, একজন ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত মানুষের যত্ন নেওয়া অনেক কঠিন কাজ। একজন শয্যাশায়ী মানুষের সার্বক্ষণিক পরিচর্যা করতে প্রশিক্ষিত কর্মীর প্রয়োজন হয়। একজন প্রবীণের ওষুধ, পুষ্টি, ফিজিওথেরাপি, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা— এসবের জন্য বিশেষ ব্যবস্থার প্রয়োজন হয়। সব পরিবারের এসব সক্ষমতা নেই, থাকে না।

আমরা যদি শিশুদের জন্য ডে-কেয়ার ও স্কুল তৈরি করতে পারি, মাতাপিতাহীন শিশুদের জন্য শিশু পরিবার বানাতে পারি, আইন ভঙ্গকারীদের জন্যে কারাগার বানাতে পারি, রোগীদের জন্য হাসপাতাল বানাতে পারি, তাহলে প্রবীণ মানুষদের জন্যে আবাসিক যত্নকেন্দ্র গড়ে তোলাকে কেন আমরা স্বাভাবিক ও প্রয়োজনীয় বলে মনে করতে পারছি না?

সময় এসেছে প্রবীণ নিবাসকে নতুন করে ভাবার। ‘বৃদ্ধাশ্রম’ বলে আর না ডাকি, বলুন ‘প্রবীণ যত্নকেন্দ্র’। আমার মনে হয়, বাংলাদেশের প্রতিটি উপজেলায় অন্তত একটি করে প্রবীণ নিবাস থাকা উচিত। আমি সেই দাবি জানাচ্ছি।

উপজেলার কথা কেন বলছি?  কারণ বার্ধক্য একটি স্থানীয় বাস্তবতা। সবাই ঢাকায় এসে থাকতে পারবেন না। সবাই নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর বা চট্টগ্রামেও আসতে পারবেন না। একজন প্রবীণ মানুষ তাঁর পরিচিত পরিবেশের কাছাকাছি থাকতে চাইবেন। তিনি নিজের জেলা, নিজের উপজেলা, নিজের মানুষের কাছেই থাকতে চাইবেন।

আমাদের উপজেলার সংখ্যা ৪৯৫টি। আগামী ২০ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে ধাপে ধাপে প্রতিটি উপজেলায় একটি করে আধুনিক প্রবীণ নিবাস গড়ে তোলার জাতীয় পরিকল্পনা এখনই যদি নেওয়া হয়, তাহলে প্রবীণদের নিয়ে যেই বাস্তবতা আমাদের সামনে আসতে যাচ্ছে, তা সামাল দেওয়া সম্ভব।

এই নিবাসগুলো কেমন হবে? এগুলো শুধু বসবাসের স্থান হিসেবে ভাবলে হবে না। এগুলো হবে চিকিৎসা, পুনর্বাসন, বিনোদন এবং সামাজিক জীবনের কেন্দ্র। সেখানে প্রশিক্ষিত কেয়ারগিভার থাকতে হবে, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা থাকতে হবে। থাকবে লাইব্রেরি, হাঁটার জায়গা, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম এবং ধর্মচর্চার সুযোগ। পরিবারের সদস্যরা যেন নিয়মিত দেখা করতে পারেন, সেই ব্যবস্থাও থাকা প্রয়োজন, কারণ প্রবীণরা যেন মনে না করেন— তাঁরা সমাজ থেকে বেরিয়ে গেছেন।

এখন অনেকেই প্রশ্ন করবেন— আরে, এত টাকা কোথায় পাবো? হ্যা, খুবই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। কিন্তু উত্তর হচ্ছে যে, সরকার একা একাজ করবে না। সরকার, বেসরকারি খাত, করপোরেট সিএসআর তহবিল, দাতাসংস্থা, সমাজকল্যাণ সংগঠন এবং স্থানীয় সরকার—  সবাই মিলে এই অবকাঠামো তৈরি করতে পারে। আসল কথা হচ্ছে, বিষয়টা চিন্তা করে করতে চাইতে হবে।

