গ্যাসের বিকল্প হিসেবে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর নির্ভরতা বাড়লেও সেখানেও মিলছে না পূর্ণ সক্ষমতার বিদ্যুৎ। রামপাল তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট কারিগরি ত্রুটিতে বন্ধ হয়ে গেছে। পায়রা ও আরএনপিএল কেন্দ্র চলছে সক্ষমতার তুলনায় কম উৎপাদনে।
এদিকে দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়ার দুটি ইউনিটেও রয়েছে কারিগরি ত্রুটি। ভারতের ঝাড়খন্ডে আদানি পাওয়ারের কেন্দ্রটির উৎপাদনেও চলছে ওঠানামা।
সবমিলিয়ে কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর মোট সক্ষমতা ৭ হাজার ৬০০ মেগাওয়াটের বেশি হলেও বর্তমানে গড়ে পাওয়া যাচ্ছে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। এর মধ্যে সোমবার বিকাল ৫টায় দেশের বিদ্যুতের ঘাটতি ছিল ১ হাজার ৬৮৬ মেগাওয়াট।
রামপালের এক ইউনিট বন্ধ
রামপাল তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের দুটি ইউনিটের মোট সক্ষমতা ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট। রবিবার বেলা ১১টার দিকে কারিগরি ত্রুটির কারণে দ্বিতীয় ইউনিটটি বন্ধ হয়ে যায়। কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিট চালু রয়েছে।
সোমবার বিকালের হিসেবে প্রথম ইউনিট থেকে জাতীয় গ্রিডে ৬৫১ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছিল বলে জানিয়েছেন রামপাল তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের মানবসম্পদ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক আনোয়ারুল আজিম। তিনি বলেন, দ্বিতীয় ইউনিট চালু হতে আরও অন্তত তিন দিন সময় লাগতে পারে। তবে কী ধরনের ত্রুটি হয়েছে, তা তিনি নির্দিষ্ট করে বলতে পারেননি।
এর আগে রামপাল কেন্দ্রটিতে ১ হাজার ১০০ মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছিল। কয়েকদিন আগেও কয়লা সরবরাহের ঘাটতির কারণে কেন্দ্রটির উৎপাদন ব্যাহত হয়েছিল।
পায়রা ও আরএনপিএলেও কম উৎপাদন
পটুয়াখালীর পায়রা তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা ১ হাজার ২৪৪ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে বর্তমানে প্রায় ৫৮০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, কারিগরি ত্রুটির কারণে প্রায় দুই মাস ধরে পায়রা কেন্দ্রের উৎপাদন কম।
একই সক্ষমতার পটুয়াখালীর আরএনপিএল কেন্দ্র থেকেও পূর্ণ উৎপাদন পাওয়া যাচ্ছে না। ১ হাজার ২৪৪ মেগাওয়াট সক্ষমতার এই কেন্দ্র থেকে বর্তমানে উৎপাদন হচ্ছে প্রায় ৮০০ মেগাওয়াট।
বড়পুকুরিয়ার দুটি ইউনিটেও ত্রুটি
বড়পুকুরিয়া কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুটি ইউনিটেও কারিগরি ত্রুটি রয়েছে। ফলে এই কেন্দ্র থেকেও কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না। ৪৪৪ মেগাওয়াটের মধ্যে পাওয়া যাচ্ছে ২০৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ।
পিডিবির হিসাবে, দেশের সাতটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মোট সক্ষমতা প্রায় ৬ হাজার ১৩৩ মেগাওয়াট। এর সঙ্গে ভারতের ঝাড়খন্ডে আদানি পাওয়ারের কেন্দ্র থেকে আমদানি করা বিদ্যুৎ ধরলে কয়লাভিত্তিক মোট সক্ষমতা ৭ হাজার ৬০০ মেগাওয়াটের বেশি। কিন্তু বর্তমানে কয়লা থেকে গড়ে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে।
তবে মাতারবাড়ি ও এসএস পাওয়ার পূর্ণমাত্রায় চলছে। মাতারবাড়ি থেকে ১ হাজার ১৫০ মেগাওয়াট এবং এসএস পাওয়ার থেকে জাতীয় গ্রিডে ১ হাজার ২২৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যাচ্ছে।
আদানির উৎপাদনেও ওঠানামা
ভারতের ঝাড়খন্ডে অবস্থিত আদানি পাওয়ারের কেন্দ্রটির সক্ষমতা প্রায় ১ হাজার ৪৩৬ মেগাওয়াট। রবিবার কেন্দ্রটির দুটি ইউনিট মিলিয়ে সরবরাহ করেছে ৭৪৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ।
এর আগে ১০ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাত ১২টার দিকে কারিগরি ত্রুটির কারণে কেন্দ্রটির একটি ইউনিট বন্ধ হয়ে যায়। এতে উৎপাদন কমে ৭৫০ মেগাওয়াটের নিচে নেমে গিয়েছিল।
এরপর ত্রুটি সারিয়ে ১৩ সেপ্টেম্বর দুপুর ২টায় কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিট থেকে ৭৫৬ দশমিক ৬৬ মেগাওয়াট এবং দ্বিতীয় ইউনিট থেকে ২৯০ দশমিক ৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ হয়েছে। দুই ইউনিট মিলিয়ে সে সময় সরবরাহ করা হচ্ছিল ১ হাজার ৪৬ দশমিক ৭৩ মেগাওয়াট।
আজ সোমবার বিকাল ৫টায় সেখান থেকে পাওয়া যাচ্ছিল ১ হাজার ১৯৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ।
বিদ্যুৎ ঘাটতি ১ হাজার ৬৮৬ মেগাওয়াট
কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে পূর্ণ সক্ষমতার বিদ্যুৎ না পাওয়ার মধ্যে দেশের বিদ্যুৎ চাহিদা ও সরবরাহের ব্যবধানও বড় রয়েছে।
পিজিসিবির সোমবার বিকাল ৫টার হিসেবে দেশের বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ৭৪৮ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে ঘাটতি ছিল ১ হাজার ৬৮৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ।
গ্যাস সরবরাহ বাড়লেও সংকট কাটেনি
এদিকে দেশে গ্যাসের সরবরাহ কিছুটা বেড়েছে। শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টায় পেট্রোবাংলার হিসাবে মোট গ্যাস সরবরাহ ছিল ২ হাজার ৩২০ মিলিয়ন ঘনফুট। রোববার একই সময়ে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৩৬২ মিলিয়ন ঘনফুটে। আর আজ সোমবার সন্ধ্যা ৬টায় তা আরও বেড়ে দাঁড়ায় ২ হাজার ৩৭৫ মিলিয়ন ঘনফুট।
এর মধ্যে দেশীয় গ্যাসের সরবরাহ ছিল ১ হাজার ৬১১ মিলিয়ন ঘনফুট এবং এলএনজি থেকে পাওয়া গেছে ৭৬৪ মিলিয়ন ঘনফুট।
সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, বিদ্যুৎ ঘাটতির অন্যতম আরেকটি কারণ হিসেবে গ্যাসের সরবরাহ সংকটও সামনে এসেছে। পেট্রোবাংলার রবিবারের হিসাবে, গ্যাসভিত্তিক ৭২টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে ৪২টিতে প্রয়োজন অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ করা যাচ্ছে না। বিদ্যুৎ উৎপাদনে এসব কেন্দ্রের প্রয়োজন ২ হাজার ৫২৮ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। বিপরীতে সরবরাহ করা হচ্ছে ৮৮১ মিলিয়ন ঘনফুট। ফলে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বড় একটি অংশও পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না।