গত শতাব্দীর বেশিরভাগ সময়ে বিশ্বের সবচেয়ে বড় জনমিতিক উদ্বেগ ছিল দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি। উন্নয়নশীল বিশ্বের বহু দেশে খাদ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, আবাসন এবং কর্মসংস্থানের ওপর ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রধান বাধা হিসেবে বিবেচনা করা হতো। টমাস ম্যালথাসের জনসংখ্যা তত্ত্ব থেকে শুরু করে বিংশ শতাব্দীর শেষভাগ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক উন্নয়ন আলোচনার একটি বড় অংশজুড়েই ছিল— কীভাবে জনসংখ্যা বৃদ্ধিকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে এসে সেই চিত্র নাটকীয়ভাবে বদলে যাচ্ছে। আজ বিশ্বের বহু দেশের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ জনসংখ্যা বেশি নয়, বরং জনসংখ্যা কমে যাওয়া। কোথাও জন্মহার ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে, কোথাও কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী দ্রুত সংকুচিত হচ্ছে, আবার কোথাও প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা এত দ্রুত বাড়ছে যে অর্থনীতি, শ্রমবাজার এবং সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা এক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছে।
ঠিক এই সময়েই বিশ্ব প্রবেশ করেছে আরেকটি বিপ্লবের যুগে— কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং রোবটিক্সের যুগে। চ্যাটজিপিটি, জেমিনি, ক্লাউড কিংবা কোপাইলট-এর মতো জেনারেটিভ এআই থেকে শুরু করে শিল্পকারখানার স্বয়ংক্রিয় রোবট, স্বচালিত যানবাহন, এআই-নির্ভর স্বাস্থ্যসেবা এবং বুদ্ধিমান উৎপাদন ব্যবস্থা— প্রযুক্তির এই দ্রুত অগ্রগতি আমাদের কাজ করার ধরন, ব্যবসা পরিচালনার পদ্ধতি এবং অর্থনীতির কাঠামোকেই বদলে দিচ্ছে। ফলে নতুন একটি প্রশ্ন সামনে এসেছে–কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কি মানুষের চাকরি কেড়ে নেবে, নাকি মানুষ কমে যাওয়ার সংকট মোকাবিলার সবচেয়ে কার্যকর সমাধান হয়ে উঠবে?
বাস্তবে এই দুই প্রশ্নকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। কারণ জনসংখ্যা পরিবর্তন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্তার পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। পৃথিবীর যে দেশগুলোতে জন্মহার দ্রুত কমছে এবং শ্রমশক্তির ঘাটতি তৈরি হচ্ছে, তারাই আজ সবচেয়ে দ্রুত রোবট ও এআই গ্রহণ করছে। অপরদিকে যেসব দেশে এখনও বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী রয়েছে, তাদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে সেই জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করা।
জাতিসংঘের ‘ওয়ার্ল্ড পপুলেশন প্রসপেক্টস ২০২৪’’ অনুযায়ী বর্তমানে বিশ্বের জনসংখ্যা প্রায় ৮২০ কোটি। ধারণা করা হচ্ছে, ২০৮০-এর দশকের মাঝামাঝি এটি প্রায় ১০৩০ কোটিতে পৌঁছে স্থিতিশীল হবে। কিন্তু এই সামগ্রিক সংখ্যার আড়ালে লুকিয়ে আছে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক বাস্তবতা। বিশ্বের অর্ধেকেরও বেশি দেশে মোট প্রজনন-হার ইতোমধ্যে জনসংখ্যা প্রতিস্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় ২.১-এর নিচে নেমে গেছে। অর্থাৎ নতুন প্রজন্ম সংখ্যার বিচারে তাদের বাবা-মায়ের প্রজন্মকে আর প্রতিস্থাপন করতে পারছে না। ইউরোপ, পূর্ব এশিয়া এবং উন্নত বিশ্বের বহু দেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির পরিবর্তে এখন জনসংখ্যা হ্রাসই প্রধান বাস্তবতা।
