‘সীতাকুণ্ড ট্র্যাজেডি’ কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড

শ্রম আইন অনুযায়ী ৮ ঘণ্টার বেশি কাজ করালে ‘ওভারটাইম’ মজুরি দেওয়ার কথা। একইসঙ্গে সাপ্তাহিক ছুটিও থাকার কথা। কিন্তু এসব কিছুই ছিল না ‘ফেরদৌস স্টিলে’। শ্রম আইন লঙ্ঘন করে শ্রমিকের মজুরি ও ছুটি ডাকাতি করে চলছিল এই কারখানার মালিকেরা। সম্প্রতি চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারীর এই কারখানার ইয়ার্ডেই ‘এমভি রাসি’ নামের একটি জাহাজ ভাঙতে গিয়ে ‘খুন’ হয়েছেন ৯ শ্রমিক। রাষ্ট্র, মালিকপক্ষ এবং ক্ষমতাকাঠামোর অবহেলা, দায়িত্বহীনতা ও চরম নিরাপত্তাহীনতার কারণে ঘটতে থাকা এসব মৃত্যু নিছক ‘দুর্ঘটনা’ নয়। বঞ্চনা ও ন্যায়বিচারের প্রশ্নে সীতাকুণ্ড-ট্র্যাজেডি ‘কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড’।

শ্রমিকের মৃত্যুর খবর গণমাধ্যমে না এলে আমাদের হয়তো জানা হতো না, কেবল ঝুঁকিপূর্ণ ও নিরাপত্তাহীন কর্মপরিবেশ নয়, এই কারখানায় শ্রমিকের অধিকারও প্রবলভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছিল। মালিক ওভারটাইমের মজুরি দিতেন না এবং শুক্রবারেও কাজ করাতেন। ৯ জনের মৃত্যুর পরও মালিকপক্ষ তার মিথ্যা বয়ান পাল্টায়নি। মালিকপক্ষের প্রতিনিধি গণমাধ্যমে দাবি করেন, শুক্রবার কারখানা বন্ধ থাকে। কারখানার সেফটি বিভাগের লোকজন কাজ করার সময় দুর্ঘটনাটি ঘটে।

দায়ী মালিকপক্ষ পঞ্জিকার পাতা কীভাবে বদলাবে? ১৪ আগস্ট ছিল শুক্রবার। সাপ্তাহিক ছুটির দিন হলেও ‘ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং’ ইয়ার্ডে জাহাজ ভাঙার কাজে নেমেছিল ২০ শ্রমিক। ইয়ার্ডের স্ক্র্যাপ জাহাজের বিষাক্ত গ্যাস ছড়িয়ে পড়লে কর্মরত অবস্থায় শ্রমিকেরা বেহুঁশ ও দমবন্ধ হয়ে মারা যান। গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নেন ১১ জন। জাহাজটিতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও সামগ্রী ছিল না। এত অবহেলা ও অব্যবস্থাপনার পরও এই বিতর্কিত ‘ফেরদৌস স্টিল’ বাংলাদেশের একটি সবুজ কারখানা হিসেবে সনদ পেয়েছিল!

‘বাংলাদেশ জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ বোর্ড’ মূলত ‘গ্রিন ইয়ার্ড’ সনদটি দেয়। শ্রমিকের নিরাপত্তা, পরিবেশ সুরক্ষা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার নিয়ম মেনে যারা জাহাজ ভাঙে, তাদের এই সনদ পাওয়ার কথা। দেশে ৮৪টি নিবন্ধিত জাহাজভাঙা কারখানা বা প্রতিষ্ঠান আছে। এর মধ্যে নানা সূচকে ২৩টিকে ‘গ্রিন ইয়ার্ড’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সাম্প্রতিক ঘটনার পর এই গ্রিন ইয়ার্ড নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। সবুজ সনদের আড়ালে কী ঘটছে, তার তদন্ত দরকার। শুধু তাই নয়, গ্রিন ইয়ার্ডখ্যাত এই কারখানাটির আরও অন্যায় ও দায়িত্বহীনতা সামনে এসেছে। এই কারখানার নামে একটি মামলা চলমান থাকা অবস্থাতেও তারা কীভাবে ‘গ্রিন’ থাকে, সেটাই প্রশ্ন।

