মুক্তিযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর প্রশাসন চলে যায় পাকিস্তানি ভাবাদর্শের কর্মকর্তাদের হাতে। স্বাধীনতা লাভের পরপর রাজনৈতিক সরকারকে ব্যস্ত থাকতে হয় নাগরিক অস্তিত্ব রক্ষায়। এক কোটি মানুষের পুনর্বাসন, যোগাযোগসহ অবকাঠামোগত উন্নয়নে। প্রশাসনিক ব্যবস্থা রক্ষায় পাকিস্তানি বশংবদদের ওপর নির্ভর করতে হয় সরকারকে। যারা একাত্তরে পাকিস্তানি সামরিক সরকারকে সহযোগিতা করেছে মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার সুযোগ থাকার পরও তারা যুদ্ধপরবর্তীকালে সাদা কাগজে মুচলেকা দিয়ে নিজ নিজ অবস্থানে বহাল থেকেছে। মুক্তিযুদ্ধের প্রতি তাদের আনুগত্য তাই প্রশ্নবিদ্ধই থেকে যায়। যার প্রমানও অনেক ক্ষেত্রে স্পষ্ট। ফলে এই প্রশাসন মুক্তিযুদ্ধের মূলধারাকে সামনে আনবে এটা অস্বাভাবিক।
অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধের সরকারের প্রশাসনে নীরব কর্মকর্তাদের শ্রেণিগত অবস্থানও মুক্তিযুদ্ধের মূল্যায়ন কিংবা মুক্তিযুদ্ধকে ঊর্ধে তোলার মানসিকতা সম্পন্ন ছিল না। সেটাও তাদের অবস্থানগত কারণে। আরো ব্যাখ্যা করে যদি বলি বিষয়টা এমন হবে। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে তাদের শ্রেণির মানুষের হার ছিল খুবই কম। যেমন সরকারি সিনিয়ার কর্মকর্তাদের মধ্যে মাত্র ৬জন ডেপুটি সেক্রেটারি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের সক্রিয় কর্মী। এর বাইরে একজন সিনিয়ার কর্মকর্তা যিনি আবার আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলারও আসামী ছিলেন, সেই রুহুল কুদ্দুস সাহেবও মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন বিজয় দিবসের মাত্র কয়েকদিন আগে। ফলে স্বাধীনতা লাভের পর পুরো প্রশাসনেই ছিল মুক্তিযুদ্ধে অংশ না নেয়া লোকদের প্রাধান্য। এই অবস্থায় নিজ শ্রেণি স্বার্থ নেই বিধায় মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের মূল্যায়ন পিছিয়ে পড়ে।
আবার সামাজিক দিক দিয়েও যদি বিবেচনা করা হয়, তাহলেও দেখা যাবে জনযুদ্ধ পিছিয়ে থাকার কারণ বিদ্যমান। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের সামাজিক অবস্থান ছিল তৃণমূলে। আর্থিক বিবেচনায় তারা ছিলেন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর। নিন্মবিত্ত ও নিন্মমধ্যবিত্তদের প্রাধান্য ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে। ফলে স্বাধীনতা লাভের পর যখন প্রশাসন ও সামাজিক শাসন শুরু হয়, কর্তা ব্যক্তিদের শ্রেণি বহির্ভূত বিষয়গুলো উপেক্ষিত হয়।
