আবারও বাড়ছে বিদ্যুতের দাম। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) প্রস্তাব করেছে পাইকারি বিদ্যুতের দাম ইউনিট প্রতি ২১ থেকে ২৯ শতাংশ বাড়ানো হোক। একইসঙ্গে পিজিসিবি সঞ্চালন চার্জও বাড়াতে হবে ১৯ পয়সা। এই প্রস্তাব মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা হিসেবেই গণ্য হবে। একইসঙ্গে মাথাব্যথার জন্য মাথা কেটে ফেলার উদ্যোগও বলা যায়। বিইআরসির কথা, বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে অর্থাৎ তাদের লোকসান কমিয়ে আনার জন্য এর কোনও বিকল্প নেই। প্রদর্শিত হিসাব অনুযায়ী বর্তমান অবস্থায় বছরে ৬০ হাজার কোটি টাকা লোকসান দিতে হচ্ছে, বর্তমান হারে বিদ্যুৎ বিল আদায় করতে থাকলে। এবং প্রস্তাবিত হারে বিল আদায় করলে ১৩ হাজার ২৯৮ কোটি টাকা লোকসান কমবে। অর্থাৎ এটা ভর্তুকি থেকে কমবে। ৬০ হাজার কোটি টাকা ১৩ হাজার কোটি টাকা কমার পরও লোকসান থাকবে অনেক বেশি। তার মানে এবারই শুধু নয়, আগামীতেও বাড়বে এই ইঙ্গিতও দিচ্ছে।
যখনই বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়, লোক দেখানোর মতো একটা গণশুনানিরও আয়োজন করা হয়। সেখানে মূল্য বৃদ্ধির পক্ষে এবং বিপক্ষে মতামত আসে। মতামত প্রকাশ হয়, কিন্তু আখেরে তা হারিয়ে যায়। সরকার যে সিদ্ধান্ত নেয় তাই বাস্তবায়ন হয়। এবারও গণশুনানি হয়েছে, বিশিষ্টজনের কাছ থেকে এর বিরূপ প্রভাবের কথাও শোনা গেছে। কিন্তু সেই আগের মতোই যে এবারও বিদ্যুতের বিল নিশ্চিত বৃদ্ধি হবে, তা বোধকরি খুলে বলার প্রয়োজন নেই। কথা হচ্ছে, কতটা ভর্তুকি দিয়ে এই খাতকে চালানো হবে। পিডিবি যে লোকসানের কথা বলছে, তা অবশ্যই সহনীয় পর্যায়ে নেই। এই অসহনীয় লোকসান কেন? বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণে বিকল্প উৎপাদন ব্যবস্থা করার খবর কী, এগুলো সঙ্গত কারণেই সামনে চলে আসে।
জ্বালানির ব্যয় বৃদ্ধি, ডলারের মূল্যসহ সেই পুরোনো কারণই উল্লেখ হচ্ছে। আর অংশীজনেরা চিৎকার করছে দুর্নীতি কমাও। বিদ্যুৎ বিভাগের বাইরের বিশেষজ্ঞরা বলছেন—নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো হোক। এই বলা আর সরকারের না শোনা সমান তালে চলছে। সব সরকারই সহজ পথে হাঁটতে পছন্দ করে। ভর্তুকি কমাতে দাম বাড়ানোই তাদের সামনে সমাধানের উপায়। কিন্তু এই দুরবস্থা থেকে রক্ষা পাওয়ার দীর্ঘস্থায়ী কোনও পরিকল্পনাই করা হয় না। বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে পরামর্শ দেওয়া হলেও বাস্তবায়ন হয় না।
বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রধান উপাদান জ্বালানি যে কতটা ভোগাতে পারে, বোধ করি এ বছর সবচেয়ে বড় উদাহরণ তৈরি করেছে। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের কারণে দেশে জ্বালানি সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করেছিল। যদিও সরকার বিদ্যুৎ খাতে বড় বিপর্যয় ঠেকাতে অনেকটা সফল হয়েছিল, কিন্তু ক্রমাগত লোডশেডিং মানুষকে বিরক্ত করেছে অবর্ণনীয়। এই যে জ্বালানির কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যয় বৃদ্ধি এবং ঝক্কি পোহানো, এ থেকে বাঁচার জন্য বিকল্প ব্যবস্থা অর্থাৎ নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে আন্তরিক সরকার?
আওয়ামী লীগ সরকার আমলে ৩৭টি প্রকল্পের মাধ্যমে ২৪০০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তাছাড়া ৫ হাজার মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনেরও পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছিল। ভাসমান সৌর বিদ্যুৎ, সোলার হোম সিস্টেম, মিনি গ্রিডসহ বেশ কিছু পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সরকার পরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগ সরকার আমলে গৃহীত পুরো প্রকল্প বাতিল করে দেয় ড. মুহাম্মদ ইউনূস সরকার। অথচ নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বড় ধরনের বিদেশি বিনিয়োগের দ্বার উন্মোচিত হয়েছিল। যাতে অন্তত ৬ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ আশা করা হয়েছিল। এসব প্রকল্পের অধিকাংশই ছিল সৌর ও বায়ুভিত্তিক নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র। ড. মুহাম্মদ ইউনূস সরকার প্রকল্পগুলো বাতিল করার সময় বলেছিল, কম দামে ও ন্যায্যমূল্যে যৌক্তিকভাবে দরপত্র আহ্বান করে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে বিনিয়োগকারী সিলেকশন করবে। বাস্তবতা তার বিপরীত। এতে বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ পরিবেশ নিয়ে নেতিবাচক বার্তা গিয়েছে। সরকারের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে চুক্তি নীতির পরিবর্তন হওয়ার কারণে শুধু এই খাতেই নয় অন্যান্য বিনিয়োগেও বিদেশিদের মধ্যে যে মনোভাব তৈরি করেছে, সেটা দেশের উন্নয়নের পথে প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করবে।
জ্বালানির উচ্চমূল্যের কথা সবাই বলে। অথচ সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে বাধা হিসেবে বিশাল করের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। পদে পদে কর আরোপ করে প্রকৃত অর্থে এই খাতে এগিয়ে যাওয়ার পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, এটা বললে বাড়িয়ে বলা হবে না। সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত সোলার প্যানেল, ইনভার্টার, ব্যাটারি, ডিসি ক্যাবলসহ বিভিন্ন যন্ত্রাংশ আমদানিতে ২৫ থেকে ৮৯ শতাংশ পর্যন্ত মোট কর আরোপ করা আছে। হাত পা বেঁধে সাঁতার কাটতে বলার সঙ্গেই এর তুলনা চলে। পরিবেশবান্ধব এই সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার বাড়াতে কর হার কমিয়ে আনার বিকল্প নেই।
এই বিদ্যুৎ উৎপাদনের বর্তমান পদ্ধতি যেখানে ৬০ হাজার কোটি টাকা সরকারকে ভর্তুকি দিতে হচ্ছে, এই পরিমাণ টাকা বেঁচে যাবে— যদি সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনের দিকে নজর দেওয়া হয়। প্রয়োজনে শূন্য কর আরোপ করার মাধ্যমে দেশে সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়।
নবায়নযোগ্য উৎস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে যুক্তরাষ্ট্র, চীন এমনকি প্রতিবেশী ভারত যে উদাহরণ তৈরি করেছে, আমাদের দেশ তা অনুসরণ করছে না কেন, তা রহস্যজনক। প্রতিবেশী ভারত আজকে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ খাতের দেশগুলোর মধ্যে বিশ্বে তৃতীয় স্থান দখল করে নিয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে তারা নবায়নযোগ্য উৎস থেকে অন্তত ৫০০ গিগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে কাজ শুরু করেছে। বিশ্বে প্রথম স্থানে রয়েছে চীন তারপরের অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের। বাংলাদেশকে এ ক্ষেত্রে ইতিবাচক পদক্ষেপ না নিলে প্রথাগত পদ্ধতিতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পথ ধরে রাখলে সামনে বিপর্যয় দেখা দিতে পারে।
দুর্নীতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা হয়। তবে এই আলোচনায় যতটা রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য করা হয়, দুর্নীতি কমানোর জন্য ততটাই নির্লিপ্ত থাকতে দেখা যায়। প্রতিটি সরকার ক্ষমতায় এসে বিগত সরকারকে চোর বানানোর প্রতিযোগিতায় নামে। কিন্তু নিজের দায়িত্ব ভুলে যায়। যে কারণে বিদ্যুৎ খাতে দুর্নীতি হেসে-খেলে বিস্তার লাভ করতে থাকে। দুর্নীতি কোথায় হচ্ছে এটা জানা। শুধু জায়গাগুলোতে হাত দিলেই অনেকটা সুফল আসতে পারে।
একটা অফিস আদেশ দিয়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো সহজ। কিন্তু এই একটা আদেশের কারণে সাধারণ মানুষের যে ভোগান্তি তৈরি হবে, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির কারণে জনজীবনে যে স্থবিরতা তৈরি হবে, তার রেশ কিন্তু অনেক দূর পর্যন্ত থাকবে। সুতরাং, বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর সময় সরকারকে সেদিকেও নজর দিতে হবে। কারণ বিদ্যুৎ এখন গ্রামে গ্রামে চলে গেছে। ৫ কোটি গ্রাহকের মাধ্যমে অন্তত ১৪/১৫ কোটি মানুষ এখন বিদ্যুৎ ব্যবহার করছে। শুধু শিল্প কারখানায় নয়, গ্রামীণ জনপদেও এখন বিদ্যুৎ অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। সুতরাং, বিদ্যুতের ওপর হাত দিলে গোটা দেশই আক্রান্ত হবে। তাই এই খাতে দুর্নীতি কমিয়ে বিকল্প উৎপাদন ব্যবস্থায় যাওয়া যত দ্রুত হবে ততই মঙ্গল।
লেখক: সাংবাদিক, শিশুসাহিত্যিক ও মুক্তিযুদ্ধ গবেষক




