২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে দীর্ঘ দেড় দশকের আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। এই রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর রাষ্ট্র মেরামতের দায়িত্বপ্রাপ্ত অন্তর্বর্তী সরকার দেশের মানবাধিকার সুরক্ষায় অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও ঐতিহাসিক একটি পদক্ষেপ গ্রহণ করে। একই বছরের ২৯ আগস্ট প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস ‘জোরপূর্বক গুমবিরোধী আন্তর্জাতিক সনদ’-এ স্বাক্ষর ও অনুসমর্থনের দলিলে চূড়ান্ত সই করেন, যা আন্তর্জাতিক মহলে ভূয়সী প্রশংসা পায়। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে এই আন্তর্জাতিক সনদের রাষ্ট্রপক্ষে পরিণত হয় এবং এর নীতি ও বাধ্যবাধকতা বাস্তবায়নে বিশ্বদরবারে দায়বদ্ধ হয়ে ওঠে। এই দায়বদ্ধতা পূরণের ধারাবাহিকতায় অন্তর্বর্তী সরকার অতি দ্রুত কিছু দৃশ্যমান ও কার্যকর পদক্ষেপ হাতে নেয়। প্রথমত, বিগত দেড় দশকের গুমের ঘটনা অনুসন্ধানে গঠিত স্বাধীন কমিশন ১৯১৩টি অভিযোগের মধ্যে ১৫৬৯টি নিশ্চিত জোরপূর্বক গুমের ঘটনা চিহ্নিত করেছে। বাকি ঘটনাগুলোর মধ্যে ২৫১ জন এখনও নিখোঁজ এবং ৩৬ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। দ্বিতীয়ত, গুমকে ‘মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ’ গণ্য করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন সংশোধন করা হয়েছে এবং দায়ী উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তৃতীয়ত, অভ্যন্তরীণ আইনে গুমকে স্বতন্ত্র অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ, ২০২৫’ জারি করা হয়েছে। এর পাশাপাশি ভুক্তভোগী পরিবারের প্রশাসনিক জটিলতা নিরসন এবং অর্থনৈতিক পুনর্বাসনের মাধ্যমে রাষ্ট্র তার নৈতিক ও আইনি বাধ্যবাধকতা বাস্তবায়নের চেষ্টা চালাচ্ছে।
আইনি স্বীকৃতির জমকালো কাগজের আড়ালে গুমের শিকার পরিবারগুলোর প্রাত্যহিক জীবন যেন এক অন্তহীন ও ধূসর লড়াই। আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি কিংবা প্রাথমিক তদন্তে রাষ্ট্র কিছুটা এগোলেও আন্তর্জাতিক সনদের শতভাগ মানদণ্ড মেনে একটি স্বাধীন ও স্থায়ী দেশীয় আইন কার্যকর করার পথটি এখনও চরম অনিশ্চিত। বাস্তবতার রুক্ষ জমিনে দাঁড়িয়ে এই পরিবারগুলো আজ বহুমাত্রিক সংকটে জর্জরিত নিখোঁজ স্বজনের কোনও প্রাতিষ্ঠানিক ‘গুমের সনদ’ বা ডেথ সার্টিফিকেট না থাকায় ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, সম্পত্তি হস্তান্তর কিংবা সন্তানদের অভিভাবকত্ব নিয়ে পরিবারগুলো আমলাতান্ত্রিক গোলকধাঁধায় আটকে গেছে। একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষকে হারিয়ে তাঁদের সংসার চলছে তীব্র আর্থিক অনটনে, যেখানে রাষ্ট্রীয় ভাতার প্রতিশ্রুতিও এখনও ফাইলবন্দি। গোপন বন্দিশালা থেকে যাঁরা অলৌকিকভাবে বেঁচে ফিরেছেন, তাঁরা কেবল গভীর মানসিক ট্রমার সাথেই লড়ছেন না, বরং বিগত আমলের সাজানো ও মিথ্যা রাজনৈতিক মামলাগুলোর কারণে