হত্যাকাণ্ডের পর ‘কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদফতরের’ উপমহাপরিদর্শক গণমাধ্যমে জানান, দেড় মাস আগে ইয়ার্ডটি পরিদর্শন করে নিরাপত্তাজনিত ঘাটতি পাওয়ায় এর বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছিল। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে পরিবেশ অধিদফতরের ৫২৯তম সভায় ফেরদৌস স্টিলকে জাহাজটি কাটার অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। অথচ এক বছরের মাথায় চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ফেরদৌস স্টিলে নিরাপত্তা ও শ্রমিকের ন্যায্য পাওনা হরণ সংক্রান্ত বহু অনিয়ম খুঁজে পায় কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদফতর। নিরাপত্তা বিষয়ে শ্রমিকদের সচেতন না করা, ঝুঁকি মূল্যায়ন প্রতিবেদন জমা না দেওয়া এবং শ্রমিকদের ওভারটাইমের টাকা না দেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগ প্রমাণিত হয়। পরিদর্শন অধিদফতর বারবার নোটিশ দিলেও প্রতিষ্ঠানটি কোনো জবাব দেয় না। শেষে বাধ্য হয়ে জুলাই মাসে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে শ্রম আদালতে মামলা করে পরিদর্শন অধিদফতর। মামলায় প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার ফেরদৌস ওয়াহিদ ও ব্যবস্থাপক মো. ইউসুফ আলীকে আসামি করা হয়েছে। মামলাটি এখনো বিচারাধীন।

ঘটনাস্থলে কোনো সেফটি অফিসার ছিল না বলে জানায় ফায়ার সার্ভিস। ৩০ হাজার ৭৭০ টন ওজনের ‘এমভি রাসি’ জাহাজটি সর্বশেষ এলএনজি বহন করছিল। জাহাজটি দেড় বছর ধরে ভাঙা হচ্ছিল। চারদিকে জাহাজটি কাটা ছিল। এতে এলএনজি মজুত ছিল, যা বিষাক্ত গ্যাসে পরিণত হয়ে পানিতে ছড়িয়ে পড়ে। শ্রমিকেরা দমবন্ধ হয়ে বেহুঁশ হয়ে মারা গেছেন। কাটার আগে জাহাজটি গ্যাসমুক্ত করা হয়নি।

প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিজ্ঞতা থেকে গণমাধ্যম জানায়, জাহাজটির এলএনজি ট্যাংক কাটার শেষ পর্যায়ে তলার দিকের একটি ট্যাংকের চারপাশ কাটার প্রায় ১০ মিনিট পর পুরোটা খোলার জন্য শ্রমিকেরা সেখানে যান। প্রথমে দুজন শ্রমিক জ্ঞান হারান। তাঁদের উদ্ধার করতে গিয়ে আরও দুজন জ্ঞান হারান। কাটিং ফোরম্যানও এগিয়ে এসে জ্ঞান হারান। মাস্ক পরে যাওয়া এক নিরাপত্তাকর্মীও অজ্ঞান হয়ে যান। এভাবেই একের পর এক শ্রমিক কাজ করতে গিয়ে বেঘোরে খুন হন। তবে অজ্ঞান হওয়ার পর সময়মতো উদ্ধার ও চিকিৎসা সহায়তা দেওয়ার অবহেলার অভিযোগও উঠেছে। অজ্ঞান হওয়া শ্রমিকদের জন্য প্রতিষ্ঠানে কোনো অক্সিজেন সিলিন্ডার, অ্যাম্বুলেন্স বা চিকিৎসক কিছুই ছিল না। অথচ সেখানে তিনটি অ্যাম্বুলেন্স ছিল।

‘বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএসবিআরএ)’ পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। কাটার আগে জাহাজটি যথাযথভাবে গ্যাসমুক্ত করা হয়েছিল কি না, ‘গ্যাস ফ্রি’ সনদ ছিল কি না, গ্যাস পরীক্ষা হয়েছিল কি না এবং নিরাপত্তাবিধি মানা হয়েছিল কি না, তদন্তে এসব বিষয় প্রাধান্য পাবে। নিহত শ্রমিকদের পরিবারকে ১০ লাখ টাকা এবং আহতদের চিকিৎসার দায়িত্ব নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে জাহাজভাঙা শিল্প মালিক সমিতি। শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব কারখানাটি পরিদর্শন করে কার্যক্রম স্থগিত রাখার নির্দেশ দেন। বিস্ফোরক অধিদফতরের সূত্র দিয়ে গণমাধ্যম জানায়, জাহাজের ব্যালাস্ট এলাকায় হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাস ছড়িয়ে পড়েছিল।

দক্ষিণ এশিয়ার শিল্প না হলেও, চলাচল অনুপযোগী মেয়াদোত্তীর্ণ জাহাজ ভাঙার বিশাল কারবার এখন বাংলাদেশের সীতাকুণ্ডে। জীবনের শক্তি দিয়ে এক একটি দশাসই জাহাজ ভাঙেন শ্রমিকেরা। ভাঙা জাহাজের ইঞ্জিন, ইস্পাত, ধাতু, উপকরণ, তার, আসবাব, সবকিছু বিক্রি হয়। যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে জাহাজভাঙা শিল্প গড়ে উঠলেও পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য প্রশ্নে তা ক্রমান্বয়ে সেসব দেশে বাতিল হতে থাকে। জাপান, চীন, দক্ষিণ কোরিয়ায় স্থানান্তরিত হয়। আশির দশক থেকে ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের উপকূল-সৈকত দখল করে এই বিনাশী জাহাজভাঙা শিল্প। জাহাজভাঙা শিল্পে এখন ভারতের পরেই বাংলাদেশের অবস্থান।

জাহাজভাঙা শিল্পে প্রতিবছর শ্রমিকের প্রশ্নহীন মৃত্যু হয়। ২০১৯ সালে নিহত হন ২৩ জন। ‘বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিলস)’ দেখায়, ২০১৫ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত জাহাজভাঙা শিল্পে ১৩৭ জন শ্রমিক মারা গেছেন। ঝুঁকিপূর্ণ ও নিরাপত্তাহীন কর্মপরিবেশ, সুরক্ষাসামগ্রীর অভাব, দ্রুত উদ্ধারকাজ ও প্রশিক্ষণের অভাব, নিয়মিত পরীক্ষণ ও ব্যবস্থাপনায় ত্রুটির কারণে জাহাজভাঙা শিল্প মূলত জীবন ও পরিবেশের জন্য এক অমীমাংসিত হন্তারক জিজ্ঞাসা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে আছে।

২০০৯ সালে গৃহীত ‘হংকং ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন ফর দ্য সেফ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টালি সাউন্ড রিসাইক্লিং অব শিপস’ সনদে বাংলাদেশ যোগ দেয় ২০২৩ সালে। শ্রমিক ও জনস্বাস্থ্য এবং পরিবেশ সুরক্ষার বিষয় এই সনদের অন্যতম অঙ্গীকার। রাষ্ট্রীয়ভাবে তৈরি ‘বাংলাদেশ জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ আইন ২০১৮’ এবং ‘জাহাজভাঙা ও জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ বিধিমালা ২০১১’-তেও শ্রমিক ও পরিবেশের নিরাপত্তার অঙ্গীকার করেছে বাংলাদেশ। কিন্তু এসব আন্তর্জাতিক সনদ ও রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকার সত্ত্বেও শ্রমিকের জীবন, পরিবেশ ও সামগ্রিক অর্থনীতি সুরক্ষিত হতে পারছে না কেন?

নিহত মোহাম্মদ নাসির উদ্দীন ও মোহাম্মদ মনসুর আলীর বাড়ি সীতাকুণ্ডের আকবর আলী হাট এলাকায়। পলাশ জলদাস, সানি জলদাস ও মতিউর রহমানের বাড়ি ভাটিয়ারীতে। পাবনার সুজানগরের ছৈয়দপুরের মোহাম্মদ আবদুল আলীম, গাইবান্ধার ক’পতলার মোহাম্মদ রানা মিয়া ও সুন্দরগঞ্জের মোহাম্মদ খোকন মিয়া। নিমতলী, তাজরীন, রানা প্লাজা, ট্রাম্পাকো, সেজান জুস, চুড়িহাট্টা, প্রাইম প্লাস্টিক, সীতাকুণ্ড—বারবার কারখানায় নির্মমভাবে হারায় শ্রমিকের জীবন। কারখানা আর কর্মক্ষেত্রগুলো এত ঝুঁকিপূর্ণ, অনিরাপদ আর বৈষম্যমূলক কেন? কেবল ক্ষতিপূরণ, চিকিৎসা, উদ্ধার আর সহায়তার আয়নায় নয়; সীতাকুণ্ডের জাহাজভাঙা থেকে সকল কর্মপরিসরের ন্যায্যতা ও সুরক্ষা রাষ্ট্রকেই নিশ্চিত করতে হবে।

পাভেল পার্থ: লেখক ও গবেষক
ই-মেইল: animistbangla@gmail.com