‘বাংলাদেশি ডেনিমের জন্য প্রয়োজন আরও গবেষণা’

মোস্তাফিজ উদ্দিনবর্তমানে বিশ্ববাজারে ডেনিম পণ্যের চাহিদা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। ডেনিম পণ্য উৎপাদনে বাংলাদেশ অন্যতম উৎস হওয়ায়, গবেষণায় আরও অগ্রগতি ও পৃষ্ঠপোষকতা দরকার। ডেনিম এক্সপার্ট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তাফিজ উদ্দিন এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন। সাক্ষাৎকারটি নিচে তুলে ধরা হলো-

বিশ্ববাজারে ডেনিম পোশাকের প্রসারে বাংলাদেশের প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো কী?

তৈরি পোশাক রফতানি বাজারে উন্নতি করার জন্য বাংলাদেশের অসাধারণ সুযোগ রয়েছে। সেখানে আমরা খুব দ্রুততার সঙ্গে উন্নতি করছি। ইতোমধ্যে ইউরোপের বাজারে ডেনিম পোশাকের জন্য বাংলাদেশ প্রধান রফতানিকারক দেশ হিসেবে কাজ করছে। আমেরিকাতেও আমরা রফতানিকারক হিসেবে প্রধান পাঁচটি দেশের মধ্যে রয়েছি। তবে বৈশ্বিক বাজারে আরও প্রসারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের কিছু চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। অবকাঠামোগত উন্নয়ন বাংলাদেশের প্রধান চ্যালেঞ্জ। এক্ষেত্রে উন্নয়নের জন্য সরকার অনেক কাজ করে যাচ্ছে। এছাড়া, বন্দরে অদক্ষতা, অপর্যাপ্ত রেল এবং সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা, গ্যাস এবং বিদ্যুৎ সংকট সমাধানসহ একটি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ বাংলাদেশের জন্য প্রধান চ্যালেঞ্জ। কাপড়ের জন্য বাইরের উৎসের ওপর নির্ভরশীল না হওয়াটাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। আমাদের এখনও প্রায় ৬০ শতাংশ ডেনিম কাপড় আমদানি করতে হয়। সেজন্য আমাদের গবেষণা, উন্নয়ন এবং উদ্ভাবনের ওপর আরও জোর দিতে হবে। তবে পোশাক রফতানিকারক দেশ হিসেবে বিশ্বকে দেওয়ার মতো অনেক কিছু আছে বাংলাদেশের। সবার আগে আমাদের দেশকে ব্র্যান্ড হিসেবে উপস্থাপন করতে হবে।
ক্রেতাদের আকর্ষণ করার জন্য মার্কেটিং ও ব্র্যান্ডিংয়ের গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। আপনি কি মনে করেন বাংলাদেশি পোশাক প্রস্তুতকারকরা তা সঠিকভাবে করতে পারছেন?
আমি শুরুতেই দেশকে ব্র্যান্ড হিসেবে উপস্থাপন করার কথা বলেছি। আসলে এই ক্ষেত্রে সরকার ও বাণিজ্য সংস্থাগুলোর দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি বলে আমি মনে করি। তবে আমাদের ফ্যাক্টরিগুলো যদি ভালো কাজের মাধ্যমে বিশ্বে নিজেদের উপস্থাপন করতে পারে তবে সেটা পশ্চিমাদের কাছে খুবই পজিটিভ একটি বার্তা হবে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, হাতেগোনা কয়েকটি ছাড়া আমাদের বেশিরভাগ ফ্যাক্টরিই তা করতে পারছে না। এমনকি তারা তাদের অজ্ঞতার কারণে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মেলায়ও নিজেদের উপস্থাপন করতে পারছে না। সত্যি কথা বলতে, আমাদের এই বিষয়ে আরও অনেক কাজ করতে হবে।
উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে পোশাকের ফ্যাশন শো কিভাবে সাহায্য করতে পারে? এটি কি ক্রেতাদের আকর্ষণ করতে সক্ষম? যদি সক্ষম হয়, তাহলে কিভাবে?
প্রচারের ক্ষেত্রে ফ্যাশন শো একটি অন্যতম মাধ্যম। যেমন ধরুন, ‘লন্ডন ফ্যাশন উইক’ এবং ‘প্যারিস ফ্যাশন উইক’ প্রচারের ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এমনকি নতুন নতুন ডিজাইন উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে তারা প্রতিনিয়তই প্রতিযোগিতার সৃষ্টি করছে। বর্তমানে তৈরি পোশাক রফতানিকারক দেশ হিসেবে বিশ্বে চীনের পরই বাংলাদেশের অবস্থান। কিন্তু আমাদের এখানে কোনও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন ‘ফ্যাশন শো’ হচ্ছে না; যেখানে আমরা আমাদের মান এবং যোগ্যতা প্রকাশ করতে পারবো।
বর্তমানে পোশাকশিল্পের চাহিদা বিবেচনা করে বাংলাদেশ ডেনিম এক্সপোর্ট লিমিটেড একটি আন্তর্জাতিক মানের ফ্যাশন শো এর আয়োজন করতে যাচ্ছে। ‘ডেনিম ইনোভেশন নাইট’ নামে ফ্যাশন শোতে বাংলাদেশের পোশাকের মান এবং যোগ্যতা তুলে ধরা হবে। আমি নিশ্চিত, এটি আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে অনেক সাহায্য করবে।
বাংলাদেশ ডেনিম এক্সপো কিভাবে সোর্সের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে সহায়তা করতে পারে? গত ছয়টি সংস্করণে বাংলাদেশ ডেনিম এক্সপো কী অর্জন করেছে?
২০১৪ সালের শুরু থেকে নিম এক্সপো বাংলাদেশ ডে, আন্তর্জাতিক ডেনিম ক্যালেন্ডারে অনেক বেশি প্রত্যাশিত একটি জায়গা হয়ে উঠেছে। বিশ্বব্যাপী প্রাইমারি ডেনিম স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে নিয়মিতভাবে একত্রিত হওয়ার একটি স্থান হয়ে উঠেছে। ডিজাইন উন্নয়নে ডেনিম নির্মাতারা বেশ ডেডিকেটেড, এতে খুব সহজেই বাংলাদেশ ডেনিম এক্সপো সোর্সের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশ ডেনিম এক্সপোর ছয়টি সংস্করণ ইতোমধ্যেই অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং সপ্তম সংস্করণটি আগামী বুধবার হবে। প্রত্যেকটি সংস্করণে বিশেষ করে টেকসই থেকে স্বচ্ছতা ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ডেনিম এক্সপো কার্যকরী অবস্থার উন্নতির জন্য সচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে সফলভাবে অবদান রেখেছে।


