রাষ্ট্র কেবল শিক্ষকদের বেলায় এসে দরিদ্র হয়ে পড়ে? 

সচিব তালুকদার
১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৪:০০আপডেট : ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৪:২১

শিক্ষকদের ক্ষেত্রে এলেই পদোন্নতির প্রশ্নটি যেন অকারণে আর্থিক সংশ্লেষের জটিল অঙ্কে আটকে যায়। রাষ্ট্রের কোষাগার সেই ব্যয় বহন করতে পারবে কিনা, এই হিসাবই তখন হয়ে ওঠে প্রধান বিবেচ্য। অথচ বিগত বছরের পদোন্নতির ইতিহাস পর্যালোচনা করলে স্পষ্ট হয়, শিক্ষকদের ক্ষেত্রে পদোন্নতি কখনোই নিয়মিত ও সময়োপযোগীভাবে কার্যকর হয়নি। শুধু বিলম্বই নয়, বহু ক্ষেত্রে পদোন্নতি দেওয়া হলেও তার সঙ্গে বেতন বা আর্থিক সুবিধার কোনও বাস্তব উন্নতি ঘটেনি; বরং পদোন্নতি কেবল নামমাত্র স্বীকৃতিতে সীমাবদ্ধ থেকেছে। পেশাগত মর্যাদা বা প্রণোদনার বাস্তব প্রতিফলন সেখানে অনুপস্থিতই রয়ে গেছে।

পদোন্নতি হলে যদি বেতনই না বাড়ে, তাহলে স্বীকৃতির সেই সামান্য পদক্ষেপ গ্রহণেও এত দীর্ঘসূত্রতা কেন? বাস্তবে বহু বছর ধরে শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তাদের পদোন্নতি কার্যক্রম শূন্য পদের সীমাবদ্ধতার অজুহাতে স্থবির ছিল। অন্যদিকে একই ব্যাচের প্রশাসন, পুলিশ, কৃষি বা কর ক্যাডারের কর্মকর্তারা নিয়মিত পদোন্নতির মাধ্যমে দায়িত্ব ও মর্যাদার উচ্চতর স্তরে উন্নীত হয়েছেন। বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারে আর্থিক সংশ্লেষসহ ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি দিয়ে বৈষম্যের সাময়িক সমাধান করার দাবি শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তাদের দীর্ঘদিনের; সেটি আমলে নিলে ন্যায্যতা বিধান করা সহজ হবে।

এই দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা ভাঙতে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া হয়। আর্থিক সংশ্লেষবিহীন ৯২২ জন সহযোগী অধ্যাপককে অধ্যাপক পদে পদোন্নতি দেওয়া হয় এবং পর্যায়ক্রমে অন্যান্য স্তরেও আর্থিক সংশ্লেষবিহীন পদোন্নতি কার্যক্রম চালু রাখার মাধ্যমে শিক্ষকদের প্রাপ্য সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করার প্রয়াস স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রথমবারের মতো বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের জন্য সুপারনিউমারি পদ সৃষ্টির যুগান্তকারী উদ্যোগ নেওয়া হয়। সেই ফাইলটি আজও আলোর মুখ না দেখায় এখনও অনেক শিক্ষক, বিশেষ করে বিসিএস সাধারণ শিক্ষার ৩৮তম ব্যাচের কর্মকর্তারা পদোন্নতিবঞ্চিত।

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার মেরুদণ্ড শিক্ষকসমাজ। রাষ্ট্রের নীতি, উন্নয়ন ও মানবসম্পদ সৃষ্টির যে মহাযজ্ঞ, তার কেন্দ্রে অবস্থান করেন শিক্ষকরা। অথচ এই পেশাজীবী গোষ্ঠীটি দীর্ঘদিন ধরে প্রণোদনা, মর্যাদা ও কাঠামোগত ন্যায্যতার প্রশ্নে এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের মুখোমুখি। সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয় বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের উৎসব ভাতা ৬০ শতাংশে উন্নীত করার উদ্যোগ নিয়েছে। নিঃসন্দেহে এটি একটি ইতিবাচক সিদ্ধান্ত—যা হাজারো শিক্ষক-কর্মচারীর পারিবারিক আনন্দকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। তবে একইসঙ্গে বাস্তবতার আরেকটি দিক স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, সরকারি শিক্ষকরা এখনও কাঠামোগতভাবে নানা বঞ্চনার মধ্যে অবস্থান করছেন।

বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারে ষষ্ঠ গ্রেডে (সিনিয়র স্কেল) পদোন্নতির চিত্র গত পাঁচ বছরে মোটামুটি নিয়মিত: ২০২২ সালে ১১৭ জন, ২০২৩ সালে ২৭০ জন, ২০২৪ সালে ২০১ জন এবং ২০২৬ সালে ২৬৪ জন কর্মকর্তা এই গ্রেডে উন্নীত হয়েছেন। একই সময়ে বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের চিত্র সম্পূর্ণ বিপরীত। ২০২২, ২০২৩, ২০২৪ ও ২০২৬, এই চার বছরের একটিতেও ষষ্ঠ গ্রেডে কোনও পদোন্নতি হয়নি। কেবল ২০২৫ সালে একবারে ১৮৭০ জনকে পদোন্নতি দেওয়া হয়, যা প্রকৃতপক্ষে বছরের পর বছর জমে থাকা জটের একলাফে নিষ্পত্তি, নিয়মিত প্রশাসনিক ছন্দের প্রতিফলন নয়। একটি ক্যাডারে পদোন্নতি একটি প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া হিসেবে চলে, আরেকটিতে তা নির্ভর করে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর আসা বিচ্ছিন্ন একেকটি সিদ্ধান্তের ওপর। এই ফারাকই প্রমাণ করে, সমস্যার মূল সম্পদের সংকটে নয়, অগ্রাধিকারের বিন্যাসে।

এখানে আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে বিবেচনার দাবি রাখে। বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারে নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সংখ্যা অন্য যেকোনও ক্যাডারের তুলনায় সর্বোচ্চ। প্রতিটি ব্যাচেই এই ক্যাডারে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক কর্মকর্তা যুক্ত হন, কারণ দেশের সরকারি কলেজগুলোর বিশাল শিক্ষক চাহিদা এই ক্যাডারের মাধ্যমেই পূরণ হয়। ফলে যুক্তিসংগতভাবেই প্রত্যাশা করা যায়, পদোন্নতির সংখ্যাও নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সংখ্যার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে। নিয়োগে যে ক্যাডার সবচেয়ে বড়, পদোন্নতিতে সেই ক্যাডারই যদি সবচেয়ে ক্ষুদ্র বা অনিয়মিত সংখ্যায় স্বীকৃতি পায়, তাহলে তা কেবল একটি প্রশাসনিক অসংগতি নয়, বরং একটি কাঠামোগত বৈষম্য। প্রশাসন ক্যাডারের তুলনামূলকভাবে ছোট আকারের বিপরীতে যে বার্ষিক পদোন্নতির ছন্দ বজায় থাকে, শিক্ষা ক্যাডারের বিশাল জনবলের বিপরীতে অন্তত সেই আনুপাতিক ছন্দ থাকা উচিত ছিল। বাস্তবে ঘটছে ঠিক তার উল্টো—সবচেয়ে বড় ক্যাডারটিই পদোন্নতির প্রশ্নে সবচেয়ে অবহেলিত। এই আনুপাতিক অসামঞ্জস্য দূর না হলে সংখ্যার হিসাবে যেকোনও একবারের বড় পদোন্নতিও (যেমন ২০২৫ সালের ১৮৭০ জন) প্রকৃত বৈষম্য আড়াল করার একটি ভুল ইঙ্গিত দিতে পারে।

একজন শিক্ষক যখন বছরের পর বছর একই পদে দায়িত্ব পালন করেন, তখন তাঁর পদোন্নতি কেবল একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার বিষয় থাকে না। এর সঙ্গে যুক্ত থাকে তাঁর পেশাগত স্বীকৃতি, সামাজিক মর্যাদা, কর্মপ্রেরণা এবং রাষ্ট্রের কাছে তাঁর অবদানের মূল্যায়ন। অথচ বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে পদোন্নতির প্রশ্নটি দীর্ঘদিন ধরেই এক অদ্ভুত অনিশ্চয়তার আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে। কখনও শূন্য পদ, কখনও পদসংকট, কখনও প্রশাসনিক জটিলতা, কখনও আর্থিক সংশ্লেষের প্রশ্ন সামনে আসে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত একটি মৌলিক প্রশ্নের উত্তর মেলে না। যাঁদের পদোন্নতি প্রাপ্য, তাঁদের পদোন্নতি আটকে থাকার প্রকৃত কারণটি কী?

সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে (২০ জুলাই প্রকাশিত) দেখা গেছে, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের অধীন সরকারি কলেজগুলোয় কর্মরত দশম গ্রেডের ১৪৫ জন বিষয়ভিত্তিক প্রদর্শককে এক লহমায় নবম গ্রেডের বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারে প্রভাষক হিসেবে পদোন্নতি ও রীতি ভেঙে নতুনভাবে ক্যাডারে অন্তর্ভুক্ত প্রদর্শকদের রাজধানী ঢাকাসহ দেশের মর্যাদাপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে পদায়ন দেওয়ায় এই প্রশ্নটি আবারও নতুন করে সামনে এসেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে অন্যান্য টায়ারে দুইবার পদোন্নতি দেওয়া হলেও প্রভাষকদের পদোন্নতি হয়েছে মাত্র একবার। ২৩ জুলাই ২০২৬ তারিখে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সরকারি কলেজ-১ শাখা থেকে জারি করা দুটি পৃথক স্মারকের মাধ্যমে বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের প্রভাষকদের সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতির লক্ষ্যে বিভাগীয় পদোন্নতি কমিটির সভা এবং বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তাদের উচ্চতর গ্রেড, বিশেষ করে চতুর্থ গ্রেড প্রাপ্যতার বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সভা আহ্বান করা হয়। নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী ২৭ জুলাই সচিব, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সভাপতিত্বে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে এসব বিষয়ে সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু অদৃশ্য কারণে তা স্থবির হয়ে আছে।

এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা একসময় মূল বেতনের ২৫ শতাংশ উৎসব ভাতা পেতেন—ধীরে ধীরে তা ৫০ শতাংশে উন্নীত হয়েছে এবং এখন ৬০ শতাংশে উন্নীত করার প্রস্তাবনা এসেছে। এই অগ্রগতি প্রশংসনীয়। কিন্তু তুলনামূলক বাস্তবতায় দেখা যায়, সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা দীর্ঘদিন ধরে পদোন্নতি, আর্থিক প্রণোদনা এবং পেশাগত মর্যাদার প্রশ্নে স্থবিরতার শিকার। ২০০৯ সালের বেতন কাঠামোয় সরকারি কলেজের অধ্যাপকদের জন্য তৃতীয় গ্রেডে উন্নীত হওয়ার একটি বাস্তবসম্মত পথ ছিল—কিন্তু ২০১৫ সালের বেতন কাঠামো সেই পথ কার্যত রুদ্ধ করে দেয়। ফলে কর্মজীবনের দীর্ঘ সময় ধরে সেবা দিলেও অনেক শিক্ষক উচ্চতর গ্রেডে উন্নীত হওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন।

এ বৈষম্য আরও স্পষ্ট হয় যখন বিভিন্ন সেক্টরের তুলনামূলক চিত্র সামনে আসে। দেশের ৫৩টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ১৬ হাজারের বেশি শিক্ষক কর্মজীবনে গ্রেড-১ পর্যন্ত উন্নীত হওয়ার সুযোগ পান। অন্যদিকে শিক্ষা ক্যাডার ও সিভিল এডুকেশন সার্ভিসের শিক্ষকরা বাস্তবে গ্রেড-১, ২ বা ৩-এ উন্নীত হওয়ার সুযোগ প্রায় হারিয়েই ফেলেছেন। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ কিংবা মাধ্যমিক স্তর, সবখানেই শিক্ষাদানের মৌলিক লক্ষ্য এক ও অভিন্ন— জ্ঞান সৃষ্টি ও মানবসম্পদ গঠন।

শহরের অনেক এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানে, বিশেষ করে বিভিন্ন বাহিনী পরিচালিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষকরা ৪০ থেকে ৫৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িভাড়া ভাতা, অতিরিক্ত সিটি অ্যালাউন্স এবং দ্রুত পদোন্নতির সুযোগ পান। অনেক ক্ষেত্রে পরিচালনা কমিটির সিদ্ধান্তেই অল্প সময়ের মধ্যে পদোন্নতি বাস্তবায়িত হয়। বিপরীতে সরকারি কলেজ, মাধ্যমিক কিংবা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া ও কাঠামোগত জটিলতার মধ্যে পড়ে বছরের পর বছর পদোন্নতির অপেক্ষায় থাকেন।

