রাজধানীতে জ্বালানি তেলের সংকট নিয়ে সরকার ও ব্যবসায়ীদের বক্তব্য অপরিবর্তিত থাকলেও এর খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। পেট্রোল পাম্পে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও তেল না পেয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন চালকরা। মালিকরা বলছেন, চাহিদা অনুযায়ী তেল পাচ্ছেন না তারা। বিপরীতে সরকার থেকে বলা হচ্ছে, তেল যথেষ্ট আছে। কিন্তু, ঈদের আগে থেকে শুরু হওয়া এই সংকটের কোনও সমাধান এখন পর্যন্ত হয়নি।
রামপুরা এলাকায় মোটরসাইকেলের তেল শেষ হয়ে যাওয়ার পর রিজার্ভে বিভিন্ন পাম্পে ঘুরে শেষ পর্যন্ত শেরাটনের সামনের মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেড পাম্পে যান স্বপন মোল্লা। সেখানে তেল পান এ মোটরসাইকেল চালক। তিনি বলেন, “রিজার্ভে রেখে অনেক ঘুরেছি। অবশেষে তেল পেয়েছি।”
একই পাম্পে তেলের জন্য অপেক্ষা করছে বেসরকারি গাড়ির মালিক শারমিন। তিনি বলেন, “ড্রাইভারকে সকাল সাড়ে ৭টা থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে রেখেছি। প্রায় আড়াই ঘণ্টা অপেক্ষার পরও পাম্পে ঢোকার আগেই ঘোষণা আসে তেল শেষ। পরে জানানো হয়, দুপুর ২টার পর তেল আসবে। এরপর থেকে পাম্পের সামনে অপেক্ষা করছি।”
শুধু এ দুই ঘটনা নয়, আশপাশের অন্যান্য পাম্পেও একই চিত্র। বন্ধ থাকা তালুকদার ফিলিং স্টেশনের সামনেও তেলের আশায় দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। অনেকেই জানান, লাইন ছেড়ে গেলে আর সুযোগ পাওয়া যাবে না, আবার অন্য পাম্পেও তেল নেই—তাই বাধ্য হয়েই ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন মোটরসাইকেলভিত্তিক রাইড শেয়ার চালকরা। তাদের দিনের বড় একটি সময় তেল সংগ্রহেই চলে যাচ্ছে। আগে কিছু নির্দিষ্ট পাম্পে নিয়মিত তেল পাওয়া গেলেও ঈদের পর সেই ধারাবাহিকতা ভেঙে গেছে।
ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে আতঙ্কে অতিরিক্ত তেল কেনার প্রবণতা বাড়ায় গত ৬ মার্চ রেশনিং চালু করা হয়। পরে তা কমিয়ে ১৫ শতাংশে আনা হয়। আর গত ১৫ মার্চ রেশনিং ব্যবস্থা তুলে নেয় সরকার। তবে, এরপরও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে এখনও দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষা করতে হচ্ছে চালকদের।
এ বিষয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু আজ (মঙ্গলবার) সচিবালয়ে বলেন, “হঠাৎ চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় এ চাপ তৈরি হয়েছে। প্রয়োজনের অতিরিক্ত তেল না নিলে সরবরাহ স্বাভাবিক থাকবে।” তিনি দাবি করেন, দেশে পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে।
এদিকে, বিপিসির চেয়ারম্যান রেজানুর রহমান জানান, গত বছরের তুলনায় চলতি বছরে তেল সরবরাহ বাড়ানো হয়েছে। তবুও অতিরিক্ত চাহিদা এবং মজুত করার প্রবণতার কারণে সংকট তৈরি হচ্ছে। যথেষ্ট মজুদ আছে। আরও তেল আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অযথা আতঙ্ক না ছড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ডিলার্স, ডিস্ট্রিবিউটর, এজেন্ট অ্যান্ড পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য সচিব মীর আহসান উদ্দিন পারভেজ বলেন, “রেশনিংয়ের পর তৈরি হওয়া আতঙ্ক এখনও কাটেনি। ফলে মানুষ বেশি করে তেল কিনছে, যা সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।”
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের আরেক নেতা বলেন, “পাম্পে গিয়ে তেল না পেলে মানুষ আতঙ্কিত হবে এটাই স্বাভাবিক। যদি সংকট না থাকে তাহলে পাম্পে এখন তেল বেশি দেওয়া হলে সমস্যা তো নাই। বরং সবাই গিয়ে তেল পেলে আতঙ্ক কমে আসবে। কেউ তখন আর বাড়তি তেল কিনে মজুদের চেষ্টাও করবে না। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও অনেকে তেল পাচ্ছে না। সরকার মুখে যতই বলুক মজুত আছে। বাস্তবে চাহিদা অনুযায়ী মানুষ তেল না পেলে আতঙ্কিত হবেই।”
সব মিলিয়ে সরকার, সরবরাহকারী ও ব্যবসায়ীদের বক্তব্য অপরিবর্তিত থাকলেও সমাধানের কোনও উদ্যোগ নেই। মাঝে ভোগান্তির শেষ নেই সাধারণ মানুষের।