পাটের আঁশ দিয়ে তৈরি ‘সোনালি ব্যাগ’ আর বাজারে আসছে না। এই ব্যাগ তৈরির গবেষণা প্রকল্প বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। পরিবেশ রক্ষায় পলিথিনের বিকল্প হিসেবে একাধিকবার ব্যবহার করা যায় এমন ব্যাগ তৈরির লক্ষ্যে ‘সোনালি আঁশ’ নামে খ্যাত পাটের তৈরি পলিথিনের বিকল্প ‘সোনালি ব্যাগ’ তৈরি করা যায় কিনা তা গবেষণার জন্য প্রকল্প গ্রহণ করেছিল বিগত আওয়ামী লীগ সরকার। গবেষণায় দেখা গেছে প্রকল্পটি ফলপ্রসূ হচ্ছে না, তাই এটি বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয়ের সচিব বাংলা ট্রিবিউনকে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
জানা গেছে, পাটের পলিমার থেকে এক ধরনের ব্যাগ তৈরি করার জন্য গবেষণা চলছিল। ২০১৬ সালে পাট থেকে পলিথিনের বিকল্প তৈরি করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন প্রখ্যাত বিজ্ঞানী, পরমাণু শক্তি কমিশনের সাবেক মহাপরিচালক ও বাংলাদেশ জুট মিল করপোরেশনের বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টা ড. মোবারক আহমদ খান। পরে তাকে বিজেএমসির বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। ড. মোবারক আহমদ খানের এই আবিষ্কার দেশে-বিদেশে ব্যাপক আলোচিত হয়।
এই ব্যাগটি দেখতে প্রচলিত পলিথিনের মতোই। হালকা-পাতলা ও টেকসই, কিন্তু পাটের আঁশ দিয়ে তৈরি এই ব্যাগের নাম দেওয়া হয়েছিল ‘সোনালি ব্যাগ’। এতে ৫০ শতাংশের বেশি রয়েছে সেলুলোজ, যা পানিতে ভিজলে বা মাটিতে ফেললে দ্রুত পচে যাবে। ফেলে দেওয়ার পর মাত্র চার থেকে পাঁচ মাসেই পুরোপুরি মাটির সঙ্গে মিশে যাবে, পরিবেশের কোনও ক্ষতি না করেই। এটি পরিবেশ দূষণ করবে না। পলিথিনের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব বলে জানিয়েছিলেন মোবারক আহমদ খান।
পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, দীর্ঘদিন গবেষণার পর ‘সোনালি ব্যাগ’ নামে পরিচিত পাটের আঁশের তৈরি পলিথিনের ব্যাগ বাজারে আনা সম্ভব হয়নি। কারণ অনুসন্ধানে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় বুয়েটের শিক্ষক ও বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করে। কমিটি দীর্ঘদিন কাজ করে সম্প্রতি এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছে।
সেখানে বলা হয়েছে, পাটের আঁশ দিয়ে পলিথিনের ব্যাগ তৈরির লক্ষ্যে গবেষণা প্রকল্পটি ফলপ্রসূ হবে না। কারণ প্রতিটি ব্যাগের দাম পড়বে ২০ থেকে ২৪ টাকা। যা বাজারে সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়বে। ক্রেতারা এতো টাকা দাম দিয়ে এই ব্যাগ ব্যবহারে উৎসাহী হবেন না।
বিশেষজ্ঞ দলের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, এই ব্যাগ তৈরিতে ১৫ থেকে ১৬ প্রকার কেমিক্যাল ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রতিটি কেমিক্যালই মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর। মানুষের সুস্থতার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে এসব কেমিক্যাল দিয়ে তৈরি ব্যাগ বাজারে না ছাড়ার সুপারিশ করেছে বিশেষজ্ঞ দল। বিষয়টি সবার অগোচরে ছিল বলেও জানায় বিশেষজ্ঞ দল। এসব কারণে পাটের আঁশ দিয়ে ‘সোনালি ব্যাগ’ তৈরির গবেষণা প্রকল্পটি অবিলম্বে বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
পলিথিনের বিকল্প পচনশীল ‘সোনালি ব্যাগ’ তৈরির পাইলট প্রকল্পের উদ্বোধন করা হয় ২০১৭ সালের ১২ মে। রাজধানীর ডেমরায় লতিফ বাওয়ানী জুট মিলে ব্যাগ তৈরির প্ল্যান্ট স্থাপন করা হয়। বিভিন্ন পর্যায় পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত মেশিনের সাহায্যে পাটের সেলুলোজ থেকে শিট তৈরি করা হয়। এরপর হাতে সেলাই করে শিট জোড়া দিয়ে ব্যাগ উৎপাদন করা হয়। সীমিত পরিসরে উৎপাদিত সেই ব্যাগ বিক্রিও করছে বিজেএমসি। ২০১৮ সালের ২ অক্টোবর পাট থেকে সোনালি ব্যাগ বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনের জন্য যুক্তরাজ্যের কোম্পানি ফিউটামুরা কেমিক্যাল লিমিটেডের সঙ্গে বিজেএমসির একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হয়। পরে আর এ বিষয়ে অগ্রগতি হয়নি। তারপরও সোনালি ব্যাগ তৈরির কার্যক্রম স্তিমিত হয়নি। আগের মতোই চলছিল। ২০১৯ সালের ২৯ জানুয়ারি সেই সময়ের বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর জানিয়েছিলেন, যত দ্রুত সম্ভব পাট থেকে তৈরি ‘সোনালি ব্যাগ’ বাজারজাত করবে সরকার।
এ প্রসঙ্গে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আব্দুর রউফ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘পাটের আঁশ দিয়ে পলিথিনের মতো সোনালি ব্যাগ তৈরির গবেষণা প্রকল্পটি আর চালানো হবে না। এটি বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এর আগে আমরা একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি করেছিলাম, এই গবেষণা প্রকল্পটি ফলপ্রসূ হবে কিনা তা জানতে। কমিটি প্রতিবেদন দিয়ে বলেছে, এটি ফলপ্রসূ হবে না, কারণ এর উৎপাদন খরচ অনেক বেশি হবে। প্রতিটি ব্যাগের দাম পড়বে ২০ থেকে ২৫ টাকা। যা সাধারণত ক্রেতারা ব্যবহারে উৎসাহী হবেন না। অপরদিকে গবেষণায় এই ব্যাগ তৈরিতে ১৫ থেকে ১৬ প্রকারের রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার করা হচ্ছিল, এর প্রতিটি কেমিক্যাল মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। বিষয়টি আমাদের জানা ছিল না, জানানো হয়নি। জানতে পেরে সরকার গবেষণা প্রকল্পটি বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’
বস্ত্র ও পাট সচিব আরও বলেছেন, ‘এতকিছুর পরও আমি নিজে আগ্রহী ছিলাম যে, কোনোভাবে গবেষণা প্রকল্পটি চালিয়ে রাখা যায় কিনা? আমার এই আগ্রহের পরিপ্রেক্ষিতে বস্ত্র ও পাট উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দিন যুক্তি উপস্থাপনের জন্য বলেছিলেন। আমি যুক্তি উপস্থাপনে ফেল করেছি। ফাইনালি আমি তাকে বোঝাতে ব্যর্থ হয়েছি। তখন তিনি গবেষণা প্রকল্পটি বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।’
বাংলা ট্রিবিউনের এক প্রশ্নের জবাবে সচিব বলেন, ‘সব গবেষণা যে কার্যকর হবে বা সুফল বয়ে আনবে তেমনটি মনে করার কোনও কারণ নাই। সব গবেষণা ফলপ্রসূ নাও হতে পারে। গবেষণা ফলপ্রসূ না হলেই যে টাকা ফেরত আনতে হবে এমনটি হওয়া উচিৎ নয়।’ তিনি জানান, গবেষণায় দুই দফায় সর্বমোট ১৯ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে।
জানা গেছে, গঠনগত দিক থেকে পাট জটিল পলিমারের সমন্বয়ে গঠিত। যাতে প্রধানত সেলুলোজ ৭৫ শতাংশ, হেমিসেলুলোজ ১৫ শতাংশ এবং লিগনিন ১২ শতাংশ রয়েছে। এছাড়া স্বল্প পরিমাণে ফ্যাট, মোম, নাইট্টোজেনাস ম্যাটার, বিটাক্যারোটিন ও জ্যানথোফেলাস থাকায় পাটপণ্য পচনশীল ও পরিবেশবান্ধব।
উদ্ভাবনের পর ড. মুবারক আহমদ খান জানিয়েছিলেন, পচনশীল ও পরিবেশবান্ধব এ ব্যাগ পানিতে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা পর্যন্ত টিকে থাকে। তারপর ধীরে ধীরে গলতে শুরু করে। কোনও কেমিক্যাল এতে ব্যবহার না করায় পাঁচ থেকে ছয় মাসের মধ্যেই মাটিতে মিশে জমির উর্বরতা বৃদ্ধি করে। ফলে পরিবেশ দূষিত হবে না, সৃষ্টি করবে না জলাবদ্ধতা। বলা হয়েছিল, পানি নিরোধক এই পলিব্যাগের সেই সময়ে প্রতি কেজির দাম পড়বে ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা। বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন করে এ ব্যাগ বাজারজাত করা হলে এর দাম আরও কমবে।
পলিথিন ব্যাগের পরিবেশ বিপর্যয়কর নানামুখী প্রতিক্রিয়ার কারণে ২০০২ সালে উৎপাদন ও ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়। বদলে পাটের, কাগজের ও কাপড়ের ব্যাগ ব্যবহার করার কথা বলা হয়। বিকল্প ব্যাগের ব্যবহার তেমনভাবে বাড়েনি। পরিসংখ্যান বলছে, শুধু ঢাকা শহরেই প্রতিদিন ১ কোটি ৪০ লাখ পলিথিন ব্যাগ ব্যবহৃত হচ্ছে, যা এ শহরের জলাবদ্ধতার জন্য ৮০ ভাগ দায়ী।
সেদিক বিবেচনায় নিয়ে সংশ্লিষ্টরা মনে করেছিলেন, সোনালি ব্যাগের ব্যবহার বাড়াতে পারলে দেশে পাটের বহুমুখী ব্যবহার বাড়বে। দেশে পাটের চাহিদা বাড়বে। ফলে কৃষক এর ন্যায্যমূল্য পাবে। পাট যে বাংলার স্বর্ণসূত্র এর প্রমাণও মিলবে। এ কারণে সরকারিভাবে পাটের পলিব্যাগ উৎপাদনকে উৎসাহিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। এছাড়া বেসরকারি খাতেও এই প্রযুক্তি ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তৎকালীন সরকার। যাতে দেশে পাটের বহুমুখী ব্যবহার বাড়ে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিজ্ঞানী পরমাণু শক্তি কমিশনের সাবেক মহাপরিচালক ও বাংলাদেশ জুট মিল করপোরেশনের বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টা ড. মোবারক আহমদ খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গবেষণা প্রকল্পটি সরকার কেন বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে তা আমার কাছে এখনও পরিষ্কার নয়। সোনালি ব্যাগ উৎপাদনে কিছু কেমিক্যাল তো প্রয়োজন হতো। তবে সব যে মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর তা আমার বোধগম্য নয়।’