এখনও নিয়মিত আইনি হয়রানির শিকার হচ্ছেন। লাশের অবস্থান কিংবা শেষ পরিণতি জানা না থাকায়, পরিবারগুলো না পারছে স্বজনের মৃত্যুর শোক পালন করতে, না পারছে ফেরার আশা ছাড়তে—এই অবর্ণনীয় মানসিক দোলাচলের মাঝেই নতুন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিচার প্রক্রিয়ার শ্লথগতি এবং কঠোর অধ্যাদেশ শিথিলের প্রচ্ছন্ন চেষ্টা তাঁদের মনে চূড়ান্ত ন্যায়বিচার পাওয়া নিয়ে গভীর সংশয় তৈরি করেছে। সামাজিক ভয়ভীতি পেরিয়ে এখনও বহু অভিযোগ সামনে না আসায়, গুমের এই ক্ষতচিহ্ন ও প্রকৃত সংখ্যা সময়ের সঙ্গে আরও বড় হতে বাধ্য।
আইনি গোলকধাঁধায় গুমের ন্যায়বিচার: বিতর্ক ও সীমাবদ্ধতার চালচিত্র
আন্তর্জাতিক সনদের বাধ্যবাধকতা মেনে দণ্ডবিধিতে গুমকে স্বতন্ত্র অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে অন্তর্বর্তী সরকার ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ’ জারি করেছিল। তবে ২০২৬ সালের নির্বাচনের পর নতুন খসড়া আইনে এর উল্টো রূপ দেখা যাচ্ছে; হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও আর্টিকেল ১৯-এর মতে, নিরাপত্তা বাহিনীকে তদন্তের বিশেষ সুবিধা দিয়ে মানবাধিকার কমিশনের ক্ষমতা সংকুচিত করার এই প্রচ্ছন্ন চেষ্টা আন্তর্জাতিক সনদের স্পিরিটের সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক। এই বাঁক বদলকে কেন্দ্র করে নাগরিক সমাজ ও বুদ্ধিজীবীদের আলোচনা এখন এক স্ববিরোধী ও একপাক্ষিক তর্কের বৃত্তে বন্দি। একদল অধিকারকর্মী যখন পুরোনো অন্ধকার যুগে ফেরার আশঙ্কা করছেন, তখন সংসদ সদস্য হওয়া সাবেক মানবাধিকার কর্মীরা অন্তর্বর্তী সরকার অধ্যাদেশ প্রণয়নের অংশীদারত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন, বাস্তবে আসলেও শুধুমাত্র শহুরে মানবাধিকার কর্মী ও ভুক্তভোগীদের সম্পৃক্ততা সেখানে ছিল। আবার জাতীয় নাগরিক কমিটি একে ব্যাপক অংশীদারত্বমূলক দাবি করায় বিতর্ক আরও ঘনীভূত হয়েছে, যার বিপরীতে ৩১ জন বিশিষ্ট নাগরিক যৌথ বিবৃতিতে একে ‘জনগণের আকাঙ্ক্ষার পরিপন্থী’ বলে অভিহিত করেছেন।
প্রকৃতপক্ষে, এই আইনি সংকটের মূল উৎস সদ্য বিদায়ী অধ্যাদেশের তাত্ত্বিক, সাংবিধানিক ও প্রায়োগিক গলদ, যা তত্ত্ব ও তৎপরতার দিক থেকে দূর করতে নাগরিক সমাজ ও বুদ্ধিজীবীরা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছেন। প্রথমত, এই আইনি বয়ানটি একটি নব্য-উদারনৈতিক বৈধতার ফাঁপা ধারণা থেকে তৈরি, যেখানে হাসিনা শাহীর দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক নির্যাতনের কোনও ঐতিহাসিক প্রতিচ্ছবি নেই। এমনকি ‘মায়ের ডাক’, ‘অধিকার’ কিংবা ‘আসক’-এর মতো সংগঠনের দীর্ঘ আত্মত্যাগ ও সংগ্রামের কোনও ন্যূনতম প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি এই অধ্যাদেশের প্রাককথনে রাখা হয়নি। অধ্যাদেশের নামকরণেই বড় গলদ রয়ে গেছে; অপরাধের আন্তর্জাতিক চরিত্র ফুটিয়ে তুলতে কেবল ‘গুম’ না লিখে ‘জোরপূর্বক গুম প্রতিরোধ, প্রতিকার ও সুরক্ষা অধ্যাদেশ’ করা আবশ্যক ছিল, যাতে অতীতে