সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে দীর্ঘ সাড়ে নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করে। সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহ তায়ালার কাছে শুকরিয়া, তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে এ বঙ্গীয় ভূখণ্ডে প্রেরণ করেছেন। বাংলাদেশের মানুষের স্বাধীনতা অর্জনের জন্য এ মানুষটি তাঁর সারাটি জীবন বিলিয়ে দিয়েছেন। এ দেশের মানুষের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করতে গিয়ে তিনি তাঁর জীবনের দীর্ঘ ১২ বছরের অধিক সময় কারাবরণ করেছেন। বাঙালি জাতির প্রতি তাঁর যে অগাধ ভালোবাসা ও বিশ্বাস ছিল, তা তাঁর বিভিন্ন ভাষণ এবং লেখনীর মাধ্যমে প্রকাশ পায়। প্রত্যেকটি মানুষের বঙ্গবন্ধুর ব্যাপারে সম্যক ধারণা পাওয়ার জন্য অসমাপ্ত আত্মজীবনী এবং কারাগারের রোজনামচা বই দুটি পড়া অত্যন্ত জরুরি। মহান এ মানুষটি স্বাধীনতার পরপরই যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটি দ্রুততম সময়ের মধ্যে সোনার বাংলা হিসেবে গড়ে তোলার যাবতীয় উদ্যোগ গ্রহণ করেন এবং সে পথে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট এ দেশের কিছু দেশদ্রোহী কুলাঙ্গার বঙ্গবন্ধুসহ তাঁর পরিবারের প্রায় সকল সদস্যকে হত্যার মাধ্যমে দেশের যাবতীয় উন্নয়ন কার্যক্রম নস্যাৎ করে দেশকে একটি ভয়ানক অন্ধকারে নিমজ্জিত করে। আল্লাহর অশেষ কৃপায় সৌভাগ্যবশত আমাদের আজকের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা এবং তাঁর বোন শেখ রেহানা সেদিন দেশের বাইরে থাকায় বেঁচে যান। ১৯৭৫ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত সময়কাল পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এ সময়কালে যারা দেশ পরিচালনা করেছে তারা কখনও দেশের মানুষের কথা ভাবেনি। বরং দেশের মানুষকে অন্ধকারে রেখে কীভাবে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি করা যায় তারই চেষ্টা করেছেন। ফলশ্রুতিতে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ ব্যবস্থা, কৃষি, শিল্পসহ সকল ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এক অমানিশার অন্ধকারে পতিত হয়। এমনকি যে জাতির জনকের নেতৃত্বে বাংলাদেশ নামক স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম হয়, তাঁর ব্যাপারে যে কোনও আলোচনা অলিখিতভাবে নিষিদ্ধ ছিল। শুধু তা-ই নয়, ইনডেমনিটি অধ্যাদেশের মতো কাল আইনের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারকাজ বন্ধ রাখা হয় এবং যারা এ ঘৃণ্য হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিল তাদের নানাভাবে পুরস্কৃত করা হয়। এসব চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্রের কারণে দেশ পিছিয়ে যায় দীর্ঘ ২১টি বছর।
এ সময়ের মধ্যে কোনোরকম অর্থ ব্যয় ব্যতিরেকে সাবমেরিন কেবল সংযোগ এর মাধ্যমে বিশ্বের সাথে যোগাযোগের দ্রুততম মাধ্যম আমাদের কাছে এলেও নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে সংযোগটি না নেওয়ায় দেশ তথ্যপ্রযুক্তি খাতে অনেক পিছিয়ে পড়ে। দীর্ঘ এ সময়কালে কোনও যথাযথ পরিকল্পনা না থাকার কারণে উন্নত বাংলাদেশ বিনির্মাণের কাজ পুরোপুরি থমকে যায়।
