বিশ্বায়নের যুগে বাণিজ্য চিন্তা প্রাধান্য পায়। সেক্ষেত্রে টেলিভিশন চ্যানেলগুলো বিজ্ঞাপন হারানোর কারণে তাদের পথে তারা চেষ্টা করতেই পারে। সেটাকে দোষের বলে মনে করি না। একইভাবে বাণিজ্য চিন্তা করে পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোও বিদেশি চ্যানেল কিংবা অন্য কোনও প্রচার মাধ্যমে যদি তাদের পণ্যের বিজ্ঞাপন দেয়, তাহলে কি তাদের দোষারোপ করা যাবে। সঙ্গত কারণেই এই মুহূর্তে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার প্রশ্নটি এসে যায়। যে পণ্যের উৎপাদক মনে করেন তিনি ভারতীয় চ্যানেলে বিজ্ঞাপন দিলে তার বিপনন সুবিধা বেশি, তাকে কি সেই পথ থেকে ফিরিয়ে আনার যুক্তি আছে? দেশের চ্যানেলগুলো যেমন তাদের বাণিজ্য সুবিধার জন্য বিদেশি চ্যানেলে বিজ্ঞাপন না দিয়ে দেশীয় চ্যানেলে দেওয়ার দাবি করতে পারে তেমনি পণ্য উৎপাদনকারীওতো মনে করতে পারে, তার পণ্যের বিপণন সুবিধার্থে তিনি বৈধ যে কোনও প্রচার সুবিধাই নিতে পারেন। এটা দেশে কিংবা বিদেশ যেখানেই হোক না কেন। যেহেতু বিদেশি প্রচার মাধ্যমে দেশের পণ্যের বিজ্ঞাপন দেওয়া যাবে না এমন কোনও আইন দেশে নেই। থাকাটাও যৌক্তিক নয়। পণ্যের প্রসারে সহযোগিতা করার কথা যদি আসে, তাহলে বাংলাদেশি পণ্যের বিদেশি চ্যানেলে সম্প্রচারের কথাটিই জোরালো হয়। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের টিভি চ্যানেলগুলো যেভাবে বাণিজ্য সুবিধা বৃদ্ধিতে বিদেশি চ্যানেলে বিজ্ঞাপন প্রচারের বিরোধিতা করছে তেমনি পণ্যের উৎপাদকও নিজের ব্যবসায়িক সুবিধা চিন্তা করে ভারত কেন বিশ্বের যে কোনও স্থানেই দিতে পারে। তাকে নিবৃহ করার সযোগটাও যে খুবই কম।
এখানে একটা বিষয় স্পষ্ট হয়ে যায়- ভারতীয় চ্যানেলগুলো এদেশের মানুষের চাহিদা পূরণে ভূমিকা রাখছে এবং তাদের জনপ্রিয়তা এখানে আছে। আর দর্শক বিবেচনা করে পণ্যের বিজ্ঞাপন সেখানেও যাচ্ছে। আমাদের চ্যানেলগুলো সেদিকে নজর দিলেই পারে। যাতে করে আমাদের দর্শকরা বিদেশি চ্যানেল থেকে তাদের দৃষ্টি দেশে ফিরিয়ে আনতে পারে। প্রশ্ন হচ্ছে, সেদিকে নজর না দিয়ে কোন কারণে তারা জবরদস্তিমূলক দাবি উত্থাপন করছে তা বোধগম্য নয়। এই দ্বন্দ উভয়ের স্বার্থেরই নিরিখে বাঁধা।
একইভাবে আমাদের চ্যানেলগুলোর ভারতীয় বাজারে প্রবেশের বিষয়টিও আসে। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ তাদের চ্যানেলগুলোর স্বার্থ বিবেচনা করে বাংলাদেশের চ্যানেলগুলো সেখানে প্রচারের সুবিধা সঙ্কোচিত করে রেখেছে। তারা মনে করছে, বাংলাদেশের চ্যানেলগুলোর অনুষ্ঠান মান তাদের চাহিদা পূরণে সক্ষম নয়। আর বাণিজ্যিক চিন্তা করে তারা ভাবছে- কী দরকার বাংলাদেশের চ্যানেলগুলো এখানে দেখানোর। আমাদেরগুলোই চলুক না। অন্যের ভাগ বসানোর সুযোগ দিয়ে লাভ কি?
