এবার তাহলে শেয়ারবাজার চাঙ্গা হবে?

বাংলাদেশের পুঁজিবাজার আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট চূড়ান্ত করার সময় সরকার শেয়ারবাজারের জন্য একগুচ্ছ কর-প্রণোদনা ঘোষণা করেছে। ব্যক্তি ও কোম্পানির লভ্যাংশ আয়ের ওপর কর কমানো, মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগের সীমা তুলে দেওয়া, তালিকাভুক্ত কোম্পানির জন্য অতিরিক্ত কর ছাড়, জিরো কুপন বন্ডের আয় করমুক্ত রাখা— এসব পদক্ষেপকে সাম্প্রতিক বছরগুলোর সবচেয়ে বড় কর-সহায়তা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। 

একই সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরও স্পষ্ট করে বলেছেন, দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য ব্যাংকনির্ভর অর্থায়ন কমিয়ে একটি শক্তিশালী ও গভীর পুঁজিবাজার গড়ে তুলতে হবে। বিদেশি বিনিয়োগ সহজ করতে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনাতেও পরিবর্তন আনা হয়েছে।  

এসব ইতিবাচক উদ্যোগের পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে— এবার কি সত্যিই শেয়ারবাজার চাঙ্গা হবে? নাকি অতীতের মতো এই আশাও বাস্তবতার মুখে ফিকে হয়ে যাবে? 

প্রত্যাশা ছিল, বাস্তবতা ভিন্ন 

বাংলাদেশের পুঁজিবাজার গত দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে আস্থার সংকটে ভুগছে। 

একসময় ধারণা ছিল, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ব্যাংক খাতের অনিয়ম, শেয়ারবাজার কারসাজি এবং প্রভাবশালী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণের কারণে বাজারে দীর্ঘমেয়াদি সংকট তৈরি হয়েছে। সে সময় অনেকের বিশ্বাস ছিল, সরকার পরিবর্তন হলেই পরিস্থিতির উন্নতি হবে।  

পরবর্তীকালে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও একই ধরনের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে বাজারে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যায়নি। বরং লেনদেন কমেছে, নতুন বিনিয়োগকারী আসেননি এবং সূচকের ওঠানামাও বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারেনি। 

এখন নির্বাচিত বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরও বাজারে কাঙ্ক্ষিত গতি না ফেরায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে— সমস্যা কি শুধু সরকারের, নাকি পুঁজিবাজারের সংকট আরও গভীরে? 

বাজেটে এলো বড় প্রণোদনা 

এই বাস্তবতায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী অর্থ বিলে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনী এনেছেন।  

সবচেয়ে আলোচিত সিদ্ধান্ত হলো ব্যক্তি বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ আয়ের ওপর করহার কমিয়ে ১৫ শতাংশ নির্ধারণ করা। আগে একজন ব্যক্তির করস্তর অনুযায়ী অতিরিক্ত কর দিতে হতো। ফলে অনেক বিনিয়োগকারী নগদ লভ্যাংশ পাওয়ার আগেই শেয়ার বিক্রি করে দিতেন। নতুন ব্যবস্থায় উৎসে ১৫ শতাংশ কর কেটে নেওয়ার পর সেটিকেই চূড়ান্ত কর হিসেবে গণ্য করা হবে। ফলে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে আগ্রহ বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। 

কোম্পানির ক্ষেত্রেও লভ্যাংশ আয়ের ওপর ২০ শতাংশ করকে আবার চূড়ান্ত কর হিসেবে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। বাজেটে প্রথমে এই সুবিধা তুলে নেওয়ার প্রস্তাব থাকলেও পরে তা সংশোধন করা হয়েছে। 

মিউচুয়াল ফান্ডে নতুন সুযোগ 

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হলো মিউচুয়াল ফান্ডে কর রেয়াত পাওয়ার জন্য বিদ্যমান পাঁচ লাখ টাকার বিনিয়োগসীমা তুলে দেওয়া।  

এতদিন শেয়ারে যেকোনও পরিমাণ বিনিয়োগে কর রেয়াত মিললেও মিউচুয়াল ফান্ডে সীমাবদ্ধতা ছিল। নতুন সিদ্ধান্তে বড় বিনিয়োগকারী এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা আরও বেশি অর্থ মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগে উৎসাহিত হতে পারেন।  

বিশ্লেষকদের মতে, এর ফলে বাজারে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীল তহবিলের প্রবাহ বাড়বে। 

তালিকাভুক্ত কোম্পানির জন্য বাড়তি কর ছাড় 

সরকার আরও ঘোষণা দিয়েছে, শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিকে অতিরিক্ত কর ছাড় দেওয়া হবে।  

যেসব কোম্পানি আইপিও, ডাইরেক্ট লিস্টিং, রাইট ইস্যু অথবা রিপিট পাবলিক অফারের মাধ্যমে অন্তত ১০ শতাংশ শেয়ার সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য উন্মুক্ত করবে, তারা অতিরিক্ত কর সুবিধা পাবে।  

পাশাপাশি সব ধরনের লেনদেন ব্যাংকিং চ্যানেলে সম্পন্ন করা কোম্পানির জন্যও অতিরিক্ত কর ছাড় রাখা হয়েছে। 

নীতিনির্ধারকদের আশা, এতে বড় ও ভালো কোম্পানিগুলো শেয়ারবাজারে আসতে আগ্রহী হবে। 

বন্ড বাজারেও নতুন বার্তা  

অর্থমন্ত্রী জিরো কুপন বন্ডের আয় সম্পূর্ণ করমুক্ত রাখার প্রস্তাব দিয়েছেন। 

এটি কার্যকর হলে দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো অর্থায়নের নতুন সুযোগ তৈরি হবে এবং বাংলাদেশের বন্ডবাজার আরও শক্তিশালী হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। 

