দুই বছরের বেশি সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, নিত্যপণ্যের লাগামহীন দাম, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যয়ের চাপ, পরিবহন খরচ বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে উঠেছিল। এমন এক বাস্তবতায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে জনগণের জন্য একগুচ্ছ স্বস্তির উদ্যোগের ঘোষণা দিয়েছে সরকার। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে কর কমানো, কৃষি উৎপাদনে প্রণোদনা, প্রবীণ নাগরিকদের জন্য বিশেষ সুবিধা, শিক্ষাঋণ, স্টার্টআপ সহায়তা এবং ডিজিটাল সেবার সম্প্রসারণ— সব মিলিয়ে এবারের বাজেটে জনজীবনের ব্যয় কমানো এবং অর্থনীতিতে ইতিবাচক বার্তা দেওয়ার চেষ্টা স্পষ্ট।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বাজেট বক্তৃতায় বলেছেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোই সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। সেই লক্ষ্য সামনে রেখেই বিভিন্ন খাতে কর ও শুল্ক ছাড় দেওয়া হয়েছে।
নিত্যপণ্যে সবচেয়ে বড় স্বস্তি
বাজেটের সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে করের বোঝা কমানো। ধান, চাল, গম, আটা, ভোজ্যতেল, চিনি, মাছ, মাংস, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, লবণসহ প্রায় ৬০টি কৃষি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উৎসে কর কমিয়ে ০.৫ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে।
এতদিন এসব পণ্যের ওপর ১ শতাংশ, ২ শতাংশ কিংবা ৫ শতাংশ পর্যন্ত উৎসে কর দিতে হতো। নতুন প্রস্তাবে আমদানি ও বাজারজাতকরণ পর্যায়ে করের চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে। ফলে উৎপাদক, আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীদের খরচ কমবে। সরকারের প্রত্যাশা, এর সুফল শেষ পর্যন্ত ভোক্তার কাছেও পৌঁছাবে।
বিশেষ করে চাল, আটা, ভোজ্যতেল ও চিনির মতো পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন ব্যয়ের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। এসব পণ্যের কর কমানোর ফলে বাজারে মূল্য স্থিতিশীল রাখার সুযোগ তৈরি হবে।
মসলার বাজারে বড় সুবিধা
কর ছাড়ের বিচারে সবচেয়ে বেশি সুবিধা পেয়েছে মসলাজাতীয় পণ্য। জিরা, এলাচ, দারুচিনি, লবঙ্গ, গোলমরিচসহ বিভিন্ন মসলার ওপর বিদ্যমান ৩ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক পুরোপুরি প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হয়েছে।
এনবিআরের হিসাব অনুযায়ী, এর ফলে প্রতি কেজি জিরায় প্রায় ১৬ টাকা, লবঙ্গে ১৮ টাকা, গোলমরিচে ১৪ টাকা এবং এলাচে প্রায় ৬৮ টাকা পর্যন্ত শুল্ক-কর কমবে।
রমজান, কোরবানির ঈদ ও বিভিন্ন উৎসবকেন্দ্রিক সময়ে মসলার চাহিদা বাড়ে। ফলে এ খাতে কর কমানোর প্রভাব সাধারণ ভোক্তার রান্নাঘরে পৌঁছানোর সম্ভাবনা তুলনামূলক বেশি।
ভোজ্যতেলে নির্ভরতা কমানোর উদ্যোগ
ভোজ্যতেল দেশের অন্যতম আমদানিনির্ভর পণ্য। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লেই দেশের বাজারে তার প্রভাব পড়ে। এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে সরকার শুধু আমদানিতে কর কমানোর পথেই হাঁটেনি, দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগও নিয়েছে।
দেশীয় তেলবীজ ব্যবহার করে ভোজ্যতেল উৎপাদনকারী শিল্পকে ১০ বছরের কর অব্যাহতি দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রথম পাঁচ বছর শতভাগ, পরবর্তী তিন বছর ৫০ শতাংশ এবং শেষ দুই বছর ২৫ শতাংশ কর ছাড় থাকবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি বাস্তবায়িত হলে সরিষা, সূর্যমুখী ও সয়াবিন চাষে বিনিয়োগ বাড়বে। দীর্ঘমেয়াদে আমদানিনির্ভরতা কমে খাদ্য নিরাপত্তা জোরদার হতে পারে।
কৃষকের জন্য বহুমাত্রিক সহায়তা
বাজেটে কৃষিকে ‘বিশেষ অগ্রাধিকার’ খাত হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। কৃষকের উৎপাদন ব্যয় কমাতে সার, কীটনাশক, বীজ ও কৃষিযন্ত্রে বিভিন্ন কর ও ভ্যাট ছাড় দেওয়া হয়েছে।
সব ধরনের কীটনাশক আমদানির ওপর থাকা ৭.৫ শতাংশ আগাম কর প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হয়েছে। কীটনাশক উৎপাদনের ৩৬টি কাঁচামালে ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়া হচ্ছে। সার সরবরাহ পর্যায়ে বিদ্যমান সাড়ে ৭ শতাংশ ভ্যাটও প্রত্যাহার করা হয়েছে।
কৃষক কার্ডের আওতায় ৪২ লাখ ৫০ হাজার কৃষককে আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। পাশাপাশি কৃষিঋণ মওকুফ, স্বল্পসুদে ঋণ, কৃষি ও মৎস্য বিমা এবং বিনা মূল্যে সার বিতরণের মতো কর্মসূচিও অব্যাহত রাখা হয়েছে। এসব উদ্যোগ উৎপাদন ব্যয় কমানোর পাশাপাশি খাদ্য সরবরাহ স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন সুযোগ
