তরুণ বাবার করুণ ছবি, হাতে পুতুল একটা। স্পষ্ট দেখা যায়, গাল ভিজে আছে চোখের পানিতে। সংবাদের শিরোনামে যাওয়ার আগেই বোঝা যায় কোনও শিশুর পিতা তিনি। সংবাদে প্রবেশকালে পাঠকেরও চোখ ভিজে যায়। সন্তানহারা এক পিতার কান্নাজড়িত কথা।
‘মেয়েটাকে শেষবারের মতো বুকে নিতে পারলাম না। এক ফোঁটা পানিও দিতে পারলাম না মুখে। অথচ আমার মেয়েটা একবার আমার বুকে আসতে আবদার করেছিল। বলেছিল, আমাকে পানি দাও।’
এই বাচ্চা মেয়েটি ২ এপ্রিল ঢাকার মিরপুরে ডা. এমআর খান শিশু হসপিটাল অ্যান্ড ইস্টিটিউট অব চাইল্ড হেলথে নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করে।
৪ বছর ৩ মাসের এই আরশি একা নয়। এভাবে শতাধিক আরশিকে জীবন দিতে হয়েছে হামে আক্রান্ত হয়ে। গণমাধ্যমে তাদের মৃত্যু সংবাদ প্রচার হয়, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী ও সংশ্লিষ্টদের ডেকে কথা বলেন, কিন্তু ঠেকানো যাচ্ছে না হামে আক্রান্ত শিশুদের মৃত্যুকে। কারণ শিশুদের টিকা দেওয়া হয়নি।
মাত্র দুই মাস বয়সের সরকারের ওপর দোষ চাপানোর সুযোগ কম। তাদের হয়তো পরামর্শ দেওয়া যায়, এই মুহূর্তে সরকার দ্রুত গতিতে কী কী পদক্ষেপ নিতে পারে। আর যতই পীড়াদায়ক ঘটনা হোক না কেন, মানুষও এর জন্য বর্তমান সরকারকে গালমন্দ করে না। এরপরও স্বাস্থ্যমন্ত্রী নিজেদের উদ্যোগের কথা বলার চেয়ে অতীতের ব্যর্থতাকে তুলে ধরাকেই অগ্রাধিকার দিলেন। আর সেই দোষারোপও আবার প্রশ্নবোধক হয়ে দাঁড়ায়। ‘গত সাড়ে পাঁচ বছর হাম-রুবেলার বিশেষ টিকা দেওয়ার কর্মসূচি হয়নি বলে জাতীয় সংসদকে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন। ফলে নবজাতকসহ যারা হামের টিকা আওতার বাইরে থেকে যায়, তারাই এখন হামে আক্রান্ত হচ্ছে। জাতীয় সংসদের অধিবেশনে দেশে হামের প্রাদুর্ভাব রোধে জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ নিয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সংসদ সদস্য আখতার হোসেনের নোটিশের জবাবে মন্ত্রী এ কথা জানান।’
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বক্তব্য সঠিক হলে অবশ্যই এই মৃত্যুর দায় আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার ও ড. মুহম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন সরকারকে বহন করতে হবে। কিন্তু প্রকাশিত সংবাদ ভিন্ন তথ্যও প্রদান করে। এই বিষয়ে বিবিসি নিউজের সংবাদের দিকে তাকানো যায়—বাংলাদেশে শিশুদের টিকা দেওয়া হতো আন্তর্জাতিক স্বীকৃত সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব সংস্থা গ্যাভির আর্থিক সহায়তায়—ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা কেনা হতো। সেক্টর প্রোগ্রামিং মাধ্যমে টিকাগুলো শিশুদের দেওয়া হতো। গ্যাভি ও ইউনিসেফের সহায়তায় এই কর্মসূচি ২০২২ সালে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু করোনার কারণে তৎকালীন সরকার ও দাতা সংস্থা এই কর্মসূচির মেয়াদ ২০২৪ সালের জুন মাস পর্যন্ত বর্ধিত করে।
অথচ বাংলাদেশে টিকাদান কর্মসূচি আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিল। এটা হয়েছিল বয়স দুই বছর পূর্ণ হওয়ার আগে দেশের ৮২ শতাংশ শিশু জীবনরক্ষাকারী টিকা পেতো। কোনও কোনও ক্ষেত্রে এই হার ৯৯ শতাংশ পর্যন্ত হওয়ার তথ্য রয়েছে। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশের টিকাদান কর্মসূচির সাফল্যের জন্য বাংলাদেশ ভ্যাকসিন হিরো মর্যাদাও লাভ করে। ইপিআই বা সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির এমন করুণ পরিণতির পেছনে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়ামক ভূমিকা পালন করেছে।