যারা গবেষণা করেন তাদের মধ্যেও তৃণমূলের এবং অধিকাংশ মুক্তিযোদ্ধার বিষয়টি গুরুত্ব পায়নি। সেখানেও আর্থিক এবং সুবিধাবাদী মানসিকতা কাজ করেছে এমনটা বললেও ভুল হবে না। যে কারণে মুক্তিযুদ্ধ যে সর্বোত সাধারণ মানুষের প্রাধান্য নিয়ে পরিচালিত হয়েছে তা উপেক্ষিত থেকে গেছে। এ প্রসঙ্গে স্বাধীনতা আন্দোলনের সূচনাকালের অর্থাৎ ভাষা আন্দোলনের একটি গবেষণার কথা উল্লেখ করা যায়। ড. আতিউর রহমান ভাষা আন্দোলনের শ্রেণিগত একটা অবস্থান স্পষ্ট করেছিলেন অংশগ্রহণকারীদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক চিত্র তোলে ধরার মাধ্যমে। সেখানেও দেখা গেছে উচ্চবিত্তদের উপস্থিতি ছিল খুবই নগণ্য। মুক্তিযুদ্ধটা তারই ধারাবাহিকতা ছিল, এমনটা বললে বোধ করি ভুল হবে না।
একাত্তরের তরুণরা যুদ্ধ করেছে। স্বাধীনতা আন্দোলনে বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ ছাত্ররা নিয়ামক ভূমিকা পালন করেছে। ছাত্র নেতৃত্ব ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়–য়াদের হাতে। নেতৃত্বে থাকা উচ্চশিক্ষার্থীদের আকাঙ্খা ও তাদের বৈশিষ্ঠ চিন্তা করলে বলতে হয়- প্রভুত্ব ও ক্ষমতা। কর্মী কিংবা আত্মত্যাগের মানসিকতা খুব কম সংখ্যকেরই ছিল। যে কারণে আত্মত্যাগ করার প্রয়োজন যখন উপস্থিত হয় তখন তাদের মাঠে পাওয়া যায়নি। (ব্যতিক্রম ছাড়া)। এ কারনেই মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সংখ্যা ছিল তুলনামূলকভাবে কম। বয়স ও প্রতিষ্ঠান বিবেচনা করলে দেখা যায়- দশম শ্রেণি থেকে দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীরাই অধিক হারে যুদ্ধ করেছেন। স্বাধীনতা আন্দোলনকালেও এই বয়সের শিক্ষার্থীরা কর্মী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছে। সেখানেও শ্রেণিগত বিষয়টি স্পষ্ট। উচ্চবিত্ত আর উচ্চমধ্যবিত্তদের সন্তানরাই মূলত তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তো। রাজনৈতিক সচেতনতা তাদের স্বাধীনতা আন্দোলনে যুক্ত করলেও ত্যাগের প্রশ্নে তাদের পিছিয়ে পড়ার মানসিকতা তৈরি করে। কিন্তু এই শ্রেণিই স্বাধীনতা লাভের পর প্রশাসন থেকে সমাজ শাসনে প্রধান ভূমিকায় অবতীর্ন হয়। যে কারণে মুক্তিযুদ্ধের নিয়ামক শক্তি প্রান্তিক জনগোষ্ঠী উপেক্ষিত হয়। যদি সব শ্রেণির প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ থাকতো, তাহলে হয়তো আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস অন্যরকম হতো।
সামরিক, আধা সামরিক বাহিনীর হিসাবও যদি দেখি সেখানেও দেখবো পরিস্থিতি প্রায় একই। বাঙালি সামরিক অফিসারদের মধ্যে মেজর পদমর্যাদার উপরেও কিছু কর্মকর্তা ছিলেন। তারা একজনও যুদ্ধে যোগ দেননি। সেক্ষেত্রে কেউ যদি বলেন তারা পাকিস্তানে ছিলেন তাকেও সর্বোত মেনে নেয়া যায় না। ক্যাপ্টেন পর্যন্ত জুনিয়ার অফিসারদের অনেকেই পাকিস্তান থেকে পালিয়ে এসে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। সুতরাং এখানেও শ্রেণিগত বিষয়টা লক্ষণীয়।
