বাংলাদেশ ও উন্নয়ন সহযোগী চীন

মোস্তফা হোসেইনউন্নয়ন সহযোগী হিসেবে চীন বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠতর। রাজনৈতিক পরিবর্তনেও হেরফের হতে দেখা যায় না। স্বাধীনতার আগে থেকে বাংলাদেশের উন্নয়নে চীন সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছে। একাত্তরে ভুলে হোক কিংবা ভূরাজনৈতিক কারণেই হোক চীন আমাদের বিরোধী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিল। বাস্তব সত্যটা মেনে নেওয়ার পরও বলতে হয়, স্বাধীনতা লাভের পর থেকে তারা অধিক আগ্রহের সঙ্গে বাংলাদেশের পাশে এসে দাঁড়ায়। শুধু তাই নয় যারা চীনের এগিয়ে আসার সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বকে মেলানোর চেষ্টা করেন, তাদেরও ভাবা দরকার চীনের সঙ্গে সম্পর্ক কিন্তু বঙ্গবন্ধুর জীবদ্দশাতেই শুরু হয়। বঙ্গবন্ধু জীবিত থাকলে হয়তো ৭৫ এর মধ্যেই চীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতিও প্রদান করতো। অন্তত বিশ্ব রাজনীতিতে বাংলাদেশের উত্থান প্রচেষ্টায় চীনের ধীরে ধীরে ইতিবাচক পরিবর্তন তাই প্রমাণ করে।
বাংলাদেশকে চীনের স্বীকৃতি প্রদানের আগে থেকেই চীন ও বাংলাদেশ বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রে সম্পর্ক স্থাপন করে। এরপর যখন স্বীকৃতি প্রদান করে তখন পুরোদমে তারা উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে বাংলাদেশের পাশে এসে দাঁড়ায়। বলতে দ্বিধা নেই প্রথম দিকে তারা অধিকতর আগ্রহী ছিল অবকাঠামোগত উন্নয়নে। কিন্তু ধাপে ধাপে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, সাংস্কৃতিকসহ বিভিন্ন খাতে তাদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পায়। এই বৃদ্ধির হারকেও কোনও কোনও ক্ষেত্রে চমকপ্রদও বলা যায়। বাংলাদেশকে সহযোগিতার হিসাবে দেখা যায়- ২০০২ থেকে ২০০৯ পর্যন্ত যেখানে এই অংক ছিল ২০০ মিলিয়ন ডলার। সেটা ২০০৯ থেকে ২০১৫ তে এসে দাঁড়িয়েছে ৯০০ মিলিয়ন ডলারে। আগামী ৫ বছরে এই অংক দুই বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে বিশেষজ্ঞগণ অভিমত প্রকাশ করেছেন। আর এর জন্য যে ক্ষেত্র প্রয়োজন তাও বাংলাদেশের অনুকূলে।
বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান উন্নয়নের সূত্রে এই মাত্রা অতিক্রম করে গেলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। বিশেষ করে সাম্প্রতিক বছরে বাংলাদেশের সমুদ্র সম্পদ আহরণ ও সমুদ্র বন্দরের মাধ্যমে এগিয়ে যাওয়ার যে সুযোগ তৈরি হয়েছে, তাকে কাজে লাগিয়ে দুই দেশই যথেষ্ট লাভবান হতে পারে। এক্ষেত্রে চীনের আগ্রহও লক্ষণীয়। মায়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা সংক্রান্ত জটিলতা নিরসন ও বাংলাদেশ লাভবান হওয়ার পর, চীন বাংলাদেশের উন্নয়নে সহযোগী হিসেবে আগের চেয়ে বেশি আগ্রহী হয়ে উঠেছে। গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণে তাদের আগ্রহের কথা উচ্চ পর্যায়েও আলোচিত হয়েছে বলে বিভিন্ন সময় জানা গেছে। সোনারদিয়া কিংবা পায়রা বন্দর যেটাই বাংলাদেশের স্বার্থের অনুকূলে হয়, সেবিষয়ে বাংলাদেশ ভূমিকা নিতে পারে। সেই সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ নিজস্ব উদ্যোগে সমুদ্র সম্পদ আহরণের যে চেষ্টা চালিয়ে আসছে, তাকে বেগবান করতেও চীনের সহযোগিতা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ সমুদ্র সম্পদ আহরণের জন্য দক্ষ জনশক্তি তৈরির ক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে। এই বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও একাধিকবার বলেছেন। তিনি বহুবার তাগাদা দিয়েছেন, মানবসম্পদ উন্নয়ন করে সমুদ্র সম্পদ আহরণে বাংলাদেশকে শক্তিশালী পদক্ষেপ নিতে হবে। তার এই বক্তব্যকে যথাযথ মনে করা যায় যৌক্তিক কারণে। আর সেই কাজটি এগিয়ে দিতে পারে চীনের সহযোগিতা। হয়তো সমুদ্র সম্পদ আহরণ ও সমুদ্র বন্দর বিষয়ে চীনের প্রেসিডেন্টের আগমন উপলক্ষে সুফলের খবরও আমরা জানতে পারবো।
সম্প্রতি সড়ক ও যোগাযোগ মন্ত্রী ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ বিষয়ে বক্তব্য রেখেছেন। চীনের এই উদ্যোগটির সঙ্গে বাংলাদেশ যুক্ত হলে তা বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে বড় ধরনের ইতিবাচক ফল আনতে পারে। বাংলাদেশ প্রতিবেশি দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ ও পণ্য পরিবহন ব্যবস্থায় যে কার্যকর কিছু কর্মসূচি নিয়েছে, সেক্ষেত্রে ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ হতে পারে মাইল ফলক। মায়ানমার ও ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক দৃঢ়তর হতে পারে এই কর্মসূচি বাস্তবায়ন হলে। চীন ও ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের যে বাণিজ্য বৈষম্য বিদ্যমান তা কমিয়ে আনার ক্ষেত্রেও তার অবদান হবে লক্ষণীয়। বাংলাদেশ আরেকটি সুবিধা পেতে পারে এই সুবাদে। চীন স্বল্পসুদে ঋণ সহযোগিতার ব্যবস্থা রেখেছে এখাতে। ‘সিল্করোড ফান্ড খ্যাত’ এসুযোগ লাভ করবে বাংলাদেশ। আশার কথা, সড়ক ও যোগাযোগ মন্ত্রীর বক্তব্য স্পষ্ট না হলেও ইঙ্গিতটা সেদিকেই মনে হয়। হয়তো চিনের প্রেসিডেন্টের বাংলাদেশ সফরকালে এ বিষয়ে আমরা স্পষ্ট কোনও নির্দেশনাও পেতে পারি।

