বাংলাদেশে বিনিয়োগ ও শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে শুল্কহার কমানোর পরামর্শ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। তবে শুল্ক কমানোর ক্ষেত্রে তাড়াহুড়ো না করে ধাপে ধাপে সংস্কারের তাগিদ দিয়েছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী নেতারা। তাদের আশঙ্কা, হঠাৎ শুল্ক কমানো হলে দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প ক্ষতির মুখে পড়তে পারে এবং কর্মসংস্থান কমে বেকারত্ব বাড়তে পারে।
মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর বনানীতে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ (পিআরআই) কার্যালয়ে পিআরআই ও বিশ্বব্যাংকের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ‘বাংলাদেশের বাণিজ্য নীতির সন্ধিক্ষণ: জাতীয় শুল্কনীতি, এলডিসি উত্তরণ ও আগামী প্রজন্মের বাণিজ্যচুক্তির প্রেক্ষাপট’ শীর্ষক সেমিনারে এসব কথা উঠে আসে।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিশ্বব্যাংকের অর্থনীতিবিদ নোরা ডিহেল। প্রবন্ধে বলা হয়, বাংলাদেশে গড় নামমাত্র শুল্কহার প্রায় ১৫ শতাংশ। তবে সম্পূরক শুল্ক, নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্কসহ বিভিন্ন ধরনের শুল্ক ও কর হিসাব করলে মোট শুল্কহার ২২ শতাংশের বেশি। এসব শুল্ক কমানো হলে স্বল্প মেয়াদে সরকারের রাজস্ব আয় কমতে পারে। তবে দীর্ঘ মেয়াদে এর সুফল পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, শুল্ক সংস্কারের মাধ্যমে দেশীয় শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব। একই সঙ্গে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্যচুক্তি (এফটিএ) করার পথও সহজ হবে। এর ফলে দীর্ঘ মেয়াদে অর্থনীতিতে অতিরিক্ত প্রায় ৪০০ কোটি ডলারের মূল্য সংযোজনের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে এই সম্ভাবনাকে উচ্চাভিলাষী হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদদের কেউ কেউ। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ফাহমিদা খাতুন বলেন, মুক্ত বাণিজ্য থেকে অতিরিক্ত ৪০০ কোটি ডলারের মূল্য সংযোজনের যে সম্ভাবনার কথা বলা হচ্ছে, তা উচ্চাভিলাষী। এই লক্ষ্য অর্জনে আগে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও সক্ষমতা তৈরি করতে হবে।
তিনি বলেন, শুধু শুল্ক কমালেই প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া যাবে না। দেশের শিল্প ও ব্যবসা খাতকে প্রতিযোগিতার জন্য প্রস্তুত করতে হবে। বিশেষ করে এলডিসি থেকে উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পণ্যকে টিকে থাকতে হলে প্রয়োজনীয় নীতি ও অবকাঠামোগত সক্ষমতা তৈরি করা জরুরি।
সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও বিভিন্ন দেশের অভ্যন্তরীণ শিল্প সুরক্ষার কারণে বিশ্বজুড়ে সংরক্ষণমূলক বাণিজ্যনীতি জোরদার হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশকে তাড়াহুড়ো করে শুল্ক কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। পরিস্থিতি বিবেচনা করে ধাপে ধাপে শুল্ক সংস্কার করতে হবে।
ব্যবসায়ী নেতারাও আকস্মিকভাবে শুল্ক কমানোর বিষয়ে সতর্ক করেছেন। মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এমসিসিআই) সভাপতি কামরান টি রহমান বলেন, শুল্ক কমানো হলে দেশের অনেক ক্ষুদ্র ও মাঝারি কারখানা প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে না পেরে বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এতে কর্মসংস্থান কমার পাশাপাশি বেকারত্ব বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তিনি বলেন, দেশের শিল্প খাতকে সুরক্ষা দেওয়ার বিষয়টিও শুল্ক সংস্কারের সময় বিবেচনায় নিতে হবে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের প্রস্তুতির সুযোগ না দিয়ে হঠাৎ করে শুল্ক কমানো হলে তাঁরা বড় ধরনের চাপের মুখে পড়তে পারেন।
পিআরআই চেয়ারম্যান জায়েদি সাত্তার বলেন, বাংলাদেশের মতো দেশের গড় শুল্কহার প্রায় ৭ শতাংশ হওয়া উচিত। কিন্তু বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের শুল্ক ও করের কারণে কার্যকর শুল্কহার অনেক বেশি। শুল্ক কমানো না হলে দেশের শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানো কঠিন হবে।
তিনি বলেন, এলডিসি উত্তরণের পর বাংলাদেশের সামনে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে প্রতিযোগিতা বাড়ানোর বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এ অবস্থায় শিল্পের দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর পাশাপাশি শুল্ক কাঠামোও সংস্কার করতে হবে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক মো. ফজলুল হক বলেন, এলডিসি উত্তরণ এবং মুক্ত বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। নতুন কোনো বাণিজ্যচুক্তি করার আগে তাদের মতামত নেওয়া এবং সম্ভাব্য প্রভাব মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
সেমিনারে বক্তারা বলেন, বাংলাদেশের শুল্ক কাঠামো সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। তবে এ সংস্কারের সঙ্গে সরকারের রাজস্ব আয়, দেশীয় শিল্পের সুরক্ষা, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতার বিষয়গুলোও বিবেচনায় নিতে হবে।
তাদের মতে, শুল্ক কমানোর ফলে আমদানি ব্যয় কমে বিনিয়োগ ও শিল্পের সক্ষমতা বাড়তে পারে। একই সঙ্গে রপ্তানি বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ার সুযোগ তৈরি হবে। তবে প্রস্তুতি ছাড়া দ্রুত শুল্ক কমানো হলে এর বিপরীত প্রভাবও পড়তে পারে। তাই এলডিসি উত্তরণকে সামনে রেখে একটি সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যনীতি প্রণয়ন এবং ধাপে ধাপে শুল্ক সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন সেমিনারের আলোচকেরা।