বাংলাদেশের চ্যানেলগুলো অন্তত এই দাবিটা করতে পারে। বাংলাদেশও যেন ভারতীয়দের মতো পদক্ষেপ গ্রহণ করে সেই ব্যবস্থা করিয়ে নিতে পারে সরকার মাধ্যমে। কই তারাতো এমন দাবি করছে না বাংলাদেশের ভারতীয় চ্যানেল দেখানো সঙ্কোচিত করা হোক। আমি মনে করি ভারতের অধিকাংশ চ্যানেলই বাংলাদেশে প্রদর্শন সুবিধা না পাওয়া উচিৎ। হিন্দির দাপটে আমাদের সাংস্কৃতিক ক্ষতির কথা বলা হলেও সেদিকে বাংলাদেশ নজর দিচ্ছে না। অথচ বাংলাদেশের তরুণদের একটি বড় অংশ সুরসুরি দেওয়া এসব চ্যানেলের ভক্ত। বাংলাদেশের চ্যানেল মালিকদের এদিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করি।
আমাদের চ্যানেলগুলোর অনুষ্ঠানের মান নিয়ে বহু কথা হয়েছে। ভালো অনুষ্ঠানের গ্রহণযোগ্যতা সবসময়ই থাকে। আর ভালো অনুষ্ঠান হলে কোনও বাধাই কার্যকর হবে না। এক্ষেত্রে আশির দশকের বাংলা টিভি নাটকের প্রসঙ্গ আনা যায়। অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং উন্নত মানের নাটক দেখার যে ক্ষেত্র তৈরি হয়েছিল, সেটি হালে নষ্ট হয়ে গেছে। যদি ওই মানের অনুষ্ঠান এখনও তৈরি করা যায় তাহলে বাংলাদেশের চ্যানেল ভারতীয় এলাকায় প্রবেশপথে যে বাধা পাচ্ছে সেই বাধাও অতিক্রম করা সহজ হবে। দর্শক চাহিদা থাকলে কিভাবে ভিন্নভাষাও দর্শকের প্রয়োজনে ডাবিং হয়ে যায় তাতো আমাদের চ্যানেলগুলোই দেখিয়ে দিয়েছে।
বিদেশি অনুষ্ঠান বাংলায় ডাবিং করার বিষয়টি নিয়ে যে আপত্তি দেখানো হয়েছে সেটাও বিতর্কের বাইরে নয়। প্রশ্ন আসতে পারে বিদেশি অনুষ্ঠানের বাংলা ডাবিং হচ্ছে কেন? আর বাংলাদেশের চ্যানেলগুলোইতো ডাবিং করা অনুষ্ঠান সম্প্রচার করছে।
নিশ্চয়ই তারা দেখেছে বিদেশি ওই অনুষ্ঠানগুলোর দর্শক বেশি। আর ওই শ্রেণির দর্শকদের কাছে টানার জন্যই তারা এটা করছে। এখানে আমাদের চ্যানেলগুলো শিক্ষা নিতে পারে। তারা ওই মানের অনুষ্ঠান তৈরি করলে তো বাংলায় ডাবিং করার প্রয়োজন পড়ে না। আর যদি না পারে তাহলে সেই বিশ্বায়নের দোহাই এখানেও দিতে হবে। বরং হিন্দিতে এসব অনুষ্ঠান দেখার চেয়ে বাংলায় দেখা যাচ্ছে এটাকে মন্দের ভালো বললেও দোষ কি।
এহেন অবস্থায় বাংলাদেশের টিভি চ্যানেলগুলোর মালিকরা বিদেশি টিভি চ্যানেলে দেশের বিজ্ঞাপন চলে যায় বলে যে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তাকে কতটা সমর্থন করা যায় চিন্তা করার আছে। বরং তাদের দেখতে হবে মূল জায়গায় গলদটা কী। বাংলাদেশের দর্শকরা যাতে ওই চ্যানেলগুলো দেখার উৎসাহ না পায় সেরকম কাজ তাদের করতে হবে। যদি ভারতীয় চ্যানেলগুলোর দর্শক এখানে কমে যায় তাহলে এমনি বিজ্ঞাপন যাওয়া বন্ধ হয়ে যাবে। আবার অবাধ প্রবেশের কারণে ভারতীয় চ্যানেলগুলো যেভাবে আধিপত্য বিস্তার করেছে সেটাও সঙ্কোচিত করতে হবে। তার জন্য ভারতীয়রা যেভাবে বাংলাদেশের চ্যানেলের প্রবেশাধিকার সঙ্কোচিত করেছে একই পলিসি অবলম্বন করতে পারে বাংলাদেশ। এটাতো স্বাভাবিক ভারত তার নিজের অর্থনৈতিক সুবিধা দেখবে। বাংলাদেশকেও একই চিন্তা করা উচিৎ। তবে সবার আগে প্রতিযোগিতামূলক পরিস্থিতি তৈরি করা জরুরি। এটাতো ঠিক আমাদের স্বার্থটা আমাদেরই দেখতে হবে।
প্রাসঙ্গিকভাবে প্রিন্ট মিডিয়ার একটি উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। একসময় কলকাতার সাপ্তাহিক দেশ বাংলাদেশে প্রায় একচেটিয়া বাজার দখল করে রেখেছিল। কিন্তু বাংলাদেশে যখন সাপ্তাহিক পত্রিকা ও দৈনিক পত্রিকা একের পর এক প্রকাশ হতে শুরু করল। এবং পাঠক যখন তাদের চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম হলো, বাংলাদেশে দেশ এর বাজার পড়ে গেলো। বাংলাদেশের বাজার এমনভাবে হ্রাস পেলো যে গত শতাব্দীর নব্বইয়ের দশকে সাপ্তাহিক পত্রিকাটি পাক্ষিকে পরিণত হলো।
অন্যদিকে হালে আমাদের দৈনিক পত্রিকাগুলোতে ভারতীয় বিজ্ঞাপন ছাপা হতে দেখা যাচ্ছে। পণ্যের বিজ্ঞাপন যেমন আছে তেমনি সেবার বিজ্ঞাপনও আছে। আমাদের পত্রিকার পাঠকদের কিন্তু ভারতীয় পত্রিকার জন্য লাইন ধরে থাকতে হয় না। বরং তারা সাপ্তাহিক দেশ থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়েছে। বাংলাদেশের পত্রিকাগুলো বাংলাদেশের প্রায় শতভাগ বিজ্ঞাপনই পাচ্ছে। এখানে ভারতীয় বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে আমাদের পত্রিকাগুলো। আমাদের চ্যানেলগুলোও কি সেই পথ অনুসরন করতে পারে না?
লেখক- সাংবাদিক, শিশুসাহিত্যিক ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক