ফ্ল্যাট-জমি কেনাবেচায় ‘প্রকৃত মূল্য’ দেখানোর সুযোগ: কালো টাকা সাদা নাকি বাস্তবতা?

গোলাম মওলা
১৩ জুন ২০২৬, ১৪:৩১আপডেট : ১৩ জুন ২০২৬, ১৪:৩১

প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে আবাসন ও ভূমি খাতকে ঘিরে নতুন এক বিতর্কের জন্ম হয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) জমি, ফ্ল্যাট ও ভবন কেনাবেচার ক্ষেত্রে দলিলমূল্যের বাইরে প্রকৃত লেনদেনমূল্য স্বপ্রণোদিতভাবে প্রকাশের সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব করেছে। সরকারের দাবি, এটি কর ব্যবস্থাকে বাস্তবমুখী করার উদ্যোগ। তবে অর্থনীতিবিদ, কর বিশেষজ্ঞ ও গবেষণা সংস্থাগুলোর একাংশের মতে, এই বিধান কার্যত কালো টাকা বা অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করার নতুন পথ তৈরি করেছে।

বাজেট ঘোষণার পর বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। একদিকে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) এটিকে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ হিসেবে উল্লেখ করেছে, অপরদিকে এনবিআর চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান খান দাবি করেছেন, এটি কোনোভাবেই প্রচলিত অর্থে ‘কালো টাকা সাদা করার’ সুযোগ নয়; বরং দীর্ঘদিনের একটি বাস্তব সমস্যার সমাধান।

কেন এ ব্যবস্থা?

বাংলাদেশে জমি ও ফ্ল্যাট কেনাবেচার ক্ষেত্রে প্রকৃত লেনদেনমূল্য এবং দলিলমূল্যের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই বড় ধরনের ব্যবধান রয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে নিবন্ধন ব্যয় কমানোর জন্য দলিলে কম মূল্য দেখানো হয়। ফলে প্রকৃত লেনদেনের একটি বড় অংশ কর নথির বাইরে থেকে যায়।

উদাহরণ হিসেবে ধরা যাক, কেউ যদি দুই কোটি টাকা দিয়ে একটি ফ্ল্যাট কেনেন, কিন্তু দলিলে মূল্য দেখান এক কোটি টাকা। বাকি এক কোটি টাকা তার আয়কর নথিতে প্রতিফলিত হয় না। ভবিষ্যতে কর কর্তৃপক্ষ ওই অর্থের উৎস জানতে চাইলে তাকে জটিলতায় পড়তে হয়। নতুন বিধান অনুযায়ী তিনি চাইলে নিয়মিত হারে কর পরিশোধ করে ওই অতিরিক্ত অর্থকে আয়কর নথিতে অন্তর্ভুক্ত করতে পারবেন।

একইভাবে বিক্রেতার ক্ষেত্রেও সুযোগ রাখা হয়েছে। কোনো জমি বা ফ্ল্যাটের প্রকৃত বিক্রয়মূল্য যদি দলিলমূল্যের চেয়ে বেশি হয়, তাহলে অতিরিক্ত অংশের ওপর মূলধনী মুনাফা কর (ক্যাপিটাল গেইন ট্যাক্স) দিয়ে তা বৈধভাবে প্রদর্শন করা যাবে।

কীভাবে কাজ করবে নতুন বিধান?

অর্থবিলে বলা হয়েছে, কোনও ব্যক্তি যদি স্বপ্রণোদিতভাবে জমি, বিল্ডিং বা অ্যাপার্টমেন্টের প্রকৃত ক্রয় বা বিক্রয়মূল্য ঘোষণা করেন, তাহলে সংশ্লিষ্ট অতিরিক্ত অর্থের ওপর নির্ধারিত কর পরিশোধ করলেই হবে। এ বিষয়ে কর কর্তৃপক্ষ পরে কোনো প্রশ্ন তুলবে না।

ক্রয়ের ক্ষেত্রে দলিলমূল্যের বাইরে অতিরিক্ত অর্থের ওপর ব্যক্তিশ্রেণির জন্য প্রযোজ্য নিয়মিত আয়কর দিতে হবে। বিক্রয়ের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত অর্থের ওপর মূলধনী মুনাফা কর দিতে হবে।

তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্তও রাখা হয়েছে। করদাতা স্বপ্রণোদিতভাবে ঘোষণা দেওয়ার আগে যদি এনবিআর কোনো তদন্ত বা কার্যক্রম শুরু করে, তাহলে তাকে প্রদেয় করের অতিরিক্ত ২০ শতাংশ জরিমানাসদৃশ অর্থ পরিশোধ করতে হবে।

কর বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিধান মূলত আয়কর রিটার্নে এতদিন গোপন থাকা সম্পদের প্রকৃত মূল্য দেখানোর একটি আইনি সুযোগ তৈরি করছে।

কালো টাকা সাদা করার সুযোগ কিনা?

বিতর্কের মূল জায়গাটি এখানেই। সিপিডিসহ অনেক অর্থনীতিবিদ মনে করছেন, যেহেতু অপ্রদর্শিত অর্থ নির্দিষ্ট কর দিয়ে বৈধ করা যাবে এবং পরে এর উৎস নিয়ে প্রশ্ন তোলা হবে না, তাই এটি কার্যত কালো টাকা সাদা করার সুযোগ।

তবে এনবিআর চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান খান এ ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যান করেছেন। তার মতে, এখানে অবৈধ আয়ের বৈধতা দেওয়া হচ্ছে না; বরং বৈধভাবে অর্জিত কিন্তু দলিলে প্রতিফলিত হয়নি—এমন অর্থকে কর নথিতে অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, দেশের জমি ও ফ্ল্যাট বাজারে দীর্ঘদিন ধরে দলিলমূল্য ও বাজারমূল্যের মধ্যে বিশাল ব্যবধান বিদ্যমান। এই বাস্তবতার কারণে অনেক করদাতা অনিচ্ছাকৃতভাবে জটিলতায় পড়েন। নতুন বিধান সেই সমস্যা সমাধানের জন্য আনা হয়েছে।

তবে তিনি এটিও বলেছেন, সমাজে ব্যাপক আপত্তি থাকলে সরকার বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করতে পারে।

সমস্যার মূল কারণ মৌজা রেট

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর মতে, সমস্যার মূল উৎস হলো মৌজা রেট বা সরকার নির্ধারিত সম্পত্তির মূল্য।

বর্তমানে অধিকাংশ এলাকায় মৌজা রেট প্রকৃত বাজারমূল্যের তুলনায় অনেক কম। ফলে ক্রেতা-বিক্রেতারা বাস্তব লেনদেনমূল্য দলিলে উল্লেখ না করে কম মূল্য দেখাতে উৎসাহিত হন।

অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, সরকার ইতোমধ্যে মৌজা রেট বাজারমূল্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার উদ্যোগ নিয়েছে। এ জন্য একটি কমিটি কাজ করছে। ভবিষ্যতে মৌজা রেট বাস্তব বাজারমূল্যের কাছাকাছি চলে এলে প্রকৃত মূল্য গোপনের প্রবণতা কমবে এবং এ ধরনের বিশেষ সুযোগের প্রয়োজনও থাকবে না।

জমির মালিকদের জন্য নতুন করের বোঝা

প্রস্তাবিত বাজেটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো ডেভেলপারদের সঙ্গে যৌথ উন্নয়ন (জয়েন্ট ভেঞ্চার) চুক্তির ক্ষেত্রে জমির মালিকদের ওপর নতুন কর আরোপ।

বর্তমানে জমির মালিক ডেভেলপারের কাছ থেকে যে সাইনিং মানি পান, তার ওপর ১৫ শতাংশ ক্যাপিটাল গেইন ট্যাক্স দিতে হয়। কিন্তু বিনিময়ে যে ফ্ল্যাট পান, তার ওপর কোনো কর নেই।

নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, ডেভেলপারের কাছ থেকে পাওয়া অ্যাপার্টমেন্ট বা অন্য যেকোনো অ-নগদ সুবিধাকেও করযোগ্য লাভ হিসেবে বিবেচনা করা হবে। অর্থাৎ জমির মালিককে এখন সাইনিং মানির পাশাপাশি প্রাপ্ত ফ্ল্যাটের মূল্যের ওপরও ১৫ শতাংশ মূলধনী মুনাফা কর দিতে হবে।

কতটা বাড়তে পারে কর?

