রোহিঙ্গা সংকট: স্মরণ নয়, এবার দায় নেওয়ার সময়

রেজাউর রহমান লেনিন
২৫ আগস্ট ২০২৬, ১০:০০আপডেট : ২৫ আগস্ট ২০২৬, ১০:০০

আজ ২৫ আগস্ট, রোহিঙ্গা গণহত্যা স্মরণ দিবস। এ উপলক্ষে নবমবারের মতো কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের আশ্রয়শিবিরসহ বিশ্বজুড়ে রোহিঙ্গা সম্প্রদায় শোক প্রকাশ, বিচার দাবি ও নিরাপদ প্রত্যাবাসনের আহ্বান জানিয়ে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছে। কিন্তু ‘রোহিঙ্গা গণহত্যা স্মরণ দিবস’ কেবল একটি বার্ষিক স্মৃতিচারণ নয়; বর্তমান ভূ-রাজনীতি, আন্তর্জাতিক আইনি লড়াই এবং মানবিক বাস্তবতায় এ দিবসের তাৎপর্য অনেক গভীর।

রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর চলমান সংকটের কেন্দ্রে থাকা তাদের নিজস্ব কণ্ঠস্বর ও সংহতির অধিকার স্বীকার করা সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক ও মানবিক পাঠ। আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামো ও জবাবদিহির প্রতি নাগরিক নজরদারি বজায় রাখাও এ দিবসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। নেদারল্যান্ডসের হেগে অবস্থিত আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে)-এ গাম্বিয়া বনাম মিয়ানমার মামলার অগ্রগতি এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি)-এর তদন্ত প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সক্রিয় আইনি ও তথ্যগত সহায়তা নিশ্চিত করতে সচেতন জনমতের চাপ গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্বরাজনীতিতে ইউক্রেন, মধ্যপ্রাচ্য কিংবা সুদানের মতো নতুন নতুন সংকটের ভিড়ে রোহিঙ্গা ইস্যু যখন আন্তর্জাতিক অগ্রাধিকার হারাচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থাগুলোর মানবিক তহবিলে ঘাটতি দেখা দিচ্ছে, তখন নাগরিক সমাজকে সোচ্চার থাকতে হবে। রোহিঙ্গা সংকট যেন কোনও ‘বিস্মৃত সংকটে’ পরিণত না হয়, তা নিশ্চিত করা জরুরি। পরাশক্তিগুলোর অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের কাছে যেন আন্তর্জাতিক আইনের সর্বজনীনতা এবং মানবাধিকারের মৌলিক অঙ্গীকার পদদলিত না হয়, সে বিষয়েও নাগরিক পর্যালোচনা প্রয়োজন।

এই বাস্তবতায় জাতিসংঘের ইন্টারনাল ওভারসাইট সার্ভিসেস অফিসের অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বাংলাদেশে ইউএনএইচসিআর পরিচালিত রোহিঙ্গা ত্রাণ প্রকল্পগুলোতে ব্যাপক অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম ও তহবিল অপচয়ের চিত্র উঠে এসেছে। ২০২৩ থেকে ২০২৪ সালের কার্যক্রমের ওপর ভিত্তি করে তৈরি প্রতিবেদনে দেখা যায়, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো ও জ্বালানি খাতে পরিকল্পনাহীন ব্যয় এবং তদারকির অভাবে কোটি কোটি ডলারের সম্পদ অব্যবহৃত পড়ে রয়েছে।

উখিয়ায় ১৫ লাখ ডলার ব্যয়ে নির্মিত বিশেষায়িত হাসপাতাল এবং ভাসানচরে ১ লাখ ৪০ হাজার ডলারের সৌর সরঞ্জাম ও ৭৪ হাজার ৩০১ ডলারের এক্স-রে মেশিনযুক্ত ২০ শয্যার চিকিৎসাকেন্দ্র সম্পূর্ণ অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে ছিল। ভাসানচরে সরকারের পূর্বনির্মিত সৌর স্থাপনা থাকা সত্ত্বেও সমান্তরালভাবে ৫ লাখ ২৮ হাজার ৫২৮ ডলারের জ্বালানি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়।

