বাংলাদেশে এই মুহূর্তের সবচেয়ে বড় সম্পদ হচ্ছে তরুণ সমাজ। সেই তরুণ সমাজকে নিয়ে সাজানো হচ্ছে বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা। টগবগে তাজা ও সবচেয়ে সম্ভাবনাময় তরুণ সমাজ আজ কিসের আকর্ষণে কেন বিপথগামী হচ্ছে সেটি অবশ্যই এই জাতিকে নিদ্রাহীন করার জন্য যথেষ্ট।
আমাদের দেশে বর্তমানে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। সবাই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বে সেটাও সম্ভব না। তাই শিক্ষার প্রসারে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থাকবে সেটা অস্বাভাবিক কিছু না।
এখানে প্রশ্ন হচ্ছে- জঙ্গিবাদ কি কেবল বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েই আছে? তাহলে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হত্যায় কেন বেরিয়ে আসছে তাদেরই ছাত্রের নাম? তার মানে এটি কেবল প্রতিষ্ঠানের সমস্যা নয়। এটি একটি সামাজিক ব্যাধি যা ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে সমাজের সমগ্র অংশে।
ঠিক তেমনিভাবেই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে কেবল ছাত্র রাজনীতি চালু করলেই তরুণরা দলে দলে সব শপথ নিয়ে সেখানে যোগ দেবে সেটা ভাবাটাও হবে সমস্যাকে ধরতে না পারার মতো আরেক ভুল। ছাত্র রাজনীতি কি আমাদের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আছে এখন? সেই ৫২, ৬২, ৬৯, ৭১, ৯০-এর ঐতিহ্য কি আছে? অথচ এই বাংলাদেশের জন্মই হয়েছে ছাত্র রাজনীতি'র মাধ্যমে। তাহলে আজ কেন তরুণসমাজ রাজনীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে? নাকি তাদেরকে বাধ্য করা হয়েছে মুখ ফিরিয়ে নিতে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে।
আমি মনে করি তরুণরা এখনও রাজনীতি বিমুখ হয়ে যায়নি। তাদের রক্তে বইছে রাজনীতি। এর উদাহরণ যুদ্ধাপরাধ ও সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী আন্দোলন। বলা হয় ২০১৩ সাল নাকি আরেকটি ১৯৭১। এই তুলনা কী প্রমাণ করে? এটা কি রাজনীতি বা রাজনৈতিক আন্দোলন নয়? অবশ্যই সেটা রাজনৈতিক আন্দোলন তবে কোনও নির্দিষ্ট দলের ব্যানারে নয়। তার মানে বুঝতে হবে, আজকের তরুণরা ব্যানারভিত্তিক রাজনীতি পছন্দ করছে না। কারণ কী? এই প্রশ্নেরও সমাধান হওয়াটা জরুরি। অন্তত রাজনীতিবিদদের এই আলোচনা করাটা অত্যন্ত জরুরি।
কেউ কেউ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র রাজনীতি চালু করাটাকে মনে করছেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কলুষিত করার উদ্দেশ্য। কেন ভাই? শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মানেই ছাত্র, আর ছাত্র মানেই সে কোনও না কোনওভাবে তার অধিকারভিত্তিক আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত থাকবে। যদি এটি না হবে তাহলে সাম্প্রতিক কালের ভ্যাট বিরোধী বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনকে কিভাবে ব্যাখ্যা করবেন? এটি কি রাজনীতি নয়?
রাজনীতি আসলে কী? রাজনৈতিক সচেতনতা বা রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা মানে কেবল মিছিল-মিটিং নয়। রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা মানে একটি বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে প্রভাবিত করে এমন কোনও বিষয়ে যুক্তি, তর্ক, আলোচনা, সমালোচনা, দাবি আদায় নিয়ে আন্দোলন, সংগ্রাম। রাজনৈতিক তর্ক মানেই নিজের মত প্রকাশ, মত প্রকাশ করতে গেলেই তাকে অবশ্যই সেই বিষয়ের গভীরে ঢুকতে হয়। এভাবেই গড়ে ওঠে একটি যুক্তি তর্কের পরিবেশ, যেখানে সবাই তার যৌক্তিক অবস্থানকে পরিষ্কার করবে। রাজনীতি থাকলেই তবে একজন তরুণ বুঝবে তার পক্ষেও কথা বলার কেউ আছে। প্রশাসন চাইলেই তাদের ইচ্ছামতো কোনও সিদ্ধান্ত নিয়ে নিতে পারে না। সে বুঝবে তার বলার কিছু আছে।
এই যে তাদের সচেতনতা, এটাইতো রাজনীতি। তাহলে কেন আমরা বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রাজনীতির কথা শুনেই ক্ষেপে উঠছি? বিষ রাজনীতিতে নেই, বিষ আছে রাজনীতিবিদদের চর্চায়। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে আজকে ছাত্র সংসদকে আবার সক্রিয় করার দাবি উঠছে। তাহলে কেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ থাকবে না? কেন ছাত্র প্রতিনিধি থাকবে না? তার মানে আমরা খুব অবচেতন মনেই ধরে নিয়েছি বেসরকারি মানেই সেখানে 'নাদুস নুদুস' কিছু ছেলেমেয়ে পড়াশুনা করবে যাদের কাজ হচ্ছে 'ফটর ফটর' ইংরেজিতে কথা বলতে শেখা আর পোজ মেরে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসা যাওয়া করা। তারা এই বাংলাদেশের নাগরিক নয়, তারা ভোট দেয় না, তাদের কোনও রাজনৈতিক দর্শন থাকতে নেই। তাদের ভাবজগতে থাকবে না বাংলাদেশ, এদেশের মাটি জলে বড় হয়ে, এদেশের খেয়ে পড়ে, সরকারি সব সুযোগ কাজে লাগিয়ে দুদিন পর তারা চিন্তা করবে কিভাবে ক্রেডিট ট্রান্সফার করে ইউরোপ, আমেরিকা পাড়ি জমানো যায়। কিংবা মালয়েশিয়াতে গিয়ে, তুরস্কে গিয়ে বা সিরিয়া থেকে ট্রেনিং নিয়ে এসে এই বাংলাদেশেরই সর্বনাশ করা যায়।
আজ যখন আলোচনা উঠেছেই তাহলে চলুক সব জায়গায়। যাতে করে আমরা ফিরে পেতে পারি আমাদের সেই শান্তির সেই বাংলাদেশ। আর তাই ছাত্র রাজনীতিকে বিষমুক্ত করার জন্য লড়াই করতে হবে। ছাত্র রাজনীতি বিষ হলে আজকের বাংলাদেশ হতো না। আমি আপনি মন খুলে বাংলায় কথা বলতে পারতাম না। সেই হিসাবেই সবার কাছে অনুরোধ- আরেকবার ভেবে দেখুন, ছাত্র রাজনীতির সেই ঐতিহ্য ফিরে এলে শেষ পর্যন্ত লাভ এই পোড়া বাংলাদেশেরই।
লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
আরও পড়তে পারেন: ছাত্র রাজনীতির বিষ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে নয়