নতুন করে করের বোঝা বাড়বে না: বাণিজ্যমন্ত্রী 

আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ব্যবসায়ীদের ওপর নতুন করে করের বোঝা বাড়ানো হবে না বলে আশ্বস্ত করেছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মোক্তাদির। তিনি বলেন, “বেসরকারি খাতের বিকাশে সরকার নিবিড়ভাবে কাজ করছে এবং ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় কমাতে নীতি সহায়তা জোরদার করা হবে।” 

সোমবার (১৩ এপ্রিল) রাজধানীর ইন্টারকন্টিনেন্টাল ঢাকার বলরুমে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত ‘প্রাক-বাজেট আলোচনা ২০২৬-২৭: বেসরকারি খাতের প্রত্যাশা’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে সহযোগিতা করে চ্যানেল ২৪ ও সমকাল। 

মন্ত্রী বলেন, “পূর্ববর্তী সময়ের কিছু উচ্চাভিলাষী প্রকল্পের কারণে সরকারের ওপর আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে, তবে তা কাটিয়ে উঠতে কার্যক্রম চলমান রয়েছে।” তিনি উল্লেখ করেন, “দেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রায় ৪৬০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছালেও এখনও বিপুল জনগোষ্ঠী দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে। এ বাস্তবতায় করদাতার সংখ্যা বাড়ানো জরুরি হলেও বিদ্যমান ব্যবসায়ীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ দেওয়া হবে না।” 

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ। স্বাগত বক্তব্যে তিনি কর ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, করজাল সম্প্রসারণ ও রাজস্ব আহরণ পদ্ধতির স্বয়ংক্রিয়করণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি করমুক্ত আয়সীমা ৫ লাখ টাকা নির্ধারণ, সর্বোচ্চ করহার ২৫ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং নন-লিস্টেড কোম্পানির করহারও ২৫ শতাংশ করার প্রস্তাব দেন। পাশাপাশি অগ্রিম ভ্যাট প্রত্যাহার, নীতি সুদহার যৌক্তিকীকরণ এবং উৎপাদনমুখী খাতে পুনঃঅর্থায়ন বাড়ানোর আহ্বান জানান। 

তিনি আরও বলেন, “টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, পণ্যের বহুমুখীকরণ এবং নতুন রফতানি বাজার অনুসন্ধান জরুরি। এছাড়া অবকাঠামো উন্নয়ন, বিশেষ করে পরিবহন ও লজিস্টিক নেটওয়ার্ক আধুনিকায়ন এবং ইনফ্রাস্ট্রাকচার বন্ড চালুর প্রস্তাব দেন। 

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে মাহবুবুর রহমান বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে জিডিপিতে করের অবদান বাড়ানোর কথা বলা হলেও বাস্তবায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। উচ্চ সুদহার, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ কমে যাওয়া এবং জ্বালানি সংকট বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।” তিনি বিকল্প জ্বালানি উৎস অনুসন্ধান এবং নীতি পরিবেশ স্থিতিশীল করার ওপর জোর দেন। 

পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য ড. মনজুর হোসনে বলেন, “বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ। এজন্য ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোগ (এমএসএমই) খাতকে আরও সহায়তা দেওয়া এবং গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন।” 

আলোচনার বিভিন্ন সেশনে অংশ নিয়ে ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা বলেন, কর ব্যবস্থার জটিলতা কমানো, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং আর্থিক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা জরুরি। রিজওয়ান রাহমান বলেন, কর প্রশাসনের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও হয়রানি বেসরকারি খাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। অন্যদিকে হোসেন খালেদ প্রস্তাব দেন, কর আহরণ পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয় করতে ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যেতে পারে।

জ্বালানি খাত নিয়ে ডেভিড হাসানাত বলেন, দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পিত এলএনজি অবকাঠামো বাস্তবায়ন না হওয়ায় সংকট বাড়ছে। তিনি এ খাতে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের ওপর জোর দেন। একই সঙ্গে ইমরান করিম পুঁজিবাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান। 

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. আকন্দ মোহাম্মদ আখতার হোসাইন কর্মসংস্থান বাড়াতে বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত নীতি প্রয়োগের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। 

আলোচনায় আরও অংশ নেন বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতা, ব্যাংকার, গবেষক ও নীতিনির্ধারকরা। তারা এলডিসি উত্তরণ প্রক্রিয়া বাস্তবতার আলোকে পুনর্বিবেচনা, একক ভ্যাট হার নির্ধারণ, সুদহার হ্রাস, স্থিতিশীল বিনিময় হার নিশ্চিতকরণ এবং শক্তিশালী বন্ড বাজার গড়ে তোলার দাবি জানান। 

অনুষ্ঠানে সরকারি-বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিদের পাশাপাশি অর্থনীতিবিদ, গবেষক এবং গণমাধ্যমকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।