ঘটে যাওয়া কিছু ‘স্বেচ্ছায় নিখোঁজ’-এর ঘটনা আইনি সংজ্ঞা গুলিয়ে দিতে না পারে। দ্বিতীয়ত, অধ্যাদেশের প্রস্তাবনায় সাংবিধানিক অধিকারের উল্লেখ অত্যন্ত সংকীর্ণ। সেখানে কেবল গ্রেপ্তার ও আটকের কারণ দর্শানোর ৩৩(১) অনুচ্ছেদকে যুক্ত করা হলেও আইনের আশ্রয় লাভ (৩১ অনুচ্ছেদ), জীবন ও ব্যক্তি-স্বাধীনতার অধিকার রক্ষা (৩২ অনুচ্ছেদ), বিচার ও দণ্ড সম্পর্কে রক্ষণ (৩৫ অনুচ্ছেদ) এবং চলাফেরার স্বাধীনতার (৩৬ অনুচ্ছেদ) মতো অলঙ্ঘনীয় মৌলিক অধিকারগুলো সম্পূর্ণ এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতিমালার আলোকেও এই প্রয়াসটি স্ববিরোধী; বিশ্বজুড়ে মৃত্যুদণ্ড বিলোপের আন্দোলনের মুখে এই আইনে ‘মৃত্যুদণ্ডের’ মতো পিছিয়ে পড়া বিধান রাখা হয়েছে, আবার অন্যদিকে আসামির অনুপস্থিতিতে বিচারের সুযোগ রেখে ন্যায়বিচারের সর্বজনীন মানদণ্ডকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ করা হয়েছে।
সর্বোপরি, অধ্যাদেশের প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রায়োগিক দিকগুলো পর্যালোচনা করলে আরও কিছু বড় সীমাবদ্ধতা সামনে আসে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দায়বদ্ধতা বা ‘সুপিরিয়র কমান্ড রেসপনসিবিলিটি’র সংজ্ঞাকে এতটাই জটিল ও সংকুচিত করা হয়েছে যে, তা পর্দার আড়ালে থাকা মূল পরিকল্পনাকারীদের বাঁচিয়ে দেওয়ার আইনি লুপহোল তৈরি করে। তদন্তের ভার জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের ওপর ন্যস্ত করা হলেও, অতীত রাজনৈতিক মেরুকরণের কারণে এর নিরপেক্ষতা নিয়ে সংশয় রয়েই যায়; একটি সম্পূর্ণ পৃথক ও শক্তিশালী ‘স্বাধীন গুম নিরোধ কমিশন’ না করে একে আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর অধীন করা হয়েছে। সবচেয়ে অমানবিক ও ত্রুটিপূর্ণ অংশটি হলো, কোনও ব্যক্তি কমপক্ষে ৫ বছর নিখোঁজ না থাকলে তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘গুম’ হিসেবে ঘোষণা না করার বিধান—যা ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর সম্পত্তির উত্তরাধিকার ও তাৎক্ষণিক আইনি প্রতিকারকে চরম সংকটে ফেলে দেয়। তাছাড়া, গত ১৫ বছরে ঘটে যাওয়া শত শত গুমের ঘটনার বিচারের ক্ষেত্রে এই আইনের ভূতাপেক্ষ কার্যকারিতা কতখানি টিকবে, তা নিয়ে সংবিধান বিশেষজ্ঞদের মধ্যে গভীর সংশয় রয়েছে।
আইনি মোড়কে দায়মুক্তি? নতুন খসড়া আইনের প্রাতিষ্ঠানিক গোলকধাঁধা
অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশটি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে পাস না হয়ে বিলুপ্ত হওয়ার পর, নির্বাচিত নতুন সরকার ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬’-এর যে নতুন খসড়া করেছে, তা মৌলিক অধিকার ও আইনের শাসনের মৌলিক প্রশ্নগুলোকে পাশ কাটিয়ে গেছে। নামমাত্র কিছু গোষ্ঠীর সাথে প্রথাগত আলোচনার মাধ্যমে তৈরি এই খসড়াটির প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো নিয়ে গুম কমিশনের সাবেক সদস্য ও মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তদন্তের