ব্যারিস্টার সালমা সোবহান: অধিকারের পক্ষে দাঁড়ানো এক সাহসী নাম

কিছু মানুষের সঙ্গে আমাদের কারও পরিচয় খুব অল্প সময়ের। হয়তো কয়েকটি কথার বেশি কথা হয়নি, পাশাপাশি কাজ করার সুযোগও হয়নি। তবু তাঁদের উপস্থিতি মনে থেকে যায়। সময়ের দূরত্ব যত বাড়ে, কখনও কখনও সেই অল্প সময়ের সাক্ষাৎই হয়ে ওঠে এক ধরনের স্মৃতি— যার সঙ্গে পরে যুক্ত হয় তাঁদের কর্ম ও জীবন সম্পর্কে জানার বিস্ময়। ব্যারিস্টার সালমা সোবহান আমার কাছে তেমনই একজন মানুষ।

তাঁর সঙ্গে আমার সরাসরি কাজ করার সুযোগ হয়নি। তবে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) সঙ্গে আমার কর্মজীবনের শুরুর মুহূর্তে একটি ইন্টারভিউ বোর্ডে তাঁকে দেখার সুযোগ হয়েছিল। তখন হয়তো তাঁর দীর্ঘ কর্মময় জীবনের পুরো ব্যাপ্তি উপলব্ধি করার মতো বয়স বা অভিজ্ঞতা আমার ছিল না। কিন্তু আজ পেছন ফিরে তাকালে মনে হয়, সেই সাক্ষাৎ ছিল বাংলাদেশের মানবাধিকার আন্দোলনের ইতিহাসের একজন গুরুত্বপূর্ণ মানুষের সামনে যাওয়ার বিরল সুযোগ।

সালমা সোবহান ছিলেন এমন একজন, যাঁর জীবনকে শুধু কয়েকটি পরিচয়ে আটকে রাখা যায় না। তিনি ছিলেন আইনজীবী, শিক্ষক, গবেষক, লেখক, মানবাধিকারকর্মী এবং নারী অধিকারের এক অগ্রণী সংগঠক। সবচেয়ে বড় কথা, তিনি তাঁর পেশাগত জ্ঞান ও সামর্থ্যকে মানুষের অধিকার ও মর্যাদার প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন।

১৯৩৭ সালের ১১ আগস্ট জন্ম নেওয়া সালমা সোবহান ১৯৫৯ সালে লিংকনস ইন থেকে বার-এট-ল সম্পন্ন করেন। তিনি সে সময়ের দুই পাকিস্তানের প্রথম নারী ব্যারিস্টার এবং উপমহাদেশের প্রথম মুসলিম নারী ব্যারিস্টার।

আমার মনে হয়, সালমা সোবহানের মাহাত্ম্য কেবল প্রথম হওয়ার মধ্যে নয়। বরং তিনি তাঁর সেই অর্জনকে কীভাবে ব্যবহার করেছিলেন, কীভাবে সেটি তাঁকে অনন্য করে তুলেছে। আইন তাঁর কাছে ছিল না কেবল আদালতের একটি পেশা। আইন ছিল মানুষের অধিকার রক্ষার একটি শক্তিশালী হাতিয়ার।

১৯৬২ সালে ঢাকায় ফিরে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে শিক্ষকতা শুরু করেন। প্রায় দুই দশক ধরে তিনি সেখানে আইন পড়িয়েছেন। তাঁর শিক্ষকতা ছিল আইনকে কেবল বইয়ের বিধান হিসেবে শেখানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়— আইন কীভাবে মানুষের জীবন, সমাজের বৈষম্য এবং ন্যায়বিচারের প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত, সেই বৃহত্তর বাস্তবতার সঙ্গে তাঁর চিন্তা ও কাজের গভীর সম্পর্ক ছিল।

১৯৭৪ সালে তিনি বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ল’ অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স-বিলিয়ায় গবেষক হিসেবে যোগ দেন। সেখানে তাঁর প্রধান দায়িত্বগুলোর একটি ছিল সুপ্রিম কোর্ট ল’ রিপোর্ট সম্পাদনা করা। আইন শিক্ষা ও মানবাধিকার আন্দোলনের পাশাপাশি আইন গবেষণা ও বিচারব্যবস্থার নথিবদ্ধকরণেও তাঁর এই ভূমিকা তাঁর কর্মজীবনের বহুমাত্রিকতা তুলে ধরে।

