অটোরিকশায় সোলার চার্জিং: বাস্তবায়নে যত চ্যালেঞ্জ

সঞ্চিতা সীতু
৩১ আগস্ট ২০২৬, ০৮:০০ আপডেট : ৩১ আগস্ট ২০২৬, ০৮:০০

বাংলাদেশে মোট জ্বালানির ৪৭ শতাংশ পরিবহন খাতে ব্যবহার করা হয়। অর্থাৎ বছরে ৬৫ লাখ টন জ্বালানি তেল ব্যবহার হলে এর মধ্যে ৩০ লাখ ৫৫ হাজার টন পরিবহনে ব্যবহার হয়। সরকার ক্রমান্বয়ে তেলের ব্যবহার কমিয়ে ইলেকট্রিক গাড়ি (ইভি) প্রচলনের উদ্যোগ নিচ্ছে। তবে সরকারের উদ্যোগের বাইরেও সারা দেশে বিপুল পরিমাণ ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলছে। এগুলো মূলত গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ নিয়ে চার্জ দেওয়া হচ্ছে। সরকার বলছে, অটোরিকশার জন্য সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করতে হবে। কিন্তু সারা দেশে এ ধরনের চার্জিং স্টেশন এখনও তেমনভাবে গড়ে ওঠেনি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ উদ্যোগ বাস্তবায়ন করতে হলে সরকারের বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবে।

বাংলাদেশে প্রচলিত ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় সাধারণত চার থেকে পাঁচটি ১২ ভোল্টের ব্যাটারি ব্যবহার করা হয়। এতে মোট ব্যাটারি ভোল্টেজ দাঁড়ায় প্রায় ৪৮ থেকে ৬০ ভোল্ট এবং ব্যাটারির ক্ষমতা সাধারণত ১০০ থেকে ১৫০ অ্যাম্পিয়ার-আওয়ার। একটি অটোরিকশা একবার পূর্ণ চার্জ দিতে আনুমানিক ৬ থেকে ১০ ইউনিট বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয়। চার্জিংয়ের সময় বিদ্যুৎ অপচয় বা চার্জারের ক্ষতি ধরলে এ পরিমাণ বেড়ে প্রায় ৭ থেকে ১১ ইউনিট হতে পারে।

পৃথকভাবে এই পরিমাণ বিদ্যুতের ব্যবস্থা করা একজন অটোরিকশা চালকের জন্য কঠিন। একটি অটোরিকশা চার্জ দেওয়ার জন্য যে অবকাঠামো গড়ে তুলতে হয়, তার জন্য কমপক্ষে দেড় লাখ টাকা প্রয়োজন হয়। অন্যদিকে একটি অটোরিকশার দাম সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা। তবে ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকায়ও অটোরিকশা পাওয়া যায়।

সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময় অটোরিকশা চার্জ দেওয়ার জন্য সোলার চার্জিং স্টেশন করার পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ও এ উদ্যোগ জোরালোভাবে নেওয়া হয়। কিন্তু সারা দেশে যে হারে অটোরিকশা রয়েছে, সেই হারে চার্জিং স্টেশন গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি।

এর প্রধান সমস্যা হচ্ছে চার্জ দেওয়ার সময়। একটি অটোরিকশা সারা দিন চালানোর পর চালক রাতে গ্যারেজে বা নিজের বাসায় চার্জ দিয়ে থাকেন। কিন্তু এ ধরনের চার্জিং স্টেশনে চার্জ দিতে হলে দিনের বেলায় চার্জ দিতে হবে। এর একটি সমাধান হচ্ছে দুই সেট ব্যাটারি ব্যবহার করা। এক সেট ব্যাটারি দিনের বেলায় চার্জ হবে, অন্যটি থাকবে অটোরিকশায়। কিন্তু এতে ব্যয় দ্বিগুণ হয়। এক সেট ব্যাটারির দাম কমপক্ষে ৬০ হাজার টাকা। এই বাড়তি ব্যয় অটোরিকশা চালকরা করবেন কি না, সে বিষয়ে সন্দেহ রয়েছে।