সময়সীমা, ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা এবং অংশীজনদের উপেক্ষার এই বাস্তবতায় আইনি গলদগুলো নিয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই চালানো এখন নাগরিক দায়িত্বের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই নতুন আইনি উদ্যোগের প্রধানতম সংকটগুলো একটি ‘কমান্ড রেসপনসিবিলিটি’র মোড়কে উচ্চপদস্থদের পার পাওয়ার সুযোগ; আন্তর্জাতিক সনদের মূল স্পিরিট হলো—গুমের পেছনে থাকা মূল পরিকল্পনাকারীদের ধরা, যেখানে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা অপরাধের কথা জানতেন বা ‘তাঁর জানা উচিত ছিল’—এই ধারণার ভিত্তিতে দায় নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু নতুন খসড়া ও পূর্বের অধ্যাদেশ, উভয় ক্ষেত্রেই এই বৈশ্বিক নীতিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার ‘সরাসরি সম্পৃক্ততা’ বা ‘সরাসরি জ্ঞান’ প্রমাণের প্রথাগত ও কঠোর ফৌজদারি মানদণ্ড চাপানো হয়েছে। এর ফলে কেবল মাঠপর্যায়ের নিম্নপদস্থ কর্মকর্তারাই বলির পাঁঠা হবেন, আর পর্দার আড়ালে থাকা মূল হোতারা ‘সরাসরি আদেশের প্রমাণ না থাকা’র আইনি ফাঁক গলে পার পেয়ে যাবেন। ন্যায়বিচারের স্বার্থে এই সংজ্ঞাটি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে পুনঃসংজ্ঞায়িত করে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার ‘‘নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে ব্যর্থতা’’ ও ‘‘তথ্য ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা’’-কে সম-অপরাধ গণ্য করা অপরিহার্য।
জোরপূর্বক গুমকে স্বতন্ত্র অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া ইতিবাচক হলেও, এর তদন্তভার পুলিশের হাতে ন্যস্ত করার প্রস্তাবটি চরম স্ববিরোধী। বাংলাদেশে গুমের অধিকাংশ অভিযোগই যেহেতু বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে, তাই একই রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অধীনস্থ পুলিশ দিয়ে তদন্ত করালে তা কতটা প্রভাবমুক্ত হবে, তা নিয়ে গভীর সংশয় রয়েছে। পুলিশের বিকল্প হিসেবে অনেকে তদন্তের দায়িত্ব জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে দেওয়ার কথা বলছেন, যা আরেকটি জটিল ও ত্রুটিপূর্ণ চিন্তা। কারণ, বিগত স্বৈরাচারী আমলে এই কমিশনের ভূমিকা ছিল চরম প্রশ্নবিদ্ধ; ২০১০ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে ৭০টি গুমের অভিযোগের একটিতেও তারা মানবাধিকার লঙ্ঘন খুঁজে পায়নি, বরং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাজানো গল্পকেই অন্ধের মতো গিলেছে। ফলে, এই কাঠামোগত সংকট নিরসনে পুলিশ বা কমিশনকে সরাসরি দায়িত্ব না দিয়ে একটি বিশেষায়িত স্বাধীন সংস্থা গঠন করা কিংবা কমিশনের ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং রিপোর্টকে আদালতে সরাসরি সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণের আইনি বৈধতা দেওয়াই হবে ভুক্তভোগীবান্ধব ও বাস্তবসম্মত সমাধান।