আর্থিক সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রেও বৈপরীত্য প্রকট। উদাহরণস্বরূপ, ব্যাংক খাতের একই গ্রেডের কর্মকর্তারা বছরে অন্যান্য সরকারি কর্মচারী এবং শিক্ষকদের তুলনায় একাধিক ইনসেনটিভ, নিয়মিত লাঞ্চ ভাতা, গৃহঋণ, গাড়ি বা মোটরবাইক ক্রয়ের সহজ ঋণসহ নানা আর্থিক সুবিধা ভোগ করেন। অথচ শিক্ষকরা, যাদের হাতে জাতির ভবিষ্যৎ নির্মিত হয়, তাদের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক পরিবহন, লাঞ্চ ভাতা কিংবা আবাসন সহায়তার মতো মৌলিক সুবিধাও অধিকাংশ ক্ষেত্রে অনুপস্থিত। একই রাষ্ট্রে সচিবালয় বা ব্যাংকের কর্মচারীদের জন্য যেখানে পরিবহন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে, সেখানে বিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষকরা প্রতিদিন ব্যক্তিগত সংগ্রামের মধ্য দিয়েই কর্মস্থলে পৌঁছান।

ফলে প্রশ্ন জাগে, রাষ্ট্র কি কেবল শিক্ষকদের বেলায় এসে দরিদ্র হয়ে পড়ে? বাস্তবতা হলো, শিক্ষকতার পেশা কেবল আদর্শবাদ দিয়ে টিকিয়ে রাখা যায় না—প্রয়োজন ন্যায্য প্রণোদনা ও সামাজিক মর্যাদা। একটি সমাজে মেধাবী তরুণরা সেই পেশার দিকেই ঝোঁকে, যেখানে পেশাগত স্বীকৃতি, আর্থিক নিরাপত্তা ও উন্নতির বাস্তব সম্ভাবনা থাকে। ইতোমধ্যে দেখা যাচ্ছে, অনেক মেধাবী কর্মকর্তা শিক্ষা ক্যাডার ছেড়ে অন্যান্য পেশায় চলে যাচ্ছেন কিংবা নন-ক্যাডার চাকরিতে যোগ দিচ্ছেন। দীর্ঘমেয়াদে এটি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য অশনিসংকেত।

অতএব, এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের উৎসব ভাতা বৃদ্ধি নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় হলেও, একই সঙ্গে সরকারি শিক্ষক সমাজের দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সমস্যা সমাধান করাও জরুরি। পদোন্নতি চক্রকে নিয়মিত করা, সুপারনিউমারি পদ সৃষ্টি করে দীর্ঘস্থায়ী জট দূর করা, লাঞ্চ ভাতা, আবাসন সহায়তা, পরিবহন সুবিধা ও ঋণ সুবিধার মতো বাস্তবসম্মত প্রণোদনা চালু করা, এসব পদক্ষেপ শিক্ষকদের পেশাগত মর্যাদা পুনরুদ্ধারে সহায়ক হতে পারে।

কারণ শিক্ষা ব্যবস্থার প্রাণভোমরা শিক্ষকরা যদি সামাজিক ও আর্থিকভাবে প্রণোদিত না হন, তবে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে পড়বে। রাষ্ট্রের উন্নয়ন, মানবসম্পদ সৃষ্টি এবং জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনের জন্য শিক্ষকদের ন্যায্য মর্যাদা নিশ্চিত করা কোনও দয়া নয়—এটি রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ। তাই এখন শুধু আরেকটি সভার নোটিশই প্রয়োজন নয়, বরং প্রয়োজন একটি স্থায়ী ও কাঠামোগত সমাধান। আর এই সমাধান আসলে সিভিল সার্ভিসের নিজস্ব ব্যবস্থার মধ্যেই লুকিয়ে আছে। লক্ষণীয়, বিসিএসের বিভিন্ন ক্যাডারের কর্মকর্তারা একই ব্যাচ হিসেবে একই দিনে নিয়োগপ্রাপ্ত হন। চাকরি স্থায়ীকরণের জন্য সব ক্যাডারের কর্মকর্তাদেরই একই বিভাগীয় পরীক্ষা দিতে হয়। পদোন্নতির জন্য সিনিয়র স্কেল অর্জনের ক্ষেত্রেও অভিন্ন পরীক্ষাব্যবস্থা বিদ্যমান। অর্থাৎ নিয়োগ থেকে স্থায়ীকরণ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপেই ক্যাডারনির্বিশেষে একটি অভিন্ন, তুলনীয় ও সমান্তরাল কাঠামো ইতিমধ্যে কার্যকর আছে। প্রশ্ন হলো, তাহলে পদোন্নতির চূড়ান্ত ধাপে এসেই কেন এই সমান্তরালতা ভেঙে পড়ে?

যেহেতু নিয়োগ, স্থায়ীকরণ ও সিনিয়র স্কেল অর্জনের জন্য অভিন্ন পরীক্ষা ও প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে বিদ্যমান, তাই একমাত্র যুক্তিসংগত ও টেকসই সমাধান হলো, সিভিল সার্ভিসের একই ব্যাচের সব ক্যাডারের কর্মকর্তাদের একই দিনে পদোন্নতি প্রদানের ব্যবস্থা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে চালু করা। এটি কোনও নতুন বা অপরিচিত কাঠামো নয়—বরং যে সমান্তরাল প্রক্রিয়া নিয়োগ ও স্থায়ীকরণে ইতোমধ্যে কার্যকর, তারই স্বাভাবিক সম্প্রসারণ। এর ফলে কোনও একটি ক্যাডারের কর্মকর্তারা একচেটিয়াভাবে অগ্রসর হবেন আর অন্য ক্যাডার বছরের পর বছর অপেক্ষায় থাকবেন, এমন বৈষম্যের সুযোগ কাঠামোগতভাবেই বন্ধ হয়ে যাবে। একই ব্যাচ, একই দিনে নিয়োগ, একই দিনে স্থায়ীকরণ পরীক্ষা, একই দিনে সিনিয়র স্কেল পরীক্ষা, এই ধারাবাহিকতার স্বাভাবিক পরিণতি হওয়া উচিত একই দিনে পদোন্নতি। এর বাইরে আংশিক বা বিচ্ছিন্ন যেকোনও সমাধান সাময়িক প্রশমন দিতে পারে, কিন্তু বৈষম্যের মূল কাঠামোকে অক্ষতই রেখে দেয়।

একই গ্রেডের অন্যান্য পেশাজীবীর সঙ্গে শিক্ষকদের বৈষম্য দূর করে সকলকে সমান মর্যাদা ও প্রণোদনার আওতায় আনা এখন সময়ের দাবি।

লেখক: কলেজ শিক্ষক

/এপিএইচ/এমওএফ/
সম্পর্কিত
আরও বিশ্ববিদ্যালয় কেন, কার স্বার্থে? 
সমতার বৈপরীত্য এবং সম্মিলিত দায় 
মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি: বাংলাদেশের কী লাভ, কী ঝুঁকি 
সর্বশেষ খবর
২ কোটি ডলার দান, যুক্তরাষ্ট্রের কলেজের নাম হচ্ছে ভারতীয় দম্পতির নামে
২ কোটি ডলার দান, যুক্তরাষ্ট্রের কলেজের নাম হচ্ছে ভারতীয় দম্পতির নামে
দেশে গণমাধ্যমের মুক্ত পরিবেশ বিরাজ করছে: রিজভী
দেশে গণমাধ্যমের মুক্ত পরিবেশ বিরাজ করছে: রিজভী
মালদ্বীপ মানেই বিলাসবহুল রিসোর্ট নয়, কম খরচেও ঘুরবেন যেভাবে
মালদ্বীপ মানেই বিলাসবহুল রিসোর্ট নয়, কম খরচেও ঘুরবেন যেভাবে
এখন সুযোগ পেলে কাকে নায়িকা হিসেবে চান আলমগীর, জানালেন নিজেই
এখন সুযোগ পেলে কাকে নায়িকা হিসেবে চান আলমগীর, জানালেন নিজেই
সর্বাধিক পঠিত
সোনালী ব্যাংকের ছয় কর্মকর্তার ১০ বছরের সাজা, ৯৩ কোটি টাকা জরিমানা
সোনালী ব্যাংকের ছয় কর্মকর্তার ১০ বছরের সাজা, ৯৩ কোটি টাকা জরিমানা
জুলাই জাদুঘরে অশ্রুসিক্ত রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল
জুলাই জাদুঘরে অশ্রুসিক্ত রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল
নতুন কৌশলে প্রতারণা, ইলিশ বিক্রেতাকে ১ লাখ টাকা জরিমানা
নতুন কৌশলে প্রতারণা, ইলিশ বিক্রেতাকে ১ লাখ টাকা জরিমানা
ডব্লিউএইচওর আঞ্চলিক প্রধানের পদ ছাড়লেন সায়মা ওয়াজেদ পুতুল
রয়টার্স এক্সক্লুসিভডব্লিউএইচওর আঞ্চলিক প্রধানের পদ ছাড়লেন সায়মা ওয়াজেদ পুতুল
কাল ৮ ঘণ্টা গ্যাস থাকবে না যেসব এলাকায়
কাল ৮ ঘণ্টা গ্যাস থাকবে না যেসব এলাকায়