দেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলে দাম বাড়ার সুযোগ নেই বলে মনে করছেন পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ী এবং আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা। তবে জ্বালানি সংকট দ্রুত নিরসন, সরবরাহ ব্যবস্থার প্রতিবন্ধকতা দূর করা এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে নিত্যপণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখা কঠিন হবে বলে আশঙ্কা করেছেন তারা।
মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর মতিঝিলে ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) কার্যালয়ে নিত্যপণ্যের বাজার পরিস্থিতি নিয়ে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় ব্যবসায়ীরা এসব কথা বলেন। সভায় সভাপতিত্ব করেন এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক মো. ফজলুল হক। সভার শুরুতে তিনি নিত্যপণ্যের সরবরাহ, মজুত, আমদানি ও বাজারদর পরিস্থিতি সম্পর্কে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে তথ্য ও মতামত চান।
ব্যবসায়ীরা বলেন, চিনি, ভোজ্যতেল, ডাল, আটা, ময়দাসহ বিভিন্ন নিত্যপণ্যের চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে বাজারে অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধির সুযোগ থাকবে না। এ জন্য উৎপাদনমুখী কারখানাগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার দাবি জানান তারা।
মিল মালিকদের প্রতিনিধিরা বলেন, জ্বালানি সংকটের মধ্যেও তারা স্থানীয় বাজারে নিত্যপণ্যের সরবরাহ ও দাম স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা করছেন। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত চিনির দাম বাড়লেও দেশের বাজারে এখনও চিনির দাম বাড়ানো হয়নি বলেও দাবি করেন তারা।
মতবিনিময় সভায় মৌলভীবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক গোলাম মাওলা বলেন, আমদানি ও মিল পর্যায়ে উৎপাদন সচল রাখা না গেলে নিত্যপণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হবে না। এ জন্য জ্বালানি সংকট দ্রুত নিরসনের পাশাপাশি ঋণপত্র (এলসি) খোলার ক্ষেত্রে বিদ্যমান জটিলতা দ্রুত সমাধানের দাবি জানান তিনি।
দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে ফুটপাতের হকার ও অনিবন্ধিত ব্যবসায়ীদেরও তদারকির আওতায় আনার দাবি জানান কাওরান বাজার কাঁচামাল আড়ৎ ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সাইফুর রহমান সুজন। বাংলাদেশ সুপার মার্কেট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো. জাকির হোসেন সরবরাহ ব্যবস্থায় পণ্যের হাতবদল কমানোর ওপর গুরুত্ব দেন।
সভায় অংশ নেওয়া বিভিন্ন বণিক সমিতির নেতারা সরবরাহ ব্যবস্থার বিভিন্ন পর্যায়ে হয়রানি বন্ধের দাবি জানান। প্রয়োজনে এ বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হস্তক্ষেপেরও আহ্বান জানান তারা। একই সঙ্গে মিলগেট, পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে পণ্যের দাম তদারকি আরও জোরদারের দাবি ওঠে।
কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সাংগঠনিক সম্পাদক মো. আবুল কালাম আজাদ বলেন, সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য নিয়ন্ত্রণে সরকার ও বেসরকারি খাত—উভয়কেই আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
সভায় ব্যবসায়ীরা সাম্প্রতিক গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার কথা তুলে ধরেন। পাশাপাশি এলসি-সংক্রান্ত জটিলতার কথাও উল্লেখ করে এসব সমস্যা দ্রুত সমাধানে সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেন তারা।
সভায় ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) প্রতিনিধি জানান, ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে প্রায় এক কোটি পরিবারের কাছে স্বল্পমূল্যে নিত্যপণ্য বিক্রি করা হচ্ছে। খাদ্য অধিদপ্তরের প্রতিনিধি জানান, খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় নিম্নআয়ের মানুষের কাছে স্বল্পমূল্যে চাল বিতরণ করা হচ্ছে। এসব কর্মসূচি বাজারে পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে বলে দাবি করেন তারা। তবে ব্যবসায়ীরা টিসিবির পণ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে দেশীয় কোম্পানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে সরাসরি আমদানি কিংবা বিকল্প উৎস থেকে পণ্য সংগ্রহের সক্ষমতা বাড়ানোর পরামর্শ দেন।
সভায় এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক মো. ফজলুল হক বলেন, ব্যবসায়ী নেতারা যেসব মতামত ও পরামর্শ দিয়েছেন, সেগুলো লিপিবদ্ধ করে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তুলে ধরা হবে। নতুন পে-স্কেলের কারণে নিত্যপণ্যের বাজারে যাতে অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি না ঘটে, সে বিষয়ে সব পর্যায়ের ব্যবসায়ীদের সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।
সভায় এফবিসিসিআইয়ের মহাসচিব মো. আলমগীরসহ বিভিন্ন চেম্বার ও অ্যাসোসিয়েশন, বণিক সমিতি ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া বাণিজ্য, শিল্প ও খাদ্য মন্ত্রণালয়, টিসিবি, বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন, বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর, ক্যাব, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিরাও সভায় অংশ নেন।