দৈনিক ঘাটতি ৩ হাজার মেগাওয়াটেরও বেশি, রাতে পরিস্থিতি বেশি খারাপ

গরমে ঘরে টেকা দায়। তার ওপর কখন বিদ্যুৎ আসবে, কখন চলে যাবে; তারও ঠিক নেই। দিনের কাজ তো বটেই, রাতের ঘুমও ভেঙে যাচ্ছে বারবার। শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ মানুষদের দুর্ভোগ সবচেয়ে বেশি। দেশের বিভিন্ন গ্রামের মানুষের এখন এমনই দিন কাটছে। কোথাও কোথাও ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। বিদ্যুৎ না থাকায় কৃষি, ছোট ব্যবসা, মুদি দোকান, ওয়ার্কশপ থেকে শুরু করে অনলাইনভিত্তিক কাজও ব্যাহত হচ্ছে। শিক্ষার্থী ও চাকরিজীবীদের ভোগান্তির সঙ্গে বাড়ছে নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ।

হঠাৎ তৈরি হওয়া এই পরিস্থিতির পেছনে মূল কারণ জ্বালানি সংকট, বিশেষ করে গ্যাস সরবরাহে ঘাটতি। প্রয়োজনীয় গ্যাস না পাওয়ায় দেশের বেশ কয়েকটি গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। ফলে বিদ্যুৎকেন্দ্রের মোট স্থাপিত সক্ষমতা পর্যাপ্ত থাকলেও প্রয়োজনের সময় সেই সক্ষমতার পুরোটা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। এর সঙ্গে গরমে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় চাহিদা ও সরবরাহের ব্যবধান আরও বড় হয়েছে।

এই ঘাটতির চিত্র সবচেয়ে স্পষ্ট হয়েছে ১১ আগস্ট রাত থেকে ১২ আগস্ট পর্যন্ত বিদ্যুতের সরবরাহে। গত ২১ ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৫৯২ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়েছে ১১ আগস্ট দিবাগত রাত ১২টায়। ওই সময়ে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৭ হাজার ৫২৩ মেগাওয়াট। বিপরীতে সরবরাহ করা হয় ১৩ হাজার ৯৩১ মেগাওয়াট।

এর আগে রাত ৯টায় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৮ হাজার ৪৩ মেগাওয়াট, যা দেওয়া তথ্যের মধ্যে সর্বোচ্চ। এ সময় সরবরাহ ছিল ১৫ হাজার ৩৬ মেগাওয়াট এবং ঘাটতি ছিল ৩ হাজার ৭ মেগাওয়াট। রাত ১০টায় চাহিদা ১৭ হাজার ৩২৪ মেগাওয়াটে নেমে এলেও লোডশেডিং ছিল ২ হাজার ২১৫ মেগাওয়াট।

রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘাটতি আবার বাড়তে থাকে। রাত ১১টায় ২ হাজার ৬৯৫ মেগাওয়াট এবং রাত ১২টায় ৩ হাজার ৫৯২ মেগাওয়াট লোডশেডিং রেকর্ড হয়। ১২ আগস্ট রাত ১টা ও ২টায় ঘাটতি ছিল যথাক্রমে ৩ হাজার ১৯৪ ও ৩ হাজার ১১৬ মেগাওয়াট।

সকালে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। সকাল ১১টায় লোডশেডিং কমে ১ হাজার ৯০০ মেগাওয়াটে নামলেও দুপুর ১২টায় তা বেড়ে ২ হাজার ৬৮৮ মেগাওয়াট হয়। বিকাল ৩টায় ঘাটতি আরও বেড়ে ৩ হাজার ৩৮২ মেগাওয়াটে পৌঁছে। বিকাল ৪টা ও ৫টায় লোডশেডিং ছিল যথাক্রমে ২ হাজার ৭১৭ ও ২ হাজার ৬৬৪ মেগাওয়াট।

গরমে বেড়েছে সংকট

দেশে সাধারণত ডিসেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিতরণ স্বাভাবিক থাকে। কারণ এ সময়ে চাহিদার তুলনায় মানানসই উৎপাদন হয়। চলতি বছরের ১ জানুয়ারি দিনের পিক সময়ে দুপুর ১২টায় দেশের বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ৯ হাজার ২৭০ মেগাওয়াট। একই দিন রাত ৯টায় পিক চাহিদা ছিল ৯ হাজার ৮৬৫ মেগাওয়াট। ওই দিন দেশে কোনো লোডশেডিং ছিল না।

জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত সাধারণত লোডশেডিং থাকে না। কিন্তু এপ্রিলে খানিকটা গরম পড়তে শুরু করলে বিদ্যুতের পরিস্থিতি বদলাতে থাকে। থেমে থেমে লোডশেডিং শুরু হয়। মে ও জুনে বরাবর লোডশেডিং হয়। জুলাই মাসে শ্রাবণে তা কিছুটা কমলেও আগস্ট অর্থাৎ ভাদ্র মাসে আবার লোডশেডিং বাড়তে শুরু করে। সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে চাহিদা কমতে থাকলে লোডশেডিংও কমে আসে।

চলতি বছরের শুরুতে দিনের পিক সময়ে ৯ হাজারের কিছু বেশি মেগাওয়াট থাকা চাহিদা ১১ আগস্ট রাত ৯টায় বেড়ে দাঁড়ায় ১৮ হাজার ৪৩ মেগাওয়াটে। এ সময় সরবরাহ করা হয় ১৫ হাজার ৩৬ মেগাওয়াট। ফলে ঘাটতি ছিল ৩ হাজার ৭ মেগাওয়াট।

রাত ১২টায় চাহিদা ১৭ হাজার ৫২৩ মেগাওয়াটে নামলেও সরবরাহ আরও কমে ১৩ হাজার ৯৩১ মেগাওয়াটে দাঁড়ায়। ফলে লোডশেডিং বেড়ে হয় ৩ হাজার ৫৯২ মেগাওয়াট। পরদিন দুপুর ও বিকেলেও ঘাটতি ২ হাজার ৬৮৮ থেকে ৩ হাজার ৩৮২ মেগাওয়াটের মধ্যে ছিল।

জ্বালানি সংকটই মূল কারণ

দেশে সাম্প্রতিক বিদ্যুৎ ঘাটতির পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে জ্বালানি সংকট, বিশেষ করে গ্যাস সরবরাহে ঘাটতিকে দায়ী করা হচ্ছে। প্রয়োজনীয় গ্যাস না পাওয়ায় বেশ কয়েকটি গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না।

পাশাপাশি কয়লা ও তরল জ্বালানির সরবরাহ ও ব্যয়ের চাপ, দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়া এবং গরমে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। ফলে বিদ্যুৎকেন্দ্রের মোট স্থাপিত সক্ষমতা পর্যাপ্ত থাকলেও প্রয়োজনের সময় সেই সক্ষমতার পুরোটা কাজে লাগানো যাচ্ছে না।

এরই প্রভাবে চাহিদা ও সরবরাহের ব্যবধান বেড়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং করতে হচ্ছে। দেশের বেশিরভাগ গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ ক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। তবে মহেশখালির টার্মিনাল স্বাভাবিক সরবরাহ শুরু করলে উৎপাদন বাড়বে।

গ্রামের মানুষের ভোগান্তি বেশি

লোডশেডিংয়ে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন গ্রামের মানুষ। দেশের প্রায় সব এলাকায় ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না। রাতেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় গরমে শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ মানুষদের দুর্ভোগ বেড়েছে।

কৃষির সঙ্গে ক্ষুদ্র ব্যবসা, মুদি দোকান, ওয়ার্কশপ ও অনলাইনভিত্তিক কাজেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। অনেক এলাকায় মোবাইল নেটওয়ার্ক ও ইন্টারনেট ব্যবহারে সমস্যা দেখা দেওয়ায় শিক্ষার্থী ও চাকরিজীবীরাও পড়ছেন বিড়ম্বনায়।

রাতের দীর্ঘ লোডশেডিংয়ে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। এ নিয়ে কোনো কোনো এলাকার ক্ষুব্ধ মানুষ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিতে হামলা পর্যন্ত করেছে।

হামলা-ভাঙচুরে নিরাপত্তা চায় পল্লী বিদ্যুৎ

পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতাধীন এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়ে অসন্তোষ বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির স্থাপনা ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিরাপত্তা নিয়ে বুধবার উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুৎ অ্যাসোসিয়েশন।

সংগঠনটির পক্ষ থেকে পুলিশ মহাপরিদর্শককে দেওয়া এক চিঠিতে বলা হয়েছে, দেশের প্রায় ৮০টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি প্রায় চার কোটি গ্রাহককে বিদ্যুৎ সেবা দিচ্ছে। উৎপাদিত বিদ্যুতের বড় একটি অংশ এসব সমিতির মাধ্যমে গ্রাহকদের সরবরাহ করা হয়। কিন্তু চাহিদার তুলনায় বিদ্যুৎ উৎপাদন কম থাকায় সমিতিগুলোকে বাধ্য হয়ে দীর্ঘ সময় লোডশেডিং করতে হচ্ছে।

চিঠিতে বলা হয়, অতিরিক্ত লোডশেডিংয়ের কারণে কোথাও কোথাও পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির স্থাপনায় হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের মতো ঘটনা ঘটছে। এতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে।

এ অবস্থায় দেশের প্রতিটি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতাধীন গ্রিড, উপকেন্দ্র ও অফিসসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় নিরাপত্তা জোরদার করার অনুরোধ জানিয়েছে বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুৎ অ্যাসোসিয়েশন। একই সঙ্গে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

সন্ধ্যা থেকে কমবে লোডশেডিং

জ্বালানি সংকটের কারণে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় লোডশেডিং বেড়েছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।

তিনি বলেন, বুধবার সন্ধ্যা নাগাদ বিদ্যুৎ পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হবে এবং লোডশেডিংও কমে আসবে। তবে পুরোপুরি জ্বালানি সংকটের সমাধান কবে হবে, সে বিষয়ে এখনই নির্দিষ্ট দিনক্ষণ বলা সম্ভব নয়।

সংকটটি গ্রীষ্ম মৌসুমে শুরু হওয়ায় মানুষের ভোগান্তি বেড়েছে উল্লেখ করে এ জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন তিনি।

পিজিসিবির হিসেবে, ১২ আগস্ট সন্ধ্যা ৬টায় লোডশেডিং ছিল ১ হাজার ৩১৯ মেগাওয়াট। এর আগের দিন ১১ আগস্ট একই সময়ে ছিল ২ হাজার ৪৯৯ মেগাওয়াট।

যদিও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ সময় পিক আওয়ার হওয়ায় তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো চালানো হয়। তাই এই সময় লোডশেডিং কমে আসা স্বাভাবিক। কিন্তু রাতে আবার এসব কেন্দ্র বন্ধ করে দিলেই লোডশেডিং দ্বিগুণের বেশি হয়ে যায়।

‘বরাদ্দ যা পাই, তা দিয়েই চালাই’

ওয়েস্টজোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির (ওজোপাডকো) নির্বাহী পরিচালক (পিঅ্যান্ডডি) মো. রোকনুজ্জামান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা মূলত ২১টি জেলা শহর ও ২২ উপজেলা শহরে বিদ্যুৎ দিয়ে থাকি। গ্রাহক প্রায় ১৮ লাখ। চাহিদা ৭০০ মেগাওয়াটের মতো। আজকে লোডশেডিং ছিল ১০০ মেগাওয়াটের মতো। গতকাল ছিল প্রায় ১৪০/১৫০ মেগাওয়াটের মতো।’

তিনি বলেন, ‘গড়ে তিন-চার ঘণ্টায় দিনে লোডশেডিং করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া হচ্ছে। আমরা তো যা বরাদ্দ পাই, তা দিয়েই চালাই। সরকার বলছে জ্বালানি ঘাটতির কারণে বিদ্যুৎ দিতে পারছে না। আমাদের তো কিছু করার নাই। এলাকায় অসন্তোষ বাড়ছে। ইতোমধ্যে জনরোষ থেকে বাঁচতে আমরা নিরাপত্তা চেয়ে সরকারের কাছে চিঠিও দিয়েছি।’

এর বাইরে অন্য বিতরণ কোম্পানি, পিডিবির চেয়ারম্যান ও আরইবির চেয়ারম্যানকে ফোনে পাওয়া যায়নি।

এদিকে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বি. ডি. রহমত উল্লাহ বলেন, সংকট কমার কোনো সমাধান তিনি দেখতে পাচ্ছেন না। বিকল্প পদ্ধতিতে বিদ্যুৎ এখনই দেওয়া সম্ভব নয় কোনোভাবেই। তিনি বলেন, ‘জ্বালানি সংকট তাৎক্ষণিকভাবে কাটানো যায় না। এটা কাটলেই কাটতে শুরু করবে বিদ্যুৎ সংকট।’

ভবিষ্যতের জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি রুফটপ সোলার আরও ব্যাপকভাবে আনার পরামর্শ দেন তিনি।