গভর্নরের বার্তা— ব্যাংকের বিকল্প হতে হবে পুঁজিবাজার 

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরও এবার স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন। 

তার মতে, দেশের বেসরকারি খাতের অর্থায়ন শুধু ব্যাংকের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। একটি শক্তিশালী ও গভীর পুঁজিবাজার ছাড়া টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সম্ভব নয়। 

তিনি আশা প্রকাশ করেছেন, আগামী কয়েক বছরে বাজার মূলধন ধারাবাহিকভাবে বাড়ানো সম্ভব হবে। 

একই সঙ্গে বিদেশি পোর্টফোলিও বিনিয়োগকারীদের জন্য অর্থ প্রত্যাবাসনের প্রক্রিয়াও সহজ করা হয়েছে। 

তাহলে বাজার কেন চাঙ্গা হচ্ছে না? 

প্রশ্ন হলো, এত উদ্যোগের পরও বাজারে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসছে না কেন? 

বিশেষজ্ঞদের মতে, এর উত্তর একটাই— আস্থার সংকট। 

২০১০ সালের ধসের পর আজ পর্যন্ত কারসাজির বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির সংখ্যা খুবই কম। 

বাজারে এখনও দুর্বল কোম্পানির আধিক্য রয়েছে। 

অনেক কোম্পানির উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ, আবার কিছু কোম্পানি বছরের পর বছর লোকসানে থেকেও তালিকাভুক্ত রয়েছে। 

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ সম্প্রতি একাধিক ঝুঁকিপূর্ণ কোম্পানির তালিকা প্রকাশ করেছে। এতে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। 

হারিয়ে গেছে লাখো বিনিয়োগকারী  

সিডিবিএলের তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ সালে বিও হিসাব ছিল প্রায় ৩৪ লাখ। বর্তমানে সক্রিয় হিসাব নেমে এসেছে প্রায় ১৬ লাখে। অর্থাৎ প্রায় ১৭ লাখ বিনিয়োগকারী গত দেড় দশকে বাজার ছেড়ে গেছেন। 

এটি শুধু সংখ্যার হিসাব নয়; এটি বাজারের প্রতি মানুষের আস্থারও প্রতিফলন। 

নতুন কোম্পানি ছাড়া বাজার বড় হবে না 

বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতার একটি হলো মানসম্মত নতুন কোম্পানির অভাব।  

বড় শিল্পগোষ্ঠী, বহুজাতিক কোম্পানি এবং লাভজনক রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশই এখনও শেয়ারবাজারের বাইরে।  

ফলে একই কোম্পানির শেয়ার নিয়েই বাজার ঘুরপাক খাচ্ছে। 

নতুন কোম্পানি না এলে বাজারে গভীরতা তৈরি হবে না, লেনদেনও বাড়বে না। 

শুধু কর ছাড়ে কি সমাধান? 

অর্থনীতিবিদদের মতে, কর-প্রণোদনা অবশ্যই ইতিবাচক পদক্ষেপ। এতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ কিছুটা বাড়তে পারে। কিন্তু শুধু কর সুবিধা দিয়ে আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। 

কারসাজিকারীদের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার, দুর্বল কোম্পানির সংস্কার, স্বচ্ছ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা, নীতির ধারাবাহিকতা এবং বড় কোম্পানির তালিকাভুক্তি— এসব একসঙ্গে বাস্তবায়ন করতে হবে। 

নতুন কমিশনের সামনে বড় পরীক্ষা 

বিএসইসির নতুন চেয়ারম্যান মাসুদ খান ইতোমধ্যে রিয়েল-টাইম নজরদারি, কারসাজির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং বাজার সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।  

কিন্তু বিনিয়োগকারীরা এখন আর প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তব ফল দেখতে চান। কারণ অতীতেও একাধিকবার একই ধরনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। 

সামনে কী? 

বর্তমান সরকার, অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং বিএসইসি— চারটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের বক্তব্যে এবার একটি অভিন্ন বার্তা স্পষ্ট হয়েছে— বাংলাদেশের অর্থনীতির ভবিষ্যতের জন্য শক্তিশালী পুঁজিবাজার গড়ে তোলা জরুরি।  

সেই লক্ষ্যেই কর প্রণোদনা, বিদেশি বিনিয়োগ সহজীকরণ, তালিকাভুক্তি উৎসাহিত করা এবং বন্ডবাজার সম্প্রসারণের মতো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। 

তবে ইতিহাস বলছে, বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে সবচেয়ে বড় সংকট নীতির নয়, বাস্তবায়নের। 

যদি ঘোষিত সংস্কার বাস্তবে কার্যকর হয়, বড় ও মানসম্মত কোম্পানি বাজারে আসে, কারসাজির বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হয় এবং বিনিয়োগকারীরা ন্যায়সঙ্গত পরিবেশ পান, তাহলে দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে বাজার ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াতে পারে। 

কিন্তু যদি এসব উদ্যোগ কেবল বাজেট বক্তৃতা কিংবা নীতিপত্রেই সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে কর-প্রণোদনার ইতিবাচক প্রভাবও দীর্ঘস্থায়ী হবে না। 

সুতরাং এখন পুরো বাজারের দৃষ্টি একটি জায়গাতেই— সরকারের ঘোষণা কত দ্রুত বাস্তবে রূপ নেয়। কারণ শেয়ারবাজারে আস্থা ফিরলে শুধু বিনিয়োগকারীরাই লাভবান হবেন না; দেশের শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও নতুন গতি পাবে।