তদন্তের নিরপেক্ষতা ও জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সক্ষমতা: কাঠামোগত সংকট উত্তরণে বিকল্প পথ
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে জোরপূর্বক গুমের ফৌজদারি তদন্তের ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাবটি আপাতদৃষ্টিতে কার্যকর মনে হলেও এর পেছনে রয়েছে গভীর প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনি জটিলতা। এই সংকটের প্রধান দিক এবং উত্তরণের বাস্তবসম্মত উপায়গুলো জানা দরকার; প্রথমত, কমিশন কাজ করে সহজতর ‘প্রমাণের ভারসাম্য’ বা দেওয়ানি মানদণ্ডে, যা ভুক্তভোগীদের দ্রুত মানবাধিকার লঙ্ঘনের স্বীকৃতি দেয়। কিন্তু গুমের বিচারের জন্য প্রয়োজন ‘সন্দেহাতীত প্রমাণের’ কঠিন ফৌজদারি মানদণ্ড, যা কমিশনের ওপর চাপালে ভুক্তভোগীদের আইনি লড়াই আরও কঠিন হয়ে পড়বে। দ্বিতীয়ত, কেবল গুমের জন্য এই ক্ষমতা দিলে তা দেশের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বা নির্যাতনের মতো অন্যান্য অপরাধের ক্ষেত্রে ক্ষমতার বৈষম্য ও প্রাতিষ্ঠানিক দ্বন্দ্ব তৈরি করবে। তৃতীয়ত, প্যারিস নীতিমালা অনুযায়ী কমিশনের মূল কাজ রাষ্ট্রের ‘ওয়াচডগ’ বা তদারককারী হিসেবে থাকা। ফৌজদারি তদন্তের ক্ষমতা ও জনবল প্রয়োগ করতে গিয়ে কমিশন নিজেই যদি এক ধরনের সমান্তরাল পুলিশ বাহিনীতে পরিণত হয়, তবে তার নিরপেক্ষ নৈতিক অবস্থান ব্যাহত হবে এবং শ্রম অধিকার বা বৈষম্যের মতো হাজার হাজার সাধারণ মানবাধিকার বিষয় চরম অবহেলার শিকার হবে।
সংকট উত্তরণে দুটি বাস্তবসম্মত বিকল্প প্রস্তাব কিংবা দুটি কার্যকর মধ্যপন্থা অবলম্বন করা যেতে পারে; প্রথমত, কমিশন নিজে সমান্তরাল পুলিশ না হয়ে, গুমের অভিযোগ পাওয়ার পর একটি বিশেষায়িত এবং সম্পূর্ণ স্বাধীন সংস্থাকে (যেমন বিশেষ টাস্কফোর্স) ফৌজদারি তদন্ত শুরুর বাধ্যতামূলক নির্দেশ দিতে পারবে। এতে কমিশনের নিজস্ব তদারককারী ভূমিকাও অক্ষুণ্ণ থাকবে। দ্বিতীয়ত, ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং রিপোর্টের আইনি বৈধতা: কমিশনের নিজস্ব অনুসন্ধান বা ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং রিপোর্টগুলোকে সরাসরি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল বা আদালতে প্রাথমিক গ্রহণযোগ্য সাক্ষ্য বা প্রমাণ হিসেবে ব্যবহারের আইনি বৈধতা দেওয়া। এটি ভুক্তভোগীদের দীর্ঘসূত্রতা কমাবে এবং কমিশনের রিপোর্টের আইনি ওজন বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।
বাংলাদেশের নুরুল আমিন বনাম সরকার (২০১৫) মামলায় আপিল বিভাগের নজির এবং ভারতের উচ্চ আদালত ও মানবাধিকার কমিশনের যৌথ পরিপূরক দৃষ্টিভঙ্গিও (যেমন- তৈয়ব আলী বা লুইথুকলা মামলা) এটিই সমর্থন করে যে, রাষ্ট্রীয় অবহেলায় জীবন ও স্বাধীনতা হানির ক্ষেত্রে চলমান ফৌজদারি বিচার প্রক্রিয়ার পাশাপাশি ভুক্তভোগীদের আর্থিক ও প্রতিকারমূলক সুরক্ষা পাওয়া একটি সাংবিধানিক অধিকার। উভয় প্রতিষ্ঠানই ধারাবাহিকভাবে এই অবস্থান বজায় রেখেছে যে, গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে চলমান ফৌজদারি বিচার প্রক্রিয়ার বাইরে এবং এর পাশাপাশি ভুক্তভোগীদের অবশ্যই আর্থিক ও প্রতিকারমূলক সুরক্ষা দিতে হবে, এবং একই সাথে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে কার্যকর কাঠামো তৈরি করার ওপর জোর দিয়েছে।
