বিদ্যুতের ভোগান্তি কাটছে না, বাড়তে পারে জ্বালানি তেলের চাপ

ভাদ্রের তীব্র গরমের মধ্যে বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন নগরবাসী। এমন পরিস্থিতিতে দিনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় ফ্যান-এসি চালানো যাচ্ছে না। রাতে বিদ্যুৎ চলে গেলে ঘরে বাতি জ্বলে না, বন্ধ থাকে ফ্যানও। ফলে দিনে গরমের কষ্ট, রাতে ঘুমের ব্যাঘাত; দুই দিক থেকেই ভুগতে হচ্ছে মানুষকে।

বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতি বিশ্লেষণ ও খাত সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আপাতত লোডশেডিং পুরোপুরি কমার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। গরমের কারণে বিদ্যুতের চাহিদা বেশি থাকায় ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। আবহাওয়াবিদদের হিসাবে, সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গরমের তীব্রতা থাকতে পারে। অক্টোবরের দিকে তাপমাত্রা কমলে বিদ্যুতের চাহিদাও কিছুটা কমতে পারে।

পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশের (পিজিসিবি) হিসাবে, সোমবার দুপুরে দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ২৪২ মেগাওয়াট। বিপরীতে সরবরাহ করা হয়েছে ১৩ হাজার ৩৩৮ মেগাওয়াট। ফলে ঘাটতি ছিল ২ হাজার ৯০৪ মেগাওয়াট। বিকালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩ হাজার ২০১ মেগাওয়াটে।

চলতি বছরের বিদ্যুতের হিসাবেও দেখা যাচ্ছে, শীতের তুলনায় গ্রীষ্মে চাহিদার বড় পার্থক্য রয়েছে। শীতে দেশে বিদ্যুতের চাহিদা থাকে ৯ থেকে ১১ হাজার মেগাওয়াট। দিনের বেলায় তা প্রায় ৯ হাজার এবং রাতে বেড়ে ১১ হাজার মেগাওয়াটে দাঁড়ায়। অন্যদিকে গ্রীষ্মে চাহিদা ১৮ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়েছে। এতে কোনও কোনও দিন প্রায় ৪ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং করতে হয়েছে।

সাধারণত অক্টোবর থেকে বিদ্যুৎ পরিস্থিতিতে স্বস্তি ফিরতে শুরু করে। অক্টোবর, নভেম্বর ও ডিসেম্বরের পর পরের বছরের জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি ও মার্চ পর্যন্ত তুলনামূলক স্বস্তি থাকে। এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিদ্যুতের মূল সংকট থাকে। জুলাই ও আগস্টে বৃষ্টির কারণে কোনও কোনও দিন তাপমাত্রা কম থাকায় চাহিদাও কিছুটা কমে এবং লোডশেডিং কমাতে হয়। তবে চাহিদা ১৭ থেকে ১৮ হাজার মেগাওয়াটে উঠলে লোডশেডিং করা ছাড়া বিকল্প থাকে না।

গ্যাস সংকটেও ব্যাহত উৎপাদন

বিদ্যুৎ ঘাটতির অন্যতম কারণ হিসেবে গ্যাসের সরবরাহ সংকটও সামনে এসেছে। পেট্রোবাংলার হিসাবে, গ্যাসভিত্তিক ৭২টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে ৪১টিতে প্রয়োজন অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ করা যাচ্ছে না। বিদ্যুৎ উৎপাদনে এসব কেন্দ্রের প্রয়োজন ২ হাজার ৫২৪ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। বিপরীতে সরবরাহ করা হচ্ছে ৮৫২ মিলিয়ন ঘনফুট।

গ্যাসের সরবরাহ কম থাকায় এসব কেন্দ্রের উৎপাদন সক্ষমতা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। পরিস্থিতি সামাল দিতে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় চালানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। এরই মধ্যে রবিবার তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে ৬ হাজার কোটি টাকা ছাড় দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়।

তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রও চলছে না

দেশে তেলচালিত সাড়ে ৫ হাজার মেগাওয়াটের মতো বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে। আগে সংকটের সময় এসব কেন্দ্র থেকে চার থেকে সাড়ে ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎও উৎপাদন হতো। এখন জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি এবং ইরানে যুদ্ধের ফলে জ্বালানি তেলের অপ্রাপ্যতাও তৈরি হয়েছে। এতে করে এখন জ্বালানি তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কমিয়ে ১ হাজার ৪০০ মেগাওয়াটে নামানো হয়েছে। গতকাল রবিবার (৩০ আগস্ট) তেলচালিত কেন্দ্র থেকে ৩ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হতে দেখা গেছে।

শীতকালে দেশের অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ রাখতে হয়। ঠিকমতো গ্যাস সরবরাহ পেলে গ্যাস ও কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র চালালেই চাহিদা মেটানো সম্ভব হয়। এর পাশাপাশি ভারত থেকে ১ হাজার ১৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করা হয়। ফলে শীতকালে বিদ্যুৎ সরবরাহে তুলনামূলক স্বস্তি থাকে।

দিনে গরম, রাতেও ঘুম নেই

বিদ্যুৎ আসা-যাওয়ার অনিশ্চয়তায় সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন শিশু, বয়স্ক ও কর্মজীবীরা। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় দিনে একাধিকবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। রাজধানীতে দিনে-রাতে মিলিয়ে গড়ে চার-পাঁচবার এক ঘণ্টা করে বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগ রয়েছে। গ্রামের পরিস্থিতি আরও খারাপ বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

দিনের বেলায় দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় বাসাবাড়িতে ফ্যান ও এসি চালানো যাচ্ছে না। তীব্র গরমে ঘরে থাকা কঠিন হয়ে পড়ছে। অনেক এলাকায় একাধিকবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় পানি তোলা, রান্না, কাপড় ধোয়া, পড়াশোনা ও অনলাইন কাজেও ব্যাঘাত ঘটছে।

বনশ্রী এলাকার গৃহবধূ পলি বেগম বলেন, ‘দিনের বেলায় গরমের মধ্যে ফ্যান চালাতে পারছি না। রাতে দুইবার করে বিদ্যুৎ গেছে। বারবার বিদ্যুৎ যাওয়ায় গরমে ঘুমানো যাচ্ছে না। সকালে উঠে অনেক কাজ করতে হয়। রাতে ঘুম না হলে এসব কাজ করতে গিয়ে অসুস্থ বোধ করছি। বিদ্যুৎ আসা-যাওয়ার কারণে স্বাভাবিক জীবনযাপনই কঠিন হয়ে পড়েছে।’

মধুবাগের বাসিন্দা আসাদ হোসেন বলেন, ‘সারাদিন অফিস করে বাসায় ফিরে একটু বিশ্রাম নেব, সেটাও সম্ভব হচ্ছে না। সন্ধ্যার পর থেকে কয়েকবার বিদ্যুৎ চলে যায়। রাতে লোডশেডিং হলে ঘুম নষ্ট হয়, সকালে আবার কাজে যেতে হয়। দিনের গরম আর রাতের লোডশেডিং—দুই দিক থেকেই মানুষ ভুগছে।’

পুরান ঢাকার লালবাগের বাসিন্দা সবিতা চক্রবর্তী বলেন, ‘দিনের বেলা কম যায় বিদ্যুৎ, একবার বা দুইবার। সন্ধ্যার পরে কয়েক দফায় লোডশেডিং হয়। গরমের মধ্যে এই লোডশেডিংয়ে সবচেয়ে বেশি কষ্ট হয় শ্বশুর আর আমার বাচ্চাগুলোর। গরমে ঘেমে-নেয়ে যায়। খালি গায়েও শান্তি মেলে না ওদের। অনেকে তো এই সময় রাস্তায়ও আজকাল নেমে যায়, যাতে বাইরে গেলে হালকা বাতাস লাগে গায়ে।’

মিরপুরের মেঘলা আক্তার বলেন, ‘লোডশেডিংয়ের কারণে গরম তো লাগছেই। দিনের কাজও আটকে যাচ্ছে সব। গ্যাসের ঘাটতির কারণে বিদ্যুতের চুলা কিনেছিলাম। এখন বিদ্যুৎ গেলে রান্না বন্ধ হয়ে যায়। আবার হয়তো পানি নেই, মোটর ছাড়লাম বিদ্যুৎ চলে গেছে। তখন পানি তোলা যাচ্ছে না। আর গরমের ভোগান্তি তো আছেই। এতদিন ঢাকার বাইরে হলেও ঢাকায় এত লোডশেডিং ছিল না। গত কয়েক দিনের গরমে লোডশেডিংয়ে সবার অবস্থা খারাপ।’

পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশের (পিজিসিবি) হিসাবে, মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) রাত ৮টায় মোট বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৭ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে ১ হাজার ৫৯৩ মেগাওয়াট লোডশেডিং করা হয়েছে। এর আগে সন্ধ্যা ৬টার দিকে লোডশেডিং ছিল ১ হাজার ২৯৫ মেগাওয়াট।