স্বাস্থ্য খাতে সমন্বিত পরিকল্পনার অভাবে ২০২৪ সালে ডায়রিয়া, কলেরা, হেপাটাইটিস সি ও খোসপাঁচড়ার মতো রোগের প্রাদুর্ভাব তীব্র আকার ধারণ করে। কালো তালিকাভুক্ত একটি প্রতিষ্ঠানকে মেয়াদোত্তীর্ণ সুঁচের তারিখ পরিবর্তনের অপরাধ সত্ত্বেও ১৮ লাখ ২০ হাজার ডলারের চুক্তি দেওয়া হয়। একই সঙ্গে ৪২ লাখ ডলারের আশ্রয় সামগ্রী ও ৮ লাখ ডলারের চিকিৎসাসামগ্রী একাধিকবার কেনা, ভ্যাট ছাড়ের সুযোগ না নেওয়ায় ৬৫ লাখ ডলারের অপূরণীয় আর্থিক ক্ষতি এবং সরকারি কর্মকর্তাদের অপ্রয়োজনীয় মাসিক ও উৎসব ভাতা হিসেবে ১ লাখ ৮০ হাজার ডলার বিতরণের তথ্যও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও প্রকাশ পায়, দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই সমাধানের মূল লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হয়ে তহবিলের ৬৭ শতাংশ ব্যয় হয়েছে তাৎক্ষণিক ত্রাণের পেছনে, আর মাত্র ১৭ শতাংশ গেছে শরণার্থী ক্ষমতায়নে। ক্রয় ও লজিস্টিক ব্যবস্থাপনাতেও অস্বচ্ছতার চিত্র উঠে এসেছে। বাজার দরের চেয়ে ২৬ শতাংশ বেশি দামে একক ঠিকাদারকে ২ কোটি ৫০ লাখ ডলারের নির্মাণকাজ দেওয়া হয়, যাতে ক্ষতি হয় প্রায় ৬৫ লাখ ডলার। একইভাবে সর্বনিম্ন দরদাতা না হওয়া সত্ত্বেও একক সরবরাহকারী থেকে ৩ কোটি ডলারের এলপিজি কেনা এবং প্রয়োজনের তুলনায় ৫৫ লাখ ডলার অতিরিক্ত এলপিজি কেনার প্রমাণ মেলে।

অবকাঠামোগত সমন্বয়ের অভাবে একই এলাকায় অতিরিক্ত ১২৮টি পাইপযুক্ত পানির নেটওয়ার্ক, ৫২টি পাম্প স্টেশন ও ২০ হাজারের বেশি নলকূপ স্থাপন করা হয়। আবার নকশাগত ত্রুটির কারণে ২ কোটি ২০ লাখ ডলার ব্যয়ে নির্মিত ৯৯টি হাতির ওয়াচ টাওয়ার অকার্যকর প্রমাণিত হয়। এ ছাড়া বাড়িওয়ালার পূর্বানুমতি ছাড়া কক্সবাজারে ২ লাখ ৪০ হাজার ডলারে অফিস তৈরি করে ফেলে রাখা, দীর্ঘদিন অচল থাকা ১০টি গাড়ির পেছনে ৮০ হাজার ডলার ভাড়া দেওয়া এবং বিকল্প সাশ্রয়ী ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও আট বছর ধরে অব্যবহৃত একটি মোটেলের পেছনে বার্ষিক ১ লাখ ২৬ হাজার ডলার খরচ করে ১০ লাখ ডলারের বেশি অপচয়ের মতো গুরুতর অনিয়মও নিরীক্ষায় চিহ্নিত হয়েছে।

এদিকে ক্যাম্পের অসহনীয় অনিশ্চয়তা, ঋণের ফাঁদ ও জীবিকার অভাবে হাজার হাজার রোহিঙ্গা; বিশেষ করে নারী ও শিশু—দালালদের মাধ্যমে আন্দামান সাগর ও বঙ্গোপসাগর পাড়ি দিয়ে মালয়েশিয়া বা ইন্দোনেশিয়া যাওয়ার ঝুঁকি নিচ্ছে। এতে স্পষ্ট হয়, সংকটটি আর কেবল সীমান্তের শিবিরে সীমাবদ্ধ নেই; বরং তা একটি স্থায়ী আঞ্চলিক মানব পাচার ও নৌ-মৃত্যুর ট্র্যাজেডিতে রূপ নিয়েছে।

অন্যদিকে, বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকারের রাজনৈতিক দল বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহার ও পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক রূপরেখায় রোহিঙ্গা সংকট নিরসন এবং বলপ্রয়োগে বাস্তুচ্যুত এই জনগোষ্ঠীর টেকসই পুনর্বাসনকে জাতীয় নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান এজেন্ডা ও সর্বোচ্চ কূটনৈতিক অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। দলটির নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, পূর্ববর্তী সরকারের সময় জনম্যান্ডেটবিহীন ও দুর্বল পররাষ্ট্রনীতির কারণে দীর্ঘস্থায়ী এ সংকট আন্তর্জাতিক পরিসরে সঠিক গতি পায়নি।

এর বিপরীতে ১৯৭৮ ও ১৯৯২ সালে তৎকালীন বিএনপি সরকারের সময়ে সফল ও কার্যকর প্রত্যাবাসনের নজির স্মরণ করিয়ে দিয়ে দলটির পক্ষ থেকে একটি স্থায়ী, মর্যাদাপূর্ণ ও অধিকারভিত্তিক সমাধানের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। ইশতেহারে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে দ্বিপাক্ষিক ব্যর্থতার গণ্ডি থেকে বের করে এনে আন্তর্জাতিকীকরণের ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, বলপ্রয়োগ বা অনিরাপদ পরিবেশে কোনও সাময়িক ট্রায়াল প্রত্যাবাসন নয়; বরং জাতিসংঘের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে রোহিঙ্গাদের নিজ ভূমি রাখাইনে স্বেচ্ছায়, নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করতে হবে।

প্রত্যাবাসনের মূল পূর্বশর্ত হিসেবে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ঐতিহাসিক জাতিগত ও সাংবিধানিক নাগরিকত্ব প্রদান, মৌলিক মানবিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা, দখলকৃত জমিজমা ও বসতভিটা ফেরত এবং জীবন-জীবিকার সম্পূর্ণ নিরাপত্তার নিশ্চয়তা আদায়ের কথা বলা হয়েছে। তবে প্রত্যাবাসন বা ক্যাম্প ব্যবস্থাপনা নিয়ে কোনও নীতিনির্ধারণ যেন রোহিঙ্গাদের বাদ দিয়ে কেবল উচ্চপর্যায়ের আমলাতান্ত্রিক সিদ্ধান্তে পরিণত না হয়।

আশ্রয়শিবিরের প্রবীণ, নারী ও তরুণ নেতৃত্বের স্বাধীনভাবে সংগঠিত হওয়ার সুযোগ, শিক্ষা অর্জনের অধিকার এবং নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে মত প্রকাশের পরিবেশ নিশ্চিত করাও জরুরি।

বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের আরও মনে রাখা দরকার, পাঁচ বছর আগের সামরিক অভ্যুত্থানের পর শুরু হওয়া রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধে এক লাখেরও বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে, যা এই অঞ্চলকে বর্তমান এশিয়ার সবচেয়ে প্রাণঘাতী সংঘাতের কেন্দ্রে পরিণত করেছে। নির্বাচিত সরকারকে উৎখাতের পর তীব্র গণবিক্ষোভ কঠোর হাতে দমন করা হলে সাধারণ আন্দোলনকারী ও তরুণরা বিভিন্ন জাতিগত সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলে।

টানা অর্ধদশক ধরে চলা বিমান হামলা, ভারী কামানের গোলাবর্ষণ ও তীব্র সম্মুখযুদ্ধে বেসামরিক নাগরিকদের জীবন বিপর্যস্ত হয়েছে, ব্যাহত হয়েছে স্বাভাবিক শিক্ষাব্যবস্থা। ব্যাপক বাস্তুচ্যুতির কারণে সীমান্তবর্তী দেশগুলোতে মানবিক সংকট ও শরণার্থীর ঢল তীব্র হয়েছে। এর পাশাপাশি সাধারণ নাগরিকদের জোরপূর্বক সামরিক বাহিনীতে অন্তর্ভুক্তি এবং সীমান্তের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সুযোগে গড়ে ওঠা আন্তসীমান্ত অপরাধ কর্মকাণ্ড সামগ্রিক মানবিক বিপর্যয়কে আরও গভীর করেছে।

অন্যদিকে, মিয়ানমারের সামরিক জান্তা সরকার বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া আট লাখেরও বেশি রোহিঙ্গার তালিকা থেকে ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জনকে রাখাইনের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে যাচাইয়ের ঘোষণা দিয়ে একটি আপাত নমনীয় কূটনৈতিক বার্তা দিয়েছে। প্রায় এক দশক ধরে স্থবির হয়ে থাকা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় এটি আলোচনার একটি প্রাথমিক সূত্র তৈরি করলেও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক ও অধিকারকর্মীরা এটিকে রাজনৈতিক চাল ও কার্যত অর্থহীন বলে মনে করছেন।

কারণ, মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ এখনও রোহিঙ্গাদের কোনও সুস্পষ্ট সাংবিধানিক নাগরিকত্বের নিশ্চয়তা দেয়নি এবং সামগ্রিক তালিকার প্রায় এক-চতুর্থাংশকে সরাসরি বাতিল বা বিতর্কিত করেছে। তদুপরি, যেসব এলাকায় রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর কথা বলা হচ্ছে, রাখাইনের সেই প্রায় ৯০ শতাংশ ভূখণ্ডের ওপর বর্তমানে জান্তা সরকারের কোনও কার্যকর সামরিক বা প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নেই; বরং অঞ্চলটি জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

জান্তা ও আরাকান আর্মির মধ্যকার চলমান তীব্র গৃহযুদ্ধ, আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়নের অভিযোগ এবং ‘নিরাপত্তা পরিস্থিতি অনুকূল হওয়া সাপেক্ষে’ প্রত্যাবাসনের অনির্দিষ্ট শর্তটি স্পষ্ট করে যে অদূর ভবিষ্যতে এই জনগোষ্ঠীর নিরাপদ ও স্বেচ্ছামূলক প্রত্যাবর্তনের বাস্তব কোনও পরিবেশ বিদ্যমান নেই।

এই জটিল ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জন্য দ্বিপাক্ষিক কূটনীতির পাশাপাশি রাখাইনের মাঠপর্যায়ের নিয়ন্ত্রক আরাকান আর্মির অবস্থান বিবেচনায় নেওয়া এবং চীনসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক অংশীজনের সঙ্গে বহুপাক্ষিক আলোচনা এগিয়ে নেওয়া অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি বাস্তুচ্যুতির ঝুঁকি সামনে রেখে বিশেষজ্ঞদের মত হলো, কেবল সাময়িক জরুরি ত্রাণের ওপর নির্ভর না করে আন্তর্জাতিক সহায়তা ঘাটতি মোকাবিলায় একটি সমন্বিত মধ্যমেয়াদি কৌশল গ্রহণ করতে হবে।

এর মধ্যে আশ্রয়শিবিরে বসবাসরত লাখ লাখ রোহিঙ্গার জন্য চলাচলের স্বাধীনতা, জীবিকা ও শিক্ষার বাস্তব সুযোগ বৃদ্ধি এবং একই সঙ্গে সীমান্তবর্তী স্থানীয় ক্ষতিগ্রস্ত বাংলাদেশি জনগোষ্ঠীর জীবনমান সুরক্ষা অন্তর্ভুক্ত। সামগ্রিকভাবে, মিয়ানমারের জান্তা সরকার আঞ্চলিক চাপ কমাতে যাচাইয়ের গতি বাড়ালেও নাগরিকত্ব, ভিটেমাটি ফেরত ও মৌলিক নিরাপত্তার পূর্ণ নিশ্চয়তা ছাড়া এ ঘোষণা প্রত্যাবাসনের দীর্ঘমেয়াদি সংকট নিরসনে কোনও স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করছে না।

প্রতি বছর ২৫ আগস্ট যখন বিশ্বজুড়ে রোহিঙ্গা গণহত্যা স্মরণ দিবস পালিত হয়, তখন বাংলাদেশের সমাজ ও জনপরিসরে তা কেবল একটি প্রথাগত আন্তর্জাতিক দিবস হিসেবে আসে না; এটি হয়ে ওঠে আমাদের জাতীয় বিবেক, মানবিক দায় ও ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতার এক গভীর পরীক্ষার মুহূর্ত।

২০১৭ সালের আগস্টে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর সুপরিকল্পিত ‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশন’ বা জাতিগত নিধনের মুখে প্রাণ বাঁচাতে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছিল লাখ লাখ রোহিঙ্গা। দীর্ঘ প্রায় এক দশক ধরে এ সংকট কেবল শরণার্থী ব্যবস্থাপনার আমলাতান্ত্রিক পরিসংখ্যানে আবদ্ধ থাকেনি; বরং তা জড়িয়ে পড়েছে বৈশ্বিক কূটনীতি, আইনি জবাবদিহি এবং আমাদের অভ্যন্তরীণ সামাজিক-রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে। ফলে একজন সচেতন নাগরিকের দায়িত্ব কেবল সাময়িক সহানুভূতি বা সামাজিক মাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। এর পেছনে থাকা কাঠামোগত নিপীড়ন, ইতিহাসের অস্বীকৃতি, আন্তর্জাতিক বিচারিক লড়াই এবং বাস্তুচ্যুত মানুষের নিজস্ব সত্তাকে অনুধাবন করাও জরুরি।

রোহিঙ্গা সংকটের গভীরতা বুঝতে হলে বাংলাদেশের নাগরিকদের প্রথমত মিয়ানমার রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি বর্ণবৈষম্য ও ইতিহাস মুছে ফেলার অপচেষ্টার স্বরূপ উন্মোচন করতে হবে। ইতিহাসের পাতা থেকে কোনও জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব মুছে ফেলার চেয়ে বড় অপরাধ আর হতে পারে না। মিয়ানমার জান্তা ও দেশটির উগ্র জাতীয়তাবাদী বলয় কয়েক দশক ধরে রোহিঙ্গাদের ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’ কিংবা ‘বাঙালি’ হিসেবে ট্যাগ দিয়ে তাদের ভূমি-অধিকার ও আত্মপরিচয় অস্বীকার করেছে।

এটি নিছক রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা নয়, বরং গণহত্যার একটি ক্লাসিক্যাল ধাপ; যাকে দার্শনিক ও ঐতিহাসিকেরা বলেন ‘স্মৃতির হত্যা’। কোনও জনগোষ্ঠীকে শারীরিকভাবে ধ্বংস করার আগে তার নাম, ভাষা, স্মৃতি ও ইতিহাসকে রাষ্ট্রীয়ভাবে অস্বীকার করা হয়। বাংলাদেশের নাগরিক সমাজের বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ের অন্যতম প্রধান জায়গাটি এখানেই। ২০১৭ সালের গণহত্যা, গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া, গণধর্ষণ ও বাস্তুচ্যুতির মৌখিক ইতিহাস এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য নথিবদ্ধ রাখা এবং বৈশ্বিক পরিসরে একে দ্ব্যর্থহীনভাবে ‘গণহত্যা’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে কণ্ঠস্বর জোরালো রাখা আমাদের নৈতিক দায়িত্বের অংশ।

একই সঙ্গে আমাদের অভ্যন্তরীণ জনপরিসরে গড়ে ওঠা একপাক্ষিক ও বিদ্বেষমূলক বয়ানের ফাঁদ সম্পর্কে সজাগ থাকা প্রয়োজন। আশ্রয়শিবিরে নানা ধরনের অপরাধ, মাদক চোরাচালান কিংবা অভ্যন্তরীণ কোন্দলের খবর যখন সংবাদমাধ্যমে আসে, তখন প্রায়শই পুরো জনগোষ্ঠীকে ঢালাওভাবে অপরাধী বা একমাত্র অর্থনৈতিক বোঝা হিসেবে চিত্রিত করার এক ধরনের জেনোফোবিক বা ‘অপরত্বায়ন’-এর রাজনীতি সক্রিয় হয়ে ওঠে।

একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে মনে রাখা জরুরি, কোনও নির্দিষ্ট জাতিগোষ্ঠী জন্মগতভাবে অপরাধপ্রবণ হয় না। দীর্ঘদিনের অধিকারহীনতা, তারের বেড়ায় ঘেরা বন্দিদশা, কর্মসংস্থান ও বৈধ আয়ের সম্পূর্ণ অনুপস্থিতি এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা যেকোনও মানবগোষ্ঠীর ভেতরেই বিশৃঙ্খলা ও অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির জন্ম দিতে পারে। দায় চাপানোর এই মনস্তত্ত্ব মূলত সংকটের মূল খলনায়ক; মিয়ানমার রাষ্ট্রের অপরাধকে আড়াল করে এবং ভুক্তভোগীকেই খলনায়ক বানানোর এক নির্মম প্রক্রিয়ায় রূপ নেয়। সমস্যার সমাধান বিদ্বেষ ছড়িয়ে বা বলপ্রয়োগের ভাষায় নয়, বরং আইনি, সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির পথেই খুঁজতে হবে।

প্রত্যাবাসনের প্রশ্নে ‘টেকসই’ ও ‘মর্যাদাপূর্ণ’ হওয়ার মৌলিক শর্তগুলো অনুধাবন করাও অপরিহার্য। কেবল লোকদেখানো আয়োজন বা জোরপূর্বক সীমান্ত পার করিয়ে দিলেই সংকট মিটে যায় না। যে রাখাইনে এখনও জাতিগত বিভাজন, নাগরিক অধিকারহীনতা এবং সামরিক জান্তা ও আরাকান আর্মির মধ্যকার সশস্ত্র সংঘাতের দাবানল জ্বলছে, সেখানে কার্যকর নিরাপত্তা ও সাংবিধানিক নিশ্চয়তা ছাড়া রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানো মানে তাদের পুনরায় মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া।

১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন সংস্কার, রোহিঙ্গাদের পূর্ণ জাতিগত স্বীকৃতি, দখলকৃত ভিটেমাটি ফেরত এবং জীবন-জীবিকার অধিকার নিশ্চিত করাই একটি স্থায়ী প্রত্যাবাসনের একমাত্র পথ; এই অবস্থানকে জাতীয় ও বৈশ্বিক আলোচনায় প্রধান এজেন্ডা হিসেবে টিকিয়ে রাখতে হবে। এর পাশাপাশি কক্সবাজার ও টেকনাফের স্থানীয় জনগণের প্রতি গভীর সংহতি প্রকাশ করাও দায়িত্বশীল নাগরিক চেতনার অংশ। 

স্থানীয় সম্প্রদায় এক দশক ধরে নিজেদের ভূমি, বন, ভূগর্ভস্থ পানি এবং সীমিত অবকাঠামোর ওপর বিপুল চাপ সহ্য করে এক অভূতপূর্ব মানবিক দায়িত্ব পালন করে আসছে। অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা ও পরিবেশগত এই বিপর্যয় কাটিয়ে তুলতে রাষ্ট্রের উন্নয়ন বরাদ্দের সুষম বণ্টন এবং আন্তর্জাতিক দাতা গোষ্ঠীগুলোর দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশ পুনরুদ্ধার কর্মসূচির প্রতি জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক ও মানসিক ক্ষতিকে অবমূল্যায়ন করে যেমন টেকসই সমাধান সম্ভব নয়, তেমনি এই ক্ষোভকে রোহিঙ্গাদের ওপর বিদ্বেষ হিসেবে রূপান্তর হতে দেওয়াও কাম্য নয়।

সর্বশেষে, আন্তর্জাতিক আইনি লড়াইয়ের পাশাপাশি আঞ্চলিক রিয়েলপলিটিকের বাস্তব চিত্রও বিবেচনায় রাখতে হবে। রাখাইনে চীনের গভীর সমুদ্রবন্দর ও অর্থনৈতিক করিডোরের স্বার্থ এবং ভারতের ‘কালাদান মাল্টি-মডাল ট্রানজিট প্রজেক্ট’ ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সীমান্ত নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। জান্তা ও আরাকান আর্মির ওপর এই দুই শক্তির প্রভাব কীভাবে প্রত্যাবাসন সমীকরণকে নিয়ন্ত্রণ করছে, সেই বিশ্লেষণও আমাদের মনে রাখা জরুরি।

২৫ আগস্ট তাই কেবল স্মরণ করার দিন নয়। এটি রোহিঙ্গাদের অধিকার, মর্যাদা ও নিরাপদ প্রত্যাবাসনের প্রশ্নে আমাদের দায় পুনর্বিবেচনার দিন। শোকের স্মৃতিকে যদি জবাবদিহির দাবি, মানবিক অবস্থান ও বাস্তব কূটনৈতিক উদ্যোগে রূপ দেওয়া না যায়, তাহলে স্মরণ দিবসও একসময় নিছক আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হবে।

লেখক: গবেষক ও মানবাধিকারকর্মী

/এপিএইচ/ইউএস/এমওএফ/
সম্পর্কিত
থামেনি অনুপ্রবেশ: রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ৩১০ হত্যা, উদ্বেগে স্থানীয়রা
৯ বছরে একজন রোহিঙ্গাও ফেরত যায়নি, ৮ হাজার একর বনভূমি ধ্বংস
প্রত্যাবাসনই রোহিঙ্গা সংকটের একমাত্র টেকসই সমাধান: প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা 
সর্বশেষ খবর
প্রধানমন্ত্রীর অনুপস্থিতিতে দায়িত্বে থাকবেন ৩ মন্ত্রী
প্রধানমন্ত্রীর অনুপস্থিতিতে দায়িত্বে থাকবেন ৩ মন্ত্রী
এক ফাঁড়ি থেকে একসঙ্গে ২৭ পুলিশকে প্রত্যাহার, কারণ কী?
এক ফাঁড়ি থেকে একসঙ্গে ২৭ পুলিশকে প্রত্যাহার, কারণ কী?
স্কুলে হিজাব পরার অধিকার চেয়ে রিট, খারিজ করে দিলেন ভারতের আদালত
স্কুলে হিজাব পরার অধিকার চেয়ে রিট, খারিজ করে দিলেন ভারতের আদালত
ব্লুটুথ নামটি এলো কোথা থেকে? নেপথ্যে হাজার বছরের পুরোনো গল্প!
ব্লুটুথ নামটি এলো কোথা থেকে? নেপথ্যে হাজার বছরের পুরোনো গল্প!
সর্বাধিক পঠিত
ঘুম থেকে তুলে ছেলেকে পুলিশের হাতে দিই, গায়ে ছিল গেঞ্জি: সিদ্ধার্থের বাবা
ঘুম থেকে তুলে ছেলেকে পুলিশের হাতে দিই, গায়ে ছিল গেঞ্জি: সিদ্ধার্থের বাবা
বরিশাল থেকে সব রুটে বাস চলাচল বন্ধ
বরিশাল থেকে সব রুটে বাস চলাচল বন্ধ
‘পরের বছর থেকে হবে না শর্তে ২৮ আগস্ট হচ্ছে নৌকাবাইচ’
‘পরের বছর থেকে হবে না শর্তে ২৮ আগস্ট হচ্ছে নৌকাবাইচ’
৪০ লাখের বেশি ইভি ফেরত নেওয়ার নির্দেশ
৪০ লাখের বেশি ইভি ফেরত নেওয়ার নির্দেশ
মানি এক্সচেঞ্জে ডলার কেনা-বেচার নতুন দর নির্ধারণ
মানি এক্সচেঞ্জে ডলার কেনা-বেচার নতুন দর নির্ধারণ