ক্ষতিপূরণের রাজনীতি ও রূপান্তরকামী বিচার
একইসাথে চলমান নতুন আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় জোরপূর্বক গুম সংক্রান্ত অপরাধের বাংলাদেশের গুমের শিকার পরিবারবর্গ ও ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণ প্রদানের বিষয়টি আলোচনায় এসেছে—যা কেবল অর্থনৈতিক নয়, বরং একটি গভীর আইনি, নৈতিক ও কাঠামোগত জটিলতায় আবর্তিত। আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে আর্জেন্টিনা, চিলি বা দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দেশগুলো স্বৈরতন্ত্র-পরবর্তী সময়ে ট্রুথ কমিশন গঠন করে কাঠামোগত পুনর্বাসন ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমা প্রার্থনার মাধ্যমে ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করেছে, যেখানে ফৌজদারি বিচার ও আর্থিক সহায়তা পরিপূরক হিসেবে কাজ করেছে। কিন্তু বাংলাদেশে এই প্রক্রিয়াটি প্রায়শই রাজনৈতিক পালাবদল এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির অভাবে এক ধরণের আইনি ধোঁয়াশায় আটকে থাকে। তাত্ত্বিকভাবে, বাংলাদেশে এই ক্ষতিপূরণের বিতর্কটি তিনটি দ্বিমাত্রিকতার জটিল সমন্বয় ও টানাপোড়েন। প্রথমত, এটি যখন নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বা অন্য কোনও ভাতার সাথে শর্তযুক্ত হয়ে আসে, তখন তা পপুলিজম বনাম কাঠামোগত স্বনির্ভরতার দ্বন্দ্বে রূপ নেয়—যা ভুক্তভোগীদের দীর্ঘমেয়াদি কর্মসংস্থানের মাধ্যমে স্বাবলম্বী করার চেয়ে সাময়িক নিজ রাজনৈতিক দলের লোক ও ভোটার-তুষ্টির রাজনীতিকে উসকে দেয়। দ্বিতীয়ত, আকস্মিক উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হারানো পরিবারগুলোর জন্য এটি একটি জরুরি সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী, কিন্তু তা যদি রাষ্ট্রযন্ত্রের সংস্কার এবং গুমের সংস্কৃতির অবসান না ঘটায়, তবে তা রূপান্তরকামী বিচারকে চরমভাবে ব্যাহত করে। তৃতীয়ত এবং সবচেয়ে সংবেদনশীলভাবে, এটি ন্যায়বিচারের পণ্যকরণ বনাম নৈতিক অধিকারের এক চরম নৈতিক সংকট তৈরি করে। কারণ, নিখোঁজ স্বজনের সন্ধান ও সত্য জানার অলঙ্ঘনীয় নৈতিক অধিকারকে বাদ দিয়ে কেবল এককালীন বা মাসিক অর্থ প্রদানকে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো অপরাধ ঢাকবার রাষ্ট্রীয় অপচেষ্টা হিসেবে দেখতে পারে। তাই, এই বহুমাত্রিক জটিলতা নিরসনে ক্ষতিপূরণকে রাজনৈতিক 'দয়া' বা 'ভাতা' হিসেবে না দেখে, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী ফৌজদারি বিচারের পাশাপাশি একটি আইনি ‘অধিকার ও সামগ্রিক পুনর্বাসন’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন।
ভুক্তভোগীবান্ধব বিচার কি সম্ভব?
