জঙ্গিবাদ ইস্যু, বিএনপি এবং...

শান্তনু চৌধুরীক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ প্রায় অভিযোগ করেন, ‘বিএনপি একটি বিবৃতি সর্বস্ব দলে পরিণত হয়ে যাচ্ছে’। তারা সীমাবদ্ধ শুধু নয়াপল্টন কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের মধ্যে। বিশেষ করে দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের রসিক মানুস। তিনি কবিতার ঢঙে রসিয়ে রসিয়ে বিএনপির সমালোচনা করেন এবং বলেন, ‘বিএনপি বিবৃতি দিয়েই দায় সারে’। তিনি বলে থাকেন, বিএনপি দু’শ জন মানুষ নিয়েও রাস্তায় দাঁড়াতে পারে না। এর অবশ্য পক্ষে-বিপক্ষে নানা মত রয়েছে। ২৮ মার্চ সিলেটের আতিয়া মহলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সফল অভিযানের পর বিএনপি চেয়ারপারসনের পক্ষে দলটির প্রেস সচিব মারুফ কামাল খানের সই করা একটি বিবৃতি পাঠানো হয় সংবাদমাধ্যমগুলোতে।
সিলেটে অপারেশন টোয়াইলাইট এর শেষে সংবাদ সম্মেলনে সেনা গোয়েন্দা পরিদফতরের পরিচালক (ডিএমআই) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ফখরুল আহসানের বক্তব্য শেষ করার কয়েক মিনিটের মধ্যে (রাত ৮টা ৩০) বিবৃতিটি আসায় ধরে নেওয়া যায় সেটি আগেই লেখা ছিল। একই সঙ্গে অনেকদিন পর বেগম জিয়ার বিবৃতি হওয়ায় কৌতূহলও ছিল বেশি। কৌতূহলের আরও কারণও রয়েছে। হলি আর্টিজানে হামলার পর একটি বিবৃতিতে বিএনপি সরকারের বিভিন্ন কাজের সমালোচনা করে বলে, ‘আমরা বারবার উগ্রবাদীদের অমানবিক রক্তঝরা অশুভ পরিকল্পনা মোকাবিলা করার জন্য দলমত নির্বিশেষে পদক্ষেপ গ্রহণ করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলাম। কিন্তু সরকার আমাদের সেই আহবানকে উপেক্ষা করে বরং বিএনপিসহ বিরোধী দলের প্রতি বিষোদগারেই ব্যস্ত থেকেছে’। দুষ্কৃতকারীদের নির্মম রক্তাক্ত অভ্যুত্থান দেশে বিরাজমান দুঃশাসনেরই বহিঃপ্রকাশ বলে মন্তব্য করা হলেছিল বিবৃতিতে।
সময় প্রায় এক বছর কাছাকাছি গড়িয়েছে। জঙ্গিদের বিরুদ্ধে বিএনপির বড় ধরনের কোনও অবস্থান বা আন্দোলন চোখে পড়েনি। রাজধানীর কল্যাণপুরে জঙ্গি নিহত হওয়ার ঘটনার পর বিএনপি নেতা হান্নান শাহ সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন কল্যাণপুরে নিহতরা আদৌ জঙ্গি কিনা। সম্প্রতি বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা নানা জঙ্গি অভিযান নিয়ে প্রশ্ন তুলে সেটিকে সরকারের ফায়দা লোটার হাতিয়ার বলে মন্তব্য করেছেন। যেখানে জঙ্গি একটি বৈশ্বিক সমস্যা এবং সেটি মোকাবিলায় সারাবিশ্ব সোচ্চার সেখানে বিএনপির এ ধরনের বক্তব্য কোনও দায়িত্বশীল রাজনৈতিক দলের বক্তব্য হতে পারে না। সবচেয়ে বড় কথা ২৫ মার্চ গণহত্যা দিবসকে যখন সারাদেশের মানুষ পালনের সিদ্ধান্ত নেয় তখনও বিএনপি নিশ্চুপ। গণহত্যা কোনও বিতর্কিত বিষয় নয়, এটি একটি স্বীকৃত বিষয় এবং সেদিনের ঘটনা নিয়ে মাতৃভূমি প্রেমিক বাঙালির মাত্রই বেদনা রয়েছে, ক্ষোভ রয়েছে। এরপর সিলেটের হামলার ঘটনার সফল সমাপ্তি শেষে যখন বিবৃতি এলো বেগম খালেদা জিয়ার সেটি স্বভাবতই কৌতূহল জাগায়। বিবৃতির শেষে তিনি দোষারোপের রাজনীতি না করে সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদের সমস্যাকে জাতীয়ভাবে মোকাবিলার জন্য ক্ষমতাসীনদের প্রতি আহ্বান জানান। কিন্তু পুরো বিবৃতি জুড়েই রয়েছে ‘দোষারোপ’। তিনি প্রশ্ন না তুলেই প্রশ্ন করেছেন, ‘আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলেই কেন জঙ্গিবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠে, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও আমরা এ প্রশ্ন কখনো তুলিনি এবং এ নিয়ে  দোষারোপের রাজনীতিতেও লিপ্ত হইনি। বিশেষ কোনো সরকার বা দলের নয়, এটি একটি জাতীয় সমস্যা’। দেশের সকলকে এ সমস্যা নিরসনে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার অনুরোধ করা হয়।