জাপান এই পরিবর্তনের সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ। দেশটির জনসংখ্যা ২০০৮ সালের পর থেকে ধারাবাহিকভাবে কমছে। বর্তমানে প্রতি তিনজন মানুষের একজনের বয়স ৬৫ বছরের বেশি। দক্ষিণ কোরিয়ায় একজন নারীর গড় সন্তান সংখ্যা বিশ্বের সর্বনিম্ন— প্রায় ০.৭৫। ইতালি, স্পেন, জার্মানি এবং সিঙ্গাপুরও একই ধরনের জনমিতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এমনকি দীর্ঘদিনের এক-সন্তান নীতির পর চীনেও এখন জনসংখ্যা কমতে শুরু করেছে। যে দেশ একসময় সন্তানসংখ্যা সীমিত করেছিল, সেই দেশই আজ জন্মহার বাড়ানোর জন্য করছাড়, নগদ প্রণোদনা, শিশুভাতা এবং আবাসন সহায়তার মতো নানা কর্মসূচি চালু করেছে।
এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে শ্রমবাজারে। একটি অর্থনীতি তখনই শক্তিশালী থাকে, যখন কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর সংখ্যা পর্যাপ্ত থাকে। কিন্তু জন্মহার দীর্ঘদিন কম থাকলে নতুন শ্রমিকের সংখ্যা কমতে থাকে, অন্যদিকে প্রবীণ মানুষের সংখ্যা বাড়তে থাকে। ফলে একই সংখ্যক কর্মীর ওপর স্বাস্থ্যসেবা, পেনশন এবং সামাজিক নিরাপত্তার ব্যয় বহনের চাপ ক্রমাগত বৃদ্ধি পায়। অর্থনীতিবিদরা একে ওল্ড-এজ ডিপেনডেনসি রেসিও বৃদ্ধির সমস্যা হিসেবে বর্ণনা করেন। বর্তমানে জাপান, ইতালি এবং দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণে এটি অন্যতম প্রধান উদ্বেগ।
এই প্রেক্ষাপটেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং রোবটিক্স নতুন গুরুত্ব লাভ করেছে। প্রযুক্তি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি প্রচলিত ধারণা হলো— রোবট মানুষের চাকরি কেড়ে নেবে। কিন্তু বাস্তবতা অনেক ক্ষেত্রেই ভিন্ন। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া কিংবা জার্মানিতে রোবটের ব্যবহার বেড়েছে মূলত শ্রমিকের অভাব পূরণের জন্য। শিল্পকারখানা, গুদাম, হাসপাতাল, কৃষি এমনকি প্রবীণদের পরিচর্যাতেও রোবটের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। অর্থাৎ সেখানে রোবট মানুষের বিকল্প নয়; বরং যে শ্রমিক আর নেই, তার কাজ সম্পন্ন করার সহায়ক।
এ কারণেই পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি শিল্প-রোবট ব্যবহারকারী দেশগুলোর দিকে তাকালে একটি স্পষ্ট সম্পর্ক দেখা যায়। ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব রোবটিকস (আইএফআর)-এর তথ্য অনুযায়ী দক্ষিণ কোরিয়া বর্তমানে প্রতি ১০ হাজার উৎপাদনশীল শ্রমিকের বিপরীতে সর্বাধিক শিল্প-রোবট ব্যবহারকারী দেশ। এরপর রয়েছে সিঙ্গাপুর, জার্মানি, জাপান এবং চীন। কাকতালীয়ভাবে এই দেশগুলোর প্রায় সবগুলোই আবার দ্রুত জনসংখ্যার বার্ধক্যের দিকে এগোচ্ছে। অর্থাৎ যেখানে শ্রমিক কমছে, সেখানেই রোবটের ব্যবহার বাড়ছে। তাই প্রযুক্তিকে শুধু চাকরি ধ্বংসকারী শক্তি হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি বোঝা যায় না— অনেক ক্ষেত্রে এটি অর্থনীতিকে সচল রাখার অন্যতম প্রধান উপায়।
তবে এর অর্থ এই নয় যে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শ্রমবাজারে কোনও পরিবর্তন আনবে না। বরং পরিবর্তনটি হবে গভীর এবং বহুমাত্রিক। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের ‘ফিউচার অব জবস রিপোর্ট ২০২৫’ অনুযায়ী আগামী পাঁচ বছরে বিশ্বব্যাপী প্রায় ১৭ কোটি নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে, আবার একই সময়ে প্রায় ৯ কোটি চাকরির ধরন বিলুপ্ত বা মৌলিকভাবে পরিবর্তিত হতে পারে। অন্যদিকে গোল্ডম্যান সাচসের বিশ্লেষণ বলছে, জেনারেটিভ এআই বিশ্বের প্রায় ৩০ কোটি পূর্ণকালীন চাকরির সমপরিমাণ কাজকে বিভিন্ন মাত্রায় প্রভাবিত করতে পারে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) মতে, উন্নত অর্থনীতির প্রায় ৬০ শতাংশ এবং বিশ্বব্যাপী প্রায় ৪০ শতাংশ চাকরি কোনও না কোনোভাবে এআই-এর প্রভাবের মুখোমুখি হবে।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা দরকার। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অধিকাংশ ক্ষেত্রে চাকরি নয়, বরং কাজের নির্দিষ্ট অংশ (টাস্কস) পরিবর্তন করে। একজন চিকিৎসক, শিক্ষক, প্রকৌশলী, আইনজীবী কিংবা সাংবাদিকের পুরো পেশা হয়তো বিলুপ্ত হবে না, কিন্তু তাঁদের দৈনন্দিন কাজের ধরন দ্রুত বদলে যাবে। যে ব্যক্তি এআই-কে কাজে লাগাতে শিখবেন, তাঁর উৎপাদনশীলতা বাড়বে— আর যিনি প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারবেন না, তাঁর প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হবে। ভবিষ্যতের শ্রমবাজার তাই মানুষ বনাম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার লড়াই নয়, বরং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে দক্ষভাবে ব্যবহার করতে পারে এমন মানুষ এবং যারা পারে না— তাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা।
ইতিহাস বলছে, প্রতিটি বড় প্রযুক্তিগত বিপ্লবই কিছু পেশার অবসান ঘটিয়েছে, আবার নতুন নতুন শিল্প ও কর্মসংস্থানেরও জন্ম দিয়েছে। শিল্পবিপ্লবের সময় যন্ত্র তাঁত হাতে বোনা কাপড়ের চাহিদা কমিয়ে দিয়েছিল, কিন্তু একই সঙ্গে আধুনিক শিল্প অর্থনীতির ভিত্তিও তৈরি করেছিল। কম্পিউটার টাইপরাইটারকে বিদায় দিয়েছে, কিন্তু সফটওয়্যার শিল্প, ইন্টারনেট অর্থনীতি এবং ডিজিটাল সেবার মতো নতুন খাত সৃষ্টি করেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাও সম্ভবত একই পথ অনুসরণ করবে। এটি কিছু পুনরাবৃত্তিমূলক কাজকে স্বয়ংক্রিয় করবে, কিন্তু একই সঙ্গে এমন বহু নতুন পেশার জন্ম দেবে, যেগুলোর অস্তিত্ব আজ থেকে দশ বছর আগেও কল্পনা করা যায়নি।
ইতোমধ্যে এই পরিবর্তনের আভাস স্পষ্ট। ডেটা সায়েন্স, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, ক্লাউড কম্পিউটিং, রোবটিক্স, ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা, জৈবপ্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে দক্ষ জনশক্তির চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। অন্যদিকে ডেটা এন্ট্রি, সাধারণ হিসাবরক্ষণ, কল সেন্টারের অনেক কাজ, প্রাথমিক পর্যায়ের প্রোগ্রামিং, রুটিন অফিস ব্যবস্থাপনা কিংবা একই ধরনের পুনরাবৃত্তিমূলক কাজ ক্রমেই অটোমেশনের আওতায় চলে আসছে। তাই ভবিষ্যতের শ্রমবাজারে সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হবে কেবল ডিগ্রি নয়; বরং নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতা, বিশ্লেষণী দক্ষতা, সৃজনশীলতা, সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা এবং আজীবন শেখার মানসিকতা।
বাংলাদেশের জন্য এখানেই সবচেয়ে বড় সুযোগ এবং একই সঙ্গে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ নিহিত রয়েছে। বর্তমানে দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই কর্মক্ষম বয়সের। অর্থনীতিবিদরা একে জনমিতিক সুযোগের জানালা (ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড) বলে থাকেন। পূর্ব এশিয়ার বহু দেশের দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়নের পেছনে এই জনমিতিক সুবিধা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। কিন্তু ইতিহাস এটাও বলে, এই সুযোগ চিরস্থায়ী নয়। একটি দেশের জনসংখ্যাগত কাঠামো কয়েক দশকের মধ্যেই বদলে যায়। আজকের তরুণ জনগোষ্ঠীই আগামী দিনের প্রবীণ জনগোষ্ঠীতে পরিণত হয়। ফলে এই সময়ে যদি শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং উৎপাদনশীল কর্মসংস্থানে যথেষ্ট বিনিয়োগ করা না হয়, তাহলে আজকের সুযোগই আগামী দিনের বোঝায় পরিণত হতে পারে।
বাংলাদেশের সামনে আরেকটি বাস্তবতা রয়েছে। আমাদের অর্থনীতির একটি বড় অংশ এখনও তৈরি পোশাক শিল্প, প্রথাগত উৎপাদন, কৃষি এবং স্বল্প দক্ষতানির্ভর সেবা খাতের ওপর নির্ভরশীল। এসব খাতের অনেক কাজ আগামী দুই দশকে ধীরে ধীরে স্বয়ংক্রিয় হয়ে যেতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, আধুনিক গার্মেন্টস কারখানায় ইতোমধ্যে স্বয়ংক্রিয় কাটিং, ডিজিটাল প্যাটার্ন তৈরি, মান নিয়ন্ত্রণ এবং গুদাম ব্যবস্থাপনায় রোবট ও এআই ব্যবহৃত হচ্ছে। কৃষিক্ষেত্রে ড্রোন, সেন্সর, স্যাটেলাইট ডেটা এবং এআই-ভিত্তিক রোগ শনাক্তকরণ প্রযুক্তি দ্রুত বিস্তার লাভ করছে। ব্যাংকিং, বীমা, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা এবং সরকারি প্রশাসনেও এআই- নির্ভর সেবা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে শুধু কর্মসংস্থান সৃষ্টি করলেই হবে না; কর্মসংস্থানের ধরনও দ্রুত পরিবর্তিত হবে।
এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকেও নতুনভাবে ভাবতে হবে। আগামী দিনের বিশ্ববিদ্যালয় কেবল সনদ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান হতে পারে না; বরং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির কেন্দ্র হতে হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা সায়েন্স, পরিসংখ্যান, কম্পিউটার বিজ্ঞান, প্রকৌশল, অর্থনীতি, স্বাস্থ্যবিজ্ঞান এবং সামাজিক বিজ্ঞানের মধ্যে আন্তঃবিষয়ক শিক্ষা ক্রমেই অপরিহার্য হয়ে উঠবে। একই সঙ্গে সমালোচনামূলক চিন্তা, যোগাযোগ দক্ষতা, দলগত কাজ, নৈতিকতা এবং সৃজনশীল সমস্যার সমাধান—এসব দক্ষতার গুরুত্বও বহুগুণে বাড়বে। কারণ এগুলোই এমন মানবিক সক্ষমতা, যেগুলোকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সহজে প্রতিস্থাপন করতে পারে না।
বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের জন্যও এটি একটি নতুন বাস্তবতা। শুধু কর্মসংস্থান সৃষ্টি নয়, ভবিষ্যতের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করাই হবে বড় চ্যালেঞ্জ। এজন্য গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, বিশ্ববিদ্যালয়-শিল্প সহযোগিতা, প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোক্তা তৈরি, ডিজিটাল অবকাঠামো শক্তিশালী করা, কর্মজীবীদের পুনঃদক্ষীকরণ (রিস্কিলিং) এবং ধারাবাহিক দক্ষতা উন্নয়ন (আপস্কিলিং) কর্মসূচিকে জাতীয় অগ্রাধিকার দিতে হবে। একই সঙ্গে নারীর শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণ বৃদ্ধি, স্বাস্থ্য ও পুষ্টিতে বিনিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
তবে প্রযুক্তি একাই সব সমস্যার সমাধান নয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পারে, কিন্তু বৈষম্যও বাড়াতে পারে। যারা প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারবে, তাদের আয় ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে; অন্যদিকে যারা প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারবে না, তারা পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকবে। তাই এআই যুগে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ হবে মানুষের ওপর বিনিয়োগ— শিক্ষা, দক্ষতা, গবেষণা এবং উদ্ভাবনে বিনিয়োগ। শেষ পর্যন্ত প্রযুক্তির সাফল্য নির্ভর করবে প্রযুক্তির ওপর নয়, বরং সেই প্রযুক্তি ব্যবহারের জন্য আমরা কেমন মানুষ তৈরি করতে পারছি তার ওপর।
১১ জুলাই, বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস। তাই আমাদের সামনে একটি নতুন প্রশ্ন তুলে ধরে। একসময় রাষ্ট্রগুলোর প্রধান উদ্বেগ ছিল কীভাবে জনসংখ্যা বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করা যায়। আজ বহু দেশের প্রধান উদ্বেগ কীভাবে জন্মহার বাড়ানো যায়, কীভাবে শ্রমিকের ঘাটতি পূরণ করা যায় এবং কীভাবে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর চাপ মোকাবিলা করা যায়। অন্যদিকে বাংলাদেশের মতো দেশের সামনে প্রশ্নটি কিছুটা ভিন্ন–আমাদের এখনও যে বিপুল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী রয়েছে, আমরা কি তাদের এমন দক্ষতায় গড়ে তুলতে পারছি, যাতে তারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে বৈশ্বিক অর্থনীতির নেতৃত্ব দিতে পারে?
ভবিষ্যতের পৃথিবী মানুষ বনাম মেশিনের পৃথিবী হবে না, বরং মানুষ এবং মেশিনের অংশীদারত্বের পৃথিবী হবে। যে দেশ তার জনমিতিক বাস্তবতা বুঝে শিক্ষা, প্রযুক্তি এবং উদ্ভাবনের মধ্যে সঠিক সমন্বয় ঘটাতে পারবে, ভবিষ্যতের অর্থনীতিতে নেতৃত্ব তার হাতেই থাকবে। বাংলাদেশের জন্যও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আর জনসংখ্যা কত-তা নয়, বরং এই জনসংখ্যাকে কত দ্রুত দক্ষ, উদ্ভাবনী, প্রযুক্তিসক্ষম এবং উৎপাদনশীল মানবসম্পদে রূপান্তর করা যায়। বিশ্ব জনসংখ্যা দিবসে এটাই হওয়া উচিত আমাদের সবচেয়ে বড় অঙ্গীকার।
লেখক: অধ্যাপক, ইনস্টিটিউট অব অ্যাপ্লাইড স্ট্যাটিস্টিক্স অ্যান্ড ডেটা সায়েন্স, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়









