একবার সড়ক দুর্ঘটনায় খুব বিখ্যাত একজন মারা গেলেন। পুরো সমাজে আলোড়ন তুললো সেই মৃত্যু। স্বাভাবিকভাবেই তাঁর বাড়ির সামনে ভীড় লেগে গেলো সাংবাদিকদের। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি তৎপর টেলিভিশন সাংবাদিকরা। তাদের একটা বড় অংশ ঢুকে পড়লো বেডরুমে। দেখলেন এক ভদ্রমহিলা কাঁদছেন। তিনি মরে যাওয়া মানুষটার মা। শোকাহত সেই নারী মুহূর্তেই অগ্নিমূর্তি ধারণ করলেন। সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে তিনি বললেন, ‘‘আপনাদের জন্য কি আমি আমার ছেলের জন্য একটু একা একা কাদঁতেও পারবো না?”
এমন এক কথায় আমাদের সাংবাদিক সমাজের অনেকেই বিস্মিত হলেন, অনেকেই প্রতিবাদ করলেন। তারা বললেন,” কভার করাই আমাদের কাজ। তাঁর দুঃখই তো আমরা জাতিকে জানাতে এসেছি” । কিন্তু কে তাদের বোঝাবে যে, স্বজন হারানো মানুষের আহাজারির ছবি এবং ভিডিও করা সাংবাদিকতার নীতি নৈতিকতা পরিপন্থী। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নাহিদা বেগমের কিশোর পুত্র অপ্রতিমের খুনের পরও এই দৃশ্য দেখা গেলো।
একদল লিগেসি মিডিয়ার সাংবাদিক, মজো সাংবাদিক, ইউটিউবার এবং কনটেন্ট মেকার ভদ্রমহিলার বেডরুমে ঢুকে তার আহাজারি লাইভ করতে শুরু করলেন। এরকম দৃশ্য আমরা বস্তির আগুনে, নৌ বা সড়ক দুর্ঘটনায় দেখি। স্বজন হারানোর বেদনায় আহাজারি করে কান্না করা মানুষের সামনে অনেক অনেক ক্যামেরা ও মাইক্রোফেন। আর দরিদ্র মানুষ হলে তো কথাই নেই। নারী হলে আরও সুবিধা— বেশি খোলামেলা দেখানো যায়।
সন্তান হারানো মায়ের গগনবিদারী চিৎকার, বুক চাপড়ে বাবার বুকফাটা আহাজারি কিংবা দুর্ঘটনাস্থলে স্বজনদের নিথর দেহের পাশে কান্নার রোমহর্ষক দৃশ্য আমাদের সংবাদমাধ্যমের পর্দায় নিত্যদিনের ছবি।
ক্যামেরা আর মাইক্রোফোন নিয়ে শোকাহত মানুষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার এই অসুস্থ প্রতিযোগিতা এখন যেন রেওয়াজ। কোনো মর্মান্তিক ঘটনার পর সেই ক্ষতে মলম দেওয়া দূরের কথা, জুম লেন্স আর হাই-ডেফিনেশন ক্যামেরার লেন্সে কান্নার প্রতিটি ফোঁটা মেপে নেওয়ার উন্মাদনায় মেতেছে আধুনিক গণমাধ্যম তথা ডিজিটাল মাধ্যম।
পেশাগত পরিভাষায় ব্রেকিং নিউজ, ‘লাইভ কাভারেজ বা;এক্সক্লুসিভ কাভারেজ— যাই বলা হোক না কেন, সেটা বাস্তবতার ক্যানভাসে থাকে এক নির্মম ও অনৈতিক তাণ্ডব। শোকাহত মানুষের ব্যক্তিগত কান্নার মুহূর্তটি পরম স্পর্শকাতর ও গোপনীয়। মানুষের জীবন যখন এক অপরিসীম বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে যায়, তখন তার নিজস্ব পরিসর বা প্রা্ইভেসি বলে একটি জায়গা থাকা জরুরি। কিন্তু আমাদের গণমাধ্যম কি সেই ন্যূনতম প্রাইভেসির অধিকারটুকু মেনে নেয়? অবলীলায় ঘরের ভেতর, হাসপাতালের জরুরি বিভাগে বা মর্গের সামনে ক্যামেরা ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। শোকাতুর মানসপটকে তোয়াক্কা না করে যখন একের পর এক প্রশ্ন করা হয়, তখন সাংবাদিকতার পেশাদারিত্ব নয়, বরং সংবেদনহীনতার চরম দেউলিয়াত্বই ফুটে ওঠে।
প্রশ্ন জাগে, ভিউ বাণিজ্যের এই ভূবনে মানুষের আবেগ ও কান্নাই কি শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বিক্রিযোগ্য পণ্যে পরিণত হলো?
ডিজিটাল মিডিয়ার বিপ্লবের সাথে সাথে সাংবাদিকতার সংজ্ঞাও অনেকাংশে বিকৃত হয়ে গেছে। ফেসবুক, ইউটিউব কিংবা টিভির রেটিং টেবিলের ভিউ এবং এনগেজমেন্টের তীব্র দৌড়ে সংবেদনশীলতা আজ চরমভাবে উপেক্ষিত। একটি মানুষের কান্না বা আর্তনাদ খুব সহজে দর্শকের আবেগ ও মনোযোগ আকর্ষণ করে।
গণমাধ্যম মালিক ও কিছু সংবাদকর্মী সেই আবেগকেই পুঁজি করে নিজেদের কাটতি বা রিচ বাড়াতে সচেষ্ট হন। কিন্তু এই চর্চার আড়ালে চাপা পড়ে যায় সাংবাদিকতার অন্যতম মৌলিক শর্ত— Do No Harm বা কারও ক্ষতি বা কষ্ট না বাড়ানো।
সংবাদ প্রকাশের মূল কাজ সত্য তুলে ধরা এবং অন্যায় ও অব্যবস্থাপনার চিত্র উন্মোচন করা। কিন্তু একজন স্বজনহারা মানুষের আহাজারিকে নাটকীয় রূপ দিয়ে বাজারজাত করা কখনো বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ হতে পারে না। ট্রমাযুক্ত বা সংবেদনশীল পরিস্থিতিতে কীভাবে সংবাদ সংগ্রহ করতে হয়, সেই প্রাতিষ্ঠানিক ও নৈতিক চর্চার অভাব আজ প্রকট। কারণ সম্পাদকীয় প্রতিষ্ঠান বলে কিছু নেই আজ।
শোকাহত মানুষের থেকে সম্মতি না নিয়ে তাদের আত্মচিৎকারকে ক্যামেরাবন্দি করে ভার্চুয়াল জগতে ছড়িয়ে দেওয়া এক ধরনের ‘মব সহিংসতা’, যা ওই পরিবারটিকে বারবার ট্রমার মুখোমুখি করে। শোকগ্রস্ত মানুষের
আহাজারির ভিডিও ইন্টারনেটে থেকে গেলে, পরবর্তীকালে তা পরিবারের সদস্যদের সামনে এলে তাদের পুরোনো ক্ষত আবার তাজা হয়ে ওঠে। এটি তাদের মানসিক ট্রমা দীর্ঘস্থায়ী করতে পারে। এই সত্যটুকু সেই সাংবাদিকরা কখনও উপলব্ধি করে না। সাংবাদিকরা একবার ভেবে দেখে না, তার নিজের পরিবারের ক্ষেত্রে এমন ঘটলে কি তিনি তাই করতে দিতেন?
এই ভয়ংকর সাংবাদিকতার দায় কেবল যে সংবাদমাধ্যমের, তা-ও পুরোপুরি সত্য নয়। ক্লিকের এই ব্যবসায় দর্শক বা পাঠকদের ভূমিকাও ভাববার মতো। চরম আবেগকেন্দ্রিক ও সংবেদনশীল এসব কনটেন্টে যখন মিলিয়ন মিলিয়ন ভিউ আসে, তখন গণমাধ্যমগুলো আরও বেশি উৎসাহিত বোধ করে। সমাজের এই সমষ্টিগত সংবেদনহীনতা ও তামাশা দেখার প্রবণতাই মূলত এই অনৈতিক ব্যবসাকে বাঁচিয়ে রাখছে।
সংবাদপত্র বা গণমাধ্যমকে সমাজের আয়না বলা হয়। কিন্তু আয়নাটি যদি মানুষের রক্ত আর চোখের জলের ওপর দাঁড়িয়ে ব্যবসা করতে শুরু করে, তবে তা পুরো সমাজের জন্যই মারাত্মক এক অশনি সংকেত। সময় এসেছে এই অসুস্থ প্রতিযোগিতার বিরুদ্ধে কথা বলার। সম্পাদকীয় প্রতিষ্ঠান নীতিমালার কঠোর প্রয়োগ, সাংবাদিকদের সংবেদনশীলতার প্রশিক্ষণ এবং সর্বোপরি পাঠক ও দর্শকদের সামাজিক সচেতনতাই পারে প্রাইভেসির অধিকার ফিরিয়ে দিতে এবং সাংবাদিকতাকে তার হারিয়ে যাওয়া মানবিক মর্যাদায় পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করতে।
লেখক: সাংবাদিক