টাকার অবমূল্যায়নের বিপক্ষে এফবিসিসিআই

ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নের বিরোধিতা করেছে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফবিসিসিআই)। সংগঠনটির নেতারা বলেছেন, মুদ্রার মান কমানো হলে তা সরাসরি মূল্যস্ফীতিকে উসকে দেবে এবং অর্থনীতিতে খরচের চাপ আরও বাড়াবে।

সোমবার (৬ এপ্রিল) বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানের সঙ্গে বৈঠকে এফবিসিসিআই প্রশাসক আবদুর রহিম খানের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল এসব মতামত তুলে ধরে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে সকাল ১১টায় অনুষ্ঠিত বৈঠকে শিল্প ও রপ্তানি খাতের বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

বৈঠকে এফবিসিসিআই জানায়, বর্তমান বৈশ্বিক ও দেশীয় অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে শিল্প ও বিনিয়োগ টিকিয়ে রাখতে নীতিগত সহায়তা জরুরি হয়ে পড়েছে। ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা, জ্বালানি ও কাঁচামালের উচ্চমূল্য এবং পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে শিল্প খাতের উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ায় রফতানিকারকরাও বাড়তি চাপের মুখে পড়েছেন।

এ প্রেক্ষাপটে ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরাতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানায় সংগঠনটি। এফবিসিসিআইয়ের মতে, অতীতে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার হওয়ায় দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে।

সুদের হার প্রসঙ্গে সংগঠনটি বলেছে, বিনিয়োগ ও শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখতে সুদের হার স্থিতিশীল রাখা জরুরি। পাশাপাশি ধাপে ধাপে সুদের হার এক অঙ্কে নামিয়ে আনার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে।

ডলার সংকট মোকাবিলায় বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখার ওপর জোর দেন ব্যবসায়ীরা। একইসঙ্গে ওভার-ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে ডলার অপব্যবহার ঠেকাতে বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যের মধ্যে সমন্বয় আনার সুপারিশ করা হয়।

ক্ষতিগ্রস্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য সহজ শর্তে ঋণ, পুনঃতফশিলকরণ এবং প্রণোদনা প্যাকেজ কার্যকর করার দাবি জানানো হয় বৈঠকে। বিশেষ করে ঋণ পুনঃতফশিলের সময়সীমা তিন মাস থেকে বাড়িয়ে ছয় মাস করার প্রস্তাব দেয় এফবিসিসিআই।

বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে যাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করে সংগঠনটি জানায়, সরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি তুলনামূলক বেশি থাকায় উৎপাদন খাত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ অবস্থায় বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরা হয়।

খেলাপি ঋণ কমাতে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি অনিচ্ছাকৃত খেলাপিদের জন্য পুনর্বাসনমূলক নীতি সহায়তার প্রস্তাব দেওয়া হয়। তবে ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর জোর দেয় ব্যবসায়ী নেতারা।

প্রবাসী আয়ের প্রবাহ বাড়াতে বিদ্যমান প্রণোদনা অব্যাহত রাখা এবং বিদেশগামী শ্রমিকদের সহজ শর্তে ঋণ দেওয়ার সুপারিশও করা হয় বৈঠকে। একই সঙ্গে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) এবং নারী উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যাংকিং সুবিধা সম্প্রসারণের দাবি জানানো হয়।

শিল্প খাতের ব্যাংকিং সমস্যার দ্রুত সমাধানে বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ডেপুটি গভর্নরের নেতৃত্বে একটি বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে এফবিসিসিআই। পাশাপাশি জ্বালানি ব্যয় কমাতে সোলারসহ গ্রিন এনার্জি খাতে স্বল্পসুদের ঋণ, একক ঋণসীমা ১৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করা এবং রপ্তানিমুখী খাতের জন্য রপ্তানি উন্নয়ন তহবিল (ইডিএফ) সম্প্রসারণের সুপারিশ করা হয়।

ব্যবসায়ী নেতারা আশা প্রকাশ করেন, এসব প্রস্তাব বাস্তবায়ন করা হলে বিদ্যমান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মধ্যেও দেশের বিনিয়োগ ও উৎপাদনের গতি ধরে রাখা সম্ভব হবে।