বেগম খালেদা জিয়া বিবৃতিতে কোনও প্রশ্ন না তুলে বলেছেন, ‘বর্তমান একটি স্পর্শকাতর সময়ে জঙ্গিবাদের আকষ্মিক বিস্তার এবং স্বচ্ছতার অভাবে জনমনে নানা প্রশ্ন ও সংশয় দেখা দিয়েছে।’ আমার মনে হয় বিএনপি কোনও দুগ্ধপোষ্য দল নয়। এটির ঐতিহ্য রয়েছে কাজেই তারাই অনেক কিছু দেশবাসীর কাছে তুলে ধরতে পারে যদি কোনও সংশয় থেকে থাকে। তাছাড়া জঙ্গিবাদের বিপক্ষে সাধারণ মানুষ বা জঙ্গিপ্রিয় মানুষের মতো (যারা সংশয়বাদী, সবকিছুতে সংশয়প্রকাশ করেন) সংশয় প্রকাশ না করে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তুলতে পারে। কারণ মানুষতো জানে, কোন সরকারের সময় জঙ্গিবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল। প্রকাশ্যে মিছিল, সমাবেশ ও মানুষ খুন করেছিল শায়খ আব্দুর রহমান ও বাংলা ভাইরা।

সংবাদ মাধ্যমের বরাতে জানা গেছে, দেশব্যাপী বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে প্রায় ২৫ হাজার মামলা রয়েছে। এগুলোর চাপে দিশেহারা দলটি। মুখে আন্দোলনের কথা শোনা গেলো কার্যত মামলা সামলাতেই হিমশিম খাচ্ছে দলটির তৃণমূল থেকে কেন্দ্রীয় নেতারা। তথ্যানুসারে, বেগম জিয়ার বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত সচল রয়েছে ৩৪টি মামলা। দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বিরুদ্ধেও রয়েছে ১০৫টি মামলা, মহাসচিব মির্জা ফখরুলের বিরুদ্ধে রয়েছে ৮৫টি মামলা।

মামলার চাপে রয়েছেন স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার  মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, তরিকুল ইসলাম, এমকে আনোয়ার, ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ও সালাহউদ্দিন আহমেদের বিরুদ্ধে। বিএনপি নেতারা অভিযোগ করেন, সরকার তাদের মাঠে নামতে দেয় না। একই সঙ্গে মামলা থেকে বেরিয়ে মাঠের রাজনীতি চাঙা করার উপায় খুঁজছে দলটি। আমার মতে, এমন মোক্ষম সুযোগ বিএনপির কাছে অনেক এসেছে। কিন্তু তারা কাজে লাগাতে পারেনি। সরাসরি রাজনীতির কোনও কর্মসূচির মাধ্যমে না হলেও সামিজিক আন্দোলনগুলোর মাধ্যমেও তারা সাধারণ মানুষের কাছে যেতে পারে। সেক্ষেত্রে জঙ্গিবাদ ইস্যুটি কাজে লাগাতে পারে দলটি। এর মাধ্যমেই তারা সামাজিক আন্দোলনও গড়ে তুলতে পারে। কিন্তু এখন পর্যন্ত সেটি না দেখে যে দলের নেত্রী বলেন, ‘দোষারোপের রাজনীতি চাই না’, সে দলের নেতাকর্মীরা দেশে জঙ্গি আছে কী নেই তাই নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন। সংশয়ে সংকল্প টলে গেলে পাছে লোকেতো ফায়দা লুটবে। বিএনপিকে সেই অবস্থানটা পরিষ্কার করতে হবে। 

লেখক: সাংবাদিক ও সাহিত্যিক