থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককের কুইন সিরিকিট ন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টারে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের ২০২৬ সালের বার্ষিক সম্মেলন উপলক্ষে অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘সিভিল সোসাইটি টাউনহল’। সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে এই বিশেষ মতবিনিময় সভায় অংশ নেন বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট অজয় বান। তিনি উপস্থিত ও অনলাইন অংশগ্রহণকারীদের প্রশ্নের জবাব দেন এবং প্রতিষ্ঠানের সাম্প্রতিক নীতি ও উন্নয়ন উদ্যোগের হালনাগাদ তথ্য তুলে ধরেন।
শীর্ষ নেতৃত্বের উপস্থিতি
সুশীল সমাজের সঙ্গে অজয় বানের এটি চতুর্থ টাউনহল। অনুষ্ঠানে তার সঙ্গে ছিলেন বিশ্বব্যাংক গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালকরা। এর মধ্যে রয়েছেন ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান জ্ঞান কর্মকর্তা পাসকাল ডোনোহো, অপারেশনস বিভাগের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আন্না বিয়ের্দে, আইএফসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাখতার দিওপ এবং মিগার (এমআইজিএ) ব্যবস্থাপনা পরিচালক সুতোমু ইয়ামামোতো। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সুশীল সমাজ সম্পৃক্তকরণ বিভাগের প্রধান রোজ কিমেউ ক্রেগ।
আয়োজকদের মতে, শীর্ষ ব্যবস্থাপনার এমন উপস্থিতি সুশীল সমাজের প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়া ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রতি সংস্থার অঙ্গীকারের প্রতিফলন।
সরাসরি ও অনলাইনে অংশগ্রহণ
কনভেনশন সেন্টারে উপস্থিত প্রতিনিধিদের পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে অনলাইনে যুক্ত হন বিপুলসংখ্যক দর্শক ও ভার্চুয়াল প্রতিনিধি। সভাকক্ষ থেকে যেমন সরাসরি প্রশ্ন করার সুযোগ ছিল, তেমনি অনলাইনে আসা প্রশ্নেরও উত্তর দেন বিশ্বব্যাংক প্রধান ও তার সহকর্মীরা।
অনলাইন চ্যাটে আফ্রিকা, ল্যাটিন আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশের নাগরিক সংগঠন, উদ্যোক্তা, শিক্ষাবিদ ও সাংবাদিক প্রশ্ন ও প্রস্তাব পাঠান। ইংরেজির পাশাপাশি ফরাসি, স্প্যানিশ ও আরবি ভাষায়ও বহু প্রশ্ন আসে।
কর্মসংস্থান, প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগে জোর
১২ থেকে ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত চলবে এবারের বার্ষিক সম্মেলন। এতে কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ, প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের বাস্তবসম্মত সমাধান নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। টাউনহলেও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বিনিয়োগ বাড়ানোর কৌশল নিয়ে আলোচনা হয়।
অজয় বান বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে উন্নয়নশীল ও নিম্ন আয়ের দেশগুলোর জন্য টেকসই প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
দারিদ্র্য বিমোচন ও বাসযোগ্য পৃথিবীর অঙ্গীকার
বৈঠকে বিশ্বব্যাংক গ্রুপের মূল লক্ষ্য—দারিদ্র্য নিরসন, সমৃদ্ধির সুষম বণ্টন এবং একটি বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ে তোলা—পুনর্ব্যক্ত করা হয়। অজয় বান জানান, নিম্ন আয়ের দেশগুলোর জন্য অর্থায়ন ও উন্নয়নবিষয়ক জ্ঞানের সবচেয়ে বড় বৈশ্বিক উৎস হিসেবে বিশ্বব্যাংক নিজের ভূমিকা আরও জোরদার করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
উদ্বেগ ও প্রশ্নের ঝলক
নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বিশ্বব্যাংকের উন্নয়ন কর্মসূচি ও বৈশ্বিক অসমতা কমানোর কৌশল নিয়ে নিজেদের উদ্বেগ ও সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব তুলে ধরেন। আলোচনায় উঠে আসা কয়েকটি উল্লেখযোগ্য বিষয়:
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই): আর্জেন্টিনা, ইথিওপিয়া ও তানজানিয়ার প্রতিনিধিরা এআই প্রযুক্তি ক্ষুদ্র কৃষকদের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর শুধু ভোক্তা নয়, প্রযুক্তি উন্নয়নের অংশীদার হওয়ার উপায় জানতে চান। জবাবে বিশ্বব্যাংকের ‘অ্যাগ্রিকানেক্ট’ উদ্যোগ ও ডিজিটাল অবকাঠামো কর্মসূচির কথা উল্লেখ করা হয়।
জ্বালানি: নাইজারে জ্বালানির সংকট ও পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে প্রশ্ন আসে। এ প্রসঙ্গে আফ্রিকার বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় বিশ্বব্যাংকের ‘মিশন ৩০০’ কর্মসূচির তথ্য দেওয়া হয়।
যুব উদ্যোক্তা ও কর্মসংস্থান: আফ্রিকার তরুণ উদ্যোক্তারা প্রশ্ন তোলেন, দীর্ঘদিন ধরে কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগের কথা বলা হলেও তার সুফল তাঁরা কেন অনুভব করছেন না।
নাগরিক সংগঠনের ভূমিকা: লিবিয়া, প্যারাগুয়ে, নাইজেরিয়া ও অন্যান্য দেশের প্রতিনিধিরা উন্নয়ন প্রকল্পের নকশা, বাস্তবায়ন ও পর্যবেক্ষণে স্থানীয় সংগঠনগুলোকে সরাসরি যুক্ত করা, তহবিল ও সক্ষমতা বৃদ্ধির সুযোগ নিয়ে প্রশ্ন করেন।
স্বাস্থ্য ও নারী-কিশোরী: কঙ্গোর কিনশাসার এক শিক্ষার্থী প্রত্যন্ত এলাকার স্কুলে জরায়ুমুখ ক্যানসার ও মাসিককালীন স্বাস্থ্যবিধি সচেতনতা কার্যক্রমে সহায়তা চান। নাইজেরিয়ার নারী ও কিশোরী উন্নয়ন সংগঠনের এক নেত্রী গবেষণা ও নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে সহযোগিতার আহ্বান জানান।
আদিবাসী জনগোষ্ঠী: আদিবাসী সম্প্রদায়ের এক প্রতিনিধি টেকসই উন্নয়ন এজেন্ডা ২০৩০-এ আদিবাসীদের কণ্ঠস্বর কার্যকরভাবে অন্তর্ভুক্তির দাবি জানান।
সমবায় ও গ্রামীণ উন্নয়ন: ল্যাটিন আমেরিকার আঞ্চলিক কৌশলে সমবায় মডেলকে স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করার প্রশ্ন ওঠে। তিউনিসিয়ার একজন প্রতিনিধি পিছিয়ে পড়া এলাকার গ্রামীণ উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থায়নের সুযোগ জানতে চান।
বাংলাদেশের প্রসঙ্গ
বাংলাদেশের একজন সাংবাদিক অজয় বানের কাছে জানতে চান, বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে বিশ্বব্যাংকের আর্থিক সহায়তা কীভাবে নিশ্চিত করবে যে তা কর্মসংস্থান বাড়াবে, বৈষম্য কমাবে এবং সাধারণ মানুষের বাস্তব উপকারে আসবে—সরকারি ঋণের চাপ ও জীবনযাত্রার ব্যয় না বাড়িয়ে। একই প্রতিনিধি আরেক প্রশ্নে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা কাটানো, সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি জনআস্থা ফেরানোর ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংকের সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ জানতে চান। জবাবে চ্যাটে বাংলাদেশে বিশ্বব্যাংকের কার্যক্রম-সংক্রান্ত তথ্যসূত্র দেওয়া হয়।
সুশীল সমাজের সুপারিশকে স্বাগত
অজয় বান সুশীল সমাজের মতামতকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বাস্তব সংকট মোকাবিলায় নাগরিক সংগঠনগুলোর সুপারিশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
অনুষ্ঠানের সমাপনীতে আয়োজকেরা অংশগ্রহণকারীদের ধন্যবাদ জানান এবং চলতি সপ্তাহে অনুষ্ঠেয় ‘সিভিল সোসাইটি পলিসি ফোরাম’-এ সরাসরি বা অনলাইনে যুক্ত হওয়ার আমন্ত্রণ জানান।