দেশে গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট সমাধান হবে কবে

সঞ্চিতা সীতু
১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২২:০০আপডেট : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২২:০৮

রাজধানীর ঘরে ঘরে এখন গ্যাসের সমস্যা। কোনও কোনও এলাকায় দিনের বেলায় একেবারে গ্যাস থাকে না। আবার কোনও কোনও এলাকায় দিনে গ্যাস থাকলেও সেখানে চাপ এত কম থাকে যে রান্নাই করা যায় না। ফলে বাধ্য হয়ে কেউ এলপিজি সিলিন্ডার ব্যবহার করছেন, আবার কেউ কেউ বিদ্যুতের চুলায় রান্না করে দিন পার করছেন। এদিকে আবার দিনের মধ্যে কয়েক দফা বিদ্যুৎ থাকছে না। ফলে একদিকে গ্যাসের সংকট, অন্যদিকে বিদ্যুতের ঘাটতি; দুই সংকটেই দীর্ঘদিনই ভুগতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। প্রশ্ন উঠছে, দেশে গ্যাস-বিদ্যুতের এই সংকটের সমাধান হবে কবে?

চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম

বর্তমানে দুটি এলএনজি টার্মিনাল সক্রিয় হওয়ার পরও রাজধানীতে গ্যাস সংকট কাটছে না। এর প্রধান কারণ, এলএনজি সরবরাহ ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি বাড়ানো যাচ্ছে না। ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ ক্ষমতার এলএনজি টার্মিনাল থেকে ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট কম পাওয়ার কারণ হিসেবে আমদানি বিঘ্নিত হওয়াকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। যদিও সরকার বলছে, চলতি মাসে বেশ কয়েকটি এলএনজি কার্গো আসার কথা রয়েছে। কিন্তু যতক্ষণ সেগুলো না আসবে, ততক্ষণ সাধারণ মানুষের কষ্ট কমানো যাচ্ছে না।

দেশে এখন মোট গ্যাসের চাহিদা ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। এর বিপরীতে সরবরাহ করা হচ্ছে গড়ে ২ হাজার ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুটের মতো। পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, রবিবার সন্ধ্যা ৬টার হিসেবে মোট গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছে ২ হাজার ৩৬২ মিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে ৭৫৫ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি থেকে পাওয়া যাচ্ছে। দেশীয় খনি থেকে সরবরাহ করা হয়েছে ১ হাজার ৬০৬ মিলিয়ন ঘনফুট।

আপাতত লোডশেডিং থেকে মুক্তি নেই

বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতি বিশ্লেষণ ও খাত সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আপাতত লোডশেডিং পুরোপুরি কমার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। গরমের কারণে বিদ্যুতের চাহিদা বেশি থাকায় ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। আবহাওয়াবিদদের মতে, সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গরমের তীব্রতা থাকতে পারে। অক্টোবরের মাঝামাঝির দিকে তাপমাত্রা কমলে বিদ্যুতের চাহিদাও কিছুটা কমতে পারে।

পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশের (পিজিসিবি) হিসাব বলছে, রবিবার সন্ধ্যা ৬টায় দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ২২৮ মেগাওয়াট। বিপরীতে সরবরাহ করা হয়েছে ৪ হাজার ২১০ মেগাওয়াট। ফলে ঘাটতি ছিল ৬৭০ মেগাওয়াট। তবে বেলা ৩টায় ছিল ২ হাজার ১৩৯ মেগাওয়াটে।

গ্যাস ও তেল সংকটেও ব্যাহত বিদ্যুৎ উৎপাদন

বিদ্যুৎ ঘাটতির অন্যতম কারণ হিসেবে গ্যাসের সরবরাহ সংকটও সামনে এসেছে। পেট্রোবাংলার হিসাবে, গ্যাসভিত্তিক ৭২টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে ৪২টিতে প্রয়োজন অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ করা যাচ্ছে না। বিদ্যুৎ উৎপাদনে এসব কেন্দ্রের প্রয়োজন ২ হাজার ৫২৮ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। বিপরীতে সরবরাহ করা হচ্ছে ৮৮১ মিলিয়ন ঘনফুট।

গ্যাসের সরবরাহ কম থাকায় এসব কেন্দ্রের উৎপাদন সক্ষমতা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। পরিস্থিতি সামাল দিতে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় চালানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। এদিকে তেলচালিত সাড়ে ৫ হাজার মেগাওয়াটের মতো বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে। আগে সংকটের সময় এসব কেন্দ্র থেকে চার থেকে সাড়ে ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎও উৎপাদন হতো। এখন জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি এবং ইরানে যুদ্ধের ফলে জ্বালানি তেলের অপ্রাপ্যতাও তৈরি হয়েছে। এতে করে এখন জ্বালানি তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনও কমে গেছে। এ ছাড়া বড়পুকুরিয়া, বাঘাবাড়ি ও সিরাজগঞ্জসহ কয়েকটি কেন্দ্রের উৎপাদন বন্ধ বা সীমিত রয়েছে। ফলে গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হলেও মোট উৎপাদন সক্ষমতার পুরোটা কাজে লাগানো যাচ্ছে না।

বিদ্যুৎ খাত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু তেল ও গ্যাস সরবরাহ বাড়ালেই বিদ্যুতের সংকটের সমাধান হবে না। একই সঙ্গে বন্ধ বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো দ্রুত উৎপাদনে ফেরানো, কেন্দ্রগুলোর কারিগরি সক্ষমতা নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।

সমাধান কবে?

গ্যাস সরবরাহ ঘাটতি ও বিদ্যুৎ সংকটে যখন নাকাল সাধারণ মানুষ, তখন সহসাই পরিস্থিতি থেকে মুক্তির পথও দেখা যাচ্ছে না। গ্যাসের সরবরাহ বাড়াতে এলএনজির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। ফলে জ্বালানি সরবরাহ, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও চাহিদা; এই তিনটি বিষয় সমন্বয় করে সংকট মোকাবিলা করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু তাৎক্ষণিকভাবে এলএনজি আমদানি বাড়িয়ে সংকট সামাল দেওয়া সম্ভব হলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি টেকসই সমাধান নয়। দেশের নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বি. ডি. রহমত উল্লাহ বলেন, এই পরিস্থিতি একদিনে হয়নি। দীর্ঘদিনের দুর্নীতি আর এক শ্রেণিকে সুবিধা দেওয়ার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের ওপর ভর্তুকির বোঝা চাপানোর ফলেই আজকের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। 

তিনি বলেন, ‘সরকার এলএনজি টার্মিনাল করার কথা বলছে, তবে এটি করতেও কমপক্ষে তিন বছর সময় লাগবে। ফলে বর্তমান সংকট দ্রুত সমাধানের সুযোগ নেই। তবে এখন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে গেলে দীঘমেয়াদে ভোগান্তি কমবে। এদিকে দ্রুত সমাধানের ক্ষেত্রে সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে মনোযোগ দিতে পারে।’

ফলে বর্তমান সংকট থেকে তাৎক্ষণিক স্বস্তির জন্য এলএনজি আমদানি বাড়ানোর ওপরই নির্ভর করতে হচ্ছে। আর দীর্ঘমেয়াদে ভোলার গ্যাস আনা এবং স্থলভাগ ও সাগরে তেল গ্যাস অনুসন্ধানের উদ্যোগগুলো বাস্তবায়ন হলে সরবরাহ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। তবে এসব উদ্যোগের কোনোটিই এখনকার সংকট দ্রুত কাটাতে পারবে না। ফলে গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটের স্থায়ী সমাধানের জন্য আরও সময় লাগবে। আর ততদিন ভোগান্তি পোহাতে হবে সাধারণ মানুষকে।

/ইউএস/
সম্পর্কিত
আদানির দুটি ইউনিট থেকেই বিদ্যুৎ পাচ্ছে বাংলাদেশ
সৌরবিদ্যুতের দিকে ঝুঁকছে বাংলাদেশ, বাধা কোথায়?
১৩ ঘণ্টা ধরে হাসপাতালে বিদ্যুৎ নেই, টর্চলাইটের আলোতে চলছে চিকিৎসা
সর্বশেষ খবর
দিনে বিএনপি, রাতে গুপ্ত ষড়যন্ত্র করে সাতক্ষীরার চারটি আসনে বিএনপিকে হারানো হয়েছে: আইনমন্ত্রী
দিনে বিএনপি, রাতে গুপ্ত ষড়যন্ত্র করে সাতক্ষীরার চারটি আসনে বিএনপিকে হারানো হয়েছে: আইনমন্ত্রী
দিনের গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক খবর
দিনের গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক খবর
মানুষের মেরুদণ্ড কি আসলেই সোজা?
মানুষের মেরুদণ্ড কি আসলেই সোজা?
হুথি হামলায় সৌদি পাইপলাইন বন্ধ, হুমকিতে ৪ শতাংশ তেল সরবরাহ
হুথি হামলায় সৌদি পাইপলাইন বন্ধ, হুমকিতে ৪ শতাংশ তেল সরবরাহ
সর্বাধিক পঠিত
গ্রেফতারের পর ৬৩ বিদেশি নাগরিক যার কথা বলেছেন, এবার সেই কর্মকর্তা গ্রেফতার
গ্রেফতারের পর ৬৩ বিদেশি নাগরিক যার কথা বলেছেন, এবার সেই কর্মকর্তা গ্রেফতার
ছিনতাইয়ের ২০ ভরি স্বর্ণ একাই নিয়ে এক মাসের ছুটিতে পুলিশ সদস্য
ছিনতাইয়ের ২০ ভরি স্বর্ণ একাই নিয়ে এক মাসের ছুটিতে পুলিশ সদস্য
টাকা দিলেই কল রেকর্ড-লোকেশন: কীভাবে চলতো এই চক্র
টাকা দিলেই কল রেকর্ড-লোকেশন: কীভাবে চলতো এই চক্র
ব্রিকস নেতাদের নৈশভোজে মোদির মেনুতে যা ছিল
ব্রিকস নেতাদের নৈশভোজে মোদির মেনুতে যা ছিল
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় তিতাস নদীতে বর্ণাঢ্য নৌকাবাইচ, দুই তীরে লাখো দর্শনার্থীর ভিড়
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় তিতাস নদীতে বর্ণাঢ্য নৌকাবাইচ, দুই তীরে লাখো দর্শনার্থীর ভিড়