আপনি কি মনে করেন ইতোমধ্যেই বাংলাদেশ হাই এন্ড মার্কেটে প্রবেশ করেছে? মূল্য সংযোজন অথবা হায়ারএন্ড প্রোডাক্টের বাজারে কিভাবে অংশগ্রহণ করা যাবে?
বাংলাদেশ এখনও মৌলিক পোশাক পণ্য উৎপাদন করছে। মূল্য সংযোজন পণ্যের মধ্যে বিশেষ করে ডেনিম পণ্যগুলোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশের উন্নয়ন এবং উদ্ভাবনখাতে গবেষণায় আরও অগ্রগতি ও পৃষ্ঠপোষকতা দরকার। মধ্যম পর্যায়ের দক্ষ বাণিজ্য সংস্থাগুলোকে এবং ফ্যাশন বিশেষজ্ঞদের মূল্য সংযোজন পণ্যের ব্যবস্থা করে দিতে হবে। বর্তমানে প্রযুক্তিনির্ভর যুগে ভোক্তাদের চাহিদা খুব দ্রুতই পরিবর্তন হয়। সেজন্য আমাদের একটি রেগুলার প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে হবে যেন আমরা সবসময়ই বৈশ্বিক আধুনিক পোশাক চাহিদা পূরণ করতে পারি। ফ্যাশন শো, সেমিনার প্রভৃতি কার্যক্রম পোশাক প্রস্তুতকারকদের নতুন নতুন ডিজাইন করার ক্ষেত্রে জ্ঞান এবং অভিজ্ঞতা বাড়াতে পারে। সর্বোপরি, পুরো বিশ্বের সামনে দেশের একটি ইতিবাচক চিত্র সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

(ঢাকা ট্রিবিউন থেকে অনূদিত)

আরও পড়ুন:

বাংলাদেশি ডেনিমের জয়যাত্রা

তৈরি পোশাকশিল্প: চীনের পড়ন্ত বাণিজ্য কি ধরতে পারবে বাংলাদেশ