বাজেটের অন্যতম ইতিবাচক দিক হলো শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষাঋণ কর্মসূচি চালুর উদ্যোগ। মেধাবী শিক্ষার্থীরা অর্থসংকটের কারণে যাতে উচ্চশিক্ষা থেকে বঞ্চিত না হয়, সে জন্য দেশে এবং বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য বিশেষ ঋণ সুবিধার প্রস্তাব করা হয়েছে। মেডিক্যাল ও ডেন্টাল শিক্ষার্থীদের জন্যও বিশেষ ঋণ কর্মসূচি থাকবে।
বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরেই উচ্চশিক্ষার অর্থায়ন একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ফলে এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি উপকৃত হতে পারে।
প্রবীণ নাগরিকদের জন্য বিশেষ স্বস্তি
প্রথমবারের মতো প্রবীণ নাগরিকদের জন্য পরিবহন খাতে বড় ধরনের সুবিধার ঘোষণা এসেছে। ৬৫ বছরের বেশি বয়সী নাগরিকরা ট্রেনে বিনা মূল্যে ভ্রমণ করতে পারবেন। মেট্রোরেলে পাবেন ২৫ শতাংশ ভাড়া ছাড়। পাশাপাশি গণপরিবহন ব্যবস্থাকে আধুনিক ও নিরাপদ করতে বাসরুট যৌক্তিকীকরণ, বৈদ্যুতিক বাস, সমন্বিত টিকিট ব্যবস্থা এবং স্মার্ট ট্রাফিক ব্যবস্থার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির বাইরে প্রবীণদের জন্য এ ধরনের সুবিধা বাংলাদেশের বাজেটে তুলনামূলক নতুন উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ব্যাংক আমানতকারীদের জন্য স্বস্তি
ক্ষুদ্র সঞ্চয়কারীদের জন্যও সুখবর রয়েছে। ব্যাংক হিসাবের ওপর আবগারি শুল্ক আরোপের সীমা ৩ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪ লাখ টাকা করা হয়েছে। ফলে যাঁদের হিসাবের স্থিতি ৪ লাখ টাকার কম থাকবে, তাঁদের আর আবগারি শুল্ক দিতে হবে না। এতে নিম্ন ও মধ্য আয়ের আমানতকারীরা সরাসরি উপকৃত হবেন।
নারীদের কর্মসংস্থানে সহায়ক উদ্যোগ
নারীদের কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণ বাড়াতে ডে-কেয়ার সেন্টার সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রথম ধাপে ২০টি এবং পরবর্তী সময়ে আরও ৬০টি আধুনিক ডে-কেয়ার সেন্টার স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।
কর্মজীবী মায়েদের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। কারণ সন্তান পরিচর্যার সমস্যা অনেক ক্ষেত্রেই নারীদের কর্মজীবনে অংশগ্রহণের বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
তরুণদের জন্য নতুন সম্ভাবনা
তরুণ উদ্যোক্তা, স্টার্টআপ, ফ্রিল্যান্সার এবং কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের জন্যও বাজেটে বড় ধরনের সুবিধা দেওয়া হয়েছে। স্টার্টআপ খাতের জন্য ৫০০ কোটি টাকার তহবিল গঠনের ঘোষণা এসেছে। স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠানকে ২০৩৫ সাল পর্যন্ত ভ্যাট অব্যাহতি এবং টার্নওভার কর শূন্য শতাংশ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
ফ্রিল্যান্সিং ও কনটেন্ট ক্রিয়েশন থেকে অর্জিত আয়কে করমুক্ত করার প্রস্তাবও তরুণদের জন্য বড় প্রণোদনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ডিজিটাল সেবায় সময় ও খরচ কমবে
ব্যবসা শুরু, বিনিয়োগ অনুমোদন, করসনদ, বিদ্যুৎ সংযোগ এবং বিভিন্ন সরকারি-সেবা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আনার উদ্যোগও জনসাধারণের জন্য পরোক্ষ স্বস্তি বয়ে আনতে পারে।
সিঙ্গেল উইন্ডো সেবা চালুর মাধ্যমে ব্যবসা শুরুর অনুমোদন সাত দিনের মধ্যে দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে একক ডিজিটাল আইডির মাধ্যমে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি সেবা গ্রহণের সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে।
বাস্তবে স্বস্তি কতটা মিলবে
তবে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাজেটে কর ও শুল্ক কমানোর ঘোষণা দিলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাজারে দাম কমে যায় না। অতীতেও অনেক ক্ষেত্রে কর কমানোর পুরো সুবিধা ভোক্তা পর্যায়ে পৌঁছায়নি।
নিত্যপণ্য, ভোজ্যতেল ও মসলার ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীরা যদি কর কমার সুবিধা ভোক্তার কাছে পৌঁছে দেন, তাহলে মূল্যস্ফীতির চাপে থাকা সাধারণ মানুষ কিছুটা স্বস্তি পাবে। একইভাবে কৃষি, শিক্ষা, পরিবহন ও ডিজিটাল সেবার ঘোষিত উদ্যোগগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে তার ইতিবাচক প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিতে পড়বে।
সব মিলিয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে করছাড়, সামাজিক সুরক্ষা, শিক্ষা, কৃষি, প্রবীণ নাগরিক, তরুণ উদ্যোক্তা ও ডিজিটাল সেবাকে কেন্দ্র করে যে উদ্যোগগুলো নেওয়া হয়েছে, সেগুলোকে সরকার ‘স্বস্তির বাজেট’ হিসেবে উপস্থাপন করতে চাইছে। এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো— ঘোষিত সুবিধাগুলো কত দ্রুত এবং কতটা কার্যকরভাবে সাধারণ মানুষের জীবনে পৌঁছায়।