বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে কেন এত উদ্বেগ আইএমএফের 

বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সর্বশেষ পূর্বাভাস। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি মাত্র ৩ দশমিক ৫ শতাংশ হতে পারে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। সরকারের নির্ধারিত ৬ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় এটি প্রায় অর্ধেক। শুধু তাই নয়, প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়ন না হলে মধ্যমেয়াদে প্রবৃদ্ধি ৩ শতাংশের নিচেও নেমে যেতে পারে বলে স্পষ্ট সতর্ক বার্তা দিয়েছে আইএমএফ।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এটি কেবল একটি পূর্বাভাস নয়, বরং বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে থাকা গভীর কাঠামোগত সংকটের প্রতিফলন। একসময় ৭-৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতা ধরে রাখা যে অর্থনীতি—দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল হিসেবে পরিচিত ছিল, সেই অর্থনীতি এখন নিম্ন প্রবৃদ্ধি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল বিনিয়োগ এবং সংকুচিত শিল্প উৎপাদনের চক্রে আটকে পড়ছে।

এ প্রসঙ্গে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানিত ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৫ শতাংশ হতে পারে—আইএমএফের এই পূর্বাভাস বাস্তব অর্থনৈতিক পরিস্থিতির প্রতিফলন। অন্যদিকে সরকার ৬ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। তবে সেই লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে শুধু সংস্কার কর্মসূচি জোরদার করলেই হবে না; একইসঙ্গে বিনিয়োগ, উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

তিনি বলেন, দেশে এখনও উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ কাটেনি, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলছে। রফতানি প্রবৃদ্ধি দুর্বল, বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতা রয়েছে এবং বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৫ শতাংশের ঘরে। ফলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি মন্থর হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে খেলাপি ঋণের চাপে ব্যাংকিং খাত দুর্বল হয়ে পড়েছে, যা বিনিয়োগ ও ব্যবসায় আস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ব্যবসা পরিচালনার পরিবেশের বিভিন্ন সূচকও কাঙ্ক্ষিত অবস্থায় নেই। এ ছাড়া বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ প্রান্তিকে জিডিপি প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ২ দশমিক ২২ শতাংশে, যা অর্থনীতির মন্থরতার স্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করে।

ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, সরকারের নির্ধারিত ৬ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জন একেবারে অসম্ভব নয়। তবে তা বাস্তবায়ন করতে হলে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলো দ্রুত ও কার্যকরভাবে মোকাবিলা করতে হবে এবং প্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক সংস্কার, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ ও নীতিগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হবে।

প্রবৃদ্ধি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ

জিডিপি প্রবৃদ্ধি একটি দেশের অর্থনীতির গতি নির্দেশ করে। প্রবৃদ্ধি যত বেশি হয়, তত বেশি বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, উৎপাদন ও মানুষের আয় বাড়ার সুযোগ তৈরি হয়। বিপরীতে প্রবৃদ্ধি কমে গেলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি ধীর হয়ে যায়, শিল্পে বিনিয়োগ কমে, ব্যবসায় সম্প্রসারণ থেমে যায় এবং মানুষের প্রকৃত আয় কমতে থাকে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য ৩ শতাংশের আশপাশের প্রবৃদ্ধি উদ্বেগজনক। এই হারে অর্থনীতি বাড়লেও বিপুল সংখ্যক নতুন শ্রমশক্তির জন্য প্রয়োজনীয় কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা সম্ভব হয় না। ফলে বেকারত্ব, আয় বৈষম্য ও দারিদ্র্যের ঝুঁকি বাড়তে পারে।

একের পর এক কমছে প্রবৃদ্ধি

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড যে ধারাবাহিকভাবে দুর্বল হচ্ছে, তার প্রমাণ মিলছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্যেও। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৪ দশমিক ৯৬ শতাংশ। দ্বিতীয় প্রান্তিকে (অক্টোবর-ডিসেম্বর) তা কমে দাঁড়ায় ৩ দশমিক ০৩ শতাংশ। আর তৃতীয় প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) আরও নেমে আসে মাত্র ২ দশমিক ২২ শতাংশে।

অর্থাৎ, তিন প্রান্তিক ধরেই অর্থনীতির গতি ধারাবাহিকভাবে কমেছে। পুরো অর্থবছরের সাময়িক হিসাবে প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ, যা কয়েক বছর আগের বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির তুলনায় অনেক কম। এই বাস্তবতার মধ্যেই আইএমএফ আগামী অর্থবছরের জন্য আরও কম, ৩ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছে। অর্থাৎ, অর্থনীতির সামনে দ্রুত ঘুরে দাঁড়ানোর কোনও শক্তিশালী ইঙ্গিত আপাতত দেখা যাচ্ছে না।

সরকারের লক্ষ্য ও বাস্তবতার মধ্যে বড় ব্যবধান

চলতি অর্থবছরে সরকার ৬ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর পূর্বাভাস সেই লক্ষ্য থেকে অনেক দূরে। আইএমএফ বলছে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ, বিশ্বব্যাংক প্রায় ৩ দশমিক ৯ শতাংশ এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ৪ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা দেখছে। অর্থাৎ, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কারও পূর্বাভাসই সরকারের লক্ষ্যমাত্রার কাছাকাছি নয়। এতে প্রশ্ন উঠছে, বিদ্যমান পরিস্থিতিতে ঘোষিত প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য কতটা বাস্তবসম্মত।

কোথায় আটকে যাচ্ছে অর্থনীতি

আইএমএফের মূল্যায়নে বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা রাজস্ব আহরণে দুর্বলতা। সরকারের আয় কম থাকায় উন্নয়ন ব্যয়, সামাজিক সুরক্ষা ও ভর্তুকি ব্যবস্থাপনায় চাপ বাড়ছে। দ্বিতীয় বড় সংকট ব্যাংকিং খাত। খেলাপি ঋণ, দুর্বল সুশাসন, সীমিত ঋণপ্রবাহ এবং আর্থিক খাতের অনিশ্চয়তা বেসরকারি বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করছে। তৃতীয়ত, মূল্যস্ফীতি দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও পণ্যের দাম বাড়ায় আমদানি ব্যয়ও বেড়েছে। এতে সরকারের ভর্তুকির চাপ বৃদ্ধি পেয়েছে।

এ ছাড়া বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য, বিনিময় হার ব্যবস্থাপনা এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নিয়েও চাপ পুরোপুরি কাটেনি।

সবচেয়ে বড় ধাক্কা শিল্প খাতে

সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক দুর্বলতার সবচেয়ে স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা গেছে শিল্প খাতে। বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে শিল্প খাতের উৎপাদন ঋণাত্মক ০ দশমিক ২৮ শতাংশ হয়েছে। অর্থাৎ, আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় উৎপাদন কমেছে। করোনা মহামারির সময় ছাড়া গত ছয় বছরে এমন পরিস্থিতি দেখা যায়নি। জ্বালানি সংকট, উচ্চ সুদহার, দুর্বল রফতানি চাহিদা, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং বেসরকারি বিনিয়োগের স্থবিরতা শিল্প উৎপাদনকে বড় ধরনের চাপে ফেলেছে। শিল্প খাত দুর্বল হওয়ায় কর্মসংস্থান ও রফতানির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবং বিজিএমইএ’র সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আইএমএফের ৩ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি এবং প্রধান রফতানি খাত তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। এটি একই সঙ্গে আত্মসমালোচনা ও ভবিষ্যৎ প্রস্তুতির সুযোগও তৈরি করেছে।

তিনি বলেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকিং খাতের নানা চ্যালেঞ্জ এবং বৈশ্বিক বাজারের দ্রুত পরিবর্তনের বাস্তবতায় শুধু স্বল্পমূল্যের শ্রমশক্তি বা প্রচলিত সিএমটি (কাট, মেক অ্যান্ড ট্রিম) মডেলের ওপর নির্ভর করে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা সম্ভব হবে না। দীর্ঘমেয়াদে শিল্পকে আরও সক্ষম ও প্রতিযোগিতামূলক করতে উৎপাদনে বৈচিত্র্য, প্রযুক্তিনির্ভরতা এবং উচ্চ মূল্য সংযোজনের দিকে গুরুত্ব দিতে হবে।

মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, তৈরি পোশাক রফতানি ১০০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য অর্জনে স্বল্পমেয়াদে শিল্পকারখানায় নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং ব্যাংকিং সহায়তা সহজলভ্য করা জরুরি, যাতে উৎপাদন কার্যক্রম স্বাভাবিক থাকে। একই সঙ্গে মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদে ম্যান-মেড ফাইবারভিত্তিক উৎপাদন সম্প্রসারণ, পণ্যে বহুমুখীকরণ এবং প্রয়োজনীয় কাঠামোগত সংস্কার সমান্তরালভাবে এগিয়ে নিতে হবে।

তার মতে, সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখার পাশাপাশি পোশাক শিল্পের কৌশলগত রূপান্তর নিশ্চিত করা গেলে বর্তমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে ভবিষ্যতের প্রবৃদ্ধির ভিত্তি আরও শক্তিশালী করা সম্ভব হবে।

বিনিয়োগে আস্থাহীনতা

অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমানে সবচেয়ে বড় সংকট হচ্ছে বিনিয়োগকারীদের আস্থার ঘাটতি। উচ্চ ঋণসুদ, ব্যাংকিং খাতের অনিশ্চয়তা, জ্বালানি সরবরাহের সমস্যা এবং নীতিগত অনিশ্চয়তার কারণে উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ হারাচ্ছেন। অনেক ব্যাংক উৎপাদন খাতে ঋণ দেওয়ার পরিবর্তে সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। ফলে শিল্পে প্রয়োজনীয় অর্থায়নও কমে যাচ্ছে। এর ফলে উৎপাদন কমছে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ধীর হচ্ছে এবং সামগ্রিক অর্থনীতির গতি আরও মন্থর হয়ে পড়ছে।

সংস্কার ছাড়া ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন

আইএমএফের মতে, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, ভর্তুকি ব্যবস্থার যৌক্তিকীকরণ, কঠোর কিন্তু ভারসাম্যপূর্ণ মুদ্রানীতি এবং বিনিময় হার ব্যবস্থার আরও নমনীয় বাস্তবায়ন ছাড়া অর্থনীতি টেকসইভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না। একইসঙ্গে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি আরও লক্ষ্যভিত্তিক করতে হবে, যাতে মূল্যস্ফীতি ও সংস্কারের চাপ নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর কম পড়ে।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আইএমএফের এই মূল্যায়ন বাংলাদেশের অর্থনীতির দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতা এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতারই প্রতিফলন। তাঁর মতে, এটি কেবল স্বল্পমেয়াদি অর্থনৈতিক পরিস্থিতির চিত্র নয়— বরং অর্থনীতির গভীরে থাকা সমস্যাগুলোর একটি স্পষ্ট বার্তা।

তিনি বলেন, গত কয়েক বছরে ধারাবাহিকভাবে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতা, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, রাজস্ব আহরণের সীমিত সক্ষমতা, বৈদেশিক লেনদেনের ওপর চাপ এবং নীতিগত অনিশ্চয়তা—এসব কারণ সম্মিলিতভাবে অর্থনীতির গতি শ্লথ করে দিয়েছে। এর সঙ্গে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা এবং সুশাসনের ঘাটতি যুক্ত হওয়ায় উৎপাদনশীলতা ও বিনিয়োগের পরিবেশ আরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে অর্থনীতির যথেষ্ট সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি অর্জন কঠিন হয়ে উঠছে।

তবে আইএমএফের এই পূর্বাভাসকে সংকটের বার্তা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলে মনে করেন ড. ফাহমিদা খাতুন। তাঁর ভাষ্য, এটিকে দ্রুত ও কার্যকর সংস্কার বাস্তবায়নের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। তিনি বলেন, ব্যাংকিং খাতে সুশাসন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া, কর ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি, সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং নীতিগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।

পাশাপাশি স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে রফতানি বহুমুখীকরণ, দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ আরও জোরদার করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, সরকার ইতোমধ্যে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছে। তবে এসব উদ্যোগের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে সেগুলো কত দ্রুত, সমন্বিত ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যায় তার ওপর। কারণ আগামী দিনের অর্থনীতির গতিপথ নির্ধারণ করবে শুধু প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নয়, বরং সংস্কার বাস্তবায়নের গতি, গুণগত মান এবং সেই প্রক্রিয়ার প্রতি দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা।

নতুন ঋণ কর্মসূচির পথে আলোচনা

সরকারের অনুরোধে সম্ভাব্য নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আইএমএফের সঙ্গে আলোচনা শুরু হয়েছে। ঢাকা সফরে সংস্থাটির প্রতিনিধিদল সরকারের অর্থনৈতিক সংস্কারের পরিকল্পনা, রাজস্বনীতি, ব্যাংক খাত এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছে।

আগামী কয়েক মাসে সম্ভাব্য ঋণের পরিমাণ, কর্মসূচির কাঠামো এবং সংস্কার-সংক্রান্ত প্রতিশ্রুতি নিয়ে আরও আলোচনা হবে। অক্টোবরে বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের বার্ষিক সভার সময় এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হতে পারে।

অর্থনীতির সামনে বড় প্রশ্ন

বাংলাদেশ এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে কেবল প্রবৃদ্ধির সংখ্যা বাড়ানোর লক্ষ্য যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন উৎপাদনশীল বিনিয়োগ বৃদ্ধি, ব্যাংকিং খাতের সুশাসন, রাজস্ব ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ, শিল্প খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানো এবং ব্যবসায় আস্থা ফিরিয়ে আনা।

আইএমএফের ৩ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস তাই শুধু একটি অর্থনৈতিক হিসাব নয়, এটি নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা। প্রয়োজনীয় সংস্কার দ্রুত বাস্তবায়ন করা না গেলে বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদি নিম্ন প্রবৃদ্ধির ফাঁদে আটকে পড়তে পারে। আর যদি কার্যকর সংস্কার বাস্তবায়ন সম্ভব হয়, তবে অর্থনীতি আবারও উচ্চ প্রবৃদ্ধির পথে ফিরে আসার সুযোগ তৈরি হতে পারে।