বিদ্যুৎ বিভাগের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আপাতত লোডশেডিং পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। বিদ্যুতের চাহিদা না কমা পর্যন্ত সংকট কাটার সম্ভাবনাও কম। বিশেষ করে গরমের কারণে বিদ্যুতের ব্যবহার বেশি থাকায় চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে যে ঘাটতি তৈরি হচ্ছে, তা মেটানো কঠিন হয়ে পড়ছে।

জেনারেটরে বাড়ছে ডিজেলের খরচ

লোডশেডিংয়ের কারণে বাসাবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে জেনারেটরের ব্যবহারও বাড়ছে। বিশেষ করে দোকান, রেস্টুরেন্ট, ছোট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে বিদ্যুৎ না থাকলে জেনারেটর চালাতে হচ্ছে।

শান্তিনগরের দোকানদার মোস্তফা আলী বলেন, ‘বিদ্যুৎ না থাকলে দোকানে বসে থাকা যায় না। জেনারেটর চালাতে গেলে ডিজেলের খরচ আছে। আবার সবসময় জেনারেটর চালানোও সম্ভব হয় না। একদিকে বিদ্যুৎ বিল, অন্যদিকে জেনারেটরের জ্বালানি খরচ—ব্যবসার খরচ বেড়ে যাচ্ছে।’

পিডিবির এক কর্মকর্তা বলেন, চাহিদার তুলনায় সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হলে লোডশেডিং করতে হয়। গ্যাসের সরবরাহ কমে গেলে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদনও ব্যাহত হয়। ফলে বিদ্যুতের ঘাটতি মেটাতে তেলভিত্তিক কেন্দ্রের ওপর নির্ভরতা বাড়ানোর পাশাপাশি গ্রাহক পর্যায়েও জেনারেটরের ব্যবহার বাড়তে পারে।

ভোগান্তির সঙ্গে বাড়ছে ব্যয়

লোডশেডিং শুধু মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে না, বাড়িয়ে দিচ্ছে পারিবারিক ও ব্যবসায়িক ব্যয়ও। বিদ্যুৎ না থাকায় জেনারেটর চালাতে হচ্ছে, কিনতে হচ্ছে অতিরিক্ত জ্বালানি। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে উৎপাদন ও পরিচালন ব্যয়।

ফলে জ্বালানি তেলের ওপর দ্বিমুখী চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একদিকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোতে বাড়তি জ্বালানি প্রয়োজন হচ্ছে, অন্যদিকে লোডশেডিংয়ের কারণে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য গ্রাহক জেনারেটর চালাতে অতিরিক্ত ডিজেল ব্যবহার করছেন। লোডশেডিং দীর্ঘায়িত হলে এই চাপ আরও বাড়তে পারে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বি. ডি. রহমত উল্লাহ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আপাতত লোডশেডিং কমতে পারে যদি কিছুটা জ্বালানি সরবরাহ বাড়ানো যায়। কিন্তু ভোগান্তি থেকে মুক্তির উপায় এই মুহূর্তে সরকারের হাতে নেই। কারণ তাৎক্ষণিকভাবে অতিরিক্ত জ্বালানি এনে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব নয়। আবার গরম বেশি থাকায় বিদ্যুতের চাহিদা বেশি। সেটাও সরকারের পক্ষে কমিয়ে আনা সম্ভব নয়। এটি পুরোপুরি আবহাওয়ার ওপর নির্ভর করছে। এই অবস্থায় লোডশেডিং কমিয়ে ভোগান্তি কমানোর সুযোগ সরকারের আছে। তবে ভোগান্তি থেকে একেবারে কবে মুক্তি মিলবে, সেটার সমাধান আপাতত সরকারের হাতেও নেই বলে তিনি মনে করেন।

এদিকে আবহাওয়া অধিদফতর জানায়, সম্প্রতি গরম কমার কোনও সম্ভাবনা নেই। ভাদ্র মাসে এমনিতেই একটা ভ্যাপসা গরম থাকে। এর সঙ্গে সাগরে লঘুচাপ থাকায় আর্দ্রতা একটু বেশিই। এই আর্দ্রতার কারণেই গরম বেশি অনুভূত হচ্ছে। এটি কমতে আরও কিছু দিন সময় লাগবে। আবহাওয়াবিদ ওমর ফারুক বলেন, বৃষ্টি হতে পারে এই মাসের শেষদিকে। এতে তাপমাত্রা কিছুটা কমলেও ভারী বৃষ্টি হবে না। ফলে ভ্যাপসা গরম থাকতে পারে সে সময়ও। সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই গরম থাকবে। অক্টোবরে গিয়ে গরম কমতে পারে বলে জানান তিনি।