এনবিআরের কর্মকর্তাদের দেওয়া উদাহরণ অনুযায়ী, যদি কোনও ব্যক্তি ২০ বছর আগে ৫০ লাখ টাকায় একটি জমি কিনে থাকেন এবং বর্তমানে সেই জমির বিনিময়ে ৫০ লাখ টাকা সাইনিং মানি ও ৫ কোটি টাকার সমমূল্যের ফ্ল্যাট পান, তাহলে তার মোট অর্জন ধরা হবে ৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা।

সেখান থেকে জমির মূল ক্রয়মূল্য ৫০ লাখ টাকা বাদ দিলে অবশিষ্ট ৫ কোটি টাকা মূলধনী মুনাফা হিসেবে বিবেচিত হবে। এর ওপর ১৫ শতাংশ হারে কর দিতে হবে ৭৫ লাখ টাকা।

পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া জমির ক্ষেত্রে অর্জনমূল্য কম হওয়ায় করের পরিমাণ আরও বেশি হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন।

উদ্বিগ্ন আবাসন খাত

রিহ্যাব এবং আবাসন খাতের ব্যবসায়ীরা নতুন এই করনীতিকে উদ্বেগের চোখে দেখছেন।

তাদের মতে, জমির মালিকদের ওপর অতিরিক্ত করের বোঝা চাপলে অনেকেই প্রকৃত মূল্য গোপন করার চেষ্টা করবেন। আর যদি গোপনের সুযোগ না থাকে, তাহলে সেই অতিরিক্ত ব্যয় শেষ পর্যন্ত ফ্ল্যাটের দামের সঙ্গে যুক্ত হবে।

রিহ্যাবের সাবেক সহসভাপতি এম এ আউয়াল বলেন, অতিরিক্ত কর আরোপ করলে প্রকৃত মূল্য গোপনের প্রবণতা বাড়তে পারে, যা কর ফাঁকিকে উৎসাহিত করবে।

কর বিশেষজ্ঞ স্নেহাশীহ বড়ুয়ার মতে, সম্পত্তির প্রকৃত মূল্য কম দেখানোর প্রবণতা ইতোমধ্যে বিদ্যমান। নতুন করের কারণে এই প্রবণতা আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

রডের ওপর বাড়তি ভ্যাট, বাড়তে পারে ফ্ল্যাটের দাম

আবাসন খাতের জন্য আরেকটি উদ্বেগের কারণ হলো রডসহ বিভিন্ন নির্মাণসামগ্রীর ওপর কর ও ভ্যাট বৃদ্ধি।

প্রস্তাবিত বাজেটে বিভিন্ন ধরনের এমএস (মাইল্ড স্টিল) পণ্য, বিলেট, ইনগট, স্ক্র্যাপ ও অ্যালয়ের ওপর সুনির্দিষ্ট ভ্যাট ও কর বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। ফলে নির্মাণ ব্যয় আরও বাড়তে পারে।

রিহ্যাবের সভাপতি ড. আলী আফজাল বলেছেন, আবাসন খাতের জন্য প্রত্যাশিত কোনো কার্যকর নীতিসহায়তা এবারের বাজেটে নেই। বরং নির্মাণসামগ্রীর ওপর অতিরিক্ত কর আরোপের ফলে ফ্ল্যাটের দাম আরও বাড়বে এবং সাধারণ ক্রেতারা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন

তার মতে, নিবন্ধন ব্যয় কমানো, দীর্ঘমেয়াদি স্বল্পসুদে অর্থায়ন নিশ্চিত করা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা এখন সময়ের দাবি।

রাজস্ব আদায়ের নতুন উৎস?