পরিশেষে বলা যায়, এই পুরো আইনি সংকটের মূল উৎসটি খুঁজতে গেলে আমাদের সদ্য বিদায়ী অধ্যাদেশের মারাত্মক কিছু তাত্ত্বিক, সাংবিধানিক ও প্রায়োগিক ত্রুটির দিকেই ফিরে তাকাতে হবে। বিশ্বজুড়ে যেখানে মৃত্যুদণ্ড বিলোপের আন্দোলন চলছে, সেখানে এই আইনে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখা যেমন আত্মবিরোধী ও পিছিয়ে পড়া পদক্ষেপ, তেমনি অভিযুক্তের অনুপস্থিতিতে বিচারের সুযোগ রাখা আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আইনের ন্যায়বিচারের সর্বজনীন মানদণ্ডকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ করে। তাছাড়া ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দায়বদ্ধতা বা ‘সুপিরিয়র কমান্ড রেসপনসিবিলিটি’র যে সংজ্ঞা এখানে দেওয়া হয়েছে, তা প্রমাণ করার প্রক্রিয়াকে অত্যন্ত জটিল করা হয়েছে। সবচেয়ে অমানবিক ও ত্রুটিপূর্ণ অংশটি হলো, কোনও ব্যক্তি কমপক্ষে ৫ বছর নিখোঁজ না থাকলে তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘গুম’ হিসেবে ঘোষণা না করার বিধান, যা ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর সম্পত্তির উত্তরাধিকার ও তাৎক্ষণিক আইনি প্রতিকারকে চরম সংকটে ফেলে দেয়। গুমের মতো একটি মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য কঠোর আইন প্রণয়নের সদিচ্ছা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক, কিন্তু তার প্রক্রিয়া যদি অস্বচ্ছ, আমলাতান্ত্রিক এবং অংশীজনদের প্রকৃত অংশগ্রহণহীন হয়, তবে তা কেবলই একটি শাসনতান্ত্রিক আনুষ্ঠানিকতায় রূপ নেয়। রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ যখন নিজেদের সবজান্তা মনে করে জনবিচ্ছিন্ন আইন তৈরি করেন, তখন তা ন্যায়বিচার নিশ্চিতের চেয়ে ক্ষমতা সংহতকরণের হাতিয়ার হয়ে ওঠে। আর এই পুরো গুরুতর রাজনৈতিক ও আইনি রূপান্তরের কালে সমাজের তথাকথিত সংবেদনশীল লেখক, কবি ও বুদ্ধিজীবী মহল যখন নিজেদের নানা ঠুনকো ও আবেগী মূর্খতার বৃত্তে বন্দি রাখেন, তখন রাষ্ট্রের কাঠামোগত সংস্কারের স্বপ্নটি আরও বেশি দুরূহ হয়ে পড়ে। আগামী দিনে দেখার বিষয়, এই সমস্ত আইনি ফাঁকফোকর ও পদ্ধতিগত ত্রুটি দূর করে রাষ্ট্র সত্যিই ভুক্তভোগীদের পাশে দাঁড়ায়, নাকি কেবলই সস্তা আইনি বাগাড়ম্বরের আড়ালে আরেকটি দায়মুক্তির অধ্যায় রচিত হয়।
লেখক: গবেষক ও মানবাধিকারকর্মী