তবে তাঁর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলোর একটি নিঃসন্দেহে মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র(আসক) প্রতিষ্ঠা । মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কাজ করা এবং আইনের আশ্রয় থেকে বঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর প্রয়োজন থেকেই ‘আসক’- এর যাত্রা হয়েছিল। সালমা সোবহান ছিলেন এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং ১৯৮৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত নির্বাহী পরিচালক হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির নেতৃত্ব দেন। তাঁর নেতৃত্বে আসক ধীরে ধীরে বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মানবাধিকার সংগঠনে পরিণত হয়।

আজ আমরা আসকের যে কাজগুলোকে স্বাভাবিকভাবে দেখি—মানবাধিকার লঙ্ঘনের তথ্য সংগ্রহ ও নথিবদ্ধ করা, ভুক্তভোগীদের পাশে দাঁড়ানো, আইনি সহায়তা, নারী ও শিশুর অধিকার নিয়ে কাজ, নীতিগত সংস্কারের দাবি এবং রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির প্রশ্ন তোলা— এসবের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ এক প্রাতিষ্ঠানিক যাত্রা। সেই যাত্রার গোড়ার দিকে সালমা সোবহানের চিন্তা, নেতৃত্ব ও নিষ্ঠা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) বাইরে তাঁর কাজের পরিধিও ছিল বিস্তৃত। তিনি বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্টের (ব্লাস্ট) প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টিদের একজন ছিলেন। বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের মানবাধিকার ও আইনি সেবা কর্মসূচিতেও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। গ্রামীণ নারীদের আইন ও অধিকার সম্পর্কে সচেতন করা এবং বিরোধ নিষ্পত্তিতে প্যারালিগ্যাল তৈরি করার উদ্যোগের সঙ্গেও তিনি যুক্ত ছিলেন। তিনি নারী অধিকারভিত্তিক আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের সঙ্গেও সক্রিয়ভাবে কাজ করেছেন।

তাঁর চিন্তার একটি বড় শক্তি ছিল— তিনি মানুষের অধিকারকে আলাদা আলাদা খোপে দেখেননি। নারী অধিকার, শ্রমিকের অধিকার, দরিদ্র মানুষের আইনি সুরক্ষা, আইনের শাসন, সামাজিক ন্যায়বিচার—সবকিছুকে তিনি একই বৃহত্তর মানবাধিকারের কাঠামোর মধ্যে দেখেছিলেন। আর এই জায়গাতেই সালমা সোবহান আজও আমাদের কাছে প্রাসঙ্গিক।

আমার সেই ইন্টারভিউ বোর্ডের স্মৃতি তাই আজ অন্যভাবে ফিরে আসে। তখন হয়তো একজন প্রার্থী হিসেবে আমি বোর্ডের সদস্যদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার কথা ভাবছিলাম। আজ মনে হয়, সেখানে বসে থাকা মানুষগুলোর একজন ছিলেন এমন একজন, যাঁর নিজের জীবনই ছিল এক অসাধারন ক্যানভাস। কীভাবে শিক্ষা, আইন ও পেশাগত দক্ষতাকে মানুষের অধিকার রক্ষার কাজে নিয়োজিত করা যায় তাঁর এক অনন্য উদাহরণ।

আজ তাঁর জন্মবার্ষিকীতে তাঁকে স্মরণ করতে গিয়ে মনে করতে চাই— তাঁর সাহসকে। তাঁর সময়কে। তাঁর পথচলাকে।

এমন এক সময়ে তিনি নারী হিসেবে আইন পেশায় প্রবেশ করেছিলেন, যখন পথটি সহজ ছিল না, এমন এক সময়ে মানবাধিকার নিয়ে কাজ করেছেন, যখন এই কাজের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক পরিসরও ছিল সীমিত।

আজ বাংলাদেশের মানবাধিকার আন্দোলন নিয়ে যাঁরা বা যে প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ করছে, যে ভাষায় মানবাধিকারের কথা বলছেন, যে পদ্ধতিতে অধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা নথিবদ্ধ করছেন, কিংবা আইনের মাধ্যমে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন— সেখানে কোথাও না কোথাও সালমা সোবহানের রেখে যাওয়া উত্তরাধিকারের ছাপ রয়েছে, এ কথা আমার নয় বরং আমাদের। সালমা সোবহান ২০০৩ সালের ২৯ ডিসেম্বর মৃত্যুবরণ করেন।

৮৯তম জন্মবার্ষিকীর দিনে এই মহীয়সীর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।

লেখক: মানবাধিকার কর্মী