যদিও ব্যবসায়ীরা উদ্বেগ প্রকাশ করছেন, এনবিআর কর্মকর্তারা এটিকে রাজস্ব আহরণের একটি বড় সুযোগ হিসেবে দেখছেন।

এনবিআরের সাবেক সদস্য সৈয়দ মো. আমিনুল করিমের মতে, সরকারি মূল্যায়নের ভিত্তিতে কর নির্ধারণ করা হলেও এই পদক্ষেপের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আদায় সম্ভব হবে।

তিনি বলেন, প্রকৃত বাজারমূল্যের ভিত্তিতে কর নির্ধারণ করা গেলে রাজস্ব আরও বেশি পাওয়া যেত। তারপরও করজাল সম্প্রসারণ এবং সম্পদভিত্তিক কর ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে এটি একটি ইতিবাচক উদ্যোগ।

সামনের দিনগুলোতে কী হবে?

প্রস্তাবিত বাজেট আগামী ৩০ জুন জাতীয় সংসদে পাস হওয়ার কথা রয়েছে। এর আগে সংসদীয় আলোচনায় এই বিধান নিয়ে বিতর্ক আরও বাড়তে পারে।

একদিকে সরকার বলছে, এটি কালো টাকা সাদা করার সুযোগ নয়; বরং করব্যবস্থায় বাস্তবতার প্রতিফলন। অন্যদিকে সমালোচকদের প্রশ্ন, অপ্রদর্শিত অর্থের উৎস নিয়ে প্রশ্ন না তুলে করের বিনিময়ে বৈধতা দেওয়ার সুযোগ থাকলে সেটিকে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ ছাড়া আর কী বলা যায়?

ফলে বাজেটের এই বিধান শেষ পর্যন্ত কী আকারে আইন হিসেবে কার্যকর হবে, তা এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

/এম/
সম্পর্কিত
বিরোধী দলের উদ্দেশ্য মানুষকে বিভ্রান্ত করা: প্রধানমন্ত্রী
বাজেটের আকার বড়, বাস্তবায়নই বড় চ্যালেঞ্জ: এফবিসিসিআই
সঞ্চয়পত্রের মুনাফা ‘কমবে’, লাখে কত?
সর্বশেষ খবর
নাঈম হাসানকে হেনস্তা: ক্ষুব্ধ বিসিবি ও কোয়াব
নাঈম হাসানকে হেনস্তা: ক্ষুব্ধ বিসিবি ও কোয়াব
দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রবাসী বাংলাদেশিদের সতর্ক করলো হাইকমিশন
দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রবাসী বাংলাদেশিদের সতর্ক করলো হাইকমিশন
এনসিপির ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির আত্মপ্রকাশ
এনসিপির ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির আত্মপ্রকাশ
কক্সবাজারে শুদ্ধ ভাষায় কথা বললে নিজেকে পর মনে হয়: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
কক্সবাজারে শুদ্ধ ভাষায় কথা বললে নিজেকে পর মনে হয়: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
সর্বাধিক পঠিত
আইনজীবী তালিকাভুক্তির এমসিকিউতে পাস করলেন জাইমা রহমান, মোট উত্তীর্ণ ৯২০১
আইনজীবী তালিকাভুক্তির এমসিকিউতে পাস করলেন জাইমা রহমান, মোট উত্তীর্ণ ৯২০১
দিল্লিতে বিএসএফ-বিজিবি শীর্ষ বৈঠক ‘ব্যর্থ’ হলো যে কারণে
দিল্লিতে বিএসএফ-বিজিবি শীর্ষ বৈঠক ‘ব্যর্থ’ হলো যে কারণে
মোটরসাইকেল আরোহীর মাথায় ইটের আঘাত: নেপথ্যে কী
মোটরসাইকেল আরোহীর মাথায় ইটের আঘাত: নেপথ্যে কী
যে পাঁচটি তথ্য কখনোই এআই চ্যাটবক্সে ইনপুট দেবেন না
যে পাঁচটি তথ্য কখনোই এআই চ্যাটবক্সে ইনপুট দেবেন না
কী আছে ইরান চুক্তিতে, যা সই করতে প্রস্তুত ট্রাম্প
কী, কেন, কীভাবেকী আছে ইরান চুক্তিতে, যা সই করতে প্রস্তুত ট্রাম্প