আমদানি-রফতানি কমেছে: কোন পথে যাচ্ছে দেশের বৈদেশিক বাণিজ্য?

বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যে এক ধরনের দ্বিমুখী চিত্র দেখা যাচ্ছে। একদিকে শিল্পের কাঁচামাল ও মূলধনি যন্ত্রপাতির আমদানি কমে যাওয়ায় উৎপাদন কার্যক্রমে মন্থরতা স্পষ্ট হয়েছে। অন্যদিকে রফতানিও প্রত্যাশিত প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারেনি। ফলে আমদানি-রফতানির ভারসাম্য আরও নাজুক হয়ে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে প্রায় ২৪ শতাংশ। তবে রেকর্ড পরিমাণ প্রবাসী আয় বৈদেশিক লেনদেনের ওপর চাপ অনেকটাই সামলে দিয়েছে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধিতেও বড় ভূমিকা রেখেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ইকোনমিক ইন্ডিকেটরস, ব্যালান্স অব পেমেন্ট (বিওপি) প্রতিবেদন এবং রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য বিশ্লেষণে এমন চিত্র উঠে এসেছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা, উচ্চ সুদের হার, বড় শিল্পগোষ্ঠীর আর্থিক সংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং ব্যবসায়ীদের আস্থার ঘাটতির কারণে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বৈদেশিক বাণিজ্যে প্রত্যাশিত গতি ফেরেনি।

আমদানি দায় পরিশোধ প্রায় স্থবির

২০২৫-২৬ অর্থবছরে ঋণপত্রের (এলসি) মাধ্যমে আমদানি দায় পরিশোধ বা ইমপোর্ট সেটেলমেন্ট হয়েছে ৭০ দশমিক ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। আগের অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল ৭০ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরে প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র শূন্য দশমিক ০৯ শতাংশ।

সাধারণত আমদানি দায় পরিশোধের এই পরিসংখ্যান দেশের শিল্প উৎপাদন ও বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচিত হয়। এত কম প্রবৃদ্ধি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে শিল্প খাত এখনও পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরতে পারেনি।

তবে আশার দিক হলো, একই সময়ে নতুন আমদানি ঋণপত্র (এলসি) খোলার পরিমাণ ৭ শতাংশ বেড়ে ৭৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি ভবিষ্যৎ আমদানি কার্যক্রম বাড়ার সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিলেও ব্যবসায়ীরা এখনও বড় বিনিয়োগে সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন।

উৎপাদনের ভিত্তিই দুর্বল হচ্ছে সবচেয়ে উদ্বেগজনক চিত্র দেখা গেছে শিল্পের কাঁচামাল ও মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানিতে।

সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে শিল্পের কাঁচামাল আমদানি ৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ কমে ২৩ দশমিক ১৮ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের অন্যতম সূচক মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি ১০ দশমিক ৬৮ শতাংশ কমে মাত্র ১ দশমিক ৮০ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।

একই সময়ে ভোগ্যপণ্য ও মধ্যবর্তী পণ্যের আমদানিও প্রায় ৭ শতাংশ করে কমেছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, শিল্পের কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি আমদানি কমে যাওয়া মানে নতুন বিনিয়োগ কমছে, উৎপাদন সম্প্রসারণ থমকে যাচ্ছে এবং ভবিষ্যতের রফতানি সক্ষমতার ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

তবে প্রধান আমদানি খাতগুলোর মধ্যে ব্যতিক্রম ছিল জ্বালানি। পেট্রোলিয়াম পণ্যের আমদানি ৬ দশমিক ৪২ শতাংশ বেড়ে ১০ দশমিক ৬৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।

কেন কমছে আমদানি?

ব্যাংকার ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর কয়েকটি বড় শিল্পগোষ্ঠীর উৎপাদন কার্যক্রম সীমিত হয়ে পড়েছে। নাসা গ্রুপ, বেক্সিমকো গ্রুপ ও গাজী গ্রুপসহ কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠানের অনেক কারখানা বন্ধ রয়েছে বা সীমিত সক্ষমতায় চলছে। অনেক কারখানা মাত্র ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ সক্ষমতা ব্যবহার করছে।

ফলে নতুন কাঁচামাল কিংবা যন্ত্রপাতি আমদানির প্রয়োজনও কমে গেছে। একইসঙ্গে উচ্চ সুদের হার, ব্যাংকঋণের ব্যয় বৃদ্ধি এবং ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তাও বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