১৯৯৬ সাথে ক্ষমতার পালাবদলের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের শক্তি ক্ষমতায় এলে দেশের মানুষ দেশকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। দীর্ঘ ২১ বছরের অন্ধকার ঠেলে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্প হাতে নেওয়ার মাধ্যমে দেশকে সোনার বাংলা হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। কিন্তু বিভিন্ন দেশি ও আন্তর্জাতিক চক্রান্তের কারণে ২০০১ সালের নির্বাচনে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের শক্তি ক্ষমতায় আসতে না পারায় দেশের উন্নয়ন আবার মুখ থুবড়ে পড়ে, যার ধারাবাহিকতা চলতে থাকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত। ২০০৯ সালে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসেই দেশকে উন্নত বাংলাদেশ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য অনেক পদক্ষেপ গ্রহণ করে, যার মধ্যে ২০২১ সালের মধ্যে ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের পরিকল্পনা ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং সময় উপযোগী । ২০০৮ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নির্বাচনি ইশতেহার যা দিনবদলের সনদ নামে পরিচিত তাতে ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণভাবে উপস্থাপন করা হয়। শুরুতে ডিজিটাল বাংলাদেশ নিয়ে বিভিন্ন মহল বিরূপ মন্তব্য করলেও ধীরে ধীরে সকলেই এর গুরুত্ব অনুধাবন করতে শুরু করেন। বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা দেশরত্ন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুযোগ্য নেতৃত্বে ডিজিটাল বাংলাদেশ আজ পুরোপুরি বাস্তবায়নের শেষ পর্যায়ে। আজ ডিজিটাল বাংলাদেশ কোনও অলীক স্বপ্ন নয় বরং বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা তথা উন্নত বাংলাদেশ বিনির্মাণের ভিত্তিমূল।
ভিশন- ২০২১ হিসেবে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নির্বাচনি ইশতেহারে ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করার পর থেকে সরকারের ধারাবাহিকতা এবং আন্তরিকতার কারণে দেশের সার্বিক উন্নয়নে ডিজিটাল বাংলাদেশের ধারণাটি মুখ্য ভূমিকা রেখে চলছে।
বিগত ১১ বছরের চেষ্টায় আমার প্রিয় মাতৃভূমি এখন পরিপূর্ণ ডিজিটাল বাংলাদেশ। এ ডিজিটাল বাংলাদেশই হবে ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত বাংলাদেশ বিনির্মাণের ভিত্তিমূল।
ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের অগ্রগতি
২০০৮ সালের বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নির্বাচনি ইশতেহারে ২০২১ সালের মধ্যে ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের পরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়, যা রূপকল্প ২০২১ নামে পরিচিত। আনন্দের বিষয় এই যে, ২০২১ সালের আগেই আমরা ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের কাজ প্রায় শেষ করে এনেছি এবং দেশের বিভিন্ন সেক্টরে ডিজিটাল বাংলাদেশের ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
১. সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দফতর:
একসময় সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত তথ্য এবং প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট পেতে কী পরিমাণ ঝামেলা পোহাতে হতো তা মোটামুটি সবারই জানা। ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের অংশ হিসেবে সরকার তথ্য ও সেবাসমূহ সহজীকরণের লক্ষ্যে “বাংলাদেশ জাতীয় তথ্য বাতায়ন” শিরোনামে ওয়েব পোর্টাল তৈরি করে, যা বর্তমানে সরকারি সেবা প্রদানের তথ্য সম্বলিত বিশ্বের বৃহত্তম ওয়েব পোর্টাল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এ ওয়েব পোর্টাল ব্যবহার করে দেশের জনগণ দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত তথ্য এবং প্রয়োজনীয় ফরমসমূহ খুব দ্রুত সংগ্রহ করতে পারছেন। এমনকি বিভিন্ন বিষয়ে জনগণ তাদের অভিযোগও জানাতে পারছেন।
২. শিক্ষা:
রূপকল্প ২০২১ ঘোষণার পর থেকে ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে বিভিন্ন প্রকল্প, যথা স্কুল-কলেজগুলোতে ডিজিটাল ল্যাব স্থাপন, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যপুস্তকসমূহ আকর্ষণীয় ও সহজে ব্যবহারযোগ্য করার জন্য ‘e-book’-এ রূপান্তরকরণ, তথ্যপ্রযুক্তি খাতে গবেষণা প্রকল্প পরিচালনার জন্য উল্লেখযোগ্য সংখ্যক গবেষণা প্রকল্পের জন্য আর্থিক সহায়তা প্রদান, উচ্চশিক্ষার মনোন্নয়নের জন্য প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন, বিভিন্ন স্থানে হাইটেক পার্ক ও ক্যাম্পাস বেইজড IT Business Incubator স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ, ICT সম্পৃক্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন ইত্যাদি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীতকরণের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
৩. কৃষি:
বাংলাদেশ কৃষিনির্ভর অর্থনীতির দেশ। দেশের মোট জনসংখ্যার ৭০ শতাংশ কৃষি নির্ভর অর্থনীতির সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত। ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের অংশ হিসেবে কৃষি ক্ষেত্রে তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিতকরণের বিভিন্ন উদ্যোগ ইতোমধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো কৃষি বিষয়ক বাংলা ওয়েবসাইটের মাধ্যমে কৃষকদের তথ্য সেবা প্রদান। এছাড়া www.moa.gov.bd ওয়েবসাইট থেকে কৃষি সংক্রান্ত বিভিন্ন নীতিমালা, কর্মকৌশল সম্পর্কে কৃষকরা সহজেই অবহিত হতে পারছেন। মোবাইল ফোনের মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে কৃষকরা শহর এলাকায় ফসলের বাজার দর খুব সহজে জানতে পারছেন। এর ফলে কৃষকগণ মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য থেকে মুক্তি পেয়ে ফসলের ন্যায্য দাম পাচ্ছেন। কৃষি ক্ষেত্রে ব্যবহার উপযোগী বিভিন্ন দেশীয় পণ্য, যথা স্ব-চালিত কর্তনকারী যন্ত্র, আলুর উৎপাদন বৃদ্ধি সহায়ক যন্ত্র, সেচের জন্য লো লিফট পাম্প, সৌরচালিত পানির পাম্প, ভুট্টার খোসা ছড়ানোর যন্ত্রসহ অন্যান্য যন্ত্রের আবিষ্কার দেশের কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলছে।
৪. মৎস্য উৎপাদন:
ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার দেশের মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখে চলছে। অভ্যন্তরীণ মৎস্য আহরণে বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বে তৃতীয় স্থানে রয়েছে। বিভিন্ন টেকনোলজি ব্যবহারের কারণে গত দশ বছরে দেশের মৎস্য উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে । যুবসমাজ আজ প্রযুক্তির সহায়তা নিয়ে মৎস্য উৎপাদনের বিভিন্ন আধুনিক পদ্ধতি যথা Biofloc পদ্ধতিতে অল্প জায়গায় অনেক বেশি মাছ চাষ করে লাভজনক ব্যবসা করছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের ফলে মাছ চাষিরা সহজেই নতুন নতুন প্রযুক্তির সাথে পরিচিত হতে পারছে, যা তাদের বিভিন্ন অসুখ প্রতিরোধ করে সঠিক সময়ে বেশি পরিমাণ মৎস্য আহরণে সহায়তা করছে। প্রযুক্তির বদৌলতে মৎস্য চাষিরা বর্তমানে মাছের প্রকৃত দাম পায়, যা তরুণদের আরও বেশি করে মৎস্য চাষে উদ্বুদ্ধ করছে ।
৫. স্বাস্থ্য সেবা:
ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের একটি বড় কাজ হলো জনগণের স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিতকরণ। স্বাস্থ্য খাতে দক্ষ জনবল তৈরির লক্ষ্যে দেশে ইতোমধ্যে একাধিক মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয়েছে। Telemedicine (Ex. Jeeon), Appointment Scheduling (Ex. Doctor Ola), Emergency Response (Ex. Criticalink), Pharmacy Delivery (Ex. Bhalothakun, Pharma 71), মানসিক স্বাস্থ্য এবং প্রসূতি স্বাস্থ্য মতো বিষয়গুলো বাংলাদেশে বর্তমানে সহজেই পাওয়া যাচ্ছে।
৬. যোগাযোগ ব্যবস্থা:
যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রভূত উন্নয়ন ছাড়া একটি দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে দেশের সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার সার্বিক উন্নয়নে অনেক প্রকল্প ইতোমধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে। যার ফলশ্রুতিতে দেশের বিভিন্ন অংশের সাথে সড়ক যোগাযোগ সহজতর হয়েছে। স্বপ্নের পদ্মা সেতু নির্মাণের কাজও দ্রুতবেগে এগিয়ে চলছে এবং আশা করা যায় যে, ২০২২ সালের মধ্যে পদ্মা সেতু নির্মাণের কাজ শেষ হবে। ঢাকা শহরে মেট্রোরেল নির্মাণ প্রকল্প, চট্টগ্রামে শাহ আমানত বিমানবন্দরকে সংযুক্ত করে উড়াল সড়ক নির্মাণ, কর্ণফুলী নদীতে টানেল নির্মাণের কাজও দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে। টেলিযোগাযোগের ক্ষেত্রে দেশ যে কতদূর এগিয়েছে তার সবচেয়ে প্রমাণ হলো দেশে প্রায় ১৬ কোটির মতো মোবাইল গ্রাহক এবং দেশে 4G সেবা চালুকরণ। তথ্য প্রাপ্তির ক্ষেত্রেও জনগণ বর্তমানে অনেক কম ভোগান্তির শিকার হচ্ছে। বিভিন্ন ধরনের রাইড শেয়ারিং apps-এর মাধ্যমে ঢাকা ও চট্টগ্রাম শহরের জনগণ খুব স্বাচ্ছন্দ্যে যাতায়াত করতে পারছে। বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইটের মাধ্যমে দেশের TV channel-গুলো সম্প্রচার কার্যক্রম পরিচালনা করছে। সাবমেরিন ক্যাবল স্থাপনের মাধ্যমে বিশ্বের সাথে দ্রুততম সময়ের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপন সম্ভব হচ্ছে।
৭. দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা:
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহারের ফলে দেশে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনেক কম। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের রোল মডেল। ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপ যথা উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ, SMS-এর মাধ্যমে জনগণকে সচেতন করা, বিভিন্ন প্রিল্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় তথ্য বহুল সম্প্রচার দেশকে দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রথম সারির দেশসমূহের কাতারে নিয়ে যাচ্ছে। সাইক্লোন সেন্টার নির্মাণ, SMS-এর মাধ্যমে জনগণকে সচেতন করার ফলে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে।
৮. ভূমি ব্যবস্থাপনা:
বাংলাদেশের পারিবারিক বিরোধের অন্যতম কারণ ভূমি ব্যবস্থাপনা। আদালতে মামলাসমূহের অধিকাংশই ভূমি সংক্রান্ত। ডিজিটাল ভূমি ব্যবস্থাপনা ভূমি সংক্রান্ত বিরোধ মেটানোর ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখে চলেছে। ভূমি ব্যবস্থাপনার ডিজিটাইজেশনের ফলে জনগণ খুব সহজে ভূমি সংক্রান্ত বিভিন্ন নথি যথা নামজারি, জমির খতিয়ান সংক্রান্ত কাজসমূহ দ্রুত সম্পন্ন করতে পারছেন। এছাড়া জমি ও অ্যাপার্টমেন্ট ক্রয়-বিক্রয়ের বিভিন্ন ওয়েবসাইট চালু হওয়ায় জনগণ সহজে তাঁদের ক্রয়-বিক্রয় সম্পন্ন করতে পারছেন।
৯. সমাজকল্যাণ ও সামাজিক নিরাপত্তা:
ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের অংশ হিসেবে সমাজকল্যাণ ও সামাজিক নিরাপত্তার বিভিন্ন উদ্যোগ পরিলক্ষিত হচ্ছে। সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচির কারণে দেশের অসংখ্য প্রতিবন্ধী, বয়স্ক, বিধবা উপকৃত হয়েছেন। (দরিদ্র নারীদের ক্ষমতায়ন এবং অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য গৃহীত) পল্লি মাতৃকেন্দ্র কার্যক্রম, একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পসহ অন্যান্য প্রকল্প সমাজকল্যাণ এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলছে। বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের হটলাইন চালুকরণের ফলে জনগণের সেবা প্রাপ্তি সহজতর হয়েছে।
১০. ব্যবসা বাণিজ্য:
ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের প্রয়াস দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যকে গতিশীল করেছে। দ্রুততম ইন্টারনেট সংযোগের ফলে ব্যবসায়ীরা সহজেই দেশে-বিদেশের সাথে ব্যবসায়িক যোগাযোগ স্থাপন করতে পারছেন। দেশে বর্তমানে E-Commerce এবং M-Commerce জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এমনকি বিভিন্ন সোস্যাল নেটওয়ার্ক সাইট ব্যবহার করে অনেকেই ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা করছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ আজ তাদের পণ্য ক্রয়-বিক্রয়ের ফলে যথাযথ দাম পাচ্ছে।
১১. ব্যাংকিং:
ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের ফলে ব্যাংকিং খাতে অনেক ধরনের সেবা সহজতর হয়েছে। বর্তমানে আন্ত-ব্যাংকিং লেনদেন দ্রুততম সময়ের মধ্যে সম্পাদন করা হচ্ছে। ব্যাংকিংসমূহ ডেবিট কার্ড এবং ক্রেডিট কার্ড প্রণয়নের মাধ্যমে cashless লেনদেনের কাজকে সহজ করেছে। এছাড়া online account ব্যবস্থাপনার ফলে জনগণ খুব সহজে তাদের ব্যালেন্স চেক করা সহ অন্যান্য কাজ সহজে করতে পারছে।
উন্নত বাংলাদেশ বিনির্মাণে ডিজিটাল বাংলাদেশের ভূমিকা
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৪ সালের ৬ মার্চ জাতীয় সংসদে রূপকল্প ২০৪১ ব্যাপারে ধারণা প্রদান করেন। রূপকল্প ২০৪১ হলো বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা তথা উন্নত বাংলাদেশ বিনির্মাণ। ডিজিটাল বাংলাদেশই উন্নত বাংলাদেশ বিনির্মাণের ভিত্তিমূল। বিষয়টি মাথায় রেখে ডিজিটাল বাংলাদেশের sustainability- এর ওপর যথাযথ গুরুত্ব আরোপ করে এগিয়ে যেতে হবে। এক্ষেত্রে নিম্নলিখিত বিষয়গুলোর ব্যাপারে অতি দ্রুত যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা বাঞ্ছনীয়।
১. তথ্যের যথাযথ নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ।
২. ইন্টারনেট সেবার মান বৃদ্ধিকরণ।
৩. আইসিটি ক্যাডার সার্ভিস চালুকরণ।
৪. সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠানে চাকরিরতদের জন্য ওয়েজবোর্ড গঠন।
৫. আইসিটি নির্ভর কারিকুলাম অন্তর্ভুক্তকরণ।
৬. পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন।
৭. আইসিটি নির্ভর গবেষণা প্রকল্পের জন্য যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ।
৮. বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের দেশের উন্নয়নে অবদান রাখার সুযোগ বৃদ্ধিকরণ।
৯. দূর প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শিক্ষার বিস্তার ঘটানো।
১০. বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের মান উন্নয়নের জন্য যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ।
উন্নত বাংলাদেশ বিনির্মাণের জন্য যেসব বিষয়ে আলোকপাত করা প্রয়োজন তা হলো দারিদ্র্য ও ক্ষুধামুক্ত বাংলাদেশ, সুপেয় পানীয় এবং শতভাগ স্যানিটেশন ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণ, শতভাগ বিদ্যুতায়নের ব্যবস্থাকরণ, অর্থনৈতিক উন্নয়ন অবকাঠামোগত উন্নয়ন ন্যায়-বিচার নিশ্চিতকরণ, শিক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ। ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের ফলে উল্লেখিত বিষয়গুলোর বাস্তবায়ন সহজতর হবে।