বাংলাদেশে রফতানি উন্নয়নে আশানুরূপ সাফল্য পায়নি। যেকারণে বাণিজ্য সম্পর্ক থাকা দেশগুলোর প্রায় সবার সঙ্গেই বাংলাদেশের বাণিজ্য বৈষম্য বিশাল। সেফারাক কমিয়ে আনার জন্য রফতানি উন্নয়নের বিকল্প নেই। সেক্ষেত্রে চীন আরও সুযোগ বাংলাদেশ থেকে পেতে পারে। বাংলাদেশে বিনিয়োগ সুবিধা সম্প্রসারিত হলে বাংলাদেশের রফতানি উন্নয়নে অগ্রসরযাত্রা তরান্বিত হবে। এক্ষেত্রে আমাদের দেশে তৈরি পোশাক শিল্পখাতে তারা যুক্ত হতে পারে আরও। আমাদের দেশ তাদের থেকে গার্মেন্ট এক্সেসরিজ আমদানি করে। এখাতে তারা বাংলাদেশে সহজেই বিনিয়োগ করতে পারে। আর এজন্য সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতেরই সুযোগ রয়েছে। এতে করে চীন যেমন স্বল্প শ্রম ব্যয়ে পণ্য উৎপাদন করতে পারবে, তেমনি বাংলাদেশও আমদানির মাধ্যমে যে ব্যয় হয়, তা থেকে অনেকটা সাশ্রয় লাভ করতে পারে। বাংলাদেশও কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবে।

চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক সম্পর্ক গভীর। শিক্ষা ও প্রশিক্ষণে দেশ দুটি একে অন্যের আরও ঘনিষ্ঠ হতে পারে সহজেই। যেকোনও উন্নয়ন ও সহযোগিতার পূর্বশর্ত রাজনৈতিক সমঝোতা সেটাও রয়েছে দেশ দুটিতে। এপর্যায়ে সুষ্ঠু পরিকল্পনা আর আন্তরিকতা থাকলে দেশ দুটি আরও সুবিধা পেতে পারে। আশার কথা চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বাংলাদেশ সফর আমাদের যথেষ্ট আশান্বিত করেছে। বাংলাদেশ নিজ স্বার্থ চিন্তা করে তাদের কাছ থেকে কতটা আদায় করতে পারে সেটাই এখন দেখার বিষয়। কারণ, তারা স্পষ্ট বুঝতে পারছে বাংলাদেশ এক দশককাল আগে যে পর্যায়ে ছিল এখন আর সেঅবস্থায় নেই। তাদের ভাবতে হচ্ছে, এখানে বিনিয়োগ হলে তারা মুনাফার হারও সহজেই বাড়াতে পারে। এমনটা হলে তাদের মতো বাংলাদেশও উপকৃত হবে।

ভূরাজনৈতিক বিষয়ে ভারত আমাদের জন্য বড় বিষয়। দুই দশক আগে হলে চীনের সঙ্গে এভাবে ঘনিষ্ঠ হওয়ার আগে হয়তো ভারতের কথা মাথায় আনতে হতো। বিশ্বায়নের যুগে এসে ভারতও চিনের সঙ্গে দূরত্ব কমিয়ে আনছে। তাদের সীমান্ত সমস্যাও অনেকদিন ধরে স্থিতিশীল। অর্থনৈতিক সহযোগিতা কার্যক্রমও এগিয়ে চলেছে। শুধু তাই নয়, চিনের প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশ সফর শেষ করেই ভারতে যাচ্ছেন। যা বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কেরই পরিচায়ক। সুতরাং ভূরাজনৈতিক কারণেও বাংলাদেশ ও  চীন আগের চেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। চীনের প্রেসিডেন্টের এসফর থেকে যার সুফল আমরা প্রত্যাশা করতে পারি।

চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সফরকে কেন্দ্র করে যেসব আলোচনা বিভিন্ন মহলে হচ্ছে তাতে মনে হয়, বাংলাদেশ সেই সুযোগটি পেতে যাচ্ছে। তার সফর উপলক্ষে যেসব সমঝোতা ও চুক্তি সই হওয়ার কথা, সেগুলোও এসব সহযোগিতা বিষয়ে দুদেশের আন্তরিকতারই বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করি।

লেখক: সাংবাদিক, শিশুসাহিত্যিক ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক