শিক্ষার অধিকার বিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ দূতের আসন্ন বাংলাদেশ সফরকে কেন্দ্র করে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয়ের সাম্প্রতিক তথ্য ও মতামত আহ্বান দেশের বিদ্যায়তনিক স্বাধীনতা ও মুক্তবুদ্ধি চর্চাকারী নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতাগুলোকে নতুন করে সামনে এনেছে। আগামী ২৩ নভেম্বর থেকে ৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত তাঁর এ সফরের পরিকল্পনা রয়েছে। এই সফরের মূল লক্ষ্য কেবল একটি আনুষ্ঠানিক পর্যবেক্ষণ নয়, বরং বাংলাদেশের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা, এর আইনি ও নীতিগত কাঠামো এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের আলোকে নাগরিকের শিক্ষার অধিকার সুরক্ষার বাস্তবতা গভীরভাবে পর্যালোচনা করা। সরেজমিন পরিদর্শনের পূর্বে মাঠপর্যায়ের বস্তুনিষ্ঠ তথ্য সংগ্রহের অংশ হিসেবেই জাতিসংঘের পক্ষ থেকে এই উন্মুক্ত আহ্বান জানানো হয়েছে— যার মাধ্যমে সরকার, নাগরিক সমাজ, শিক্ষক-গবেষক, শিক্ষার্থী এবং মানবাধিকার কর্মীদের কাছ থেকে সরাসরি মতামত সংগ্রহ করা হচ্ছে।
এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জাতিসংঘের বিশেষ দূত বাংলাদেশের জন্য মূলত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে নীতিগত পর্যালোচনা ও সংস্কারের ভিত্তি তৈরি করতে চাচ্ছেন। প্রথমত, বাংলাদেশে সবার জন্য সমতাভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার প্রাপ্যতা মূল্যায়ন করা। প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, যেমন-দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত পরিবারের শিশু, আদিবাসী ও নৃতাত্ত্বিক সংখ্যালঘু, প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী এবং কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরের রোহিঙ্গা শিশুদের শিক্ষার অধিকার ও সুযোগ বাস্তবে কতটা নিশ্চিত হচ্ছে, তা আন্তর্জাতিকভাবে পর্যবেক্ষণ করা। দ্বিতীয়ত, শিক্ষার গুণগত মান, বিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামো, শিক্ষকের পেশাগত নিরাপত্তা এবং সামগ্রিক শিক্ষার পরিবেশ কতটা ঝুঁকিমুক্ত—তা নিবিড়ভাবে খতিয়ে দেখা।
বিশেষ করে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে বিদ্যায়তনিক স্বাধীনতা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসনের বাস্তবতা এই পর্যালোচনার একটি অন্যতম প্রধান বিবেচ্য বিষয়। ক্যাম্পাসে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের স্বাধীন মতপ্রকাশ, গবেষণার স্বাধীনতা, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বা দলীয়করণের প্রভাব এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া শিক্ষাক্ষেত্রে জাতীয় বাজেটের অপ্রতুলতা, বরাদ্দের সঠিক ব্যবহার এবং বিদ্যমান শিক্ষানীতি ও সংশ্লিষ্ট আইনের কার্যকারিতা পর্যালোচনা করে তা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার তাগিদ রয়েছে।
এই তথ্য সংগ্রহের পর বিশেষ দূত বাংলাদেশ সফরকালে সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, নীতি-নির্ধারক, নাগরিক সমাজ এবং সরাসরি শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সাথে মুখোমুখি সংলাপে বসবেন। সবশেষে মাঠপর্যায়ের তথ্য ও প্রাপ্ত মতামতের ভিত্তিতে তিনি একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন তৈরি করে তা জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলে আনুষ্ঠানিকভাবে পেশ করবেন। এই প্রতিবেদনের মূল উদ্দেশ্য হবে— বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার ঘাটতিগুলো আন্তর্জাতিক মহলে তুলে ধরা এবং শিক্ষার অধিকার নিশ্চিতকরণ, বৈষম্য দূরীকরণ ও শিক্ষাঙ্গনে প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা সুরক্ষায় বাংলাদেশ সরকারের জন্য সুনির্দিষ্ট, বাস্তবসম্মত ও দায়বদ্ধতামূলক সুপারিশ প্রণয়ন করা। এই প্রেক্ষাপটে, নির্বাচনপূর্ব ও পরবর্তী উচ্চশিক্ষা অঙ্গনের বিদ্যায়তনিক স্বাধীনতা ও মুক্তবুদ্ধি চর্চার নির্মোহ মূল্যায়ন এবং বিদ্যমান সংকটগুলোর চুলচেরা বিশ্লেষণ করাই এই প্রবন্ধের মূল উদ্দেশ্য, যা সম্ভবত অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ও সময়োপযোগী।
নির্বাচনপূর্ব উচ্চশিক্ষা অঙ্গন এবং বিদ্যায়তনিক স্বাধীনতার স্বরূপ
একটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক স্বাস্থ্য ও বুদ্ধিবৃত্তিক অগ্রযাত্রার প্রধানতম পরিমাপক হলো— তার উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর জ্ঞানচর্চার স্বাধীনতা ও মুক্তবুদ্ধির বিকাশ। বিশ্ববিদ্যালয় কেবল প্রচলিত পাঠ্যপুস্তকের জ্ঞান বিতরণ কিংবা সনদ বিতরণের কোনো আনুষ্ঠানিক কারখানা নয়; বরং তা প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার, ভিন্নমতের সঙ্গে যুক্তিতর্কের লড়াই চালানোর এবং সমাজের বিবেককে জাগ্রত রাখার এক মুক্ত অভয়ারণ্য। বিশ্ববিদ্যালয় কেবল ডিগ্রি অর্জনের স্থান নয়, বরং তা মানবসভ্যতার জ্ঞানসৃজন, মুক্তচিন্তা এবং সত্যানুসন্ধানের প্রধান কেন্দ্র। ক্ষমতার বিপরীতে যুক্তি, প্রমাণ ও মুক্তবুদ্ধির চর্চাই উচ্চশিক্ষার প্রাণ। বিগত ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে আন্তর্জাতিক সংগঠন ‘স্কলার্স অ্যাট রিস্ক’-এর অ্যাকাডেমিক ফ্রিডম মনিটরিং প্রজেক্ট প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদন ‘ফ্রি টু থিংক ২০২৬’-এ বিশ্বজুড়ে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের ওপর নেমে আসা নানামুখী দমন-পীড়ন এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতার সংকটের এক গভীর ও বাস্তবসম্মত চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনটি স্পষ্ট করে দেখায় যে, বিশ্বজুড়ে বিদ্যমান ক্ষমতা কাঠামো কীভাবে ভিন্নমত দমন ও নিজস্ব মতাদর্শ চাপিয়ে দেওয়ার হাতিয়ার হিসেবে উচ্চশিক্ষা অঙ্গনকে নিশানা বানাচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিদ্যমান ক্ষমতার সঙ্গে চিন্তার সংযোগস্থলে অবস্থান করে। শিক্ষার্থীরা যখন প্রচলিত মতবাদ বা ক্ষমতার কর্তৃত্বের বাইরে গিয়ে প্রশ্ন তুলতে শেখে, তখনই তা কায়েমি স্বার্থবাদী ও কর্তৃত্ববাদী শাসনের জন্য অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
প্রতিবেদনটিতে বিশ্বব্যাপী উচ্চশিক্ষার ওপর আক্রমণের প্রধানত দুটি ধারা চিহ্নিত করা হয়েছে। একটি ধারা হলো প্রত্যক্ষ দমন-পীড়ন ও শারীরিক সহিংসতা। বিশ্বের বহু দেশে শিক্ষার্থী আন্দোলনকে গুঁড়িয়ে দিতে রাষ্ট্রীয় বাহিনী ও পুলিশের বর্বর বলপ্রয়োগ, শিক্ষক ও গবেষকদের অন্যায্য কারাদণ্ড, এমনকি বলপূর্বক গুমের মতো ঘটনা ঘটছে। অন্য ধারাটি অপেক্ষাকৃত প্রচ্ছন্ন অথচ দীর্ঘমেয়াদে অত্যন্ত ক্ষতিকর; তা হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসনে সরাসরি রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ। আইন প্রণয়ন বা নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে পাঠ্যক্রম নিয়ন্ত্রণ, শিক্ষক নিয়োগে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার, গবেষণার স্বাধীনতা সংকুচিত করা এবং আদর্শিক কারণে আর্থিক বরাদ্দ বন্ধ করে দেওয়ার মতো কৌশল ব্যবহার করা হচ্ছে। বাহ্যিকভাবে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা বা জনস্বার্থের দোহাই দেওয়া হলেও এর মূল উদ্দেশ্য থাকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে রাষ্ট্রের অনুগত প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে যেখানে বহু দেশে বিদ্যায়তনিক স্বাধীনতা ক্রমাবনতির দিকে ধাবিত হচ্ছে, সেখানে চরম সংকটাপন্ন ও দমনমূলক পরিস্থিতি কাটিয়ে বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গনের উত্তরণ ও পুনর্গঠনের বাস্তবতাকে প্রতিবেদনটিতে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে।আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘স্কলার্স অ্যাট রিস্ক’-এর অ্যাকাডেমিক ফ্রিডম মনিটরিং প্রজেক্ট প্রকাশিত পূর্ণাঙ্গ বার্ষিক প্রতিবেদন ‘ফ্রি টু থিংক ২০২৬’-এ বিশ্বজুড়ে উচ্চশিক্ষার সংকট ও অগ্রগতির বিশদ পর্যালোচনার মধ্যে বাংলাদেশকে একটি অনন্য ও তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
বিদ্যায়তনিক স্বাধীনতা ইনডেক্স এর সাম্প্রতিক উপাত্তের বরাতে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, গত এক দশকে বিশ্বের বহু দেশে জ্ঞানচর্চার স্বাধীনতা আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেয়েছে।মধ্যপ্রাচ্য, এশিয়া, পূর্ব ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকার একাধিক অঞ্চলে শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশকে পুরোপুরি বা চরমভাবে অবরুদ্ধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চল এবং স্বৈরতান্ত্রিক দেশগুলোর পাশাপাশি তথাকথিত প্রতিষ্ঠিত গণতান্ত্রিক দেশগুলোতেও মতাদর্শিক মেরুকরণের কারণে উচ্চশিক্ষা প্রাতিষ্ঠানিক চাপের মুখে পড়ছে। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা এমন এক ভয়ের সংস্কৃতির মধ্যে বাস করছেন, যেখানে সামান্য দ্বিমত প্রকাশের জন্যও চাকরিচ্যুতি, আইনি হয়রানি বা শারীরিক নিগ্রহের শিকার হতে হয়, যা শিক্ষক-গবেষকদের আত্মনিয়ন্ত্রণ বা স্ব-আরোপিত নীরবতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তবে সার্বিক সংকটের মধ্যেও প্রতিবেদনটি ইতিবাচক পরিবর্তন ও প্রতিরোধকে গুরুত্ব সহকারে তুলে ধরেছে। শাসনব্যবস্থার রূপান্তর বা নীতিগত সংস্কার কীভাবে একটি দেশের উচ্চশিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে পারে, তার দৃষ্টান্ত হিসেবে ব্রাজিলের মতো দেশের পুনরুত্থান এবং বাংলাদেশ, হাঙ্গেরি ও ভেনিজুয়েলার রাজনৈতিক পরিবর্তনের সম্ভাবনাকে নির্দেশ করা হয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে ক্যাম্পাসে দলীয় রাজনীতির প্রভাব হ্রাস এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মাধ্যমে শিক্ষাঙ্গনের স্বাধীনতা পুনরুদ্ধারের যে প্রচেষ্টা শুরু হয়েছিল, তা সতর্ক আশাবাদের বার্তা দেয়। একইসঙ্গে সরকার পরিবর্তন না হলেও রাষ্ট্রীয় অন্যায্য সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের দীর্ঘস্থায়ী সৃজনশীল প্রতিরোধ— যেমন তুরস্কে চাপিয়ে দেওয়া উপাচার্যের বিরুদ্ধে শিক্ষকদের অহিংস অবস্থান কিংবা সার্বিয়ায় শিক্ষার্থীদের পাশে শিক্ষকদের দাঁড়ানো— প্রমাণ করে যে দমন-পীড়নের মধ্যেও মুক্তচিন্তার চেতনা পুরোপুরি স্তব্ধ হয়ে যায় না।
প্রতিবেদনের পর্যবেক্ষণে স্পষ্টভাবে বিধৃত হয়েছে যে, বিগত বছরগুলোতে বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা গভীর রাজনৈতিক আধিপত্য, ভীতির সংস্কৃতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, ডিন ও বিভাগীয় প্রধানের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে মেধার চেয়ে দলীয় আনুগত্যকে প্রধান মানদণ্ড করায় উচ্চশিক্ষা অঙ্গন মুক্তবুদ্ধি চর্চার বদলে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছিল। এই অবরুদ্ধ দমবন্ধ পরিস্থিতির বিরুদ্ধে ২০২৪ সালে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে সূচিত দেশব্যাপী ঐতিহাসিক আন্দোলন কেবল রাজনৈতিক পটপরিবর্তনই ঘটায়নি, বরং শিক্ষাঙ্গনের সামগ্রিক পরিবেশকে আমূল বদলে দেওয়ার এক ঐতিহাসিক সুযোগ তৈরি করে। প্রতিবেদনে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনের নেওয়া সংস্কারমূলক উদ্যোগগুলোর বিস্তারিত মূল্যায়ন করা হয়েছে। বিশেষ করে ক্যাম্পাসের প্রশাসনিক কাঠামোকে নির্দলীয়করণ, শীর্ষ পদে রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগপ্রাপ্তদের অপসারণ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘদিনের হারানো প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসন ফিরিয়ে আনার যে তৎপরতা শুরু হয়, তা আন্তর্জাতিক বিদ্যায়তনিক পরিমণ্ডলে ভূয়সী প্রশংসা পায়। এই ইতিবাচক পরিবর্তনের স্পষ্ট প্রমাণ মিলেছে ‘বিদ্যায়তনিক স্বাধীনতা ইনডেক্স’-এর সংখ্যাতাত্ত্বিক মূল্যায়নে। প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে, রাজনৈতিক নিপীড়নের চূড়ান্ত সময়ে ২০২৩ সালে যেখানে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা অঙ্গনে বিদ্যায়তনিক স্বাধীনতা স্কোর ছিল তলানিতে, অর্থাৎ শূন্য দশমিক এক-তিন (০.১৩), যা আন্তর্জাতিকভাবে ‘সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ’ বা ‘কমপ্লিটলি রেস্ট্রিকটেড’ শ্রেণিভুক্ত ছিল; সেখানে ২০২৪-পরবর্তী ধারাবাহিক সংস্কারের ফলে ২০২৫ সালে তা এক লাফে বেড়ে শূন্য দশমিক পাঁচ-দুই (০.৫২)-তে উন্নীত হয় এবং দেশ ‘মাঝারি মাত্রায় সীমিত’ স্তরে প্রবেশ করে। এই কাঠামোগত অগ্রযাত্রাকে প্রতিবেদনে ‘সতর্ক আশাবাদ’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এটি নির্দেশ করে যে, শুধু সরকার পরিবর্তনই নয়, বরং ক্যাম্পাসে মুক্তচিন্তার চর্চা, বহুত্ববাদী চিন্তার গ্রহণযোগ্যতা ও ভীতির সংস্কৃতির অবসান ঘটানোই ছিল এই রূপান্তরের মূল চালিকাশক্তি। একইসঙ্গে প্রতিবেদনে এ কথাও স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, অতীত ক্ষত কাটিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতাকে স্থায়ী রূপ দেওয়া এবং শিক্ষাঙ্গনকে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বা সামাজিক শক্তির নতুন আধিপত্যের কবলে পড়তে না দেওয়া বাংলাদেশের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি ও সংবেদনশীল চ্যালেঞ্জ। সামগ্রিকভাবে, স্কলার্স অ্যাট রিস্কের প্রতিবেদনে বাংলাদেশকে এমন একটি অনুপ্রেরণাদায়ী দেশ হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে, যা প্রমাণ করেছে দমন-পীড়ন যত গভীরই হোক না কেন, ছাত্র-শিক্ষক সমাজের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ ও কার্যকর সংস্কারের মাধ্যমে শিক্ষাঙ্গনের মৌলিক স্বাধীনতা ও মুক্তচিন্তার পরিবেশ ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
নির্বাচনোত্তর উচ্চশিক্ষা অঙ্গন: বিদ্যায়তনিক স্বাধীনতার প্রাতিষ্ঠানিক বিপর্যয় ও বহুমাত্রিক দমন-পীড়ন
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের দীর্ঘ পরিক্রমায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা সবসময়ই ছিল ক্ষমতার স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতার বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী দুর্গ। তবে ইতিহাসের এক নির্মম পরিহাস হলো, প্রতিটি রাজনৈতিক পটপরিবর্তন কিংবা নির্বাচনের পর উচ্চশিক্ষা প্রাঙ্গণই সবচেয়ে আগে ক্ষমতা কাঠামোর পুনর্বিন্যাসের শিকার হয়। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন-পরবর্তী বাংলাদেশের বাস্তবতায় মুক্তচিন্তার পরিসর এবং উচ্চশিক্ষার স্বাধীনতা এক অভূতপূর্ব ও বহুমাত্রিক প্রাতিষ্ঠানিক সংকটের মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা ও গণআকাঙ্ক্ষার প্রেক্ষিতে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের পর যেখানে শিক্ষাঙ্গনে একটি বহুমাত্রিক, বহুত্ববাদী ও ভয়হীন পরিবেশ প্রত্যাশিত ছিল, সেখানে বাস্তবে দৃশ্যমান হচ্ছে নতুন আঙ্গিকের দমন-পীড়ন, মতাদর্শিক একাধিপত্য এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসনের গভীর অবক্ষয়।
নির্বাচন-উত্তর বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে সবচেয়ে দৃশ্যমান আঘাতটি এসেছে প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসনের ওপর। কাগজে-কলমে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নিজস্ব বিধি ও ১৯৭৩ সালের অধ্যাদেশের মতো আইনগত রক্ষাকবচ থাকলেও বাস্তবে তা বরাবরই রাজনৈতিক সরকারের ইচ্ছাপূরণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে এসেছে। ত্রয়োদশ নির্বাচন-উত্তর পর্বে এই প্রবণতা নিঃশেষিত হওয়ার বদলে আরও তীব্র রূপ ধারণ করেছে। ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, উপাচার্য, উপ-উপাচার্য থেকে শুরু করে অনুষদের ডিন, হলের প্রাধ্যক্ষ এবং সিন্ডিকেট সদস্যদের মতো নীতি-নির্ধারণী পদগুলোতে শুরু হয় একচ্ছত্র পুনর্বাসন ও অনুগতদের পদায়ন। মেধা, বৈশ্বিক গবেষণা মান বা প্রশাসনিক যোগ্যতার চেয়ে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা ও নতুন ক্ষমতা কাঠামোর প্রতি প্রশ্নহীন আনুগত্যই হয়ে ওঠে মূল মাপকাঠি। উদাহরণস্বরূপ, অতীতে বিভিন্ন পটপরিবর্তনের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে যেভাবে দীর্ঘমেয়াদী প্রশাসনিক সংস্কার ও স্বাধীন ‘উপাচার্য সার্চ কমিটি’ গঠনের দাবিকে পাশ কাটিয়ে রাজনৈতিক লবিং ও দলীয় মতাদর্শের ভিত্তিতে উপাচার্য ও ডিন নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল, নির্বাচনোত্তর পর্বেও সেই পুরোনো আমলাতান্ত্রিক দখলদারিত্বই পুনরাবৃত্ত হয়েছে। যখন একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ প্রশাসন কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বলয়ের অনুগ্রহপুষ্ট হয়ে পড়ে, তখন সেই প্রতিষ্ঠান আর স্বাধীনভাবে সত্য উচ্চারণের নৈতিক বল পায় না। ফলে উচ্চশিক্ষার পুরো প্রশাসনিক কাঠামোটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটি নজরদারি ও অনুশাসনমূলক ব্যবস্থায় রূপান্তরিত হয়, যার প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়ায় ক্ষমতাসীন দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে থাকা যেকোনও কণ্ঠকে দমন করা।
প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতার এই সংকটের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়েছে বহুমাত্রিক দমন-পীড়ন ও ভীতির সংস্কৃতির পুনরাবির্ভাব। এই দমন-পীড়ন কেবল অতীতের মতো পুলিশি অ্যাকশন বা সরাসরি শারীরিক বলপ্রয়োগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং তা এখন অত্যন্ত সূক্ষ্ম, কাঠামোগত ও বহুমুখী। নির্বাচন-উত্তর পরিস্থিতিতে ক্যাম্পাসে ভিন্নমতাবলম্বী শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের কোণঠাসা করার জন্য নানামুখী প্রশাসনিক ও মনস্তাত্ত্বিক কৌশল প্রয়োগ করা হচ্ছে। শিক্ষক নিয়োগ, পদোন্নতি, ছুটি মঞ্জুর কিংবা গবেষণার তহবিল বরাদ্দের ক্ষেত্রে আদর্শিক আনুগত্যকে অদৃশ্য পূর্বশর্ত হিসেবে দাঁড় করানো হচ্ছে। সামান্য দ্বিমত পোষণ করলেই শৃঙ্খলা ভঙ্গের নোটিস জারি, কারণ দর্শানোর চিঠি দেওয়া কিংবা তদন্ত কমিটির নামে দীর্ঘমেয়াদি হয়রানির মুখে ফেলা হচ্ছে। অতীতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সমসাময়িক রাষ্ট্রীয় নীতি বা নির্বাচনের ন্যায্যতা নিয়ে মন্তব্য করায় শিক্ষকদের যেভাবে বিভাগীয় শোকজ ও তদন্ত কমিটির মাধ্যমে বছরের পর বছর পদোন্নতি বঞ্চিত রাখা হয়েছিল, সেই প্রশাসনিক হাতিয়ারগুলো এখনও সক্রিয় রাখা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রেও আবাসিক হলে সিট বণ্টন, পরীক্ষার ফল বা মেধার ন্যায্য স্বীকৃতিতে আঘাত হেনে ভিন্নমত প্রকাশের সাহসকে গুঁড়িয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা স্পষ্ট। ক্ষমতা কাঠামোর প্রত্যক্ষ প্রশ্রয়ে ক্যাম্পাসে এমন এক অদৃশ্য নজরদারির জাল বিছানো হয়েছে, যেখানে সাধারণ একটি সমালোচনাও ‘রাষ্ট্রবিরোধী’ বা ‘শৃঙ্খলাবিরোধী’ আখ্যা পেয়ে শাস্তির আওতায় চলে আসছে।
দমন-পীড়নের এই প্রক্রিয়ায় সাম্প্রতিক সময়ে একটি নতুন ও বিপজ্জনক মাত্রা যোগ করেছে দলবদ্ধ আক্রমণ বা তথাকথিত ‘মব জাস্টিস’ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংঘবদ্ধ সাইবার বুলিং। কোনো শিক্ষক বা শিক্ষার্থী যদি প্রচলিত মতাদর্শ কিংবা ক্ষমতা কাঠামোর সংবেদনশীল কোনো বিষয়ে নিজস্ব বিশ্লেষণ বা মুক্তচিন্তার প্রকাশ ঘটান, তবে তার বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিকভাবে একটি কৃত্রিম জনরোষ তৈরি করা হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চরিত্রহরণ, ধর্মীয় বা জাতীয়তাবাদী অনুভূতির অপব্যাখ্যা দিয়ে ঘৃণা ছড়ানো এবং বিদ্যায়তনিক প্রাঙ্গণে সরাসরি হুমকি প্রদর্শনের মাধ্যমে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে চূড়ান্তভাবে একঘরে করে দেওয়া হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অ্যাকাডেমিক মতামত প্রকাশের জেরে শিক্ষকদের ঘেরাও করা, জোরপূর্বক পদত্যাগে বাধ্য করার চেষ্টা কিংবা ক্লাস-পরীক্ষা থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য অব্যাহতি দেওয়ার যে নজিরগুলো দেখা গেছে, তা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের মেরুদণ্ডহীনতাকেই উন্মোচিত করে। এই ধরনের অগণতান্ত্রিক ও উন্মত্ত প্রবণতার বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন প্রায়শই নিরপেক্ষ ভূমিকা পালনের বদলে আক্রমণকারীদের দাবির মুখেই নতজানু হয়ে পড়ছে। কখনও কখনও ভুক্তভোগী মুক্তমতের শিক্ষক বা শিক্ষার্থীকেই ‘পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার’ অজুহাতে বরখাস্ত বা ক্যাম্পাস ছাড়া করা হচ্ছে, যা কার্যত স্বাধীন চিন্তা ও বুদ্ধিবৃত্তিক সত্যানুসন্ধানের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেওয়ার শামিল।
এর ফলে উচ্চশিক্ষার অঙ্গনে নেমে এসেছে এক ভয়াবহ আত্মনিয়ন্ত্রণ বা স্ব-আরোপিত নীরবতার ব্যাধি। শিক্ষক ও গবেষকরা এখন এমন কোনো বিষয়ে মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না, যা ক্ষমতার বৃত্তে অস্বস্তি তৈরি করতে পারে। ইতিহাস, রাজনীতি, অর্থনীতি কিংবা সমাজবিজ্ঞানের মৌলিক বিষয়গুলোতে যে স্বাধীন ও নির্মোহ বিশ্লেষণ প্রয়োজন, তা আজ ভয়ের চাদরে ঢাকা। পাঠ্যক্রম প্রণয়ন থেকে শুরু করে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান—সবক্ষেত্রেই একটি অদৃশ্য সেন্সরশিপ কাজ করছে। উদাহরণস্বরূপ, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বা আইন বিভাগের ক্লাসরুমে সংবিধানের বিতর্কিত সংশোধনী, মানবাধিকার হরণ, রাজনৈতিক বন্দিদের পরিস্থিতি কিংবা ডিজিটাল নজরদারির ঝুঁকি নিয়ে আলোচনার সময় শিক্ষকদের প্রতিনিয়ত নজরদারি বা অডিও ফাঁসের আশঙ্কায় থাকতে হয়। শিক্ষক যখন ক্লাসরুমে কোনও প্রতিষ্ঠিত তত্ত্বকে নির্দ্বিধায় চ্যালেঞ্জ করার সাহস হারান এবং শিক্ষার্থী যখন কোনও প্রশ্ন তোলার আগে নিজের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করতে বাধ্য হয়, তখন বিশ্ববিদ্যালয় তার মূল চরিত্র হারিয়ে ফেলে। আন্তর্জাতিক মানের গবেষণার বদলে সেখানে প্রাধান্য পায় আপসকামী ও তোষণমূলক বুদ্ধিবৃত্তি, যা উচ্চশিক্ষার সামগ্রিক গুণগত মানকে চরমভাবে নিম্নমুখী করে তোলে। মুক্তচিন্তা ছাড়া মৌলিক জ্ঞানসৃজন অসম্ভব; আর এই বন্ধ্যাত্ব দীর্ঘমেয়াদে পুরো জাতিকে অন্ধ অনুকরণ ও পরনির্ভরশীলতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
একই সাথে ছাত্ররাজনীতির নামে ক্যাম্পাসে আধিপত্যবাদী একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রবণতাও মুক্তচিন্তার পরিবেশকে রুদ্ধ করে রেখেছে। নির্বাচন-উত্তর পর্বে সুস্থ, গণতান্ত্রিক ও সহাবস্থানমূলক ছাত্ররাজনীতির পথ উন্মুক্ত হওয়ার যে প্রত্যাশা ছিল, তা নতুন শক্তির আধিপত্য প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতায় বারবার ম্লান হচ্ছে। সাধারণ শিক্ষার্থীদের মুক্ত আলোচনা সভা, সাহিত্য আসর, বিতর্ক প্রতিযোগিতা কিংবা স্বাধীন প্ল্যাটফর্মগুলোকে সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি চত্বর কিংবা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তমঞ্চে মুক্তচিন্তার চলচ্চিত্র প্রদর্শনী, সেমিনার বা বিতর্ক উৎসব আয়োজনের ক্ষেত্রে প্রক্টরিয়াল অনুমোদনের নামে কৃত্রিম বাধা সৃষ্টি করা এবং মাইক খুলে নেওয়ার ঘটনা অহরহ ঘটছে। ভিন্ন মতাদর্শের ছাত্র সংগঠনগুলোকে কার্যক্রম পরিচালনায় বাধা দেওয়া এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর জবরদস্তিমূলক মতাদর্শ চাপিয়ে দেওয়ার যে চর্চা দশকের পর দশক ধরে বিদ্যমান ছিল, তার ধরন বদলেছে কিন্তু চরিত্র বদলায়নি। একটি গণতান্ত্রিক ক্যাম্পাসে সকল মত ও পথের শান্তিময় সহাবস্থানই ছিল মুক্তচিন্তার মৌলিক শর্ত; কিন্তু আধিপত্যের রাজনীতি সেই বহুত্ববাদী পরিবেশকে বারবার ধ্বংস করে একদলীয় বা একমতীয় মনস্তত্ত্ব চাপিয়ে দিচ্ছে।
এই বহুমুখী সংকট থেকে উত্তরণ কোনো সহজ পথ নয়, তবে এটি জাতির অস্তিত্বের স্বার্থেই অপরিহার্য। ত্রয়োদশ নির্বাচন-উত্তর বাংলাদেশের রাষ্ট্রনায়ক ও নীতিনির্ধারকদের এটি গভীরভাবে অনুধাবন করতে হবে যে, উচ্চশিক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা কোনো রাজনৈতিক ছাড় নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের মেধা ও উদ্ভাবনী শক্তি টিকিয়ে রাখার মৌলিক পূর্বশর্ত। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সত্যিকার অর্থেই স্বাধীন করতে হলে আইনগত স্বায়ত্তশাসনের বাস্তব ও আপসহীন প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। উপাচার্য নিয়োগ থেকে শুরু করে শিক্ষক নিয়োগ পর্যন্ত সকল পর্যায়ে দলীয় আনুগত্যের বদলে উচ্চমানের মেধা ও গবেষণার যোগ্যতাকে একমাত্র মাপকাঠি করতে হবে। একই সঙ্গে ভিন্নমত ও সমালোচনাকে রাষ্ট্রদ্রোহিতা না ভেবে গণতন্ত্রের অন্যতম রক্ষাকবচ হিসেবে বিবেচনা করার মানসিকতা রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ফিরিয়ে আনা জরুরি। কোনো শিক্ষার্থী বা শিক্ষক যেন তার মতাদর্শ বা গবেষণামূলক বক্তব্যের কারণে প্রাতিষ্ঠানিক কিংবা সামাজিক প্রতিহিংসার শিকার না হন, তার আইনি ও নৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকেই।এই গভীর অবক্ষয় থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে রাষ্ট্র ও সমাজকে উচ্চশিক্ষার স্বাধীনতা ও সর্বজনীন শিক্ষার অধিকারকে নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে পুনর্বিবেচনা করতে হবে।
বিদ্যায়তনিক স্বাধীনতা ও মুক্তবুদ্ধির চর্চা কোনো পৃথক বা বিলাসিতামূলক দাবি নয়, বরং তা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের বুদ্ধিবৃত্তিক অস্তিত্ব, ন্যায়বিচার ও মৌলিক মানবিক অগ্রযাত্রার প্রধানতম ভিত্তি। জাতিসংঘের বিশেষ দূতের আসন্ন সফর বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার ঐতিহাসিক ক্ষত, কাঠামোগত দুর্বলতা এবং সাম্প্রতিক সময়ে পুনরাবৃত্ত হওয়া প্রশাসনিক ও সামাজিক দমন-পীড়নের বাস্তবতাকে আন্তর্জাতিক জবাবদিহিতার মুখোমুখি দাঁড় করানোর একটি অনন্য সুযোগ তৈরি করেছে। তবে এই আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ তখনই প্রকৃত সুফল বয়ে আনবে, যখন রাষ্ট্র ও নীতিনির্ধারকেরা অভ্যন্তরীণ জায়গা থেকে উচ্চশিক্ষার সংকট নিরসনে দৃশ্যমান ও কাঠামোগত সংস্কারে ব্রতী হবেন।
এই অবক্ষয় থেকে কার্যকর উত্তরণ ঘটাতে হলে সর্বাগ্রে শিক্ষা অর্থায়নের সনাতন ধাঁচ বদলে জাতীয় বাজেটে এর হিস্যা অন্তত জিডিপির চার শতাংশে উন্নীত করা অপরিহার্য। তবে আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ রোধে সেই অর্থ ছাড় হতে হবে শর্তহীন ‘ব্লক গ্রান্ট’ পদ্ধতিতে, যাতে তহবিল বরাদ্দ ও গবেষণার অগ্রাধিকার নির্ধারণের পূর্ণ স্বাধিকার বজায় থাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীন অ্যাকাডেমিক কাউন্সিল ও সিন্ডিকেটের হাতে। একই সঙ্গে উপাচার্য ও শীর্ষ নেতৃত্ব নির্বাচনে রাজনৈতিক বিবেচনার অবসান ঘটিয়ে একটি উন্মুক্ত, স্বচ্ছ ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন নিরপেক্ষ সার্চ কমিটির আইনি বিধান নিশ্চিত করতে হবে, যেখানে দলবাজির বদলে কেবল উচ্চ অ্যাকাডেমিক খ্যাতি ও সততাই হবে একমাত্র মাপকাঠি। ১৯৭৩ সালের বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশের গণতান্ত্রিক রক্ষাকবচগুলোকে সকল উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সম্প্রসারিত করার পাশাপাশি শিক্ষক-গবেষকদের মতপ্রকাশের কারণে যেকোনো প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ গ্রহণকে স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ করতে হবে।
উচ্চশিক্ষার এই মুক্তি কেবল শীর্ষ পর্যায়ের সংস্কারে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায় থেকে বহুমুখী ধারার বৈষম্য দূর করে একটি জাতীয় সমতাভিত্তিক মৌলিক শিক্ষানীতি বাস্তবায়ন করতে হবে, যাতে দূরবর্তী ও প্রান্তিক অঞ্চলের সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীরাও সমমানের সুযোগ পায়। পাশাপাশি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলোকে প্রয়োজনীয় তহবিল ও গবেষণার সুবিধাসহ আধুনিক আঞ্চলিক বিদ্যাপীঠে রূপান্তর করা এবং শিক্ষাঙ্গনে পেশিশক্তি ও একক দখলদারিত্ব ঠেকাতে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত ছাত্র সংসদ নির্বাচন নিশ্চিত করা জরুরি, যা ক্যাম্পাসে সুস্থ বিতর্ক ও গণতান্ত্রিক সহাবস্থান ফিরিয়ে আনবে। পরিশেষে, রাষ্ট্রকে এটি গভীরভাবে উপলব্ধি করতে হবে যে মুক্তচিন্তা ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসন কোনো রাজনৈতিক অনুগ্রহ নয়, বরং একটি স্বনির্ভর, উদ্ভাবনী ও শোষণমুক্ত জ্ঞানভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণের অবিচ্ছেদ্য শর্ত। কেবল পর্যাপ্ত অর্থনৈতিক বিনিয়োগ এবং নিঃশঙ্ক বিদ্যায়তনিক মুক্তাঙ্গনের যুগপৎ নিশ্চয়তাই পারে বাংলাদেশকে তার উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার হারানো মর্যাদা পুনরুদ্ধার করে একটি আলোকোজ্জ্বল ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে নিতে।
লেখক: গবেষক ও মানবাধিকারকর্মী