বাংলাদেশে হাজার হাজার কোটি টাকা বিভিন্ন সামাজিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে ব্যয় হয়, অনেক সময় প্রয়োজন ছাড়াই ব্যয় হয়। ক্রমবর্ধমান প্রবীণ জনগোষ্ঠী যদি আগামী দিনের অন্যতম সামাজিক বাস্তবতা হয় এবং আপনারা যদি সততার সঙ্গে বিষয়টি ভেবে দেখেন, তাহলে এই বিনিয়োগকে ব্যয় নয়, ভবিষ্যতের প্রস্তুতি হিসেবে দেখা প্রয়োজন।

আপনাদের দৃষ্টিভঙ্গি একটু পরিবর্তন করতে হবে। আবারও বলি, আমরা শিশুদের জন্যে স্কুল তৈরি করছি, রোগীদের জন্যে হাসপাতাল তৈরি করছি। আমি আজ বলে দিতে পারি যে, আগামীতে আমাদের অনেক অনেক প্রবীণ নিবাস তৈরি করতে হবে। কারণ প্রবীণ মানুষদের সংখ্যা অনেক বেড়ে যাবে।

একটি বিষয় উপলব্ধি করা খুব প্রয়োজন। আজ হয়তো আমরা প্রবীণ নিবাস নিয়ে অস্বস্তি বোধ করতে পারি, কিন্তু আমাদের সন্তানদের এখন যাদের বয়স ৩০-৩৫ বছর, ২০৫০ সালে সেই হয়তো একজন ৫৫ কিংবা ৬০ বছরের মানুষ হবে। আজকের ৪০ বছরের মানুষটি তখন অনেক প্রবীণ হবেন। অর্থাৎ আমরা আসলে বর্তমানের প্রবীণদের জন্যে নয়, আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যেই এই অবকাঠামো তৈরি করবো।

প্রবীণ মানুষের সংখ্যা বাড়বে, তা নিশ্চিত। পারিবারিক কাঠামো আরও বদলাবে তাও নিশ্চিত। মানুষদের দীর্ঘমেয়াদি যত্নের প্রয়োজন বাড়বে, তা আরও হলফ করে বলা যায়। অনিশ্চিত শুধু একটি বিষয়— আমরা প্রস্তুতি নেবো? নাকি সংকট তৈরি হলে সেই এখনকার মতো আহা-উহু করবো?

আমরা অনেক বড় বড় উন্নয়ন করেছি। নদীর ওপর সেতু তুলেছি, বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়িয়েছি, ডিজিটাল সেবা বিস্তৃত করেছি, কৃষিপণ্য ডাইভার্সিফাই করেছি; ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ তলা ভবন গড়েছি। এখন মানবিক অবকাঠামোর উন্নত করার এসেছে।  কারণ একটি সভ্য সমাজকে শুধু তার আকাশচুম্বী ভবন দিয়ে বিচার করা যায় না। বিচার করা যায় সেই সমাজ তার সবচেয়ে দুর্বল মানুষদের পাশে কীভাবে দাঁড়াচ্ছে।

যেই মানুষগুলো এখন প্রবীণ বা ভবিষ্যতে প্রবীণ হবেন, একদিন তারাই আমাদের বড় করেছেন, এই দেশ গড়েছেন, কর দিয়েছেন, মাঠে কাজ করেছেন, আপিসে কাজ করেছেন, সন্তান মানুষ করেছেন, তাঁদের শেষ বয়সে নিরাপদ সেবা কেন্দ্র নিশ্চিত করা কোনো দয়া-দাক্ষিণ্য নয়, এটি রাষ্ট্র ও সমাজের নৈতিক দায়িত্ব।

তাই আমি আমাদের প্রতিটি উপজেলায় একটি করে আধুনিক, মর্যাদাপূর্ণ, মানবিক প্রবীণ যত্নকেন্দ্র তৈরি করার প্রক্রিয়া শুরু করার দাবী জানাচ্ছি। এটিই আগামী দিনের জরুরি অবকাঠামো।

ইকরাম কবীর: কথাসাহিত্যিক

ekabir@gmail.com