পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় নির্মিত কয়লাভিত্তিক বৃহৎ তাপ-বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য দীর্ঘমেয়াদে কয়লা সরবরাহের দরপত্র বেশ কয়েকবার বাতিল হয়েছে। বারবার দরপত্র বাতিল করায় কয়লার সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারছে না আরপিসিএল-নরিনকো ইন্টারন্যাশনাল কোম্পানি লিমিটেড (আরএনপিএল) কর্তৃপক্ষ। সর্বশেষ চতুর্থ দফা দরপত্র বাতিল করে আবার আহ্বানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। তাতে সিঙ্গাপুরভিত্তিক একটি কোম্পানি যোগ্য বিবেচিত হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা বাতিল হলো।
প্রসঙ্গত, চলতি বছরের এপ্রিলে বিদ্যুৎকেন্দ্রটির দুটি ইউনিট গ্রিডের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এবং পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করেছে। কিন্তু কয়লার অভাবে ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্রটি বর্তমানে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে।
এদিকে এই কেন্দ্র নির্মাণে মোট ২ দশমিক ৫৪ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে ১ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলার ঋণ রয়েছে চীনের। চুক্তি অনুযায়ী চলতি বছরের সেপ্টেম্বর থেকে এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের ঋণ পরিশোধ শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরুর আগেই বিপুল পরিমাণ ঋণ পরিশোধের বিষয়টি নিয়ে এরই মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এই কেন্দ্র ব্যবহার না করলেও বড় আকারের ক্যাপাসিটি পেমেন্ট পরিশোধ করতে হবে সরকারকে।
এদিকে বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ শামসুল আলম বলেন, ‘এটা সরকারের ব্যর্থতা। আরএনপিএলের কয়লার জন্য দরপত্র আহ্বান করেছে। তারাই আবার বাতিল করেছে। এই দায় তাদের। লোকসানের দায়ও তাদেরই নিতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘বারবার দরপত্র বাতিল করলে বিনিয়োগকারীরা যেমন উৎসাহ হারাবে তেমনি বিদ্যুৎ বিভাগের লোকসানও বাড়বে। অযোগ্য লোকের হাতে দিয়ে কোম্পানি গঠন করাই এর প্রধান কারণ।’
এই জ্বালানি বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হচ্ছে সেই লোকসানের দায় শেষ পর্যন্ত এসে বিদ্যুতের বাড়তি দাম হিসেবে জনগণের ঘাড়েই পড়বে। সুতরাং সরকারের উচিত এসব বিষয়ে আরও কঠোর মনিটরিং করা এবং কেন বারবার বাতিল করা হচ্ছে তা খতিয়ে দেখা।’
বিদ্যুৎ বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, এই কেন্দ্রের জন্য পাঁচ বছর মেয়াদি কয়লার সরবরাহকারী নিশ্চিত করতে কয়েকবার শর্ত শিথিল করে দরপত্র আহ্বান করা হয়। কিন্তু কারিগরি ও আর্থিক মূল্যায়ন সম্পন্ন হলেও সর্বশেষ চতুর্থ দফার চূড়ান্ত পর্যায়ে দরপত্রে ত্রুটি ও অনিয়মের অভিযোগে তদন্ত কমিটি করা হয়। কমিটি দরপত্র বাতিল করে দ্রুত নতুন দরপত্র আহ্বানের সুপারিশ করে।’
সুপারিশগুলো হলো
ভবিষ্যতে কয়লা ক্রয়ে টেকনিক্যাল স্পেসিফিকেশন, বিশেষ করে কয়লার ক্যালোরিফিক ভেল্যু (জিএআর), অ্যাশ ফিউশন টেম্পারেচার, কয়লার সাইজ দরপত্রে শর্তে এমনভাবে নির্ধারণ করতে হবে, যেন দরপত্র প্রক্রিয়ায় অবাধ, নিরপেক্ষ ও প্রতিযোগিতামূলক সুপারিশ করা হয়। আগামীতে কয়লা ক্রয়ের চুক্তির মেয়াদ পাঁচ বছরের পরিবর্তে দুই বছর করারও সুপারিশ করা হয়।
আরএনপিএল-এর এক কর্মকর্তা জানান, আরএনপিএলের ১ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলারের ঋণচুক্তি রয়েছে। ১৪ বছর মেয়াদি এই ঋণচুক্তির মধ্যে চার বছর গ্রেস পিরিয়ড। ২০২০ সালের ডিসেম্বরে এই ঋণচুক্তি হয়। চুক্তির শর্তে বলা হয়, প্রকল্প শেষ হওয়ার ছয় মাস পর থেকে ঋণ পরিশোধ শুরু হবে।
এই বিষয়ে বিদ্যুৎ উপদেষ্টা ফওজুল কবীর খান এবং বিদ্যুৎ সচিব ফারজানা মমতাজকে ফোন করলে তারা ব্যস্ত বলে লাইন কেটে দেন।