এখনও সোলার বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের তুলনায় জাতীয় গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ নিয়ে অটোরিকশার ব্যাটারি চার্জিং স্টেশন পরিচালনা করাই তুলনামূলকভাবে বেশি লাভজনক রয়েছে। সৌরবিদ্যুৎ দিয়ে চার্জ দিতে হলে দুই সেট ব্যাটারি অবশ্যই প্রয়োজন। এর বাইরে আরও দেড় লাখ টাকার সৌর অবকাঠামো প্রয়োজন।

হিসাবটি আরও বিস্তারিত করলে দেখা যায়, প্রচলিত অটোরিকশায় ব্যবহৃত এক সেট লেড-অ্যাসিড (পানি) ব্যাটারির দাম প্রায় ৬০ হাজার টাকা। একটি অটোরিকশার জন্য দুই সেট ব্যাটারি প্রয়োজন হলে বিনিয়োগ দাঁড়ায় ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। প্রতি সেট ব্যাটারি চার্জের জন্য ১০০ টাকা করে নিলে একজন গ্রাহকের দুই সেট ব্যাটারি চার্জ থেকে স্টেশনের আয় হবে ২০০ টাকা।

একটি ব্যাটারি সেট গড়ে ৪০০ থেকে ৬০০ বার চার্জ দেওয়া যায়। মাঝামাঝি ৫০০ বার ধরা হলে দুই সেট ব্যাটারি থেকে মোট চার্জিং আয় দাঁড়ায় প্রায় ১ লাখ টাকা। অর্থাৎ চার্জিং থেকে তার বিনিয়োগ ওঠাই কঠিন। এ ছাড়া এ ধরনের চার্জিং স্টেশনের জন্য প্যানেল, ইনভার্টার, ব্যাটারি স্টোরেজ, চার্জিং অবকাঠামোসহ শুরুতেই বড় অঙ্কের মূলধন বিনিয়োগ প্রয়োজন হয়।

তবে এই প্রচলিত পন্থার বাইরে গিয়ে লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারি ব্যবহার করা গেলে এটি লাভজনক হতে পারে। তবে এক্ষেত্রে অটোরিকশার ব্যাটারির ব্যয় বাড়তে পারে কমপক্ষে দেড় লাখ টাকা। একটি লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারি ৩ হাজার বার চার্জ দেওয়া যায়। এটি দীর্ঘ সময় চার্জ ধরে রাখতে পারে। তবে শুরুতেই এর দাম অনেক বেশি।

অটোরিকশার জন্য সৌরবিদ্যুতের অবকাঠামোর ব্যবস্থা করার আগে এসব বিষয় নিয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ প্রয়োজন।

মনে করা হচ্ছে, সব মিলিয়ে অটোরিকশার জন্য সারা দেশে সোলার চার্জিং অবকাঠামো গড়ে তোলার আগে শুধু সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা বিবেচনা করলেই হবে না। ব্যাটারির ধরন, চার্জিংয়ের সময়, অতিরিক্ত ব্যাটারির প্রয়োজন, চার্জিং ফি, বিদ্যুতের দাম, স্টেশন স্থাপনের ব্যয় এবং চালকদের সক্ষমতা—সবকিছু একসঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ প্রয়োজন। অন্যথায় বিপুল বিনিয়োগের পরও সোলার চার্জিং স্টেশনগুলো কাঙ্ক্ষিতভাবে ব্যবহার না হওয়ার ঝুঁকি থেকে যাবে।

পিডিবির পরিচালক (উৎপাদন) জহুরুল ইসলাম বলেন, ‘সোলারের জন্য সরকার ক্র্যাশ প্রোগ্রাম হাতে নিয়েছে। আশা করি আগামী ফেব্রুয়ারি মাসে একটি সিগনিফিক্যান্ট পরিস্থিতি দেখা যাবে। তবে সেটা কতটা বিদ্যুৎ, তা এখনই বলা সম্ভব না।’

তিনি বলেন, ‘সৌরবিদ্যুতের জন্য সরকার নীতিমালা করতে যাচ্ছে। নীতিমালার কাজ চলছে। ব্যাপকভাবে কাজের পরিকল্পনা হচ্ছে। সোলার সিস্টেম, রুফটপ সোলারসহ সব ধরনের পরিকল্পনায় রাখা হয়েছে। তবে কীভাবে সব হবে, তা নীতিমালা চূড়ান্ত হলে বলা যাবে।’

এদিকে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বি. ডি. রহমত উল্লাহ বলেন, ‘অটোরিকশার ক্ষেত্রে সোলারের কোনও বিকল্প নেই। গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ দিয়ে এই চাহিদা পূরণ করা সম্ভব না। এমনিতে সাধারণ মানুষ লোডশেডিংয়ের অত্যাচারে অতিষ্ঠ। সবার আগে অটোরিকশাগুলো নিবন্ধনের আওতায় আনা, সৌরবিদ্যুতের চার্জিং স্টেশন করা জরুরি। এ জন্য ব্যাপকভাবে এখনই সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘এখন যা পরিস্থিতি দাঁড়িয়েছে, তাতে আর রাস্তা থেকে অটোরিকশা উঠিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। বরং এটা একটি নীতিমালার মধ্যে এনে এটাকে নিয়ন্ত্রণে আনা উচিত সরকারের। আর সৌরবিদ্যুতের কাজ এখন শুরু করলে এক বছরের মধ্যেই একটা ফলপ্রসূ ফলাফল পাওয়া যাবে।’

/ইউএস/এমওএফ/
সম্পর্কিত
রাজধানীতে ২৪ ঘণ্টায় গ্রেফতার ৪৮৬, মামলা ৪৯
রাজধানীতে পাকিস্তানি নাগরিকের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার
বায়ুদূষণে আজ বিশ্বে ৯ম স্থানে ঢাকা, শীর্ষে লাহোর
সর্বশেষ খবর
ঘুষ দাবির অভিযোগে থানা থেকে এএসআই প্রত্যাহার
ঘুষ দাবির অভিযোগে থানা থেকে এএসআই প্রত্যাহার
আওয়ামী লীগকে ‘পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে বড় চোরের দল’ বললেন স্পিকার
আওয়ামী লীগকে ‘পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে বড় চোরের দল’ বললেন স্পিকার
সু চিকে যে দুটি বই পাঠালেন রাজা তৃতীয় চার্লস
সু চিকে যে দুটি বই পাঠালেন রাজা তৃতীয় চার্লস
দিলীপ আগরওয়ালা ১ দিনের রিমান্ডে
দিলীপ আগরওয়ালা ১ দিনের রিমান্ডে
সর্বাধিক পঠিত
ইশরাকের পদত্যাগের পরই ‘ক্ষমতা’ নিয়ে স্ত্রীর বার্তা
ইশরাকের পদত্যাগের পরই ‘ক্ষমতা’ নিয়ে স্ত্রীর বার্তা
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর প্রসঙ্গে যা বললেন জামায়াত আমির
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর প্রসঙ্গে যা বললেন জামায়াত আমির
বাবার চোখ এড়াতে ঢোলা জামা, আড়ালে চলতো শিশুর ওপর নির্যাতন
বাবার চোখ এড়াতে ঢোলা জামা, আড়ালে চলতো শিশুর ওপর নির্যাতন
পদত্যাগ করানো সরকারের প্যারাসিটামল থেরাপি: হাসনাত
পদত্যাগ করানো সরকারের প্যারাসিটামল থেরাপি: হাসনাত
পানাম নগরী ঘুরে দেখলেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত, নকশিকাঁথা-জামদানি দেখে মুগ্ধ
পানাম নগরী ঘুরে দেখলেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত, নকশিকাঁথা-জামদানি দেখে মুগ্ধ