অথচ আমাদের মুক্তিযুদ্ধে সেই সাধারণ মানুষ যা করেছে তা বিশ্বের যুদ্ধের ইতিহাসে বিরল। ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা সংগ্রামের আহ্বান নিয়ে কেউ কেউ কথা তোলেন। বঙ্গবন্ধুর ওই বক্তব্য যে স্পষ্টতই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার কথাই মনে করিয়ে দেয়। এরমধ্যে একটা গোষ্ঠীতো প্রকাশ্যেই বলতে থাকে বঙ্গবন্ধুর ভাষণে স্বাধীনতার কথা নেই। কিন্তু ওই যে তৃণমূলের মানুষ, নিন্মবিত্ত, নি¤œমধ্যবিত্ত গ্রামের খেটে খাওয়া মানুষ এবং অধিকাংশই অর্ধশিক্ষিত তারা ঠিকই বুঝেছিল বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন। শুধু তাই নয়, তিনি সশস্ত্র লড়াইয়ের কথাও বলেছেন। তা না হলে ৭ মার্চের পর থেকে অসহযোগ আন্দোলনের চেয়ে সশস্ত্র প্রস্তুতির দিকে তাদের ধাবিত হতে দেখা যায় কেন। তারা কিন্তু স্পষ্টতই বুঝেছিলেন অসহযোগ আন্দোলনে তারা সফল হয়েছেন। আর পরের স্তর যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে হবে তাদের। সেই বোধ থেকেইতো গ্রামে-গঞ্জে বাঁশের লাঠি নিয়ে প্রশিক্ষণ শুরু হয়। আরো যদি বলি এই সাধারণ মানুষ শ্রমিক কৃষক তারা এটা ৭ মার্চের আগেই বুঝতে পেরেছিল। আর সেই জন্যই ৭ মার্চের আগেই বাঁশ তাদের হাতের সঙ্গী হয়ে যায়। অন্তত যারা ঐতিহাসিক ৭ মার্চ দেখেনি তাদের বিনীতভাবে আহ্বান জানাবো ৭ মার্চের ওই সমাবেশের ভিডিও চিত্র দেখার জন্য। লাখ লাখ মানুষ বাঁশের লাঠি নিয়ে হাজির হয়েছিল রেসকোর্স ময়দানে। উপস্থিত শ্রোতাদেরও যদি পরখ করা হয় সেখানেও দেখা যাবে, শহুরে বিত্তবানরা একান্তই দর্শকশ্রোতা হিসেবেই সেখানে উপস্থিত ছিলেন। ( তবে তাদের মধ্যে দেশাত্মবোধের অভাব ছিল সেটা বলছি না)।
ওই আবেগপ্রবণ জনগোষ্ঠী সমাবেশ থেকে ফিরে গিয়ে আগের চেয়ে বেশি মনোযোগী হয় প্রশিক্ষণের জন্য। গ্রামের খেলার মাঠগুলো তখন তৈরি হয়ে যায় মুক্তিযোদ্ধার প্রশিক্ষণকেন্দ্র হিসেবে। এই প্রশিক্ষণে বিত্তবানদের অনুপস্থিতি স্পষ্ট। আবার যুদ্ধ শুরু হলে যখন মুক্তিযোদ্ধারা দেশে আসে লড়াই করতে। তখন তাদের আহার বাসস্থান থেকে শুরু করে আহত হওয়ার পর প্রাথমিক চিকিৎসার ভারও নিয়েছিল এই খেটে খাওয়া মানুষগুলোই। গ্রামের বিডি চেয়ারম্যানদের বেশিরভাগই ভাগই ছিল পাকিস্তানি সৈন্যদের সমর্থক ও তারা ব্যস্ত ছিল তাদের প্রিয় ভূমি পাকিস্তানকে রক্ষা করতে। তারাও ছিল মূলত গ্রামীণ বিত্তবান।
এমন অবস্থায় মুক্তিযুদ্ধের মূলধারা সাধারণ মানুষ উপেক্ষিত হওয়াটাই স্বাভাবিক। আর এ কারণেই মুক্তিযুদ্ধে একবারে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণের ইতিহাস লেখা হয় না। তাদের তাদের নিয়ে একটি গ্রন্থও প্রকাশ হয়নি। যা থেকে অন্তত বোঝা যায় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধটা ছিল একবারে তৃণমূলের মানুষের লড়াই। যেখানে ক্ষুদ্র একটি অংশ ছিল উপরের তলার মানুষ। যারা আজও সমাজ ও রাষ্ট্রকে নিয়ন্ত্রণ করেন।
লেখক- সাংবাদিক, শিশুসাহিত্যিক ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক।