অনলাইন মব, ক্ষমতার বিকৃত খেলা ও নারীর মানহানি 

ফারিন বিনতে জহির
০৫ আগস্ট ২০২৬, ১৪:০০ আপডেট : ০৫ আগস্ট ২০২৬, ১৪:০০

২০২৬ সালে এসে বিশ্ব যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আর মহাকাশ প্রযুক্তির নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে, তখন আমাদের সমাজ ও ডিজিটাল পাড়া ব্যস্ত রয়েছে একজন শিক্ষিকার অনলাইন বিনোদন ঘিরে মধ্যযুগীয় বিচারালয় বসাতে। সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার পিটাইটিকর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা বিউটি রাণী পালের একটি সাধারণ ফেসবুক রিলস ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর সোশ্যাল মিডিয়ায় যে ট্রলিং, কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য এবং ভার্চুয়াল লিঞ্চিংয়ের ঝড় উঠলো, তা কেবল একজন ব্যক্তিকে আক্রমণের ঘটনা নয়, বরং এটি আমাদের সার্বিক মানসিক দেউলিয়াত্ব, পিতৃতান্ত্রিক অহং এবং সাইবার অপরাধপ্রবণতার এক নগ্ন প্রতিচ্ছবি।

একটি নির্দোষ ভিডিও ঘিরে সমাজ ও প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া স্পষ্ট করে দেয় যে প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতি সত্ত্বেও আমাদের মননে এখনও নারী-বিদ্বেষ এবং সস্তা উগ্রতার চরম উপস্থিতি রয়েছে। এই ঘটনার নেপথ্যে লুকিয়ে থাকা সামাজিক ও প্রশাসনিক অসঙ্গতিগুলো গভীর বিশ্লেষণের দাবি রাখে।

মনস্তাত্ত্বিক ও নারীবাদী বিশ্লেষণে ‘পাওয়ার প্লে’ বলতে কোনও ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর এমন এক কৌশলগত পদক্ষেপকে বোঝায়, যার লক্ষ্য অন্যকে দমন করা বা নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা। আলোচ্য ঘটনার মূলে রয়েছে—ঠিক এই বিকৃত ক্ষমতার খেলা। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, জনৈক ব্যক্তি উক্ত শিক্ষিকাকে ফেসবুক রিকোয়েস্ট পাঠিয়েছিলেন, যা তিনি গ্রহণ করেননি। একজন নারীর স্বাতন্ত্র্য এবং একজন পুরুষের অযাচিত উপস্থিতিকে ‘না’ বলার এই মৌলিক অধিকারকে পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা মেনে নিতে পারেনি। প্রত্যাখ্যাত হয়ে নিজের ক্ষোভ, রাগ ও নিয়ন্ত্রণ হারানোর ভয় থেকে সেই ব্যক্তি শিক্ষিকাকে সামাজিকভাবে হয়রানি করার সিদ্ধান্ত নেয়।

আমাদের সমাজ যৌনতা নিয়ে এক অদ্ভুত ভণ্ডামি ও ট্যাবু লালন করে। এই সামাজিক দুর্বলতাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে সেই ব্যক্তি ভিডিও পোস্টটিতে যৌনতার উসকানিমূলক নোংরা ব্যাখ্যা জুড়ে দেয়। উদ্দেশ্য ছিল খুব পরিষ্কার, উৎসুক জনতাকে উসকে দেওয়া। ফলশ্রুতিতে, তথ্য যাচাই না করেই ফেসবুকের তথাকথিত ‘নৈতিকতার প্রহরীরা’ পঙ্গপালের মতো ঝাঁপিয়ে পড়লো। প্রতিশোধের এই বিষাক্ত চালে একজন দায়িত্বশীল শিক্ষিকাকে অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে বিচারে দাঁড় করানো হলো। একজন নারীর ‘না’ বলার সাহসের মূল্য চুকোতে হলো সাইবার বুলিংয়ের শিকার হয়ে।

যে ভিডিওর কন্টেটে কোনও অশ্লীলতা ছিল না, এমনকি তদন্তে এবং শিক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্তদের পর্যবেক্ষণেও স্পষ্ট হয়েছে যে এতে আপত্তিকর কিছুই নেই। সেই পোস্টটি কেবল সামাজিক মানসিক চাপের মুখে ওই শিক্ষিকাকে নিজ ওয়াল থেকে মুছে ফেলতে হয়েছে। কেবল ‘নারী’ হওয়ার কারণে তাকে এই চরম মাশুল দিতে হলো।

এখানে একটি সোজা প্রশ্ন উঠে আসে—আজ যদি কোনও পুরুষ শিক্ষক একই ধরনের ব্যাকগ্রাউন্ড সংগীতে একটি সাধারণ রিল বানাতেন, কিংবা বাতাসে হাত-পা নেড়ে ভিডিও পোস্ট করতেন, তবে কি সমাজ একইভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাতো? কেউ কি প্রশ্ন তুলতো “ইনি কেমন শিক্ষক? এর কাছ থেকে শিক্ষার্থীরা কী শিখবে?” অবশ্যই না। তাকে হয়তো ‘স্মার্ট’ বা ‘প্রাণোচ্ছ্বল’ আখ্যা দিয়ে এড়িয়ে যাওয়া হতো। অথচ একজন নারী শিক্ষক হওয়ামাত্রই তার শিক্ষাগত যোগ্যতা, মেধা, মনন, শ্রম ও সৃজনশীলতার মূল্যায়ন শূন্যে নামিয়ে আনা হলো একটি সামান্য রিলসের দোহাই দিয়ে।

তদন্ত কমিটি গঠনের প্রোপাগান্ডা থেকে শুরু করে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের (মাউশি) বিভিন্ন নোটিশ ও নির্দেশনা যেন এই প্রাতিষ্ঠানিক লিঙ্গবৈষম্যেরই বহিঃপ্রকাশ। মাউশি নারী শিক্ষার্থীদের ‘মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় মনের বন্ধু’ কর্মসূচির মতো ভালো উদ্যোগ নিয়েছে, যা প্রশংসনীয়। কিন্তু একজন নারী শিক্ষক যখন পুরো সমাজের এই চরম হেনস্তা ও ট্রলিংয়ের শিকার হন, তখন তার মানসিক স্বাস্থ্যের সুরক্ষা বা সচেতনতার খবর কে রাখে?

একজন শিক্ষককে যদি ২৪ ঘণ্টা সমাজ ও নেটিজেনদের দৃষ্টিভঙ্গির তদারকিতে থাকতে হয়, তবে তিনি কর্মক্ষেত্রে নিজের শতভাগ মনোযোগ দেবেন কীভাবে? মুখে নারী ক্ষমতায়নের বুলি আওড়ালেও আমরা কি সত্যিই নারীবান্ধব ও চাপমুক্ত কর্মপরিবেশ তৈরি করতে পেরেছি? আমাদের সমাজে শিক্ষক সম্পর্কিত একটি করুণ ও প্রথাগত ধারণা বদ্ধমূল হয়ে আছে, শিক্ষক মানেই তাকে হতে হবে হতদরিদ্র, জরাজীর্ণ, নিরানন্দ ও মলিন চেহারার। কোনও শিক্ষক যদি যুগোপযোগী, স্মার্ট, মননশীল বা আধুনিক হন, তবে নাকি তার শিক্ষকতার যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে!

২০২৬ সালে দাঁড়িয়েও এই মানসিকতা প্রমাণ করে আমাদের চিন্তাধারা কতটা পিছিয়ে আছে। কারও ব্যক্তিগত ভিডিও অনুমতি ছাড়া সংগৃহীত করে নিজের পেজে পোস্ট করা, তাকে নিয়ে ট্রলিং, মকিং বা বডি-শেমিং করা কোনও নাগরিক অধিকার হতে পারে না। এটি স্রেফ একটি অপরাধ, যার নাম সাইবার ক্রাইম। যে ফেসবুক পেজ প্রথম এটি ছড়িয়ে বিতর্ক উসকে দিলো, তাকে এই ‘সোশ্যাল পুলিশিং’ বা সামাজিক প্রহারের অধিকার কে দিলো? অন্যের ব্যক্তিগত জীবন ও গোপনীয়তা হরণ করা দেশের প্রচলিত আইনে দণ্ডনীয় অপরাধ।

এই ঘটনার পেছনে আরও একটি চরম আশঙ্কাজনক মাত্রা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, যা আমাদের সামাজিক বাস্তবতার একটি অন্ধকার দিক উন্মোচিত করে। বিতর্কটি কি কেবল একজন নারীর ব্যক্তিগত স্বাধীনতাকেন্দ্রিক, নাকি তিনি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত বলেই আক্রমণের তীব্রতা এত বেশি? আমাদের সমাজে একশ্রেণির ধর্মান্ধ গোষ্ঠী প্রতিনিয়ত সাধারণ মানুষের মননে নারী-বিদ্বেষ এবং সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প ইনজেক্ট করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের একজন স্পষ্টভাষী, আত্মনির্ভরশীল ও স্বাধীনচেতা নারীকে সামাজিক বা প্রাতিষ্ঠানিক কাঠগড়ায় দাঁড় করানো এই বিকৃত মানসিকতার উগ্রপন্থিদের জন্য সবসময়ই একটি সহজ লক্ষ্যবস্তু। সামাজিক ট্যাবু আর চরম ধর্মান্ধতাকে ঢাল বানিয়ে একজন সংখ্যালঘু নারী শিক্ষককে যেভাবে মানসিক চাপে ফেলা হলো, তা আমাদের ধর্মীয় সহনশীলতার ভিত্তিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। এতে স্পষ্ট যে সমাজ ও সাইবার অঙ্গনে সংখ্যালঘু নারীদের নিরাপত্তা আজ চরম ঝুঁকির মুখে।

যে স্বাধীন বাংলাদেশে আজ একজন নারী শিক্ষিকাকে সাধারণ এক সোশ্যাল মিডিয়া ভিডিওর জন্য পদে পদে লাঞ্ছিত হতে হচ্ছে, সেই বাংলাদেশের জন্ম ইতিহাস কি আমরা ভুলে গেছি? ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে নারীদের অবদান কেবল সহায়ক হিসেবে সীমাবদ্ধ ছিল না। বীর প্রতীক তারামন বিবি কিংবা সেতারা বেগমের মতো নারীরা সরাসরি অস্ত্র হাতে যুদ্ধক্ষেত্রে লড়াই করেছেন। কাকন বিবির মতো বীরাঙ্গনারা জীবনবাজি রেখে রেকি করে খবরাখবর এনে দিয়েছেন, শত শত নারী মুক্তিযোদ্ধা প্রশিক্ষণ নিয়ে সম্মুখসমরে অংশ নিয়েছেন, আবার কেউ কেউ প্রাথমিক চিকিৎসা ও আশ্রয় কেন্দ্রে অবিরাম সেবা দিয়েছেন। আর আড়াই লাখেরও বেশি নারী তাঁদের সম্ভ্রম ও চরম আত্মত্যাগের বিনিময়ে এই স্বাধীন ভূখণ্ড আমাদের উপহার দিয়েছেন।

অথচ কী নির্মম বাস্তবতা! যে দেশে নারীদের এত রক্ত, সম্ভ্রম ও অপরিসীম ত্যাগের বিনিময়ে স্বাধীনতা অর্জিত হলো, সেই স্বাধীন দেশে আজও নারীদের নিরাপত্তা থাকবে না? একজন স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে নারীর আত্মমর্যাদা ও মুক্তচিন্তার কোনও গ্যারান্টি থাকবে না? নারীদের সেই বীরত্বপূর্ণ ইতিহাসের ওপর দাঁড়িয়ে আজ যদি সমাজ ও রাষ্ট্র তাঁদের সামান্যতম সম্মান আর আইনি সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়, তবে এই স্বাধীনতার অর্থই বা কী থাকে?

প্রযুক্তির চরম উৎকর্ষের যুগে বসবাস করেও আমরা নারীকে রক্ত-মাংসের স্বাধীন ‘মানুষ’ হিসেবে গণ্য করতে শিখিনি। আমাদের মানসিকতায় আজও নারী মানেই ঘরের চার দেয়ালে বন্দি এক ‘মোমের পুতুল’, যাকে যেভাবে ইচ্ছা ভেঙে ফেলা যায়, যার নিজস্ব কোনও আনন্দ বা অনুভূতির অধিকার থাকতে নেই, এবং যাকে চাইলেই নৈতিকতার কাঠগড়ায় দাঁড় করানো যায়।

একজন শিক্ষিকা বা একজন নারী শুধুই তার পেশা বা সামাজিক পরিচয়ে আটকে থাকা কোনও জড়বস্তু নন। কর্মক্ষেত্রের বাইরে তাঁর নিজের ব্যক্তিগত পছন্দ, বিনোদন ও মুক্তচিন্তার সম্পূর্ণ অধিকার রয়েছে। বিকৃত ক্ষমতার খেলা, সস্তা ভার্চুয়াল পুলিশিং এবং সাম্প্রদায়িক-মৌলবাদী মানসিকতার এই সামাজিক আক্রমণ অবিলম্বে বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। ভণ্ড সামাজিকতার মুখোশ খুলে ফেলে অপরাধীকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা এবং নাগরিকের মৌলিক অধিকার ও আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করাই এখন সময়ের দাবি।

লেখক: পিএইচডি গবেষক, ইউনিভার্সিটি অফ লুইভেল, যুক্তরাষ্ট্র

/এপিএইচ/এমওএফ/
সম্পর্কিত
শিক্ষায় এগিয়ে, ক্ষমতায়নে পিছিয়ে: দেশে নারীর সংকট কোথায়
স্ক্রিনের ওপারে কেমন ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে শিশুদের?
পর্যটন অর্থনীতি-৯: যোগাযোগ-নিরাপত্তা নিশ্চিতের পর অবকাঠামো উন্নয়নই পর্যটনের মূল স্তম্ভ
সর্বশেষ খবর
পিকআপচালক হত্যা মামলায় ১ জনের মৃত্যুদণ্ড, ৩ জনের যাবজ্জীবন
পিকআপচালক হত্যা মামলায় ১ জনের মৃত্যুদণ্ড, ৩ জনের যাবজ্জীবন
অস্টেনের রোমান্সে ডিওরের নতুন সাজ, প্যারিস মাতালেন জোনাথন অ্যান্ডারসন
অস্টেনের রোমান্সে ডিওরের নতুন সাজ, প্যারিস মাতালেন জোনাথন অ্যান্ডারসন
বাংলাদেশ-তুরস্কের মধ্যে বিমান চলাচল ও পর্যটন খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান
বাংলাদেশ-তুরস্কের মধ্যে বিমান চলাচল ও পর্যটন খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান
এলএনজির ঘাটতি নেই, আসছে ১৯ কার্গো: পেট্রোবাংলা
এলএনজির ঘাটতি নেই, আসছে ১৯ কার্গো: পেট্রোবাংলা
সর্বাধিক পঠিত
‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বই বিক্রয়ে বাধা নিয়ে মধ্যরাতে আসিফ নজরুলের পোস্ট
‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বই বিক্রয়ে বাধা নিয়ে মধ্যরাতে আসিফ নজরুলের পোস্ট
পুলিশ পরিদর্শককে কল করে এমপি বললেন ‘এসব ফাইজলামি বাদ দেন’
পুলিশ পরিদর্শককে কল করে এমপি বললেন ‘এসব ফাইজলামি বাদ দেন’
ঘরে টাকার স্তূপ-স্বর্ণ-গাড়ি, গ্রেফতার মাদক সম্রাজ্ঞী
ঘরে টাকার স্তূপ-স্বর্ণ-গাড়ি, গ্রেফতার মাদক সম্রাজ্ঞী
পুলিশের ঊর্ধ্বতন দুই কর্মকর্তা বরখাস্ত
পুলিশের ঊর্ধ্বতন দুই কর্মকর্তা বরখাস্ত
দুদকের বিরুদ্ধে আসিফ মাহমুদের রিট, হাইকোর্টে শুনানির আগেই যা হলো
দুদকের বিরুদ্ধে আসিফ মাহমুদের রিট, হাইকোর্টে শুনানির আগেই যা হলো