রফতানিতেও ভাটা

আমদানি ধীরগতির প্রভাব পড়েছে দেশের রফতানি বাণিজ্যেও। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের মোট পণ্য রফতানি হয়েছে প্রায় ৪৮ বিলিয়ন ডলার—যা আগের বছরের তুলনায় শূন্য দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। অথচ সরকার এ অর্থবছরে ৫৫ বিলিয়ন ডলার রফতানির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল।

রফতানির প্রায় ৮০ শতাংশ আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। বিদায়ী অর্থবছরে এ খাত থেকে আয় হয়েছে প্রায় ৩৮ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার। রফতানিকারকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক, ইউরোপীয় বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতা, বৈশ্বিক চাহিদা কমে যাওয়া, জ্বালানি সংকট, উচ্চ সুদের হার এবং লজিস্টিকস ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় রফতানি প্রত্যাশা অনুযায়ী বাড়েনি।

তবে অর্থবছরের শেষ মাস জুনে রফতানিতে প্রায় ২৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি দেখা গেলেও বিশ্লেষকদের মতে, এটি মূলত কর্মদিবস বেশি থাকার প্রভাব। নতুন বাজার বা চাহিদা বৃদ্ধির প্রতিফলন নয়।

বাণিজ্য ঘাটতি আরও বেড়েছে

আমদানি ও রফতানির ব্যবধানও বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে (জুলাই-মে) মোট আমদানি হয়েছে ৬৪ দশমিক ০২ বিলিয়ন ডলারের পণ্য। একই সময়ে রফতানি হয়েছে ৪০ দশমিক ০৪ বিলিয়ন ডলার।

ফলে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৩ দশমিক ৯৮ বিলিয়ন ডলারে—যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ১৯ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ঘাটতি বেড়েছে প্রায় ২৪ শতাংশ।

অর্থনীতিবিদদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে এমন প্রবণতা বৈদেশিক খাতের জন্য চাপ সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে রফতানি আয় প্রত্যাশিত হারে না বাড়লে আমদানি ব্যয় সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।

প্রবাসী আয় দিয়েছে বড় স্বস্তি

বৈদেশিক বাণিজ্যের এই দুর্বলতার মধ্যেও দেশের জন্য সবচেয়ে বড় স্বস্তির খবর এসেছে প্রবাসী আয়ে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ রেকর্ড ৩৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার প্রবাসী আয় পেয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ বেশি।

এই শক্তিশালী প্রবাহের কারণে চলতি হিসাবের ঘাটতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। একই সঙ্গে আর্থিক হিসাবে ৪ দশমিক ১৬ বিলিয়ন ডলারের উদ্বৃত্ত সৃষ্টি হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রবাসী আয় না বাড়লে বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য অনেক বেশি চাপের মুখে পড়তো।

রিজার্ভ বেড়েছে, কিন্তু চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে

শক্তিশালী রেমিট্যান্স এবং সীমিত আমদানির কারণে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও বেড়েছে। বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে ২০২৬ সালের জুন শেষে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩২ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার, যা এক বছর আগে ছিল ২৬ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার।

অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি স্বস্তিদায়ক হলেও দীর্ঘমেয়াদে শুধু রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভর করে বৈদেশিক খাতকে শক্তিশালী রাখা সম্ভব নয়। টেকসই সমাধান হলো উৎপাদন বৃদ্ধি, রফতানি সম্প্রসারণ এবং নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ।

ফ্রি ট্রেড জোন: নতুন সম্ভাবনার দরজা

এমন বাস্তবতায় সরকার দেশের প্রথম ফ্রি ট্রেড জোন (এফটিজেড) চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ইতোমধ্যে এফটিজেডে বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন ও আমদানির জন্য বিস্তারিত নীতিমালা জারি করেছে।

নতুন ব্যবস্থায় ব্যবসায়ীরা চালানভিত্তিক (কনসাইনমেন্ট) পদ্ধতিতে এলসি ছাড়াই কাঁচামাল আনতে পারবেন। শুল্কমুক্তভাবে কাঁচামাল সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, রিপ্যাকেজিং, রিলেবেলিং এবং পুনঃরফতানির সুযোগও থাকবে।

ব্যবসায়ীদের মতে, এর ফলে উৎপাদনের সময় কমবে, কার্যকর মূলধনের চাপ হ্রাস পাবে, সরবরাহ শৃঙ্খল আরও দক্ষ হবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের রফতানি প্রতিযোগিতা বাড়বে। একই সঙ্গে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণেও নতুন গতি আসতে পারে।

বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবং বিজিএমইএ’র সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘রফতানি শুধু বিদেশি চাহিদার ওপর নির্ভর করে না, এর সঙ্গে দেশের উৎপাদন সক্ষমতা, কাঁচামাল সরবরাহ, জ্বালানি, লজিস্টিকস ও বিনিয়োগ পরিবেশ সরাসরি যুক্ত। শিল্পের কাঁচামাল ও মূলধনি যন্ত্রপাতির আমদানি কমে যাওয়া ভবিষ্যৎ উৎপাদন ও রফতানির জন্য সতর্কবার্তা। কারণ আজ যে বিনিয়োগ কমছে, তার প্রভাব কয়েক মাস পর উৎপাদন ও রফতানিতে দেখা যায়।’’

তিনি বলেন, ‘‘বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি। ভিয়েতনাম, ভারত ও অন্যান্য প্রতিযোগী দেশ বিভিন্ন মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির সুবিধা পাচ্ছে। অপরদিকে বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উত্তরণের পথে। ফলে শুধু কম খরচে উৎপাদন করলেই হবে না, ব্যবসার ব্যয় কমানো, বন্দর ও লজিস্টিকসের দক্ষতা বৃদ্ধি, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ এবং দ্রুত বাণিজ্য সহজ করার মতো সংস্কার বাস্তবায়ন করতে হবে।’’ মহিউদ্দিন রুবেল আরও বলেন, ‘‘প্রথম ফ্রি ট্রেড জোনের উদ্যোগ ইতিবাচক। তবে এর প্রকৃত সুফল পেতে হলে নীতির কার্যকর বাস্তবায়ন, দ্রুত কাস্টমস সেবা এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে রফতানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনা ও নতুন বাজারে প্রবেশের উদ্যোগ জোরদার করা গেলে বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্য আবারও শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারবে।’’

প্রতিযোগিতা বাড়াতে সংস্কারের বিকল্প নেই

সিপিডির সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘‘বৈশ্বিক সংঘাত, এলডিসি থেকে উত্তরণ এবং প্রতিযোগী দেশগুলোর সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির কারণে আগামী দিনগুলো আরও কঠিন হবে।’’

তার মতে, ব্যবসার ব্যয় কমানো, লজিস্টিকস ব্যবস্থার উন্নয়ন, ন্যাশনাল সিঙ্গেল উইন্ডো কার্যকর করা, বাণিজ্য সহজীকরণ, রফতানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনা এবং দ্রুত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) সম্পাদনের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে হবে।

পোশাক খাতের উদ্যোক্তারাও বলছেন, ভারত ও ভিয়েতনামের মতো প্রতিযোগী দেশ ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে বাড়তি সুবিধা পাচ্ছে। তাই উৎপাদন ব্যয় কমানো, জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং বন্দর ও লজিস্টিকসের দক্ষতা বাড়ানো এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

সামনের পথ

অর্থনীতিবিদদের মতে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বৈদেশিক বাণিজ্যের চিত্র স্পষ্টভাবে দেখিয়েছে যে শুধু আমদানি বা রফতানির একটি সূচক দিয়ে অর্থনীতির স্বাস্থ্য বিচার করা যাবে না। শিল্পে বিনিয়োগ কমে গেলে তার প্রভাব কয়েক মাস পর রফতানিতে পড়ে, আর রফতানি দুর্বল হলে বাণিজ্য ঘাটতি বাড়ে।

প্রবাসী আয় আপাতত বৈদেশিক খাতকে স্বস্তি দিলেও দীর্ঘমেয়াদে টেকসই সমাধান হলো উৎপাদনমুখী বিনিয়োগ বাড়ানো, শিল্পের সক্ষমতা পুনরুদ্ধার, রফতানি বাজার ও পণ্যে বৈচিত্র্য আনা এবং বাণিজ্য সহজীকরণের মাধ্যমে বাংলাদেশের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা শক্তিশালী করা। অন্যথায় বৈদেশিক বাণিজ্যের বর্তমান চাপ আগামী অর্থবছরগুলোতেও অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকতে পারে।