যেমন, দারিদ্র্য ও ক্ষুধামুক্ত বাংলাদেশ বিনির্মাণের ভিত্তিমূল হলো অধিকতর ফসল উৎপাদন, ফসলের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি নিশ্চিতকরণ এবং যথাযথ বণ্টনের ব্যবস্থা গ্রহণ। ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের ফলে ফসল উৎপাদন, ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণ এবং বিতরণের ক্ষেত্রে বিভিন্ন আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার সহজতর হয়েছে। একসময় উত্তরবঙ্গে মঙ্গার যে কথা শোনা যেত, সরকারের যথাযথ উদ্যোগ এবং প্রযুক্তির ব্যবহার সে মঙ্গা মোকাবিলা করে দেশকে উন্নত বাংলাদেশের দিকে এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে অধিকতর খাদ্য উৎপাদন এবং পুষ্টির বিষয়টি নিশ্চিতকরণের জন্য ব্যাপক পরিমাণ কার্যকর বিনিয়োগের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। অন্য সকল ক্ষেত্রেও ডিজিটাল বাংলাদেশের সুবিধাকে যথাযথ ভাবে কাজে লাগাতে হবে।
বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ে তোলার মাধ্যমে দেশকে একটি সুখী সমৃদ্ধ ও উন্নত বাংলাদেশ বিনির্মাণের জন্য ডিজিটাল বাংলাদেশকে হাতিয়ার করে যার যার অবস্থান থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। আমাদের সৌভাগ্য বর্তমানে বাংলাদেশে একটি স্থিতিশীল অবস্থা বিরাজমান। ফলশ্রুতিতে সকলে মিলে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করলে ২০৪১ সালের পূর্বেই আমরা উন্নত দেশের কাতারে নাম লেখাতে পারবো। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় বাংলাদেশকে যখন বঙ্গবন্ধু কন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর গতিশীল নেতৃত্বে দৃঢ় পদক্ষেপে উন্নত বাংলাদেশ বিনির্মাণের দিকে অগ্রসর হচ্ছে, তখনই আবার ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে। অবশ্য এমন ষড়যন্ত্র নতুন নয়, দেশ-বিদেশে ঘাপটি মেরে থাকা দেশবিরোধী ষড়যন্ত্রকারীরা সর্বদা এসব করে আসছে। জাতির জনকসহ তার পরিবারের অধিকাংশ সদস্যকে হত্যার মতো ইতিহাসের জঘন্যতম ঘটনার মধ্য দিয়ে যার সূচনা হয়েছিলো। শুধু তাই নয়, আগের সরকারগুলো এই খুনিদের সর্বোচ্চভাবে পুরস্কৃত করেছিল। বর্তমানে পুনরায় যে দেশ বিরোধী প্রোপাগান্ডার সূচনা হয়েছে, তার পেছনে একই ষড়যন্ত্রকারীরা জড়িত। এমন পরিস্থিতিতে দেশবাসীর কাছে আমার আবেদন, আপনারা সচেতনভাবে চিন্তাভাবনা করে দেখুন আমরা কোথায় ছিলাম ও কোথায় আছি এবং কোথায় যাবার সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন হয়েছে। উন্নত বাংলাদেশ বিনির্মিত হলে আমি-আপনি সবাই কি এর সুফল ভোগ করবো না?
সত্যি করে বলুন তো বর্তমান নেতৃত্বের বাইরে বিকল্প কোনও নেতৃত্ব আছে যারা বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা তথা উন্নত বাংলাদেশ বিনির্মাণে নেতৃত্ব দিতে পারবে? একটি দেশের উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন দেশের স্থিতিশীলতা, যোগ্য নেতৃত্ব যাদের রয়েছে আন্তর্জাতিক চাপ উপেক্ষা করে দেশের স্বার্থে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, আমরা সবাই সচেতন থেকে যার যার অবস্থান থেকে কাজ করলে এবং যাবতীয় অপপ্রচার প্রতিরোধে সক্ষম হলে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে উন্নত বাংলাদেশ বিনির্মাণ করতে সক্ষম হবো। পরিশেষে বলবো, মহান আল্লাহ আমাদের প্রিয় বাংলাদেশকে যাবতীয় দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র থেকে রক্ষা করুন।
লেখক: অধ্যাপক, কম্পিউটার বিজ্ঞান ও কৌশল বিভাগ, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট)।