২০২৪ সালের জুন মাসে আওয়ামী লীগ সরকারের অন্তিম অবস্থা ছিল। জুলাই মাসে তো সরকার কার্যত কোমায় চলে যায়। আগস্টের ৫ তারিখ সরকারকে বিদায় নিতে হয়। সুতরাং, বলা যায়, ওই সরকার থাকাকালীন টিকা কর্মসূচি চালু ছিল। এবার দেখা যাক অন্তর্বর্তী সরকার কী পদক্ষেপ নিয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগ সরকারের অধিকাংশ সিদ্ধান্তকে সংস্কারের আওতায় আনে। টিকাদান কর্মসূচিও তার মধ্যে পড়ে। ইতোমধ্যে ২০২৪-এর শেষার্ধ গত হয়। ২০২৫ এর মার্চে এসে সংস্কারের আওতায় তারা সেক্টর প্রোগ্রামগুলো সব বাতিল করে দেয়। তার মানে ইউনিসেফকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশকে টিকা কিনতে হবে। টাকার দরকার। প্রস্তাব যায় অর্থ মন্ত্রণালয়ে। অর্থ মন্ত্রণালয় প্রশ্ন তোলে—ইউনিসেফকে বাদ দিয়ে নিজস্ব টাকায় কেন টিকা কিনতে হবে। আমলাতান্ত্রিক দৌড়ঝাঁপ চলে। এই দৌড়ঝাঁপ চলে কয়েক মাস। অন্তর্বর্তী সরকার আবার ইউনিসেফকে যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেয়। অর্থ ছাড়, হিসাব নিরীক্ষাসহ প্রাসঙ্গিক কাজে চলে যায় ৬ মাস। এই সময় টিকা কেনা বন্ধ রাখে অন্তর্বর্তী সরকার। টিকার সংকট দেখা দেয় অন্তর্বর্তী সরকারের সময়। এ বিষয়ে গত ২ এপ্রিল জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেনের মন্তব্য প্রকাশ হয়েছে বিবিসি নিউজে। তিনি বলেছেন, ‘টিকা ব্যবস্থায় পরিবর্তন আসার ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকারের যথেষ্ট প্রস্তুতির অভাবের কারণে এগুলো ঘটেছে। সেক্টর প্রোগ্রামগুলো হঠাৎ করে বাদ না দিয়ে ধীরে ধীরে পরিকল্পিতভাবে বের হয়ে এলে টিকা ব্যবস্থা বিঘ্নিত হতো না।’
বিবিসি থেকে অন্তর্বর্তী সরকারের স্বাস্থ্য উপদেষ্টার মন্তব্য চাওয়া হলে তিনি মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকেন।
এদিকে সেক্টর প্রোগ্রাম বন্ধ থাকার কারণে ম্যালেরিয়া, যক্ষ্মা, এইডসসহ অন্যান্য স্বাস্থ্য কর্মসূচিও বন্ধ রয়েছে। টিকার সংকট রয়েছে যক্ষ্মা, পোলিও, নিউমোনিয়া, ডিপথেরিয়া, হুপিংকফ, ধনুষ্টংকারসহ বেশ কয়েকটি রোগের। এই তথ্য স্বাস্থ্য অধিদফতরই স্বীকার করেছে। ফলে বলতে হয় সংকটকে সঙ্গী করেই বর্তমান সরকারের যাত্রা।
অপরদিকে চিকিৎসা ব্যবস্থাও সুখকর নয়। এর মধ্যে হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা সুবিধার অনুপস্থিতির চিত্রও বেরিয়ে এসেছে। হামের চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে আইসোলেশনের প্রয়োজন। কিন্তু নেই। চিকিৎসা ব্যবস্থার দুরবস্থা জানতে স্বয়ং স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বক্তব্যই পড়া যায়।
বিভাগীয় শহর রাজশাহীতে গিয়েছিলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন। রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আইসিইউ ভেন্টিলেটরের অভাবে শিশুদের মৃত্যুর ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তিনি। বলেন, ‘১১ দিনে ৩৩ জন বেবি (শিশু) মারা গেছে আমার। রাজশাহীতে সেই ডাইরেক্টর (পরিচালক) আমাদের বলে নাই যে তার ভেন্টিলেটর নেই, নিউনেটাল ভেন্টিলেটর নেই, ওকে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলানো উচিত।’
কিন্তু আমাদের হাসপাতালগুলোতে আইসোলেশন একেবারেই নেই। জেলা-উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালসহ বড় বড় হাসপাতালেও নেই। বিশেষ করে রাজশাহী অঞ্চলের কথা বেশি সামনে এসেছে। হাসপাতালে আইসিইউ ও এনআইসিইউ নেই।’
দুর্বিষহ অবস্থার জন্য একবাক্যে বিগত সরকারকে দায়ী করবে। কিন্তু এতে কি সমস্যার সমাধান হবে? রাজনীতির কারণে সমালোচনা হতেই পারে। কিন্তু এই মুহূর্তে দরকার দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ। আন্তর্জাতিক দুর্যোগ করোনার সময় টিকার বিশ্বব্যাপী সংকট দেখা দেয়। ওই সময়ের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানো যেতে পারে। ওই বিশেষজ্ঞদের প্রায় সবাই এখনও সরকারে আছেন। জাতীয় স্বার্থেই দ্রুত সমাধান প্রয়োজন।
সব শেষে একটাই কথা—আমরা আর কোনও আরশিকে হারাতে চাই না।
লেখক: সাংবাদিক, শিশুসাহিত্যিক ও মুক্তিযুদ্ধ গবেষক




